দায়িত্ব

দায়িত্ব
সকালে মা আমায় রান্নাঘরে নাস্তা বানানো অবস্থায় দেখে চমকে গিয়ে বললো,
~ তুই নাস্তা বানাচ্ছিস কেন? বউমার কি হয়েছে? আমি পানি দিয়ে ময়দা গুলতে গুলতে বললাম,
— শ্রাবণীর শরীরটা মা খারাপ লাগছে। রাতে হালকা পেট ব্যথা করেছিলো তাই সারা রাত ঘুমাতে পারে নি। এখন একটু ঘুমিয়েছে। মা আমার কথা শুনে রেগে চিৎকার করে বলতে লাগলো,
~বউ এসি রুমে আরামে ঘুমাচ্ছে আর জামাই এই গরমে নাস্তা বানাচ্ছে। বাহ্ জমিদারের মেয়েকে ভুল করে পুত্রবধূ করে বাড়িতে নিয়ে এসে পড়েছি। আমি মা’কে থামাতে চেষ্টা করলাম কিন্তু মা আমার কথা না শুনে একের পর এক উল্টো পাল্টা কথা বলতে লাগলো। মার এইসব কথা শুনে শ্রাবণী তাড়াতাড়ি রান্না ঘরে আসলো। আর আমাকে কানে কানে বললো,
– ঘুমিয়ে ছিলাম একটাবার তো আমায় ডাকতে পারতে না কি? শুধু শুধু কেন আমার কাজ করতে গিয়ে আমায় কথা শুনাও সকালের নাস্তার পর শ্রাবণীকে বললাম,
— তাড়াতাড়ি তৈরি হও তো একটু ডাক্তারের কাছে যাবো। আমার কথা শুনে মা বললো,
~সবে তিন মাস এখনি দুইদিন পর পর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে না কি? আমি মাকে বললাম,
— মা রাতে ওর পেট ব্যথা করেছিলো। হঠাৎ কেন ব্যথা করলো সেটা তো জানা দরকার। মা আমার কথাতে রেগে গিয়ে বললো,
~এই সময় একটু আধটু পেট ব্যথা করবেই। সহ্য করতে হয়। আমরাও তো মা হয়েছি। মার কথা শুনে শ্রাবণী আমায় বললো,
-আমার পেট ব্যথা নেই এখন। শুধু শুধু ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না।
এইকথা বলে শ্রাবণী অন্য রুমে চলে গেলো। আমি জানি শ্রাবণী অভিমানে কথাটা বলেছে। আসলে আমার আর শ্রাবণীর প্রেমের বিয়ে। যেটা আমার বাবা মা মেনে নেয় নি। মেনে না নেওয়ার অবশ্য কয়েকটা কারণ আছে প্রথম কারণ হলো শ্রাবণীর বাবার চরিত্র তেমন একটা ভালো না। সমাজে উনার যথেষ্ট বদনাম আছে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো ওদের আর্থিক অবস্থা আমাদের থেকে অনেক নিচে। এইজন্যই বাবা মা শ্রাবণীকে তেমন একটা সহ্য করতে পারে না। অথচ বাবা মা এটা বুঝে না এতে শ্রাবণীর কোন দোষ নেই। রুমে এসে দেখি শ্রাবণী জানালার গ্রিল ধরে আনমনে বাহিরে তাকিয়ে আছে। আমি পিছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
— মা’র কথায় রাগ করে আমাদের লাড্ডুকে কেন কষ্ট দিচ্ছো বলো? চল না ডাক্তারের কাছে জেনে আসি আমাদের লাড্ডু কেমন আছে। আমার কথা শুনে শ্রাবণী রাগে কুনই দিয়ে আমার বুকে আঘাত করে বললো,
– একদম মেরে ফেলবো আমার বাচ্চাকে উল্টো পাল্টা নামে ডাকলে। শ্রাবণীর কথা শুনে আমি হাসতে হাসতে বললাম,
— এখন আসো তো দেরি হয়ে যাচ্ছে সময় যত যাচ্ছে শ্রাবণীর শরীরটা একটু একটু করে ততখারাপ হচ্ছে। ইদানীং চেষ্টা করি শ্রাবণী টুকটাক কাজ গুলো আমি করে দিতে। মাঝে মধ্যে ওর চুল গুলো বেণী করে দেওয়া। গোসলের পর ওর ভেজা কাপড় গুলো ধুয়ে দেওয়া। খাবার খেতে না চাইলে নিজ হাতে খাইয়ে দেওয়া। এজন্য বাবা মা আমাকে অনেক কথা শুনায়। অবশ্য সে গুলো আমি তেমন একটা পাত্তা দিই না। সেদিন শ্রাবণীর ময়লা কাপড় গুলো ধুয়ে যখন ভেজা কাপড় গুলো ছাদে শুকাতে নিয়ে গেলাম তখন মা বললো,
– তোর লজ্জা করে না পুরুষ হয়ে বউয়ের শাড়ি ব্লাউজ ধুয়ে দিতে? আমি মুচকি হেসে মাকে বললাম,
— না মা, একদম লজ্জা করে না। তুমি যখন বাবার কাপড় গুলো ধুয়ে দাও তখন কি তোমার লজ্জা লাগে? আমার কথা শুনে মা বললো,
– স্বামীর কাপড় ধুঁয়ে দিতে লজ্জার কি আছে? আমিও তখন বললাম,
–তাহলে স্ত্রীর কাপড় ধুয়ে দিতে লজ্জার কি আছে?
রাতে ৩০ মিনিট ধরে খাবার প্লেট হাতে নিয়ে বসে আছি কিন্তু শ্রাবণী খাবে না। ওর শুধু এক কথা এখন খাবার খেলেই ও বমি করবে আমিও ওকে না খাওয়ানো পর্যন্ত জোরাজোরি করতে লাগলাম। এমন সময় মা রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
~বউকে যে আদর করে মুখে তুলে এত খাওয়াচ্ছিস পরে যে সমস্যা হবে সেটা বুঝিস কি? আমি অবাক হয়ে বললাম,
— পরে কি সমস্যা হবে? মা তখন বললো,
~বেশি খেলে পেটের বাচ্চা বড় হয়ে যাবে তখন ডেলিভারির সময় তোর বউ বুঝবে কষ্ট কি জিনিস
আমি মুচকি হেসে বললাম,
— মা যাও তো যা বুঝো না তা নিয়ে কথা বলো না… মা চলে যাবার পর শ্রাবণী আমার হাত ধরে বললো,
– মা হয়তো ঠিকিই বলেছে। আমি খাবো না। পরে যদি কোন সমস্যা হয় আমি শ্রাবণীকে জোরে একটা ধমক দিয়ে বললাম,
– চুপচাপ খাও বলছি। তা না হলে খবর আছে সকালের দিকে শ্রাবণী হঠাৎ করে বললো ওর পেট ব্যথা করছে। আমি যখন ওকে দিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবো তখন বাবা বললো,
– কোথায় যাচ্ছিস? আমি বললাম,
— একটু ডাক্তারের কাছে। ওর পেট ব্যথা করছে। বাবা আমার কথা শুনে রেগে গিয়ে বললো,
– প্রতিদিনিই কি তোর বউয়ের পেটে ব্যথা ওঠে? জগতে কি তোর বউ শুধু মা হচ্ছে আর কি কোন মেয়ে মা হয় নি? তাড়াতাড়ি দোকানে যা। দোকানে মাল নিয়ে কি যেন একটা সমস্যা হয়েছে। আমি বাবাকে বললাম,
— বাবা, শ্রাবণীকে ডাক্তার দেখিয়ে পরে যাই? কিন্তু বাবা আমার কথা শুনলো না। জোর করে দোকানে পাঠিয়ে দিলো। নিরুপায় হয়েই দোকানে গেলাম। দোকানে যাওয়ার ঘন্টা খানিক পরেই বাবা ফোন দিয়ে বললো শ্রাবণীর শরীর বেশি খারাপ আমি যেন তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসি। ওরা শ্রাবণীকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে। কথাটা শুনে আমি যে কিভাবে হাসপাতালে আসলাম আমি নিজেও জানি না৷ হাসপাতালে এসে পাগলের মত ছুটাছুটি করতে লাগলাম। বাবা মাকে ইমারজেন্সি রুমের বাহিরে দেখে জিজ্ঞেস করলাম শ্রাবণী কোথায়? মা আমার মাথায় হাত রেখে বললো, ভিতরে আছে দেড়ঘন্টা পর ডাক্তার এসে বললো,
-দুঃখিত বাচ্চাটাকে আমরা বাচাতে পারি নি। মনে হয় পেটে অনেকক্ষণ ধরে ব্যথা হচ্ছিলো। আপনারা যদি ব্যথা হওয়ার পরপরই নিয়ে আসতেন তাহলে হয়তো বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারতাম। আমি অস্পষ্ট স্বরে শুধু ডাক্তারকে বললাম,
–শ্রাবণী ঠিক আছে তো? ডাক্তার বললো,
– হ্যাঁ ঠিক আছে বাচ্চাটা মারা যাওয়ার পর শ্রাবণী একটু অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকে। মা মাঝে মাঝে শ্রাবণীকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে,
– আমি আগেই বলেছিলাম একটু কম খাওয়া দাওয়া করতে। বিছানায় শুয়ে না থেকে কাজ কর্ম করতে। এখন তো তার ফল পেলো। মার এইসব কথা বার্তা বাবার ধমক কেন জানি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। তাই আজ সকালে বাবা মা যখন টিভি দেখছিলো আমি উনাদের সালাম করে মাকে বললাম,
— মা আমি চলে যাচ্ছি। মা অবাক হয়ে বললো,
~কোথায় যাচ্ছিস? আমি মা বললাম,
— আমি শ্রাবণীকে নিয়ে চলে যাচ্ছি। কিন্তু যাবার আগে তোমায় কিছু বলতে চাই। মা, শ্রাবণী যদি আজ তোমার মেয়ে হতো তাহলে ওর সাথে এমনটা করতে পারতে? আমি ওকে খাইয়ে দিলে তোমার সমস্যা হয়, ওর টুকটাক কাজ করে দিলে তুমি শ্রাবণীকে যা তা বলো। মা, তুমিও তো আমায় জন্ম দিয়েছো। একটা মেয়ে যখন প্রথম গর্ভবতী হয় তখন ওর মনে কত রকম ভয় কাজ করে সেটা তো তুমিও জানো। তারপরও তুমি শ্রাবণীকে সাহস না দিয়ে উল্টে ভয় দেখিয়েছো। নিজের মেয়ে হলে এমনটা করতে পারতে মা? বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম,
— বাবা, আমি জানি শ্রাবণীর বাবার চরিত্র ভালো না। আর এর জন্য তোমাকে সমাজের অনেক মানুষদের থেকে নানা রকম কথা শুনতে হয়। কিন্তু এতে শ্রাবণীর কি দোষ বাবা বলতে পারো? ঐ রকম লোকের ঘরে শ্রাবণীর জন্ম হয়েছে এটাই তো শ্রাবণীর দোষ তাই না? বাবা আমি যেমন তোমার অনুমতি না নিয়ে শ্রাবণীকে বিয়ে করে অপরাধ করেছি তেমনি কিন্তু বাবা তুমিও অপরাধ করেছো। সেদিন যদি আমাকে দোকানে জোর করে না পাঠিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে দিতে তাহলে হয়তো আমার সন্তানটা বেঁচে যেতো। বাবা মা আমার কথা শুনে কিছু না বলে চুপচাপ বসে আছে। আমি তখন উনাদের বললাম,
— তোমরা আমার বাবা মা। তোমাদের প্রতি আমার যেমন কর্তব্য আছে তেমনি যে মেয়েটা পরিবারের সবাইকে ছেড়ে আমার হাত ধরে এইখানে এসেছে তার প্রতিও আমার একটা দায়িত্ব আছে। ওর প্রতি অবিচার কিভাবে করি বাবা? রাস্তার মধ্যে হঠাৎ শ্রাবণী আমার হাতটা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
-আমার বাচ্চাটা মারা গিয়েছে এটা আমার কপালের দোষ। শুধু শুধু মা বাবাকে অপরাধী বানিও না। আমি বাবা মার সাথেই থাকতে চাই। আমি শ্রাবণীর চোখের জলটা মুছে মুচকি হেসে বললাম,
— পাগলি, মাঝে মধ্যে কাছে আসার জন্য হলেও দূরে যেতে হয়। বাবা মা যখন ওনাদের ভুল বুঝতে পেরে যখন অনুতপ্ত হবেন তখন আমরা ঠিকিই চলে আসবো। মাত্র কয়েক দিনেরই ব্যাপার শ্রাবণী আমার হাতটা শক্ত করে ধরে আমার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদছে। আমার ও খুব কষ্ট হচ্ছে মা বাবাকে ছেড়ে যেতে। আচ্ছা লাড্ডু যখন আমাদের ছেড়ে চলে যায় তখন মনে হয় এমনটাই কষ্ট পেয়েছিলো যেমনটা আমি এখন পাচ্ছি বাবা মাকে ছেড়ে যেতে
গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত