আমরা বাঙালি

আমরা বাঙালি

শোভা’দি সন্দেশ ! আমরা হাত পাততাম। শোভা’দি এলাচের গন্ধ মাখা ধবধবে সাদা সন্দেশ আমাদের হাতে দিতো। তারপর স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি দিয়ে বলতো –

– কিরে মুনিম, আজ চন্দনা আসলো না যে !

শোভা’দি হাসি মুখে চেয়ে থাকতেন । আমরা যারা একসাথে খেলি। আমি তপু, চন্দনা, স্বপন, শেফালি বংকু, রেণু । আমরা সবাই শোভাদির একনিষ্ঠ ভক্ত। রেণু আমাদের সবার ছোট। তবুও ওকে আমরা খেলায় নেই। শোভাদির সুন্দর মুখ আর মিষ্টি আচরণ তো আছেই ! পূজা শেষে কোনোদিন বাতাসা, কোনোদিন সন্দেশ, কখনো নারিকেল নাড়ু এসবের লোভ ও আমাদের কম না। যদিও আমরা কেউ তা স্বীকার করি না। কিন্তু শোভাদি কখন পূজায় বসবে এইজন্য তাদের বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করি।

শোভাদির কারণে তার বিড়ালটাও আমাদের খুব প্রিয়। ওর নাম ‘মাসী’। মাসী কখনো বিড়ালের নাম হয়! কিন্তু তার এক কথা ‘ কে না জানে! বিড়াল হলো বাঘের মাসী। তাই আগে থেকেই ওর নাম মাসী। আমাদের মতো বিড়াল ও শোভাদির আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। মাঝে মাঝে নিঝুম দুপুরে ! শোভাদি এসে জানালায় আস্তে ডাকে – মুনিম তুই আর স্বপন একটু পাহারা দিবি? আমি একটু পুকুরে স্নান করবো!

– স্বপন’রে লাগবে না। আমি শেফালিরে ডাকি ?

ও আর আমি মিলে তোমাকে পাহারা দেব। নিঝুম দুপুরে স্নান মানে তো পুকুরপাড়ে বসে পানি নিয়ে খেলা। শোভাদি তার পদ্মফুলের মত হাত দুটো জলে রাখেন। তারপর অনেকক্ষণ জল নাড়াচাড়া করে, একটা ডুব সাঁতার দিয়েই উঠে আসেন। তার নাকি খুব ভাল লাগে। কিন্তু ভাত ঘুম দুপুরে স্নান করতে আসা ! কাকিমা জানলে বকাঝকা করবে। তাই এতো কড়া পাহারার ব্যবস্থা।

শোভাদি স্বপনকে ডাকতে বললে কি হবে? পরশু স্বপনের সাথে আমার একটা কঠিন মারামারি হয়ে গেছে। আম গাছের ডালে বসে আমরা সবাই ‘আম ডালা’ খেলছিলাম। এর মাঝে তপু হঠাৎ বলে উঠলো – জানিস তো ! শোভাদির না বিয়ে হবে ! আমার আর স্বপনের মাথায় বাজ পরলেও এতোটা অবাক হতাম না। তপুটাকে একটা আস্ত কান কাটা মফিজে মর মত মনে হচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দেই। কিন্তু ও শোভাদির আপন কাকাতো ভাই। অনেক কষ্টে রাগ সামলালাম। অন্য দিকে তাকিয়ে স্বপন বললো –

– কার সাথে বিয়ে হবে রে?

— ওই যে ঢাকায়। কালেজে না ডাক্তারিতে কি যেন পড়ে ! দাদাভাইয়ের ( অসীম ) বন্ধু গত পুজোয় আমাদের বাড়িতে এসেছিল। তার সাথে।

আমি আর স্বপন দুজন দুজনের দিকে তাকাই। আমি আর ও দুজনেই বড় হয়ে শোভাদিকে বিয়ে করতে চাই। এই নিয়ে আমাদের একটা নিরব প্রতিযোগিতা চলছে। মাঝে মাঝে মন ভাল থাকলে আমরা বিয়ের পর শোভাদিকে নিয়ে কী করবো, সেসব নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করি। স্বপন বলে, ও নাকি শোভাদিকে দিয়ে অনেক সন্দেশ বানাবে তারপর পেট ভরে শুধু সন্দেশ খাবে। বেটা খাদক কোথাকার ! শেফালি একদিন খুব গম্ভীর হয়ে বললো..

– এই স্বপন, তুই তো তোর মাকে ছাড়া ঘুমুতে পারিসনা

তুই বিয়ে করবি কী করে? জানিসনা বুঝি, বিয়ের পর বৌয়ের সাথে ঘুমুতে হয় ! ঠিক কথা! আমরা সবাই সায় দেই। স্বপন ঝগড়ায় হেরে যাবে তাই অনেক কষ্টে ঢোক গিলে বলে –

– কেন…মা মাঝখানে, তারপাশে আমি, ওপাশে ছুটকি আর এপাশে শোভাদি ঘুমুবে। আমরা সবাই হুহু করে হেসে উঠি। শেফালি বলে

– হ্যা’রে মুনিম তুই, কী করবি ? আমি কিছু বলিনা হেহ… এই সব কুঁচো কাঁচা বুঝবে আমার মনের ইচ্ছের কথা !

আমিও ভেবে রেখেছি, শোভাদিকে বিয়ে করলে আমাদের পুকুর ঘাটটা নতুন ইট দিয়ে ভালো করে বাঁধিয়ে দেবো। চারপাশে থাকবে হিজল গাছ। পুকুরে ছায়া হয়ে থাকবে ভাঁটফুলের জঙ্গল। নাম না জানা কালো পাখিটা গাইবে – কুউ কুউ। এক ফালি চিকচিকে রোদ পাউডারের মতো গায়ে মেখে শোভাদি পুকুর ধারে বসে থাকবে। আমি তখন বলবো…

— এই নাও তোমার নিজের একলা ঘাট। এখন যত খুশি যখন ইচ্ছে জল নাড়ানাড়ি করো। কেউ তোমায় বকবে না।

সনটা ছিল ১৯৭১ আমরা সবাই ক্লাস ফোরে পড়ি । শুধু বংকু আর রেণু একটু ছোট। ওরা কেবল ক্লাস থ্রি তে পড়ে । সেইসব কাঁচা মিঠে আম কুড়িয়ে খাওয়ার দিনগুলিতে আমরা সবাই আমাদের শোভাদিকে অনেক ভালবাসি। রমিজ মিঞা মদন গিয়েছিল সুপারি বিক্রি করতে। সেখান থেকে পাক্কা খবর নিয়ে এসেছে। দেশে নাকি সংগ্রাম শুরু হয়েছে ! রেডিওতে নাকি শোনা যাচ্ছে। আমাদের এই রুপপুর গ্রামে শুধু একটাই রেডিও তাও সৈয়দ বাড়িতে । আমাদের এই শান্ত গ্রামে খবরটা তাই পৌঁছায় অনেক দেরিতে।

আর একটা রেডিও অবশ্য আছে, সেটা শোভাদির দাদা অসীমের । কিন্তু সে থাকে ঢাকায় । একবার গেলে আর আসতেই চায় না। সেই কবে বলে গেছে এবারে ঢাকা থেকে আমাদের জন্য ফুটবল নিয়ে আসবে। ফুটবলের অভাবে জাম্বুরা দিয়ে বল খেলতে গিয়ে আমাদের সবারই পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে। তবুও তার আসার নাম নেই। আমরা প্রায়ই এই নিয়ে শোভাদির কাছে নালিশ করি। শোভাদি মনোযোগ দিয়ে সাদা কাপড়ের উপর বড়ি শুকাতে দিতে দিতে আমাদের অভিযোগ শোনেন। এবারে বাড়ি আসার জন্য খুব করে বকে একটা চিঠি লিখবে বলে আমাদের সান্তনা দেন ।

শুধু সান্তনায় কী পেট ভরে! সাথে খানিকটা বড়ইয়ের আচার আর আমসত্ত্ব ছিঁড়ে আমাদের হাতে দেন। বাসন্তী শাড়ি পরা শোভাদিকে আমাদের কাছে বড় পূজার মেয়ে ঠাকুরের মতো মনে হয়। ঠিক তেমনই টানা টানা চোখ। লম্বা চুল। হাবিলির মেয়ে রুনুর সাথে শোভাদির খুব ভাব ছিলো। দুজনেই খুব গল্প করতো এবার শীতে সেও বরের সাথে ঢাকায় চলে গেছে। আমরা ছাড়া শোভাদির সাথে গল্প করার আর কেউ নেই। ঠিক এভাবেই কাটছিলো আমাদের একাত্তরের দিনগুলি। রেণুর কাল থেকে জ্বর, তাই আজ আমাদের সাথে খেলতে আসেনি । ওর আব্বা ইমাম সাব । খুব ভাল মানুষ। দেখা হলেই বলেন –

– মসজিদ এ আয়ো না কেরে ? নমাজ ফরন লাগতো না! নইলে বেহেশতে যাইবা কেমনে? তুমার আব্বায় তো নমাজ কাজা করেনা। তুমারেও নমাজ শিখতে হইবো !

তারপর স্বপনকে বলেন । –কিতা ব্যাডা ! আফনে কিতা ! খালি বামুন বাড়ির সন্দেশ কাইলেই ওইবো?
মক্তবে আসেন না কেরে? ‘কায়দা’ রাইখা কবে ‘আমপারা’ ধরবাইন ! আমরা সবাই তখন আমপারা শেষ করে ‘কোরআন শরীফ’ হাতে নেবো নেবো করছি। প্রায়ই ভোরে গলা ছেড়ে সুরা পড়ি। রেণু তো ইতিমধ্যে দুলে দুলে কোরআন পড়া শুরু করে দিয়েছে। ওর ছোট্ট মুখটা ওড়নায় ঢেকে ও আমাদের সাথে মক্তবে আসে। ইমাম সাব প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসেন আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে।

ইমাম সাহেব এরপরে হেসে নিজের পাঞ্জাবীর পকেট থেকে শাল পাতায় মোড়া দুটি জেলাপি আমাদের দুজনের হাতে দেন। উনি একটু আড়ালে চলে গেলেই আমরা বড় বড় দুই কামড়ে জেলাপি শেষ করি। স্বপন আবার মনের আনন্দে রেডিও তে শোনা একটা গান ই গেয়ে ফেলে। “কাজল নদীর জলে ভরা ঢেউ ছলো ছলো প্রদীপ ভাসাও কারে স্মরিয়া…”, সোনার বরণী মেয়ে, বলো কার পথ চেয়ে আঁখি দুটি ওঠে জলে ভরিয়া”।

আমার হিংসায় পেট জ্বলে যেতে থাকে। সুন্দর গলা হলে কি হবে ! জানিতো কার জন্য এমন সুন্দর গান গাওয়া হচ্ছে। স্বপন চার লাইন গেয়েই থেমে যায়। পরের টুকু শুনতে আমার মন কেমন আঁকুপাঁকু করতে থাকে । কিন্তু হিংসায় আর বাকিটুকু গাইতে বলিনা। না শোনার ভান করে ওর পাশে পাশে হাঁটতে থাকি। এক মাঝরাতে হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ। রুপপুর গ্রামের সবাই চমকে ওঠে। পাশের হিন্দু পাড়ায় খালি আগুন আর আগুন। বাচ্চাদের চিৎকার বুড়োদের হাহাকার আর মেয়েদের চাপা কান্নায় কান পাতা দায়। এর মাঝেই আমাদের গ্রামে ভেসে আসে কিছু ভারী বুটের আওয়াজ। পুরো এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

কোনো কোনো বাড়ির সামনে শব্দ থামে। চিৎকার গুলি, চুপচাপ, আবার পাশের বাড়ি। যে যেখানে পারছে দৌঁড়ে পালাতে চাইছে বা লুকাচ্ছে । কাউকে নিস্তার দিচ্ছে না হয়তো। দৌঁড়ের শব্দের পরপরই ভেসে আসছে গুলির শব্দ। একটা আর্তচিৎকার, কোন কিছু পরে যাওয়ায় আওয়াজ । আহ আল্লাহ এ কোন গজব! বুড়োরা চেঁচাচ্ছে বাচ্চারা কাঁদছে। হঠাৎ যেন কেউ রুপপুরের দিকে অশান্তির দরজা খুলে দিয়েছে। হঠাৎ শোভাদিদের বাড়ি থেকে চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। বুড়োরা হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। বাচ্চারা কান্না ভুলে ফোঁপাতে থাকে।

– না না মিনতি করছি এ কাজ করবেন না। মিনতি করছি আমি। আমাদের যা আছে সব নিন। তবুও এই কাজ করবেন না।

গলা স্বরটা বংকুর বাবা ধীরেন কাকুর। আমি এক ছুটে সামনের বড় আমগাছটায় উঠে পড়ি। চোখে অন্ধকার সয়ে আসতেই দেখি, স্বপন আর রেনু আগে থেকেই গাছে উঠে বসে আছে। ঝগড়া ভুলে স্বপন আমাকে গাছে টেনে তোলে। স্বপন কাঁদতে কাঁদতে বলছে , – মুনিম দেখ !

আমি ম্যাটমেটে ভোরের আলোয় অবাক হয়ে দেখি ওরা শোভাদিকে টেনে ঘর থেকে বের করছে। শোভা দির পরনে শিউলির বোটা রঙা একটি শাড়ি। কাকাকে একটা মুষকো জোয়ান লোক লাথি মেরে ফেলে দিয়ে গুলি করলো। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলো শরীর থেকে, একটু ধরফড় করেই কাকা নিস্তেজ হয়ে গেলো। আম্মা বলেন, ‘সুবহে সাদিক’ ভোর। সেদিন সেই সুবহে সাদিক ভোরে রুপপুর গ্রাম পুরো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল । খাকী পোশাক পড়া হায়েনার মত চেহারার কিছু লোক শোভাদিকে ঘিরে হাসা হাসি করতে লাগলো।

– ইতনা জোয়ান লাড়কি। কিতনা খুব সুরৎ, কিতনা পেয়ারা। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল ওদের ঢিল ছুড়ি। চোখ কান বুজে থাকি। তবু শোনা যায়। ওরা নিজেদের মাঝে হাসাহাসি করছে আর হাঁটছে। রেণু কখন যে পাকা আমের মত টুপ করে গাছ থেকে পড়ে গেছে..আমরা খেয়াল করিনি। স্বপন বললো –

– মুনিম তুই উপরেই থাক, আমি রেণুরে একটু দেখে আসি। আমি ভয়ে স্বপনের হাত চেপে ধরলাম। দেখি কোথা থেকে যেন রেণুর বাবা দৌড়ে এলেন !

– এইটা কি করেন ! আপনেরা এইটা কি করেন !

শোভা আমাদের গ্রামের মাইয়া… খুব ভাল মাইয়া, ওরে ছাড়েন ! আল্লার দোহাই লাগে ওরে ছাড়েন। উনি শোভাদির হাত ধরে ছাড়িয়ে নিতে টানাটানি করতে থাকেন। হৈ হল্লায় বাইরে থেকে ফর্সা আর লম্বা লোকটা চিৎকার করে বললো!

– শুট দ্য বাষ্টার্ড পিপল, শুট হিম।

আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। স্বপন আস্তে বললো — ভাগ্যিস রেনুটা অজ্ঞান হয়ে গেছিল। আমরা দুজন জড়াজড়ি করে কাঁদতে কাঁদতে দেখি – স্বপনের আব্বা, শেফালির ভাই, চন্দনার মামা, যতীন মাষ্টার এমন আরও দশ বারোজন লোক’কে খাকি পোষাক পরা হায়েনাগুলো নদীর পাড়ে হাঁটিয়ে নিয়ে গেল। যতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, দেখলাম ওরা লাথি মারতে মারতে আর নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করতে করতে গেলো। আর শোভা’দি ! আমাদের আশ্চর্য সুন্দর শোভাদি মাথা নিচু করে ওদের সাথে হেটে গেলো। শোভা’দি কি কাঁদছিলো! কি ভাবছিল মনে মনে! স্বপন আর আমি দুজন দুজনকে জড়িয়ে আশ্চর্য মায়ায় কাঁদতে লাগলাম। একটা সংগ্রাম কিছু হত্যা অনেক বড় কিছু অবিচার….আমাদের এই নাবালক কিশোর মনকে এক নিমিষে বড় বানিয়ে দিয়ে গেলো।

খুব আস্তে আস্তে সেদিন রুপপুর গ্রামে ভোর এলো। এ এক অন্যরকম ভোর। মানুষের আহাজারি, বুক ফাঁটা আর্তনাদ। রক্ত আর লাশের মিছিল সাথে আনা ভোর। এমন সূর্য শান্ত রুপপুর গ্রামের মানুষেরা কখনো দেখেনি। সেই ভোরে নির্লজ্জ সূর্য একাই রোদ নিয়ে এলো। একটা পাখিও ডাকলো না। মসজিদে সেদিন কেউ আজান দিয়েছিলো কি না! মনে নেই। সেই আশ্চর্য অবাক করা সকালে, পোড়া কিছু বাড়িঘর আর লাশগুলো নিয়ে সবাই স্তব্ধ হয়ে রইলো। কেনো এলো এমন কুৎসিত নরকের গন্ধ ছড়ানো দিন! বড়’রা শার্টের হাতা বা গামছার কোণায় চোখ মুছতে লাশগুলো সব সমাহিত করলো। আমরা ছোট’রা কাঁদতে ভুলে গেছি। চেয়ে চেয়ে শুধু দেখলাম। পরদিন রেণুর জ্ঞান ফিরে এসেছিলো। রেণু জ্ঞান ফিরেই বললো।

– যারা আজান দেয়, ওরা যদি সব্বাইরে মেরে ফেলে , তাইলে আজান দিবে কে? স্বপন দাদা ?

– স্বপনটা বড্ড বোকা। ও রেণুর হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো – কেউ না কেউ তো দিবেই! আর যদি কেউ না দেয় মুনিম দিবে। ও পারবে। না পারলে আমি ওরে শিখাই দিবো। তবু তুই কান্দিস না। রেণু কাঁদেনি, শুধু ওদের পোড়া বাড়িটার দিকে অবাক হয়ে চেয়েছিলো। তিনদিন পর ধরলা নদীর তীরে, শোভাদির লাশ ভেসে আসে। জাত যাবার ভয়ে নাকি হায়েনাদের ভয়ে শোভা’দি কে কেউ নিতে আসলোনা। রুপপুর গ্রামের অনেক মানুষ শুধু ভয়ে ভয়ে শোভা’দিকে দেখে আসলো। বড় মহিলারা কানাকানি করছিলো। শিশুগুলি মায়ের বুকে চুপ করে লেপটে রইলো। আমরা কজন, আমি স্বপন, শেফালি,রেণু,আমরা দিদি’র গায়ে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিলাম।

সেই শিউলি রঙা আধ ছেঁড়া শাড়িটি তখনো তার গায়ে পেঁচানো ছিল। মেঘের মতো লম্বা চুলের মাঝে অবুঝ মাছের পোনাগুলি লুকোচুরি খেলছিল। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, সেই ডালের বড়ি দেয়া হাত, পূজোর ফুল তোলা হাত, আমাদের সন্দেশ দেয়া অপূর্ব সাদা হাতখানি তেমনি আছে। শুধু শোভাদির ডাবের মতো গোল মুখটায় কোন বনের পশু যেন প্রবল আক্রোশে খুবলে খুবলে খেয়েছে । এতোকিছুর পরেও ডালিম ফুলের মতো ঠোঁটগুলো দেখে আমার মনে হচ্ছিল।

শোভাদি এখুনি বলবে ‘ ওই মুনিম, এই নে সন্দেশ। আমি একটু স্নান করুম, তুই একটু পাহারা দিবি! ‘ অনেক জলের মাঝে স্নান করার শখ নিয়ে আমাদের শোভাদি জলের বিছানায় শুয়ে আছে। মানুষ নির্মম, সমাজ নির্মম, কিন্তু আমার দেশের মাটি আর নদী নির্মম নয়, নদী তার অদ্ভুত মায়া দিয়ে একসময় শোভা’দিকে একসময় ভাসিয়ে নিয়ে গেলো। আমরা, সেই রুপপুরের শিশুরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। “আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার।। বুকের ব্যথা বুকেতে চাপায়ে নিজেরে দিয়েছি ধিক্কার !!

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত