অনুভূতির মৃত্যু

অনুভূতির মৃত্যু

হেনাঃ ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিয়েছি।

ফাহাদঃ আচ্ছা।

হেনাঃ কাল সকাল হলেই আমি চলে যাব।

ফাহাদঃ হুম।

হেনাঃ তোমার দেয়া কিছুই নিচ্ছি না, গহনাগুলো সব আলমারিতেই আছে।

ফাহাদঃ তুমি গহনাগুলো সব নিয়ে যাও।

হেনাঃ না, এ বাড়ির কোন স্মৃতি নিতে চাচ্ছি না আমি।

ফাহাদঃ না মানে, নিশি তো এমন ব্যাকডেটেড ডিজাইনের গহনা পরে না, ওর জন্য তো নতুন করে সব বানাতেই হবে। আর গহনা সব নিলে, সাথে আর পাঁচ, না না চার লাখ টাকা দিলেই কাবিনের টাকাও শোধ হয়ে যাবে। বিয়ের পর তো কাবিনের সব টাকা শোধ করা হয়নি।

হেনাঃ (হাসবে না রাগ করবে ঠিক বুঝতে পারছে না) থাক না ফাহাদ, তোমাকে আর এখন এত হিসেব নিকেশ করতে হবে না। আমার এগুলো কিছুই লাগবেনা। তুমি নাহয় এগুলো তোমার বোনদের দিয়ে দিও। রাত একটা বাজে, রাতে হেনা শাশুড়ির সাথে থাকছে আজ। দুচোখ দিয়ে তার অশ্রু বেয়ে পড়ছে, ঘুম আসছে না। কি মনে করে বিছানা থেকে উঠে ড্রইং রুমে হাটতে গেল, শেষ বারের মত সব ঘুরেঘুরে দেখছে। ফাহাদের রুমের দিকে যেতেই শুনতে পেল, ফাহাদ নিশির সাথে ফোনে খুব হেসে হেসে কথা বলছে। ” আজ তো কথা বলবেই প্রান খুলে, আজ যে লিগ্যালি সে স্বাধীনতা পেয়েছে দুজন” – মনে মনে বলছে হেনা। কেন জানি এখন তার কষ্টের থেকেও ঘৃণাটা বেশি লাগছে।

হেনা আর ফাহাদের বিয়ে হয়েছিলো তিন বছর আগে পারিবারিক ভাবেই। বিয়ের প্রথম প্রথম না বললে হয়তো কেউ বুঝতোই না যে বিয়েটা প্রেমের না। সময় পেলে ট্যুর, মুভি দেখা, কনসার্টে যাওয়া। আর একটা প্রতিষ্ঠানের খুব বড় পোস্টে থাকায় ফাহাদেকে অফিস থেকে তো প্রতি দু মাস পরপর ট্যুরে যেতেই হয়। বিয়ের পর থেকে সে হেনাকে সাথে নিয়েই যায়। দু পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ ভালো। তাই বিয়ের পর হেনা যখন চাকরি করতে চাইল, ফাহাদ তাকে বুঝালো, হেনাও যদি চাকরি করে দুজন দুজনকে সময় দিতে পারবে না। আর দুজনের টাইমিং না মিললে হুটহাট ট্যুরেও যাওয়া হবে না। হেনাও মেনে নিলো। এভাবে একবছর যাবার পর, একবার ট্যুরে থাকা অবস্থায় এক্সিডেন্টে হেনার পা ভেঙে যায়। ফাহাদের তেমন কিছুই হয় না৷ ডাক্তার পুরো তিন মাসের বেড রেস্ট দিয়েছেন হেনাকে।

তিন মাস পরে কিছুটা উন্নতি হলেও, পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও দুই মাস লেগে যায়। ওষুধের সাইড ইফেক্ট আর কয়েকমাস বেডরেস্টে থাকতে থাকতে হেনার শারীরিক কিছু পরিবর্তন আসে। ওজন টা বেশ বেড়ে গেছে। চেহারার সৌন্দর্যে ও কিছুটা ভাটা পড়েছে। এদিকে হেনার অসুস্থতার পর থেকে ফাহাদ অফিসের ট্যুরগুলোতে ও একাই যায়। সিনেপ্লেক্সে নতুন কোন মুভি আসলেও ফাহাদ তার কলীগদের সাথে দেখে রাত করে বাসায় ফিরে। হেনার প্রতি তার উদাসীনতা স্পষ্ট বোঝা যায়। প্রথম প্রথম হেনা ওগুলো নিয়ে তেমন কিছু না ভাবলেও, আস্তে আস্তে কেমন যেন খটকা লাগতে শুরু হয়। প্রায় রাতে ফাহাদকে ফিসফিস করে কার সাথে কথা বলতে শোনে। একসময়,তার সন্দেহটাই সত্যি প্রমাণিত হয়।

নিশি, ফাহাদের অফিসের নতুন কলীগ। অফিসের ফাঁকে গল্প করা, একসাথে মুভি দেখা থেকেই বন্ধুত্ব আর তারপর নিশির ব্যাক্তিত্ব ফাহাদকে বেশ আকৃষ্ট করে। যেমন সুন্দর, স্মার্ট, ঠিক তেমনি অফিসের বেশ বড় একটা পোস্টে আছে। সবদিক থেকে পারফেক্ট বলা যায়। নিশি আর হেনার মধ্যে তুলনা করলে নিশিকেই যেন তার জীবনসঙ্গী হিসেবে বেশি মানায়। আরও আগেই যে কেন নিশি তার জীবনে এলো না, ভেবেই আফসোস করে ফাহাদ। কিন্তু হেনাকে মুখে কিভাবে বলবে তাই বুঝতে পারছেনা সে। তাই ইদানীং আকার ইঙ্গিতে হেনাকে সে বোঝানোর চেষ্টা করে।

হেনা যখন একদিন ফাহাদের মোবাইলে নিশির মেসেজ দেখে ফাহাদকে হাতেনাতে ধরলো, ফাহাদ ও কিছুই লুকায়নি। মনে মনে সেও এটাই চাচ্ছিলো। ধরা পরে যাবার পর ফাহাদের এমন নির্বিকার ভাব দেখে হেনাও বুঝে ফেলেছে, সম্পর্কটা উপরেই যা লোক দেখানো ছিলো, ভিতরটা পুরোই ঘুনে খেয়ে ফেলেছে। ফাহাদের মা যদিও অনেক রাগারাগি করেছিলো, কিন্তু হেনাই সবাইকে বোঝালো, যে এইটাই সবার জন্য ঠিক। আলাদা হওয়াটাই এখন সমাধান। জোড় করে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে চাইলেও ফাহাদকে সে আর আগের মত পাবেনা। তাই আর দেরি না করে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত। ডিভোর্সের পর হেনা একবারের জন্য ও ওই বাড়ির খবর রাখেনি। আসার আগে শুনেছিলো, মাস দুয়েকের মধ্যে ফাহাদ আর নিশির বিয়ে।

ছয় মাস পর,

– হ্যালো মিসেস হেনা! আপনি কি ফাহাদ সাহেবকে চেনেন?

হেনাঃ জ্বি। কিন্তু আপনি কে বলছেন?

– আমি গুলশান থানা থেকে বলছি, আপনি কি একটু আসতে পারবেন।

হেনাঃ কিন্তু কেন? আসলে আমাদের তো ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে।

– তা আপনি আসলেই জানতে পারবেন। ফোনে এত কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না৷

হেনাঃ আচ্ছা আসছি।

থানায় ফাহাদ, ফাহাদের মা, ফাহাদের দুই বোন। ফাহাদের মা মুখ লুকিয়ে কাদছে৷ বোনগুলো ও লজ্জায় মুখ ঢেকে রেখেছে। ফাহাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে গত কয়েক রাত ঘুমায় না। হেনা সোজা ফাহাদের মায়ের কাছে গিয়ে দাড়ালো।

হেনাঃ কি হয়েছে মা? আপনারা সবাই এখানে কেন? থানা থেকে ফোন দিয়ে আসতে বললো।

শাশুড়ীঃ( আরও জোড়ে কাদতে কাদতে) তুমি আসছো মা,আমাদের এই খারাপ সময়ে শুধু তুমি আসলা মা।

হেনাঃ আপনি শান্ত হয়ে আমাকে সব বলুন।

শাশুড়ীঃ (ছোখ মুছতে মুছতে) নিশির সাথে বিয়ের কয়দিন পর থেকেই ফাহাদ আর নিশির ঝামেলা হচ্ছিলো মা। একে তো নিশি আলাদা পরিবারে থাকরে চায়,তা নিয়ে ঝগড়া। বিয়ের আগে নিশির যে লাইফস্টাইল, ফাহাদকে আকর্ষণ করতো, বিয়ের পর ফাহাদের কাছে তা উচ্ছৃঙ্খলতা মনে হতে লাগলো। অফিস,ক্যারিয়ার নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা। ফাহাদের মনে হতো নিশি ওর থেকে উপরে উঠে যাচ্ছে। এসব নিয়ে প্রায়ই দুজনের ঝগড়া হতো, অতিষ্ঠ হয়ে এক পর্যায়ে ফাহাদ নিশিকে ডিভোর্স দিতে চাইলো। আর নিশিও জেদের মাথায় ফাহাদ সহ আমাদের সবার নামে মিথ্যা যৌতুক আর নারী নির্যাতনের মামলা দিয়ে দিল। বিশ্বাস কর মা, আমি বা আমার মেয়েরা কেউ কিছুই বলিনি নিশিকে৷ যা হয়েছে ওদের দুজনের মধ্যে। কিন্তু এতে আমাদের যে দুর্নাম হয়েছে সমাজে, তাতে কেউ আমাদের সাহায্যে এগিয়ে ও আসছে না, আত্মীয় স্বজনরা ও না। তাই বাধ্য হয়ে তোমাকে ফোন দিলাম মা। কত অন্যায় হয়েছে তোমার সাথে মা,তাও তুমিই এলে। অন্তত একটা ভালো উকিলের ব্যাবস্থা কর মা।

হেনাঃ জ্বি মা। আমি চেস্টা করবো। শুধু আপনার আর ওদের দুই বোনের কথা ভেবে। কারন আমি জানি, আপনাদের তিন জনের কোন দোষ নেই।

শাশুড়ীঃ আর ফাহাদ?

হেনাঃ তা জানিনা মা। তবে এবার আপনার ছেলেকে নিজেরটা নিজেকেই সমাধান করতে দিন। হেনার মত মেয়ে খুব সহজে সব মেনে নিয়েছে, তার মানে এই না নিশিও তাকে এমনি এমনিই ছেড়ে দিবে। আর দোষটা কার বেশি তাই তো জানি না মা। নিজের ভুলগুলো তাকে বুঝতে দিন। অন্তত ভবিষ্যতের ডিসিশনগুলো ভেবে চিনতে নিবে। বারবার একই ভুল করলে তা আর ভুল থাকে না মা,তা অন্যায় হয়ে যায়। আর অন্যায়ের শাস্তি তো পাওয়াই উচিৎ। আর আমি যাই করবো আপনার জন্য করবো। ওর প্রতি এখন আর কোন অনুভূতিই কাজ করে না। শুধু আপনার জন্যই আসা। ভুল কিছু বললে ক্ষমা করবেন আমাকে। আর আপনি নিজেও কিন্তু জানেন, দোষটা একা নিশির নয়, আপনার ছেলের ও আছে।

শাশুড়ীঃ ঠিক বলেছ মা। ওর শিক্ষা হওয়া উচিৎ।

খুব চেয়েছিলাম তুমি ওর জীবনে আবার ফিরে আসো। কিন্তু আমার ছেলে তোমার মত মেয়ের যোগ্য না মা। পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো ফাহাদ হেনা যখন পাশ কাটিয়ে চলে আসছিলো, ফাহাদ তার চোখদুটো নিচে নামিয়ে নিল, চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। হেনা স্পষ্ট সব দেখলো, কিন্তু কেন জানি কিছুই বলতে ইচ্ছে হলো না।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত