নষ্ট ফোন

নষ্ট ফোন

বৃষ্টি গুলো ঝুম ঝুম করে পড়ছে টিনের চালে।জানালার ফাক দিয়ে মিহি শীতলায় ভরে গেছে ছোট্ট রুমটা।চোখটা নিভু নিভু হয়ে আসছি;হুট করেই যেন কখন ঘুমিয়ে পড়ব।ফোনটা কাঁপতে শুরু করল এরই মধ্যেই।চোখটা যেন খুলতে ইচ্ছে করছে না।চোখটা ধেয়ে ঘুমে বিভোর হতে চাইছে। হাতটা বাড়িয়ে মাথার সামনে থাকা টেবিলের ওপর থেকে মোবাইল আন্দাজে হাতে নিয়ে কলের আইকনটা ডান পাশে চেপে রিসিভ করেই চুপ করে রইলাম। ফোনের ওপাশ থেকে আভা শব্দে ভেষে এলো,

“নাম্বারটা ভুলে গেছেন?” মেয়ের কন্ঠে ঘুমটা চুপসে গেল না,কৌতূহল হলো না।মিহি শীতলায় যেন শরীর’টা ঘুমিয়ে যেতে চাইছে।আমি ঘুমো ঘুমো কন্ঠে জবাব দিলাম,

“হেয়ালি করা বাদ দিন,সোজা বলুন কে আপনি?”

“তিথি বলছি।”

তিথি নামটা শুনেই ফোনটা চোখের সামনে ধরলাম।বেশ অবাক লাগছিলো।একটা বছর পর হঠাৎ মেয়েটার খোঁজ,কতো খুঁজেছি মেয়েটাকে।এসব ভাবতে ভাবতে ফোনটা কেঁপে উঠল।ওপাশ থেকে যেন আর কোন শব্দ এলো,চুপ রইল।বুঝলাম ফোনটা বন্ধ হয়ে গেছে চার্জের অভাবে।চেয়ে দেখলাম বিদ্যুৎ নেই। পর দিন ফোনটা আর অন হলো না।অনেক চেষ্টা করেও অন করতে পারলাম না।মেরামত করতে দিলাম শেষমেষ,পজেটিভ রেজাল্ট আসলেও চার দিন সময় চেয়েছে। রাত তখন দশটা বেঁজেছে।সারা দিন ফোনটার অপেক্ষায় ছিলাম।কিন্তু সময়টা আমার হবার নয়,হয়তো এর জন্যই সুযোগটাও বেইমানি করল। দশটায় বাসায় আসার আগে এক প্যাক সিগারেট নিলাম।কারণ এতো রাতে আজ আর পেটে ভাত জুটবে না।জানি সিগারেট পেট ভরাবে না,তবে মনের জ্বালার খিদেটা হাল্কা হলেও কমাবে।না খেয়ে দুইটা রাত পার করা তেমন কোন ব্যপার না।

সিগারেট খাওয়ার দীর্ঘতা ঘিরে তিথিকে নিয়ে ভাবছি।যদি আর দুই’টা পার্সেন্ট চার্জ থাকত।তাহলে হয়তো মেয়েটার সাথে আবার কথা হতো,আমি সবটা উজার করে তাকে বলে হাল্কা হতাম।কিন্তু ভাগ্য’টা দীর্ঘশ্বাস উজার করে বুকটা ব্যথায় পরিণত করতে বড্ড ব্যস্থ হয়ে উঠেছে। সিগারেট শেষ!রাত সাড়ে তিন’টা।বুকটা মৃদু চিন চিন করছে কেন জানি।বড্ড চিৎকার করতে মন চাইছে।বুকের পাথর চাপা কষ্টগুলো মানুষকে হাঁসায়,তবে বুক ব্যথা নিয়েই হাঁসাবে।মাঝে মাঝে মিথ্যে হাঁসলে বুকের বাম পাশটা মোচর দিয়ে উঠবে,গা শিউরে উঠবে। সকালটা ছাদেই হলো।সকাল দশটার দিকে ফারাবী এসে তাঁর দ্বিতীয় ফোনটা দিয়ে বলল, “দেখ তিথি’কে খুঁজে পাস কি না!তোর’টা যতোদিন ভালে না হয় আমারটা ব্যবহার কর।”

অনলাইন বসলাম রাতে।ঢুকেই তিথির ম্যাসেজ পেলাম। “ফোন কেটে দিলি কেন?” দু’দিন আগের ম্যাসেজ ছিল এটা।যেদিন ফোনটা নষ্ট হলো।আমি সিন কারার পরপরই টং করে ম্যাসেজ ভেষে উঠল তিথির! “কলেজ ক্যাম্পাসে অনেক দিন আসিস না,আসবি আজ?” বুঝলাম মেয়েটা গুরুদাসপুরেই আছে।বাসায় এসেছে হয়তো ছুটিতে।আমার এসব ভাবাতে ম্যাসেজ সিন হলেও রিপ্লাই করি না আমি।আবার ম্যাসেজ আসে তিথির,

“কাল ক্যাম্পাসে তোর জন্য অপেক্ষা করব।” আমি এবার তড়িঘড়ি করে রিপ্লাই দিলাম,

“সময়টা পার হয়ে গেছে!কলেজ ক্যাম্পাসে এখন আমাদের গল্পটা মানায় না।আর শাড়ী পড়বি কাল?”

কথাটা লিখে পাঠালেও সিন হলো না আর।ততক্ষণে তিথি অফলাইন হয়েছে।মেয়েটাকে শাড়ী’তে বেশ মানায়।এর জন্য ওর জন্মদিনে একটা শাড়ী গিফট করেছিলামও।শাড়ী পড়ে মেয়েটা হাঁসলে চাঁদটা যেন মাটিতে নামে।হাঁসলেই টোল পড়বে মেয়েটার ডান গালে।অনেকবার চেষ্টা করেছি তিথির হাঁসিময় টোল পড়া ছবি তুলতে;অথচ বরাবরই ব্যর্থ হয়েছি। পর দিন মেয়েটার দেওয়া শার্ট পড়ে বের হলাম।আলমারিতে রাখা ছিল,পড়িনি সাহস করে।ফোনটা কাঁপাতে বাস্তবে ফিরলাম।আয়নার সামনে বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে।বিছানা থেকে ফোনটা হাতে নিতেই ম্যাসেঞ্জারে কল পেলাম তিথির।ফোনটা কেন জানি রিসিভ করলাম না।কেটে দিয়ে ম্যাসেজ করলাম,

“রেডি হয়ে আসছি,আধা ঘন্টা লাগবে।”

“আমার দেওয়া শার্ট পড়ে আসবি?”

“না,নিজের কেনা শার্টে আসব।”

কেন জানি লুকাতে ইচ্ছে করল কথাটা।ম্যাসেজটা সিন হলো,কিন্তু রিপ্লাই আর আসল না।আমি তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে কলেজের দিকে রওনা দিলাম। দু’বছর পর কলেজেটাতে আসলাম।ইন্টারের পর আর আসা হয়নি কলেজটাতে। ক্যাম্পাসে পা দিতেই মেয়েটাকে পাইকর গাছের নিচে বসে থাকতে দেখলাম। বুকে এক প্রকার ধুকধুকানি নিয়ে আগাচ্ছিলাম।অস্বস্তি লাগছিলো কেন জানি!ইতস্তত লাগছিলো তিথির সামনে দাঁড়াতে। তিথির সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম তারপরও কিছুক্ষণ!মেয়েটা ফোনের দিকে তাকিয়ে।সামনে পেছনের খেয়াল নেই।আনমোনা লাগছে লাজুক মেয়েটাকে।হাঁসলে যেন এখন তাঁকে বিচ্ছিরি লাগবে।

“তোরিও,কখন আসলি?” তিথি’র কথায় ঘোরটা কাটল।বুঝলাম তাঁর দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছিলাম।খানিকটা ইতস্তত করে চোখটা নামিয়ে জবাব দিলাম,

“এইত এক মিনিট হবে,কেমন আছিস?” মেয়েটা আমার কথার প্রত্যুত্তর না দিয়ে বলে,

“পাশে বস,অনেক দিন গল্প হয় না।”

“একটা বছর অনেক দিন না,অনেক রাত।”

তিথি আমার কথায় বৃথা হাঁসে।মিথ্যে হাঁসিটা কেন জানি বিচ্ছিরী লাগে আমার কাছে।আমি চুপ থাকি!রাগ হয়,অভিমান হয়।কিন্তু নালিশটা করা হয় না। “চুপ থাকবি?গল্প করার জন্য না তোকে ডাকলাম।কিছু সময় ভালো থাকব বলে তোকে ডাকা।” তিথির কথায় আমার ভেতরে একটা দীর্ঘশ্বাস জড়ো হয়।ফেলতে পারি না,বুকটা আটকে আসে।কারণ দীর্ঘশ্বাস নিলেই মেয়েটা আমার দূর্বলতা বুঝে ফেলবে।তাঁর কিছু সময় ভালো থাকাটা হবে না।আমি চাই সে কিছু সময় ভালো থাকুক। আমি মৃদু হাঁসিতে দীর্ঘশ্বাস’টা ছেড়ে দিয়ে বলি!

“শাড়ী পড়লে বেশ লাগে তোকে।”

“এটা গতো বছরে কেনা।তোর নীল রঙের শাড়ীটা যত্ন করে রেখেছি।”

“তোর শার্ট আজই প্রথম পড়েছি,যত্নেই ছিল একটা বছর।”

“বুঝেছিলাম যখন ম্যাসেজ করে বললি আমার দেওয়া শার্ট পড়বি না।যাই হোক শার্ট’টা দিবি আমাকে?”

তিথির কথায় চুপ থাকি আমি।আমার কোন প্রত্যুত্তর দেওয়ার থাকে না। আমি শার্ট’টা খুলে ফেলি।তারপর তিথি’র হাতে দেই।মেয়েটা শার্ট হাতে পেয়ে মৃদু হাসে।হাঁসিটা মিথ্যে লাগে। পরিশিষ্ট শরীরের টি-শার্ট দেখে তিথি হাঁসে!যেন মেয়েটা অনেকদিন পর হাঁসে এমন করে।ডান গালে টোল পড়ে নিমিষেই।আমি চেয়ে থাকি,চুপিচুপি দেখি। “তোর বার্থডের টি-শার্ট না এটা?” তিথি’র এমন হাঁসাতে বুকটা মোচর খায়।গা শিউরে উঠে।মুখে মৃদু হাঁসি ফুটিয়ে তখন জবাব দেই, “তোর রঙগুলো এখন ধুয়ে ফেলতে পারিনি,সব ডিটারজেন্ট ট্রাই করেছি;যায় না।” “থাকুক না,সময়টা মনে করে সৃতি আঁকবি;ভালো লাগবে,মনে পড়বে আমাকে।” আমার বুকের বাম পাশটা হাল্কা হয়।দুজনেই হাঁসি।এরই মাঝে একটা বছরে আগের সৃতি মনে করি।ফিরতে চাই কল্পনার নৌকায় করে সময়টাতে,কিন্তু সময় কখনও ফিরবে না জানি।

দুপুর গড়াচ্ছে,এই করে করে বিকেল হতে চলেছে।দুজন ক্যাম্পাসের পুকুর পাড়ের পথটা ধরে হাঁটছি।কেন জানি একটা শীতল প্রবাহ ভেতরটা দিয়ে বয়ে চলেছে।সময়টা ধরে রাখতে বড্ড মন চাইছে।বার বার হাত ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছি।মিনিটগুলো আজ বড্ড স্বার্থপর হচ্ছে,ঘন্টাগুলো বেইমানি করছি ভালো থাকার সময়টাতে। সূর্যটা পশ্চিমা আকাশে হেলে পড়েছে।আকাশটা লালচে রঙে রাঙানো।মিহি শীতলতা কাজ করছে শহরটাতে।কেমন জানি অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছে। “তোর সাথে কথা বলে আমার সময় সত্যিই অনেক ভালো কাটে,আগেও এখনও।” কথাটা বলে মেয়েটা মৃদু হাঁসে।কথাটার প্রত্যুত্তর চায় না আর বুঝতে পারি।দুজন কলেজের পথ ধরে হাঁটতে থাকি।হয়তো মেয়েটাকে ভালো রাখতে পেরেছি। আমারও কেন জানি ভালো থাকতে ইচ্ছে হয়,লোভ হয়!মেয়েটার থেকে নাম্বার চাইব চাইব করে চাইনা।সাহস হয় না।তারপরও সাহস করি!

“নাম্বারটা দিবি তোর?” তিথি আমার কথায় থমকে দাঁড়ায়।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,

“আমি তোর কে আরেকবার বলবি?”

“প্রিয় বন্ধু!হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

“প্রিয় কেন এটা বল?”

“কারণ ভালো লাগায় বন্ধুত্ব আমাদের,বন্ডিং মিলে;তাছাড়া বন্ধুত্ব শব্দটা এমনি এমনি হয়নি।অনেক ঝড়ঝাপটা পাড় করে হয়েছে।” “তাহলে নাম্বার চাইবি কেন?পেয়ে যাবি।” বলেই দুজন আবার গুটি গুটি পায়ে হাঁটি।সন্ধা হতে চলে।শহরের হলুদ আলোগুলো জ্বেলে উঠেছে।দুজন যেন আর কথা বলি না।নিশ্চুপে হাঁটতে শুরু করি।আমার কেন জানি হাঁটতে ভালো লাগে।হয়তো পাশের মেয়েটার জন্য’ই ভালো লাগে।

রাতে অপেক্ষা করি তিথির ফোন কলের জন্য।বুকটা মৃদু মৃদু ব্যথা করে।ছোট্ট ছোট্ট করে দীর্ঘশ্বাস নেই।রাতগুলো গভীর হয়।ফোন আসে না। ঘন্টাগুলো একটা সময় দিনে পরিণত হয়।দিনও চলে যায়।ফোনের রিংটোন বাঁজে না। মাসটা শেষ হতে চলছে।তিথির সাথে আর কথা হয়নি।সে একটা দিন ভালো থাকলেও আমার আর ভালো থাকা হয় না। আসলে যার সাথে কথা বললে ভালো থাকতে পারব;ঠিক সেই মানুষটাই আমাকে খারাপ রাখবে।কথা বলবে না,বাহানা খুঁজবে দূরে থাকার। “তোরিও তোর নষ্ট ফোনটা ভালো হয়েছে এই নে।” ফারাবী’র কথায় ডাইরীটা লুকিয়ে ফেলি।তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে টেবিলের ওপর রেখেই ফারাবীর ফোনটা ফেরৎ দিয়ে বলি, “নষ্ট ফোনটা সাড়ল কি করে?তুই না বললি ফোনটা ঠিক হবে না।”

“হলো কি করে জানি না।ভাগ্য ভালো তোর।” এই বলে ফারাবী চলে যায়।আমি টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা হাতে নেই।ডায়াল লিস্টে ঢুকেই শেষ কথা বলেছি তাঁর নাম্বারটা দেখতে পাই!তিথির নাম্বারটা আমার চোখে জ্বল জ্বল করে। ডাইরীতে নাম্বারটা লিখতে চাই,কিন্তু লিখি না।থেমে যাই। বুকে কিঞ্চিৎ ব্যথা করে নিমিষেই।ফোনটা পরপরই মাটিতে পিশে দেই,ফোনের স্ক্রিন ভেঙ্গে দু ভাগ হয়। এবার আর ভালো থাকতে চাই না কাউকে ভেবে;কারে সাথে কথা বলে।নিজে একাকিত্ব নিয়ে নিশ্চুপে ভালে থাকতে চাই।একা ভালো থাকতে চাই।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত