ভয়ংকর স্বপ্ন

ভয়ংকর স্বপ্ন

রাত প্রায় ৩টা। কানে ইয়ারফোন দিয়ে বেলকনিতে বসে গান শুনছি। হটাৎ নটিফিকেশন আসলো। ” Nill Pori wants to be your friend”। প্রোফাইলে ঢুকে দেখি এক ঘন্টা আগে প্রথম প্রো পিক আপলোড দিছে, সেইটাতে কোনো লাইকও নাই। বুঝতে বাকি রইলো না যে এইটা নতুন কারো আইডি। পুরনো অভ্যাসবশত মেসেজ দিলাম।

আমিঃ Do you known me?

সেঃ না।

আমিঃ তাহলে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিলেন কেন? (মেসেজ সিন করছে, বাট কোনো রিপ্লে নাই)

আমিঃ ধুর বাল

সেঃ ধুর বাল টু এইবার শিউর হইলাম, নিশ্চয় এইটা কারো ফেইক আইডি। আমার সাথে হয়তো মজা করছে।

আমিঃ কে তুই ভাই? সত্যি কইরা বল। সে একটা ছবি পাঠাইলো, শুধু হাতের ছবি। হাতে সিগারেট ধরা। যেইমাত্র ধরে নিব যে এইটা ফেইক আইডি, হঠাৎ করে হোচট খাইলাম। একি, এটা তো মেয়ে মানুষের হাত। মেসেজ দিলাম,

আমিঃ এটা ডাউনলোড করা পিক, তাই না? রিপ্লেতে আরেকটা ছবি পাঠাইলো। আগের ছবির মতোই, পার্থক্য শুধু এইটুকু যে হাতের উপড় কলম দিয়ে লেখা, “এইটা ডাউনলোড করা পিক না।” এরপর আর সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই যে এইটা সত্যিই মেয়ে।

আমিঃ আপনি স্মোক করেন?

সেঃ হু।

আমিঃ তাই তো বলি, সিগারেটের দাম হঠাৎ বাড়লো কেন! আপনারা মেয়েরা তো জিন্স, শার্ট, টি-শার্ট কাইরা নিছেন। দয়া করে সিগাটের কে মুক্তি দেন।

সেঃ আপনি কই থাকেন?

আমিঃ ৩০৭ এ । আপনি?

সেঃ ৩০৭ এ মানে?

আমিঃ STA-307

সেঃ বুঝিয়ে বলেন।

আমিঃ শহীদ তাজউদ্দীন আহম্মেদ হল, রুম নং ৩০৭ (ডুয়েট)

সেঃ আপনি ডুয়েটে পড়েন?

আমিঃ হুম, একটা কথা বলেন। আপনি স্মোক করেন কেন?

সেঃ অনেক বড় ইতিহাস। শুনবেন?

আমিঃ হুম।

সেঃ কল দেই?

আমিঃ দেন। মেসেঞ্জারে কল আসলো। রিসিভ করলাম। সুন্দর করে সালাম দিল। জবাব দিলাম। সে বলতে শুরু করলো।

সেঃ আমার নাম জাকিয়া। বাসা বি.বাড়িয়া। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে, পড়াশুনা করছি এসিয়ান স্পেসিফিক এ। এই আইডিটা একটু আগেই খুলেছি। সত্যি কথা বলতে “চলো বদলে যাই” গ্রুপে আপনার একটা লেখা পড়েছিলাম। সেখানে আপনি খুব সুন্দর করে একটা মেয়ের সবকিছু হারানোর পরও কিভাবে বেচে থাকতে হয় সে বিষয়ে লিখেছিলেন। আপনি কি ঘুমাই গেলেন?

আমিঃ না, ঘুমাইনি। শুনছি, বলেন।

সেঃ আপনার সেই লেখার বিরুদ্ধে কিছু কথা বলতেই আমি আপনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিয়েছি।

আমিঃ বিরুদ্ধে বলবেন? আচ্ছা বলেন।

সেঃ আমি যখন প্রথম ভার্সিটিতে ভর্তি হই তখন একটা ছেলের সাথে পরিচয় হয়। সে জাবি তে পড়তো। আমার বাবা কুয়েত থাকে। টাকা পয়সা যখন যা চাই তাই পাই। ওর বাবা কৃষক ছিলেন। ঠিকমত ওর বাসা থেকে টাকা আসতো না। আমি টানা দুই বছর ওরে প্রত্যেক মাসে আমার হাত খরচ থেকে টাকা বাচিয়ে ৫০০০/- করে দিয়েছি। তার খুব ইচ্ছে সে বিসিএস ক্যাডার হবে। কত স্বপ্নই না দেখাতো সে আমাকে। আপনার কি ঘুম পাচ্ছে?

আমিঃ আরে না। বলেন।

সেঃ এর মধ্যে সে একদিন খুব ফোর্স করতে থাকে শারিরীক সম্পর্ক করার জন্য। আমি রাজি না হওয়াতে সে আমার সাথে এক সপ্তাহ কথা বলেনি। সেই এক সপ্তাহ যে আমার কিভাবে কেটেছে তা বলে বুঝাতে পারবো না। রিলেশন টিকিয়ে রাখার জন্য আমি রাজি হয়ে যাই। আমরা তো কিছুদিন পর বিয়ে করবই। তারপর সে কি করেছে জানেন?

আমিঃ কি?

সেঃ ৩৭ বিসিএস এ ক্যাডার পাওয়ার পর সে আর আমার সাথে কোনো যোগাযোগ করে না। শুনলাম সে নাকি অন্য কাউকে বিয়েও করেছে। এখন বলেন, কিভাবে আমি স্বাভাবিক থাকবো? যার জন্য সব উজার করে দিয়েছি, সে তো ছেড়ে চলে গেছে।

আমিঃ এখন আবার সবকিছু নতুনভাবে শুরু করেন।

সেঃ নতুনভাবে শুরু করতে চাইলেই কি হয় বলেন! এখন কি কেউ আমাকে গ্রহণ করবে?

আমিঃ কেন করবে না? কারো প্রথম প্রেম হওয়ার চাইতে শেষ প্রেম হওয়া কোটি গুণ ভালো।

সেঃ আপনি তো অনেক বড় বড় কথা বলেন, পোস্ট দেন। আপনার পোস্ট পড়ে যতদুর জেনেছি আপনি এখনও সিঙ্গেল। আগে রিলেশন দুইটা করে ছ্যাঁকা খেয়েছেন। আপনি আমাকে গ্রহণ করবেন?

আমিঃ আপনাকে চিনি না, জানি না। হুট করে কি কিছু বলা যায়?

সেঃ আসল কথা বলেন। এইটাই বাস্তব। বিয়ে করার জন্য সবাই ভার্জিন মেয়েই খোঁজে।

আমিঃ আপনি এখন কোথায় থাকেন?

সেঃ মিরপুর, কেন?

আমিঃ ২৩ তারিখে আমার পরীক্ষা শেষ। ২৪ তারিখে কোচিং এ পরীক্ষা নিয়ে ২৫ তারিখ আপনার সাথে দেখা করবো। ঠিক আছে?

সেঃ সিরিয়াসলি বলছেন? নাকি মজা করছেন?

আমিঃ ২৫ তারিখ সকাল দশটায় দিয়া বাড়ীতে আপনাকে যেন পাই। এখন আপনার ফোন নাম্বারটা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ভোর হয়ে গেছে। গুড নাইট। বাই।

বিছানাতে গিয়ে ঘুম আসছে না। সামনের হিট ট্রান্সফার পরীক্ষার সাথে যুক্ত হয়েছে আজাইরা এক টেনশন।
২৫ তারিখ সকালে ডুয়েট গেট থেকে উঠলাম গাজীপুর পরিবহনে। সকাল ১০ টার আগেই দিয়া বাড়ী পৌছে কল দিলাম জাকিয়ার নাম্বারে। একি, নাম্বার তো বন্ধ। এই নাম্বারেই অবশ্য দুই দিন কথা বলেছিলাম। তাহলে কি মেয়েটার সব অভিনয় ছিল! মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কোচিং এ ক্লাস না নিয়ে দেখা করতে আসলাম, অথচ তার নাম্বারই বন্ধ। ফিরে আসবো এই সময় তার কল।

সেঃ কই আপনি?

আমিঃ বট গাছের নিচে। ঐতিহাসিক বটতলায় আমাদের দেখা হলো। সে জিন্স আর টপস পড়ে এসেছে। কুশল বিনিময়ের পর সে আমাকে বলছে,

সেঃ আপনি কি সত্যিই আমাকে গ্রহণ করবেন?

আমিঃ আচ্ছা, সেটা পরে দেখা যাবে। এখন চলেন ফুসকা খাই।

সেঃ ফুসকা না, অন্য কিছু খাবো। সাথে আসেন। তার সাথে গেলাম, একটা চায়ের দোকানে নিয়ে গেল। “এই মামা, দুইটা বেনসন দেন আর দুইটা রং চা করেন।”

আমিঃ আপনি তো বড় বেয়াদব, আমার সামনে সিগারেটের কথা বলছেন।

সেঃ রাগ করলেন? দুইটা সিগারেটই আমি আপনার জন্যই চাইছি।

আমিঃ তাহলে ঠিক আছে।

সেঃ আপনার ফোনটা একটু দেখা যাবে?

আমিঃ ফোনের কি দেখবেন?

সেঃ কথা দিচ্ছি লক খুলবো না। আমি ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম।

সেঃ আপনার ফোনে দেখি চার্জ নাই। আর ওয়ালপেপারে পাখির পিক কেন?

আমিঃ আপনি হয়তো জানেন না, আমি পাখী (ডানাওয়ালী পাখী) খুব ভালোবাসি। আর আমার ফোনের সমস্যা, চার্জ থাকে না ঠিকমতো।

“এই প্যাকেট টা রাখেন” বলে সে আমার দিকে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল। ভিতরে কি আছে জিজ্ঞেস করলে সে বললো, “রুমে গিয়ে খুলে দেখবেন।” কারো সাথে প্রথম দেখা হলে যে কিছু দিতে হয়, তা আমার মাথায়ই ছিল না। নিজের কাছে নিজেকে খুব বোকা মনে হলো। সেদিনের মতো রুমে এসে প্যাকেট খুলে দেখি তার মধ্যে একটা মোবাইল। ফোনটা দেখার পর এতো খুশী হইলাম যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। কল দিলাম,

আমিঃ আপনি আমাকে মোবাইল দিছেন কেন?

সেঃ আপনি কোথাও লাইক কমেন্ট করলে সেটা যে আপনার ফেসবুক ফ্রেন্ডরা দেখতে পারে, এইটা কি ভুলে গেছেন?

আমিঃ মানে?

সেঃ আপনি গত একমাস যাবৎ এই ফোনের দাম জিজ্ঞেস করছিলেন একটা পেজে। তাই ভাবলাম আপনাকে ফোনটা গিফট্ করি। দামও বেশী না। ২১৫০ টাকা।

আমিঃ সত্যি কথা বলতে এই ফোনটা আমার খুব পছন্দ হয়েছিল। কখনও ভাবিনি ফোনটা এইভাবে আমার কাছে আসবে। ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা আমার নাই। কেউ আইফোন গিফট্ করলেও হয়তো এতো খুশী হইতাম না।

সেঃ এখন আর এতো চাপা মারতে হবে না।

এভাবেই তার সাথে আমার কথা চলতে থাকলো। সারাক্ষণ মনের মধ্যে বাজতে থাকে,”তোমরা কাউকে বলো না, কাউকে বলো না। এইতো প্রথম একটি মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছে, পাগল করেছে আমায় যাদু করেছে।” “পড়েছি ভালোবাসায়, আর কে আমাকে পায়, আমিও এবার পার্কে ঘুরিবো কখনও বা সিনেমায়।” আর মনে মনে পাখীর (ডানা ছাড়া পাখী) কথা ভাবছিলাম। আমাকে ছেড়ে তো অন্য কাউকে বিয়ে করে নিয়েছ। তিন বছরের রিলশনে একটা কলমও কখনও গিফট্ করে নাই। এখন দেখো তোমার থেকে অনেক ভালো মেয়ে পেয়েছি।
এর দশদিন পরের ঘটনা। তার একটা পোস্টে আমার চোখ আটকে গেলো। “জরুরী (AB+) রক্তের প্রয়োজন। হেল্প প্লিজ।” কল দিলাম,

আমিঃ রক্ত কার দরকার?

সেঃ আমার মামার ছেলের জন্য রক্তের প্রয়োজন।

আমিঃ আমি রক্ত দিব।

সেঃ আপনার দিতে হবে না। এমনি আপনার শরীর দূর্বল।

আমিঃ আরে সমস্যা নাই। আমি দিতে পারবো।

সেঃ ঠিক আছে। আমার মামারই ডায়াগনেস্টিক সেন্টার আছে। ঠিকানা দিচ্ছি, চলে আসেন।

আমি ঠিকানা অনুযায়ী চলে গেলাম। ক্লিনিক দেখে অনেক পুরাতন মনে হলো। “আঁখী ডায়াগনেস্টিক সেন্টার”। রোগী তেমন একটা নাই বললেই চলে। সে আমাকে তাড়াতাড়ি ভিতরের একটা চেম্বারে নিয়ে গেল।

আজ সে চোখে কালো কাজল পড়েছে। চুলগুলো খোলা। আমি হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছি। চেম্বারে শুধু সে আর আমি ছাড়া কেউ ছিল না। ওর ডাক্তার মামা এখানেই বসেন। একটু পর একটা নার্স এসে আমার ব্লাড সেম্পল নিয়ে গেলেন। একটু পর একজন আয়া এসে দুইকাপ কফি দিয়ে গেলেন। কফি খাচ্ছি আর ওর দিকে তাকিয়ে আছি। রুমে সে আর আমি ছাড়া আর কেউ নাই। খুব মন চাচ্ছিলো তার হাত ধরতে, কিন্তু সাহস হচ্ছিলো না। তার চোখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছে আমি তার চোখের নেশায় আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। তার রুপের নেশায় আমি বেহুশ হয়ে যাচ্ছি। সে মিটিমিটি হাসছে। যেন দুনিয়ার সব কিছু আমি ভুলে যাচ্ছি। আমার চোখ ছোট হয়ে আসছে। এরপর যখন চোখ খুললাম, দেখি আমি আমার হলের রুমে। চারপাশে সব বড় ভাই, ছোট ভাই, আর ফ্রেন্ডরা। পেটে চিনচিন ব্যথা করছে। তাকিয়ে দেখি পেটে অনেকগুলো সেলাই। একজন বলছে আমার নাকি একটা কিনডি খুলে নিয়েছে কে বা কারা। তারপর আমাকে শেষরাতে রাস্তার ফেলে দিয়ে গেছে। তখন নাকি আমি বেহুশ ছিলাম। পকেটের আইডি কার্ড দেখে আমাকে হলে পৌছে দিয়ে গিয়েছে অপরিচিত কয়েকজন।

সব কিছু আমার কাছে ক্লিয়ার হয়ে গেল। নেশা তার চোখে ছিল না, ছিল কফির মধ্যে। তার মানে ঐ মেয়ে ছিল কিডনি চোর। সে তো কিডনির সাথে সাথে আমার হৃদয়টাও চুরি করে নিয়ে গেছে। আস্তে আস্তে আমার রুমমেট নাজমুল আমার কাছে আসলো। এসে আমাকে ধাক্কা দিতে লাগলো। এই , উঠ। রান্না করতে হবে। আজ তো তোর ভাগে রান্নার দায়ীত্ব। তাড়াতাড়ি উঠে রান্না কর। আমার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। মনে মনে বলছি, শালা নাজমুল আমাকে এই অবস্থায় রান্না করতে বলতে পারলো! এখনও পেটে টাটকা সেলাই।

আমার কোনো সাড়া না পেয়ে নাজমুল জোড়ে কয়েকটা ধাক্কা দিল। আমার চোখ খুলে গেলো। সাথে সাথে পেটে হাত দিলাম। একি, সবই তো ঠিকই আছে। তারমানে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। নীল পরির ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসা, দিয়া বাড়ীতে দেখা করা, রক্ত দিতে যাওয়া, কিডনি হারানো, ফোন গিফট্ করা, সবই তাহলে স্বপ্ন ছিল (ছ্যাঁকা তো ছ্যাঁকাই, সেটা স্বপ্নে হোক অথবা বাস্তবে।) হৃদয় টা ভেঙ্গে দিলো

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত