পনেরোয় যে ভুলটি করার কথা ছিল সতেরোয় এসে আমি সেই ভুলটি করলাম। এক দেখায় শশির প্রেমে পড়লাম। শশি আর আমাদের বাড়ির ছাদের দূরত্ব তিন ফিট। মাঝরাতে আশেপাশে কেউ গান বাজালে ভাবতাম শশি বাজাচ্ছে। ঝড়ের ছেঁড়া পাতাকে ভাবতাম শশির লেখা প্রেমপত্র। ঝড়ো বাতাসগুলো আমার কাছে শশির তপ্ত নিশ্বাস । আমি সাজতে শিখলাম, অকারণ হাসি ও কথা বলা রোগে পেলো আমায়।
শশিরা মোহাম্মদপুর ছেড়ে কলাবাগানে চলে গেল। আমি পাগলের মতো হয়ে গেলাম। আশেপাশের সবাই বলতো সে আজকাল ভালো চাকরি করে। আমার মাতাল মাতাল পাগল অবস্থা দেখে মা সিদ্ধান্ত নিলেন আমায় বিয়ে দেবেন। শশির জন্যও মেয়ে দেখছে ঘটক। তাকে পটিয়ে ঘুষ দিয়ে আমার ছবি পাঠালাম ওদের বাসায়। এবারে কাজ হলো । এক বিকেলে শশি তার দুই বোন আর মাকে সাথে নিয়ে আমায় দেখতে এলো। শরবতের ট্রে হাতে দুরুদুরু পায়ে আমি বসার ঘরে গেলাম। দু’বছর পেরিয়ে গেছে। লজ্জা আর ভয়ে আমি নিচের দিকে তাকিয়ে আছি। তুমি নুসরাত? শব্দে আমার চমক ভাঙ্গে। শশিই বলছে।
হালকা নীল ফুলহাতা শার্ট আর গ্যাবার্ডিং এর অফ হোয়াইট প্যান্টের দিকে চেয়ে থাকলাম। আমার চুল টান করে বাঁধা। চোখে লেপ্টানো কাজল। আমি কাঁপছি। তারা চলে যাওয়ার তিনদিন পরে খবর নিয়ে জানা গেলো, এই আমাকে তাদের পছন্দ হয়নি। আমি নাকি বড্ড ছেলেমানুষ। রাগে দুঃখে আমার পিত্তি জ্বলে গেল। অভিমানে তিনদিন ভাত খেলাম না। চোখের জলে শুধু বালিশ না তিন বক্স ট্যিসুও ফুরোলাম। চতুর্থ দিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ওর অফিসে যাবো। ওর প্রতি আমার এই উচ্ছল আবেগের কথাগুলো নিজ মুখে ওকে বলবো। যেন অনন্তকাল অফিসের রিসিপশনে বসে আছি। এক সময় শশি এসে আমার পাশে বসলো। ওর হালকা পারফিউমের গন্ধ আমার নাকে লাগছে। সেই ঝকঝকে হাসি। অদ্ভুত পাগল করা চাহনি।
– এখানে একা বসে আছো কেন? চলো আমরা একটা পার্কে বা রেস্টুরেন্টে যাই। তোমায় খুব ক্লান্ত লাগছে। সে আমার হাতে হাত রাখলো। আমি আবেগে ভাসতে ভাসতে আমার গত চার বছরের সব অভিযোগ তার কাছে ঢেলে দিলাম। সে হাসতে হাসতে বললো, ‘খুব কষ্ট পেয়েছো তাই না! ‘ কিন্তু তুমি একবার ভাবো, প্রতিটি মানুষের তার প্রিয় মানুষটিকে বেছে নেয়ার অধিকার আছে । আমি নিজেও তার বাইরে নই।
– তাই বলে তুমি আমায় অপছন্দ করবে? তুমি কি আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজেছো? কদম ফুল পেড়ে এনেছো আমার জন্য! বাজি ধরে ফুঁচকা খেয়েছো? একটা ডাবে দুটি স্ট্র লাগিয়ে খেয়েছো? রবীন্দ্র সরোবরে বসে গালে হাত দিয়ে গল্প করেছো? আমার এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়েছো! মাঝরাতে টেলিফোনে ছেলে মেয়েদের নাম ঠিক করেছো! করোনি! তাহলে আমার সাথে তোমার এই সুন্দর সময়গুলো কেন কাটানো হবে না ! আমার অবুঝ চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে আমায় একটা আইসক্রিম কিনে দিল। আমি এক কামড় খেয়ে তার দিকে আইসক্রিম বাড়িয়ে দিলাম, সেও মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে গরমে ঘামতে ঘামতে আমার সাথে আইসক্রিম খেতে খেতে হাঁটতে লাগলো।
আমার খুব ইচ্ছে হলো বলি – আমিতো তোমায় ভালোবেসেছি। কেন তুমি আরো একটু বেশি করে ভালোবাসতে পারছো না! প্রথম দেখাতেই এতোটা ভালোবাসাবাসির কথা আমার বলা হয়ে ওঠে না। বাড়ি ফিরে আমি একদম ভালো মেয়ে হয়ে গেলাম। পড়াশোনায় জোড় দিলাম। ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। ও প্রায়ই কলা ভবনের সামনে আমার জন্য অপেক্ষা করে। আমরা হাত ধরে হাঁটি। আশেপাশে কেউ না থাকলে ও আমায় টুপ করে একটা চুমু খায়। চুমু যতো না জোড়ে শব্দ তারচেয়ে অনেক বেশি। আমি হাসি। মাঝেমাঝেই ও আমাকে শপিং করাতে নিয়ে যায়। আমার পছন্দমত কাপড় কিনে দেয়। এমনকি জন্মদিনে ও আমাকে একটা দামি ঘড়ি কিনে দিলো। অনার্স শেষ। আমার ইচ্ছে চাকরি করি। ওর ইচ্ছে আমি মাষ্টার্স করবো। বাবা মা বিয়ের চাপ দিচ্ছেন। আমি ওকে বলি। ও মিষ্টি মিষ্টি হাসে। আমরা ভালো আছি।
আজকাল একটা জব পেয়েছি। ভালো প্রতিষ্ঠান। বেতন ও বেশ ভালো। মা বলেন তোমার কোথায় কম আছে! যে তোমায় চাকরি করতে হবে! প্রথম বেতন পেয়ে ওকে নিয়ে বসুন্ধরার চয়নিকায় যাই। দুটি প্যান্ট শার্টের কাপড় কিনে বানাতে দেই। ফুড কোর্টে বসে রাজকচুরি খেতে খেতে গল্প করি। ওর পছন্দ নীল শাড়ি। অফিসে আজকাল শাড়ি পরছি । বেশ লাগে আমার। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সিএনজিতে দুজন গল্প করছি । আমার শাড়ি আঁচল ওর প্যান্টের কাছটা ছুঁয়ে আছে। আমি লজ্জায় লাল হই। ও বুঝতে পেরে একটু সরে বসে । আমার হাতে হালকা চাপ দিয়ে বলে ‘ দশ বছর হয়ে গেলো, তোমার লজ্জা গেলো না।
আজকাল আমাদের সিনেমায় পেয়েছে। প্রায়ই স্টার সিনেপ্লেক্সে হানা দেই দুজন। চিকেন ফ্রাই, কোক আর পপকর্ণ নিয়ে ভেতরে ঢুকি। বসে বসে খাই আর মুভি দেখি। আজকাল ও বড্ড দুষ্টু হয়েছে। সুযোগ পেলাই আমার কাঁধের কাছে নাক এনে গন্ধ শোঁকে। এতে নাকি ওর এনার্জির লেভেল বাড়ে। সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় শুয়ে আছি। মা এসে পাশে বসলেন। আমার ছোট দুবোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ভাইটিও বিয়ে করতে চাইছে। শুধু আমার অনুমতি চায়। আমি অনুমতি দিয়ে দিলাম। আলমারিতে বেশ কিছু গহনা জমেছে। সবই শশির দেয়া গিফট। চেন আংটি, দুল, নোজ পিন, লকেট। আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। চার বছর চাকরি করছি। এবার শুনছি অফিসে র্যাংক বাড়বে । জুনিয়র থেকে সিনিয়র হবো। এমন সময়ে অফিসের এমডি বদল হলো। নতুন বস। একদম আনস্মার্ট এর অধীনে কাজ করতেই বিরক্ত লাগে।
মাঝেমাঝে দেখা হয়ে গেলে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকি। ভদ্রলোক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খোঁজেন। কী বিরক্তিকর ! একদিন অফিস থেকে প্রায় সবাই চলে গেছে। উনার সাথে আমার লিফটের পাশে দেখা। আবার সেই মুখের দিকে তাকানো। আমি মুখটা কঠিন করে না দেখার ভান করতে চাই। হয়ে ওঠে না। কখনো কী তাকে দেখেছি! মনে পড়ে না। উনি আমাকে কিছু বলতে চান আমি চলে আসি। আজ আমাদের সিনেপ্লেক্সে গিয়ে ‘কৃষ্ণপক্ষ’ মুভি দেখার কথা। শশির জন্য টিকিট কেটে দাঁড়িয়ে আছি। তার আসার নাম নেই। এদিকে ছবি আরম্ভ হয়ে যাচ্ছে।
বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করে ভেতরে ঢুকি। পাশের সিটে পপকর্ণ, পাকৌড়া, স্প্রাইটের বোতল রেখে মুহিবের বোনের দুঃখে কাঁদছি। দেখি পাশ থেকে শশি আমায় ট্যিসু এগিয়ে দিচ্ছে। কখন এসেছে টেরই পাইনি। মুভি দেখা ভুলে ওর কাঁধে মাথা রাখি। ‘চলো আমরা আমাদের হবু ছেলে মেয়ের নাম রাখি। ‘ ও হেসে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। বাসরঘরে বউ রেখে কেউ বাইরে যায়! আমার অরুর জন্য বেশ কষ্ট হয়। বাইরে এসে দুজনে হাঁটছি। এই তুমি কৃষ্ণপক্ষ পড়েছো! না পড়িনি। বইয়ের অরু আরো সুন্দর। ঠিক তোমার মতো। আর তুমি বুঝি মুহিবের মতো ! আমরা দুজনেই হাসতে থাকি। কে বলেছে সুখ চির অধরা? বিরক্তি নিয়ে এমডির রুমে যাই। উনি আমায় ডেকেছেন। আমি মাথা নিচু করে বসে আছি। উনি বলছেন – আমাকে চিনেছো নিশ্চয়ই। আমি শশি।
তোমাদের প্রতিবেশী ছিলাম। এক বিকেলে তোমায় পাত্রী দেখতে গিয়েছিলাম। আমি চুপচাপ বসে থাকি। না শুনতে চাইলেও আমার কানে ভেসে আসে। বারো বছরের ইতিহাস। আমি একজন টিন এজার মেয়েকে নয়, একজন নারীকে পাশে চেয়েছিলাম। যে এসে আমার জীবন পূর্ণ করে দেবে। আমি তা পেয়েছিলাম। তবে সে সুখী হয়নি। আমার চোখের সামনে সবসময় দুটো অল্পবয়সী অভিমানী চোখ ভেসে উঠতো। বারো বছর আগে আমার অফিস থেকে যাকে মিথ্যে বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। আমি চুপচাপ কাঁদছি। আমি জানি সেদিনের মতোই আজো আমার কান্নার কোন আলাদা মূল্য নেই। সে এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো। মধ্য চল্লিশের এক মার্জিত ভদ্রলোক।
– নুসরাত, আমার স্ত্রী চারবছর আগে ওর বোনেদের কাছে আমেরিকা চলে গেছে। সেখানেই কারো সাথে ঘর বেঁধেছে। আমার সামনে আজ তুমি আবার ফিরে এসেছো। শুনলাম কোন এক অজানা কারণে তুমিও বিয়ে করোনি। চলো আমরা তাহলে ঘর বাঁধি। এবার আর আমার সহ্য হলো না। সোজা অফিস থেকে বের হয়ে চলে আসলাম। আমি বসুন্ধরার ফুডকোর্টের সামনে দাঁড়াই। আমার মনে আবার সেই অদ্ভুত আশা জাগে। শশি হয়তো এখনো টিকিট হাতে আমার জন্য সিনেপ্লেক্সের সামনে অপেক্ষা করছে। হয়তোবা খালি সিএনজির জন্য ছুটে রাস্তা পার হচ্ছে। নিত্যদিনের আমার এইযে গুছিয়ে শাড়িপরা, কাজল চোখে, ভ্রুর মাঝখানে কালো গোল টিপ, সব ওর জন্য। আমার হাতের নখে যে চোরা নেইলপলিশের ছোঁয়া, সেটাও নাকি ওকে প্রতিদিন মায়ায় ফেলে দেয়।
ওর নীল শার্ট, গলার নিচের হালকা ঘাম নাকের স্বেদবিন্দু যা আমাকে মায়ায় মায়ায় ভরিয়ে রাখে।
শশিই তো আমাকে বলেছিল – শোন আমরা দুজন এক ভালোবাসার সমুদ্রে নিরন্তর ছুটে চলেছি। আমরা কোন বন্দরে ভিড়বো না। শুধু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখবো। সেসব কি তাহলে ভুল ! বিকেলের রোদ ধর্ষিতা নারীর মতো মুখ লুকিয়েছে অনেকক্ষণ। অন্ধকারের চুল এলিয়ে একসময় রাত্রি এলেন। আমি শুধু হাঁটছি আর হাঁটছি। হয়তো সামনেই কোথাও শশি লুকিয়ে আছে। আড়াল থেকে আমায় দেখছে আর মিটমিট করে তার যাদুকরী হাসি হাসছে। ইচ্ছে হচ্ছিল চিৎকার করে বলি। ‘শশি শুনছো। কল্পনার তোমায় নিয়ে আমি বাস্তবের চেয়েও অনেক বেশি সুখে আছি।
গল্পের বিষয়:
গল্প 