মোবাইলে নামাজ

মোবাইলে নামাজ

দেশে টেলিভিশন আসে নাই। নতুন ফোন আবিষ্কার হয়েছে। কোনো এক পরিস্থিতির জন্য ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষেধ। এদিকে রমজান মাস এসে গেছে। মসজিদেও যাওয়া যাচ্ছে না। সরকার ঘোষণা দিয়েছে নামাজ হবে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। একটা ইমার্জেন্সি নম্বর চালু করা হয়েছে। সেখানে সবাই কল দিয়ে সংযোগ করলে একজন ইমামকে নামাজ পড়াতে শুনা যাবে। ফোন লাউডে রেখে তার সঙ্গে সঙ্গে নামাজ পড়তে হবে। বাবা নতুন মোবাইল কিনেছে। লাউড স্পিকারও ভালো। ফোন সামনে লাউডে রেখে নামাজ আদায় হবে। বাড়ির সবাইকে বড় ঘরটাতে হাজির করা হয়েছে। বাবা বাড়ির কাজের লোক রশিদকে বললেন, ওই রশিদ ফোন লাগা। নামাজ শুরু হবে। রশিদ ফোনে নির্দিষ্ট নম্বরটি তুলে ফোন দেওয়ার খানিকক্ষণের মধ্যেই বলে উঠল, ‘তওবা তওবা! নাউজুবিল্লাহ্ দুলাভাই! এ আমি কি শুনলাম! ছিঃ ছিঃ বেটি মাইনষে নামাজ পড়ায়। এ আমি নামাজ পড়ুম না দুলাভাই। তওবা তওবা!’ বাবার ভ্রু সংকুচিত হলো। ধমক দিয়ে বলল,

– কী বলিস যা তা? মেয়ে লোকে নামাজ পড়াইবো ক্যান? বাবা ফোন নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘নে দ্যাখ তো! ও মনে হয় ভুল নম্বরে ডায়াল করেছে।’ নম্বর দেখলাম সঠিকই আছে। ফোন দিলাম। ওপাশ থেকে বলে উঠল, ‘আপনার যোগাযোগকৃত নম্বরটি ব্যস্ত রয়েছে।’ এই তাহলে ঘটনা? ফিক করে হেসে উঠলাম বাবার সামনে। যার দরুণ আমাকে ‘বেয়াদব’ উপাধি দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হলো। বের হয়ে আমি আমার ঘরে চলে এলাম। তারাবিহ তো পড়তেই হবে। ফোনটা হাতে নিলাম। আমার ফোনের লাউড স্পিকারটা বেশি ভালো না! তবে অল্প অল্প শুনা যায় কানে ঠেসে ধরে রাখলে। কল দিলাম ইমার্জেন্সি নম্বরটাতে। কিন্তু নেটওয়ার্কও আজ সায় দিলো না। কিছুই শুনা যাচ্ছে না।

অগত্যা বের হয়ে চুপিচুপি বড় ঘরটায় এলাম আবার। সবাই নামাজে দাঁড়িয়ে গেছে। সামনে একটা টেবিলের উপরে মোবাইল ফোন রাখা। আমি পিছনের সারিতে দাঁড়ালাম। এখান থেকে ফোনের আওয়াজ শুনা যাচ্ছে না। আশেপাশের মানুষদের অনুসরণ করে রুকু, সেজদা করছি। এভাবে প্রথম দু’রাকআত শেষ হলো। আবার নামাজ শুরু হয়ে গেছে। সবাই তাড়াতাড়ি উঠে হাত বেঁধে দাঁড়িয়েছে। আমিও দাঁড়ালাম, তাদের সঙ্গে সেজদায়ও গেলাম। সেজদায় আছি অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, প্রায় তিন মিনিটের মতো। তবুও কেউ সেজদা থেকে উঠছে না। এদিকে পশ্চাৎদেশে একটা মশা এত্ত জোরে সুচ ফুঁটিয়েছে যে ব্যথায় আমি লাফিয়ে উঠে বসলাম। পেছনের অংশে হাত বুলাতে বুলাতে দেখলাম কেউ এখনো উঠেনি। আমার পাশে নামাজ পড়ছে বড় চাচা। সে মাথা তুলে বলল, কী হচ্ছে এসব? সেজদায় ক’ঘন্টা থাকতে হয়?

তার কথায় সবাই একে একে নামাজ ছেড়ে দিয়েছে। বাবা বলল, এমন তো হওয়ার কথা না। বাবা ফোনের কাছে গিয়ে বিরক্তির ছাপ নিয়ে সবার দিকে তাঁকালো। ফোন বন্ধ হয়ে গেছে, চার্জ নেই। কী অসহ্যকর অবস্থা! এভাবে নামাজ পড়া যায় নাকি? খানিক্ষণ পর সবাই আবার নামাজ শুরু করেছে। এবার ফোন বন্ধ হওয়ার চান্স নেই। ব্যাটারিতে চার্জ করা হয়েছে। সবাই নতুন উদ্যমে নামাজে দাঁড়িয়েছে। এবার বিপাকে বাধল রুকুতে গিয়ে। রুকুতে গিয়েছে অথচ উঠার নামই নেই। এবার বাবা নিজেই সবার আগে নামাজ ছেড়ে ফোনের কাছে গেল। এবারও বিরক্তির ছাপ মুখে। ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাওয়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বাবা ঘর থেকে অনেকগুলো কার্ড এনে রিচার্জ করল। সবার দিকে তাঁকিয়ে বলল, এবার আর অসুবিধা নেই।

অসুবিধা হওয়ারও কথা না। চার্জ আছে, যথেষ্ঠ ব্যালেন্সও আছে। বাবা সবাইকে নামাজে দাঁড়ানোর আদেশ দিলেন। ছানা পড়ার পরে মাত্র ইমাম সাহেব বোধহয় সূরা পড়া শুরু করেছে। সঙ্গে সঙ্গে টুটুটুটু করে ফোন বেজে উঠল। বাবা এবার রেগেই নামাজ ছেড়ে ছুটে ফোন হাতে নিলেন। বাবার বন্ধু আলতাফ ফোন করেছে। বাবা রিসিভ করেই লাউড দিলেন। ওপাশ থেকে শোনা গেল, দোস্ত বাড়ির সব ভালো আছো তো? বাবা ফোনটা ফ্লোরে স্বজোরে আঘাত দিয়ে বলল, নিকুচি করেছে তোর ভালো থাকা হারামী।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত