কালো যাদু

কালো যাদু

তিথি স্বামীকে চুমু খেয়ে বলল, ‘আজ অনেক ধকল গেছে তাই না? তোমাকে কেমন ক্লান্ত লাগছে।’ হাসিবুর কোনো কথা বলতে পারছে না৷ তার বমিবমি ভাব হচ্ছে। ঝাপসা চোখে সন্ধ্যার মতোন সবকিছু আবছা লাগছে। খুব চেষ্টা চালাচ্ছে বমি আটকানোর। এই যুদ্ধ কতক্ষণ চালাতে পারবে বুঝা যাচ্ছে না। কিন্তু বাসর ঘরে বমি করে ফেললে ভীষণ লজ্জার ব্যাপার হবে। বাইরে গিয়ে বমি করে আসতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সে যেন নড়তেও পারছে না। তিথি খানিক অবাক হয়ে বলল, ‘হাসু তুমি কোনো কথা বলছো না কেন! তোমাকে কেমন জানি দেখাচ্ছে, কোনো সমস্যা? দেখে তো মনে হচ্ছে শ্বাস বন্ধ করে আছো। মুখ-টুখ ঘেমে অবস্থা খারাপ।’ হাসিবুর দূর্বল গলায় বলল, ‘আমাকে একটু টয়লেটে নিয়ে চলো।’

তিথি চোখ পাকিয়ে বলল, ‘কেন? তুমি একা যেতে পারো না?’ হাসিবুর কোনো উত্তর দিলো না। কেবল শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তিথির দিকে। মুখ খুলে কথা বললেই বাসর ঘরে বমি করার মতো বিশ্রী একটা কান্ড ঘটে যেতে পারে। তিথির কাছেও এখন হাসিবুরকে কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। হাত ধরে তাকে শোয়া থেকে বসিয়ে বলল, ‘টয়লেটে চলো।’ হাসিবুর নিজে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিল। ধরে ফেলল তিথি। লক্ষ্য করলো হাসিবুর পা ফেলতে পারছে না৷ তিথি খুব সাবধানে তাকে টয়লেটে নিয়ে গেল। মুহূর্তেই সে গড়গড় করে বমি করা শুরু করেছে। রক্তবমি। নাকমুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।

হাসিবুরের জন্মের সময় তার মা মারা গেলেন। ছোট্ট একটা শিশু। শুধু বাবাকে দিয়ে তার পোষাবার কথা নয়। দরকার মায়ের মমতা। আজমল সাহেবকে তখন সবাই বিয়ের জন্য জোরাজোরি করে। কিন্তু উনার কথা একটাই, বিয়ে করবেন না। হাসিবুরের মা’র স্মৃতি বুকে নিয়েই পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে চান। এতে অবশ্য হাসিবুরের খুব একটা সমস্যা হলো না। দু’জন চাচি তাকে দেখাশুনা করেছেন। একজন চাচি তিথির আম্মু। তিথি হচ্ছে হাসিবুরের চাচাতো বোন। শৈশব তাদের একসাথে কেটেছে। বিকেলে যখন হাসিবুর ঘুড়ি নিয়ে দৌড়ে মাঠের দিকে যেত। পেছন থেকে একটা ডাক ভেসে আসতো, ‘ও হাসু ভাই। আমিও যাবো।’

হাসিবুর দাঁড়িয়ে বলতো, ‘ তাড়াতাড়ি আয় তিথি। আজ দেখিস সবার উপরে আমার ঘুড়ি থাকবে।’ পশ্চিম আকাশে সূর্য লাল হয়ে দূরের কোনো অচেনা গ্রামে হারিয়ে গেলেই কেবল দু’জন বাড়ি ফিরতো। গোরস্থানের দেয়ালে এক পাগল বসে পা নাড়াতে নাড়াতে ভুলবাল ইংলিশ বলতো। সবাই ইংলিশ পাগল বলে ডাকে। এই পাগলকে তিথির যা ভয় লাগতো৷ কিন্তু দূর থেকে পাগলের কান্ড কারখানা দেখতে বড় ভালো লাগে। মাঝেমাঝে হাসু ভাইরা পাগলকে আড়াল থেকে ঢিল মারে। পাগল তাড়া করলেই সবাই দৌড়। পেছনে পড়ে যেত তিথি। ভয়ে সে কাঁদো কাঁদো গলায় ডাকতো, ‘ও হাসু ভাই আমাকে নিয়ে যাও, হাবু পাগলা আমাকে ধরে ফেলবে।’ হাবু পাগলা কাউকে ধরতে পারে না। সে খানিক দৌড়ে আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়।

হাসিবুর একদিন তিথিকে বলল, ‘পাগলের পাশে বসে আমি তমাল আর হৃদয় গল্প করেছি জানিস? হাবু পাগলা মারে না৷ একা একা শুধু ভুলবাল ইংলিশ বলে।’ তিথির বিশ্বাস হলো না৷ সে মুখ বিকৃত করে বলল, ‘অ্যা কি সাহস, সব মিথ্যা কথা।’ হাসিবুর বলল, ‘তুই যাবি?’ তিথি থুতনি বুকের সাথে লাগিয়ে মাথা নীচু করে বলল ‘আমার ভয় লাগে। তুমি যদি পাগলের কাছে রেখে দৌড়ে পালাও।’ ‘আরে রেখে আসলেও কিছু করবে না।’ একদিন তিথি হাসিবুরের সাথে ভয়ে ভয়ে পাগলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সে একা একা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভুলবাল ইংলিশ বলছে, ‘ইউ চুয়িং বাং টু মে হাউ টু দুয়িং মাউ।’ হাসিবুরের হাত শক্ত করে ধরে আছে তিথি। ভয় অনেকটা কেটে গিয়ে পাগলকে দেখে হাসি পাচ্ছে।

এমন নানান স্মৃতিতে ভরা তিথির শৈশব। ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠার পর ওর বাবা ইংল্যান্ড থেকে চলে আসেন। মেয়ে আর স্ত্রীকে ইংল্যান্ড নিয়ে যাবেন। পাসপোর্ট ভিসা সব রেডি। খবরটা শুনে হাসিবুরের মন খারাপ হয়ে গেল৷ সে বিলের পাড়ে বসে পানিতে অন্যমনস্ক হয়ে ঢিল মারছে। তিথি চুপচাপ হাসিবুরের পাশে গিয়ে বলল, ‘আমি চলে যাব হাসু ভাই।’ তিথির দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘হ্যা জানি।’ ‘ও দেশ থেকে চিঠি লেখা যায় হাসু ভাই।’ ‘হ্যাঁ।’ ‘আমিও লিখবো তোমাকে।’ হাসিবুর কোনো কথা বলে না। এক ঝাক হাঁস বিলে নেমে পড়েছে। বিলের ঢলঢলে জলের ভেতর সূর্য। মাঝখানে এক ঝাঁক লাল শাপলা, শাপলার পাশে একদল পানা, পানার উপরে সাদা ধবধবে বক বসে আছে পুঁটি মাছ ধরার জন্য। হাসিবুর আরেকটা ঢিল মারে। বক নিরাপদ স্থানের খুঁজে উড়াল দেয়। হঠাৎ হাসিবুর দাঁড়িয়ে যায়। তারপর বলে, ‘তুই এখন যা তিথি৷ আমি বকুলদের বাড়ি যাবো।’

বাবা-মা’র সাথে কেনাকাটা আর আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ব্যস্ত দিন কাটে তিথির৷ হাসিবুর কেমন নীরব হয়ে গেছে। তিথি যেন তখনও পুরোপুরি বুঝতে পারছে না ক’দিন পর ওর হাসু ভাইকে রেখে অচেনা-অজানা এক দূরের দেশে চলে যাবে সে। কিন্তু যেদিন বাড়িতে গাড়ি এলো ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে তোলা হচ্ছে৷ আত্মীয়-স্বজন আয়োজন করে তাদেরকে বিদায় দিচ্ছেন। হাসিবুর খানিক দূরে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ তিথির কেমন জানি লাগে। ভেতর গুলিয়ে কান্না আসে। আচমকা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে সে। হাসিবুর তিথির দিকে তাকায় না। তারও জলভরা চোখ। শরীরে কান্নার কাঁপন। তিথি বাসর ঘরে হাসিবুরের হাত ধরে প্রথম কথাটা বলল, ‘আমার একটা কথা রাখবে হাঁস ভাই।’

হাসিবুর অবাক হয়ে বলল, ‘হাঁস ভাই!’ তিথি ফিক করে হেঁসে ফেলল, তারপর বলল, ‘ছোটবেলায় স্কুলে তোমাকে হাসিবুর না ডেকে সবাই হাঁস বলে  ক্ষেপাতো মনে নাই?’ ‘তাই বলে তুমিও ডাকবে?’ ‘ওমা আমি একবার শখ করে স্বামীকে ডাকতে পারি না?’ হাসিবুর মেঘ জমা থমথমে মুখে বলল, ‘এটা কেমন শখ?’ ‘আচ্ছা ডাকছি না। কিন্তু আমার কথাটা রাখবে প্রমিজ করো।’ ‘আগে কথাটা তো বলো।’ তিথি ছোটবেলার সেই বাচ্চা মেয়ের মতোই বলল, ‘না আগে প্রমিজ।’ হাসিবুর হেঁসে ফেলল। তারপর বলল, ‘প্রমিজ করলাম কথা রাখবো, এবার তো বলো।’

– ‘আমি না কখনও প্রেম করিনি।

তাই ইচ্ছে ছিলো স্বামীর সাথে প্রেম করবো। কমপক্ষে এক বছর অবিকল সাচ্চা প্রেমিক-প্রেমিকার মতো আমরা চলাফেরা করবো।’ হাসিবুর আসলে তখনও তিথির চালাকি ধরতে পারেনি। সে ভীষণ খুশি হয়ে বলল, ‘আরে এটা তো খুবই আনন্দের কথা। স্বামী-স্ত্রীর প্রেমই তো পবিত্র প্রেম। আমি একশো একবার প্রমিজ করলাম। আমি তোমার স্বপ্নের সেই প্রেমিক হবো। এক বছর কেন জীবনভর আমি তোমার সেই স্বপ্নের প্রেমিক হতে রাজি।’

তিথি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল – ‘ধন্যবাদ। জানতাম তুমি কথাটা রাখবে। এখন থেকে বিয়ের আগে ছেলেমেয়েরা যেমন প্রেম করে আমরাও সেরকম প্রেম করবো।’ হাসিবুর তখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি।সে তিথিকে টেনে বুকে জড়িয়ে নিতে নিতে বলল, ‘আচ্ছা ঠিকাছে। কিন্তু এবার তো আমার বুকে এসো। পঁচিশ বছর যাবত এই বুক শুন্য। এবার তুমি ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দাও।’ তিথি হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল, “ছি ছি হাসু। তোমার দেখছি চরিত্র ভালো না। প্রেমের প্রথমদিন কী কেউ এভাবে প্রেমিকাকে জড়িয়ে ধরে?’ হাসিবুরের যেন আসমান ভেঙে মাথায় পড়ে। সে বিস্মিত হয়ে বলল, ‘ওমা নিজের বউকে বাসর ঘরে জড়িয়ে ধরলে চরিত্র খারাপ হয়ে যায় নাকি?’ তিথি আরও চড়াও হয়ে বলল, ‘তো চরিত্র খারাপ না? বিয়ের আগে আমি ওসব জড়াজড়ি চুমাচুমিতে নেই।’

হাসিবুর এতোক্ষণে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। তার মেজাজ সাথে সাথে খারাপ হয়ে গেল। চরম বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘তোমার এসব ছেলেমানুষী প্রেম-ভালোবাসার আলাপ বাদ দাও তো তিথি৷’ ধমক খেয়ে তিথি পাক্কা অভিনেত্রীর মতো কাঁদতে শুরু করেছে। ‘আরে কান্নাকাটি করছো কেন? কেউ শুনলে কী ভাববে?’ তিথি আরও উচ্চস্বরে বলল, ‘যার যা ইচ্ছে ভাবুক। তুমি কীভাবে আমার প্রেম-ভালোবাসাকে ছেলেমানুষী বললা? এই কী সাচ্চা প্রেমিকের ধরন! আমার স্বপ্নের প্রেমিক তো এমন ছিলো না।’ হাসিবুর হাতজোড় করে বলল, ‘প্লিজ কান্না থামাও আর একটু আস্তে কথা বল।’ তিথি কান্না থামিয়ে বলল, ‘তাহলে আলাদা বিছানা করে নাও। বিয়ের আগে কী প্রেমিক-প্রেমিকা একসাথ থাকে বল?’ হাসিবুর কোনো কথা না বলে করুণ মুখে তিথির দিকে তাকিয়ে রইল।

তিথি খিলখিল করে হাসতে শুরু করে। তারপর চোখে খানিক জল। হাসিবুরকে জড়িয়ে ধরতে যেতেই তিথিরের ঘুম ভেঙে গেল। এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখেছিল। বাসর ঘরে হাসিবুর নেই। তাকে ডাক্তারে নেয়া হয়েছে। রক্তবমি দেখে সবাই ঘাবড়ে গেছেন। রাত খুব বেশি হয়নি৷ সবেমাত্র বারোটা হয়েছে। হঠাৎ তিথি লক্ষ্য করলো দরজায় কে জানি অনবরত নক করে যাচ্ছে। বোধহয় নক শুনে তার ঘুম ভেঙেছিল। তিথি দরজা খুলে দেখে হাসিবুর হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
‘আরে এলে কখন? আর তোমার শরীর কেমন?’ ‘আমি পুরোপুরি ঠিক আছি তিথির পাখি।’ বলেই হাসিবুর দরজা বন্ধ করে নেয়। বাসর রাতের এক মুহূর্ত সময় যেন সে নষ্ট করতে চায় না৷ জড়িয়ে ধরে তিথিকে। বৃষ্টির মতো চুমু পড়তে থাকে তিথিরের কপালে গালে ঠোঁটে গলায় তিথির ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠে। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে আজমল চাচা। আজমল চাচা হচ্ছেন হাসিবুরের বাবা।
তিথি ফোন রিসিভ করে সালাম দিল।

‘হ্যাঁ মা তুমি ফোন দিয়েছিলে রিসিভ করতে পারিনি।’ ‘ওর কী অবস্থা জানার জন্য কল দিয়েছিলাম চাচা।’ ‘মা হাসিবুরের কোনো রোগই তো ধরা পড়ছে না৷ রক্তবমি হওয়া যেসব রোগের লক্ষণ ওর সেসব রোগই নেই। হাসিবুরকে নিয়ে চলে আসতেছি মা।’ তিথি বিস্মিত হয়ে গেল। সে তাকিয়ে দেখলো হাসিবুর বিছানায়। অবাক হয়ে বলল, ‘বাবা হাসিবুরকে নিয়ে আসছো মানে? সে কোথায়?’ ‘মা এইতো আমাদের সাথে আছে। ফোনে কথা বলবে নাকি? আচ্ছা হাসিবুরকে বলছি কল দিতে।’ ফোন রেখে দিলো তিথি। ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম৷ খানিক বাদেই হাসিবুরের নাম্বার থেকে কল এলো। অথচ বিছানায় দেখা যাচ্ছে হাসিমুখে হাসিবুর তার দিকে তাকিয়ে আছে।

তিথির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে বুঝতে পারছে না এসব কি হচ্ছে। খানিক বাদেই হাসিবুরের নাম্বার থেকে কল এলো। তারমানে সে এখনও হসপিটালে। তাহলে বিছানার এই হাসিবুর কে? তিথি ভয়ে ভয়ে বিছানার দিকে তাকায়। হাসিবুর ওর দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। তিথির ভয় লাগে৷ ভীষণ ভয়। এক পা দুই পা করে পেছনে যেতে যেতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে। তারপর একটা চিৎকার। অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে যায়৷ সবাই দৌড়ে আসে ওদিকে। এসে দেখে তিথি মেঝেতে পড়ে আছে। জ্ঞান ফেরার পর তিথি কারো সাথে কোনো কথা বলে না। কালো একটা পুতুল হাতে বিছানার মাঝখানে থমথমে মুখে আসন পেতে বসে আছে৷ তিথির বাবা-মা বারংবার জিজ্ঞেস করে যাচ্ছেন, ‘মা কি হয়েছে বল না। এমন করছিস কেন?’

এতক্ষণে হসপিটাল থেকে হাসিবুর এবং আজমল সাহেব ফেরে এসেছন। সবাই তিথির রুমে। তিথি হঠাৎ বলে উঠলো, ‘তোমরা এখান থেকে চলে যাও আমি একা থাকবো।’ তিথির মামা মতিন সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা মা, হাসিবুরকে রেখে আমরা কথা শেষ করার আগেই তিথির বলল, ‘না।’ ‘তাহলে তোমার মায়ের সাথে থাকো।’ ‘না।’ তিথিরকে একা রেখেই সবাই অন্য রুমে গিয়ে বসলেন। নীরব। কারো মুখে কোনো কথা নেই। মতিন সাহেব নীরবতা ভেঙে গম্ভীরমুখে বললেন, ‘আমার মনে হয় কবিরাজ দেখানো দরকার।’ তিথিরের বাবা মোজাম্মেল হোসেন এসব তাবিজ-কবিরাজ বিশ্বাস করেন না। ‘কবিরাজ দেখানোর কিছু নেই মতিন৷ ভয় পেয়ে মেয়েটা এমন করছে।

‘আরে কবিরাজ এলে তো কোনো ক্ষতি নেই। খামোখা তো আর মেয়েটা ভয় পায়নি। আমার চেনাজানা একজন ভালো কবিরাজ আছে উনাকে কাল আসতে বলবো।’ পরেরদিন বিকেলে দু’জন লোক এসেছে। কবিরাজ এবং তার সহকারী। লোকটির মুখে দাড়ি। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। কোরআনে হাফিজ। তিথির বড় মামাদের এলাকায় বেশ নামডাক। নাম রাফসান উদ্দিন। লোকে রাফসান মোল্লা ডাকে৷ এক সময় একটা মাদ্রাসায় হাফিজি পড়াতেন। এলাকার লোক নানান সমস্যা নিয়ে আসতো। প্রায়ই অনেকের বাড়িতে যাবার ডাক আসে। তিনি গিয়ে আহামরি কিছু করতেন না, কোরআনের যে আয়াত ইচ্ছে সেটা পড়ে ফুঁ দিয়ে চলে আসতেন। কিভাবে জানি কাজ হয়ে যায় বুঝতে পারেন না।

এইসব আয়াত পড়ে সবাই ফুঁ দেয় কাজ হয় না। এক সময় রাফসান উদ্দিন বুঝতে পারেন উনার মধ্য আধ্যাত্মিক একটা ক্ষমতা আছে৷ হঠাৎ হাফিজি পড়ানো বাদ দিয়ে নানান ধরনের বই পড়া আর কবিরাজি শুরু করেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে জয়জয়কার। উনার সাথে সহকারী ছেলেটার নাম সাহেল রহমান৷ খুব সাহসী ছেলে৷ এতদিনে রাফসান উদ্দিনের অবিজ্ঞতার থলি ভরপুর৷ একটুতেই সবকিছু বুঝে ফেলতে পারেন৷ এসব বিষয়ে প্রচুর পড়ালেখাও করেছেন। ‘হুজুর চা নেন।’ মতিন সাহেব চা নিয়ে এসেছেন। রাফসান উদ্দিন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘সবকিছু আমার জানা দরকার। পুরো ঘটনা আপনি জানলে বলা শুরু করুন।’

মতিন সাহেব বলতে শুরু করেন, ‘আমার ভাগ্নীর বিয়ে হয়েছে ওর চাচাতো ভাইয়ের সাথে। গতকাল ওদের বাসর রাত ছিলো। কিন্তু ছেলেটা হঠাৎ রক্তবমি করায় থাকে হসপিটাল নেয়া হয়। রাত বারোটার সময় হাসিবুর ফিরে আসে তিথির কাছে। খানিক বাদেই আবার হসপিটাল থেকে হাসিবুর আর আজমল সাহেব কল করেন। মেয়েটা ভয় পেয়ে যায়৷ হাসিবুর হসপিটালে থাকলে এই ছেলেটা কে?’ রাফসান উদ্দিন খুবই শান্ত। যেন এগুলো খুব জটিল কিছু না। ‘যে ছেলেটার রক্তবমি হয়েছে তাকে ডাক্তার দেখে কি বললো? ‘কোনো রোগ নেই৷ সবই ঠিক আছে৷’ ‘আর মেয়েটার অবস্থা এখন কেমন?’  সে খুব কম কথা বলছে৷ সকালে খানিকটা ভালোই ছিলো। কথা বলেছে। কিন্তু রাতে কারো সাথে ঘুমোতে চায়নি।’ ‘স্বামীর সাথেও না?’ ‘না’। এমন সময় বাড়িতে খানিক গুঞ্জন শোনা গেল। মুতিন সাহেব রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। হাসিবুর রক্তবমি করছে৷ বমি করতে করতে মাটিতে নেতিয়ে পড়ে যাচ্ছে। মতিন সাহেব তাড়াতাড়ি এসে রাফসানকে জানান। তিনি সহকারী কে নিয়ে হাসিবুরকে দেখতে যান।

হাসিবুর মাটিতে পড়েও বমি করছে৷ শরীরের সমস্ত রক্ত যেন বের হয়ে যাচ্ছে। রাফসান উদ্দিন হাসিবুরের অবস্থা দেখে খুব ব্যস্ত হয়ে বললেন তাড়াতাড়ি একটা গ্লাসে করে পানি আনেন। তিনি আপন মনে কিছু একটা পড়তে শুরু করলেন। গ্লাস আনা হলো। তিনি ফুঁ দিয়ে পানি ছিঁটে দিলেন হাসিবুরের গায়ে। খানিক বাদেই বমি বন্ধ হয়ে হাসিবুর অজ্ঞান হয়ে গেল। রাফসান উদ্দিন ঘেমে গেছেন। উনাকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে। ড্রয়িং রুমে মতিন সাহেবকে ডেকে নিলেন। তারপর খানিক শান্ত থেকে বললেন, ‘ছেলেটার কোনো রোগ ধরা পড়েনি না?’ ‘না।’ রাফসান উদ্দিন রুমাল বের করে মুখের ঘাম মুছে বললেন, ‘ছেলেটাকে কেউ মেরে ফেলতে চাচ্ছে৷ আমার ধারণা যাদু করা হয়েছে। ওর বাবাকে ডেকে আনেন।’ আজমল সাহেবকে আনা হলো। দেখে মনে হচ্ছে খুব ভেঙে পড়েছেন।

রাফসান উদ্দিন বললেন, ‘আমার ধারণা ছেলেটিকে যাদু করে মারার চেষ্টা চলছে। আপনাদের কি সেরকম কোনো শত্রু আছে?’ ‘না হুজুর।’ ‘আপনার ছেলের আছে?’ ‘এই মা হারা ছেলের সাথে কে এমন করবে হুজুর।’ ‘যার সাথে বিয়ে হয়েছে সেই মেয়েটিকে দেখতে চাই।’ রাফসান উদ্দিনকে তিথির সামনে নিয়ে যাওয়া হলো। সে একা একা বসে আছে৷ আগের থেকে অনেক স্বাভাবিক। রাফসান রুমে গিয়ে বললেন, ‘কেমন আছেন?’ তিথি কোনো জবাব না দিয়ে হাতের পুতুলের দিকে তাকিয়ে আছে। ‘আপনার স্বামী একটু আগে রক্তবমি করেছে জানেন?’ তিথি নীচের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার কোনো স্বামী নেই।’ ‘আপনার তো কাল বিয়ে হলো।’

তিথি কোনো জবাব দিলো না৷ রাফসান ব্যাগ থেকে একটা তাবিজ বের করে মতিন সাহেবকে বললেন তিথির হাতে বেঁধে দিতে। মতিন তাবিজ নিয়ে যেতেই তিথি বড় বড় চোখে তাকাল। সে তাবিজ হাতে দিবে না। মোজাম্মেল গিয়ে মেয়ের দুই হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন। তাবিজ তাড়াতাড়ি বেঁধে ফেললেন মতিন সাহেব। রাফসান উদ্দিন উঠে যাচ্ছিলেন হঠাৎ চোখ পড়েছে পুতুলের দিকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এই পুতুল কোত্থেকে এনেছেন? মোজাম্মেল হোসেন বললেন, ‘জানি না। কাল থেকে দেখছি হাতে।’ রাফসানের মাথায় খটকা লাগে। তিথিকে বললেন, ‘আপনার পুতুল তো অনেক সুন্দর। একটু দেখি?’

তিথি মাথা নাড়িয়ে নিষেধ করে। তিথির হাত থেকে টান মেরে পুতুলটা নিয়ে আসলেন। তিথি ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে লাগলো। পুতুলটার মুখে হাসি লেগে আছে। রাফসান পুতুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছেন। মাথার একপাশে লম্বা চুল আরেকপাশে খাটো। রাফসান উদ্দিনের কাছে পুতুলটা সুবিধার মনে হচ্ছে না৷ তিনি ব্যাগ থেকে একটা লাইট বের করে জ্বেলে পুরো পুতুল দেখতে লাগলেন। পুতুলের পরনে লাল একটা প্যান্ট। তিনি টেনে প্যান্টটা খুলে ফেললেন। পুতুলকে উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলেন কিছু লেখা আছে কিনা। কিছুই নেই। পুতুলের দুই পা মেলে লাইট মারলেন। হঠাৎ চোখে পড়ে দু’টা চিহ্ন। পুরুষ এবং নারী লিঙ পাশাপাশি আঁকা। তিনি অস্ফুটে বললেন, ‘মাই গড।’ এটা তো যাদুর পুতুল। স্বামী-স্ত্রীর দূরত্বের জন্য এই পুতুল ব্যবহার করা হয়েছে। পুতুলের মাথায় চুলও একপাশে লম্বা যার মানে স্ত্রীর চুল। আরেক পাশে খাটো মানে পুরুষের চুল৷ মনে হচ্ছে মেয়েটাকে এখনও পুরোপুরি যাদু করতে পারেনি। কারণ মেয়েটা পুতুলের জন্য খুব বেশি অস্থির হচ্ছে না।

তাবিজও সহজে পড়ানো গেছে। যারা যাদু করেছে তারা এই মেয়ের খুব ক্ষতি করতে চাচ্ছে না। ভয় হচ্ছে ছেলেটাকে নিয়ে৷ তাকে মেরে ফেলতে চাইছে৷ এখন এই পুতুলকে জ্বালিয়ে ফেললে মেয়েটা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে৷ সে তখন স্বামীকে কাছে চাইবে৷ তখন শত্রুরা আরও কঠিন যাদুর পথ খুঁজবে। অবশ্য সবাই সতর্ক থাকলে তারা ব্যর্থ হবে৷ পুতুল জ্বালানোর আগে আমি ছেলেটির সাথে কথা বলতে চাই। হাসিবুর বিছানায় শুয়ে আছে। খানিকটা দূর্বল দেখাচ্ছে তাকে। রাফসান উদ্দিন আর হাসিবুর একা রুমে। ‘পুতুলটা জ্বালিয়ে দিলে আপনার স্ত্রী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে। আপনাকে কাছে চাইবে। মিলন হবে৷ তখন দয়া করে কোনো প্রকার প্রটেকশন ব্যবহার করবেন না।’ হাসিবুর চমকে উঠে বলল, ‘মানে?’

রাফসান উদ্দিন মুচকি হেঁসে বললেন, ‘উত্তেজিত হবেন না, ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝিয়ে বলি। আমার ধারণা আপনাদেরকে যাদু-টোনা করা হচ্ছে। এসব ব্যাপারে আপনার রুগীর আশেপাশের কেউ জড়িত থাকে। অলরেডি আপনাকে যে যাদু করা হয়েছে সেখানে আপনার কমপক্ষে একটা কাপড় প্রয়োজন। তারা সেটা পেল কীভাবে? আর এই যাদুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে পুরুষের বীর্য আর নারীর মাসিকের রক্তাক্ত কাপড়। কারণ শয়তান জিনেরা নাপাক জিনিস বেশি পছন্দ করে।’ ‘কিন্তু আমাদের সাথে কারা এমন করবে?’ ‘আমার ধারণা আপনাদের বিয়ে কেন্দ্র করে এসব হতে পারে। আপনার বাবার কাছ থেকে আমি বিস্তারিত জেনে নেব। আপনি এখন রেস্ট নেন।

আজমল সাহেব আর রাফসান ড্রয়িং রুমে বসে আছেন। তিথি আর হাসিবুরের বিয়ের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চায় রাফসান। ‘আপনি একটু সংক্ষেপে বলুন তিথি আর রাফসাবের বিয়ের ব্যাপারে।’ ‘বিয়ের ব্যাপারে বলার মতো কিছু নেই। আমার ভাতিজি ইংল্যান্ড ছিলো। তিথি হচ্ছে আমার বড় ভাই মোজাম্মেলের মেয়ে। আমার আরেক ভাই মোসাদ্দেক। দীর্ঘদিন আগে থেকে মোজাম্মেল আর মোসাদ্দেকের মধ্য কথাবার্তা ঠিক ছিলো তিথির সাথে সাহেদের বিয়ে হবে। সাহেদ হচ্ছে মোসাদ্দেকের ছেলে। শুধু তিথি ছাড়া বাকি সবাই জানতো সাহেদের সাথেই বিয়ে হবে৷ তিথিকে বিয়ে করে ম্যারেজ ভিসায় সাহেদ একেবারে ইংল্যান্ড স্যাটেল হবে। গতমাসে তিথিকে দেশে নিয়ে আসে মোজাম্মেল। এদিকে সাহেদের সাথেও বিয়ের কথাবার্তা পুরোপুরি ঠিকঠাক। তিথি সব সময় বাবার বাধ্যগত মেয়ে।

তাই তাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করেননি। কিন্তু দেশে এসে যখন সাহেদকে বিয়ের কথা বলা হলো সে কোনোভাবেই রাজি হয় না৷ কারণ ওর শৈশবের বন্ধু হাসু ভাইকে সে পুরো জীবনের জন্য বন্ধু হিসেবে চায়। ইউরোপে গিয়ে নিজের সুনালী শৈশবকে ভীষণ মিস করেছে৷ আর সেই শৈশবের পুরোটা জুড়ে হাসু ভাই। আমরা সবাই থাকে বুঝালাম বিয়েটা ঠিক হয়ে গেছে। মেনে নে মা। সে আরও বিগড়ে যায়৷ তাকে না জানিয়ে কেন বিয়ে ঠিক করা হলো। দেশে বিয়ে করলে হাসু ভাইকেই বিয়ে করবে। বিষ খেয়ে মরে যাবে তবুও হাসু ভাইকে ছাড়া বিয়ে করবে না। তাছাড়া অল্প কয়দিনে হাসিবুরের সাথে কেমন ভাবসাবও হয়ে যায়। একপর্যায়ে বড় ভাই হাসিবুরের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেলেন। মোসাদ্দেকও হাসি মুখে বড় ভাইয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তারপর হাসিবুর আর তিথির বিয়ে হলো।’

রাফসান উদ্দিন পুরো ব্যাপারটা মনযোগ দিয়ে শুনলেন। এখন আর ধারণা করে কিছু বলতে চাইছেন না। ‘চলুন আজমল সাহেব। পুতুলটা জ্বালিয়ে ফেলা যাক।’ পুতুল নিয়ে বাইরে যাওয়া হলো। তারপর কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে ছাঁইগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। পুতুল জ্বালানোর পর থেকেই অস্বাভাবিকভবে হাসিবুরের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে৷ তিথি ভীষণ অস্থির। হাসিবুরের পাশে বসে শুধু কান্নাকাটি করছে। রাফসান উদ্দিন ভীষণ চিন্তিত। তিনি ঝাড়ফুঁক দিয়ে যাচ্ছেন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না৷ তাড়াতাড়ি বাথরুমে যেয়ে অযু করে এলেন। আলাদা রুমে যেয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে চোখ বন্ধ করে খানিক্ষণ বসে রইলেন।

এদিকে হাসিবুর কৈ মাছের মতো ছটফট করছে৷ খানিক বাদে তিনি আজমল সাহেবকে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘ওরা অনেক আগে থেকে হাসিবুরের উপর যাদু চালাচ্ছিল। তিথি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাওয়ায় হাসিবুরকে মেরে ফেলতে চাইছে। তাদের কাছে একটা পুতুল আছে। সেই পুতুলে যখন সুই দিয়ে আঘাত করে তখন হাসিবুরের রক্তবমি হয়। এখন পুতুলের গলা টিপে ধরে আছে তাই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।

আমি ওই যাদুকরের সাথে যুদ্ধে নামবো। ওরা হাসিবুরের চুল বা কাপড় কিছু একটা দিয়ে যাদু করে কোথাও পুঁতে রেখেছে৷ এসব যাদু সাধারণত এভাবেই করা হয়। এবং যাদুকর শয়তানের সাথে চুক্তিনামা তৈরি করে রুগীর নাম দিয়ে। সবকিছু মাটিতে পুঁতে রাখে। এগুলো খুঁজে বের করে শয়তান জিনের সাথে যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনতে হবে।
আমি জয়ী হবো কি না জানি না। কিন্তু পরাজিত হলে আপনার ছেলে মারা যাবে। নববিবাহিতা মিষ্টি মেয়েটি বিধবা হবে।

আজমল সাহেব কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘হুজুর আমার ছেলেটাকে বাঁচান। আমাকে শুধু কি করতে হবে বলুন।’ আপনি দ্রুত একটা রুম পরিষ্কার করেন। একেবারে পবিত্র হতে হবে রুম। আর একটা তলোয়ারের ব্যবস্থা করেন। অবশ্য গরু কোরবানির ছুরি হলেও হবে। শুধু “ওমরের তলোয়ার” লেখার মতো জায়গা থাকতে হবে। কারণ শয়তান ওমর (রাঃ) কে বেশি ভয় পায়। খুব তাড়াতাড়ি সবকিছুর ব্যবস্থা হয়ে গেছে। হাসিবুরের অবস্থা খুবই খারাপ। এরিমধ্য একবার রক্তবমি করেছে। শ্বাসকষ্ট বেড়েই চলছে৷ চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে। পাশে বসে তিথি কান্নাকাটি করছে। আলাদা একটা রুমে রাফসান উদ্দিনের সহকারী সাহেল পশ্চিমে সেজদারত। হুজুর তাকে ফুঁ দিচ্ছেন। রুম পুরো অন্ধকার।

হঠাৎ রুমে দু’জন সাহেল হয়ে গেল।সেজদারত সাহেল থেকে আরেকজন সাহেল উঠে দাঁড়াল। পাশে রাখা আরবীতে আঁকিবুঁকি করা একটা কাপড় মাথায় বেঁধে তলোয়ার হাতে নেয়। ছোট্ট তলোয়ার হাতে নেবার সঙ্গে সঙ্গে লম্বা হয়ে গেছে। ধারালো তলোয়ার। সে সোজা রুম থেকে বের হয়ে যায়। তার অস্তিত্ব এই জগতের কেউ টের পাচ্ছে না। অদৃশ্য এক সাহেল রুম থেকে বের হয়ে বাড়ির আশেপাশে ঘুরতে তাকে। তার কেন জানি ইচ্ছে করছে পাশের বাড়িতে যেতে। সেটা মোসাদ্দেক হোসেনের বাড়ি। এই বাড়ির ছেলে সাহেদের সাথে তিথির বিয়ে ঠিক ছিলো। সাহেলকে সেদিকে টানছে। খানিক এগুতেই দেখলো তার মাথার উপরে একটা বাদুড়। সাহেল হাতের তলোয়ার শক্ত করে ধরে নেয়। আকাশের রঙ পরিবর্তন হয়ে গেছে।

নীল আসমান কালো হয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। হঠাৎ একটা ধমকা হাওয়া এসে সাহেলকে উড়িয়ে নিয়ে একটা পাহাড়ে ফেলে দিল। সে দেখতে পেলো একটা বিশ্রী লোক জঙ্গলের ভেতরে পুতুল হাতে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। পুতুলটির গলা টিপে ধরে আছে। লোকটি পুরোপুরি উলঙ্গ৷ এই জায়গা কোথায় সাহেল বুঝতে পারছে না। খুব সম্ভব এই লোকটি কালো যাদুকর। একে দিয়েই শক্তিশালী যাদু করা হয়েছে। সাহেল লোকটির দিকে এগিয়ে যাবে এমন সময় দেখতে পেলো অনেকগুলো সাপ বিভিন্ন গাছগাছালি থেকে নেমে তার দিকে এগিয়ে আসছে। এই অচেনা জায়গায় সে কোনদিকে দৌড়াবে বুঝতে পারছে না। বিশাল বড় বড় সাপ মুখ হা করে তার দিকে চলে আসছে দেখে সে দৌড়ানো শুরু করলো। কিন্তু কখন পাথরের সাথে ধাক্কা লেগে সে পাহাড় থেকে পড়ে যাবে বুঝতে পারছে না।

হাতের তলোয়ার এখনও শক্ত করে ধরা। দৌড়াতে দৌড়াতে সাহেল একটা লতানো গাছের সাথে পা লেগে পড়ে যায়। আবার উঠতে যেয়ে দেখে মুখের সামনে একটা বিশাল সাপ ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সাহেল খুব দ্রুত পাশে থাকা তলোয়ার চালিয়ে দেয় সাপের মাথায়। দুভাগ হয়ে যায় সাপটির মাথা। সাহেল আবার দৌড়ায়। মাথার উপর একটা বাদুড়। পেছনে অনেকগুলো সাপ। হঠাৎ দেখে মাথার উপরে অনেকগুলো পায়রা৷ একটি পায়রার মুখে চিরকুট। সাহেল হাত বাড়ায় পায়রার দিকে। সেখানে লেখা তুমি এখন আসামে আছো। তোমাকে ধমকা বাতাসে আসাম কবিরাজের এলাকায় এনে ফেলেছে৷ মোসাদ্দেকের বাড়ি যাবার পথে বাঁধা দিয়েছে এই কবিরাজ। তারমানে সেখানেই যাদুর সবকিছু পুঁতে রাখা। হঠাৎ সাহেল দেখতে পায় তার শরীর মিলিয়ে যাচ্ছে ধূয়া হয়ে।

সাহেল সেজদা থেকে উঠে বসে রাফসান উদ্দিনের সামনে। সে হাঁপাচ্ছে। রাফসান উদ্দিন রুমাল দিয়ে নিজের মুখের ঘাম মুছে বললেন, ‘সাহেল, আবার প্রথম থেকে কাজ করতে হবে। তোমাকে আসাম উড়িয়ে নিয়েছিল কবিরাজ। আমি প্রস্তুত ছিলাম না তাই তোমাকে আটকাতে পারিনি। আবার চেষ্টা করে দেখতে হবে হাসিবুরের চাচার বাড়ি যাওয়া যায় কিনা। তোমার পকেটে লাইটার নাও। আবার সেজদা দাও পশ্চিমে। রাফসান উদ্দিন সাহেলের পা বেঁধে নেন একটা গামছা দিয়ে। গামছাটা ধরে রাখেন নিজের হাতে।

তারপর ফঁ দিলেন। খানিক বাদেই সাহেল আগের মতো রুম থেকে বের হয়ে যায়। সোজা তলোয়ার হাতে হাটঁতে থাকে হাসিবুরের চাচার বাড়ির দিকে। আবার আকাশ কালো রঙ ধারণ করে। তারপর ধমকা হাওয়া। তাকে উড়িয়ে নিচ্ছিল এমন সময় মনে হলো কেউ থাকে পায়ে ধরে টেনে রাখছে। বাতাস থাকে কোনোভাবেই টেনে নিতে পারছে না। হঠাৎ দেখলো এখানেও চারদিক থেকে সাপ আসতে শুরু করেছে। সে আর ভয় পায় না৷ তলোয়ার হাতে এগিয়ে যায়। অনেকগুলো সাপ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে।

সাহেল তলোয়ার নিয়ে মাটিতে হাটু ঘেরে বসে যায়। এগিয়ে আসে একটি সাপ। সাহেল চোখের পলকে তলোয়ার চালিয়ে দেয় সাপটির মাথায়। দুভাগ হয়ে যায় সাপ। ধীরে ধীরে সব সাপ ভয়ে পেছনে যেতে থাকে। সাহেল দৌড়াতে থাকে ওই বাড়ির দিকে। বাড়ির সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। খানিক সময় চোখবন্ধ করে থেকে বাড়ির পুকুর পাড়ের দিকে দৌড়ায় সে। হঠাৎ চোখে পড়ে দু’টি বিশাল সাপ ফণা তুলে বসে আছে। মাঝখানে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে কোনো কিছু পুঁতে রাখা। সাহেল সেদিকে এগিয়ে যায়। সাপ দু’টা তার দিকে ধেয়ে আসে। সাহেল তলোয়ার নিয়ে হাঁটু ঘেরে বসে যায়। সাপ কাছাকাছি আসার পর চালিয়ে দেয় মাথায়। দুভাগ হয়ে যায়। দ্বিতীয় সাপটি তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে৷ সাহেল বাম হাত দিয়ে সাপটির গলা চেপে ধরে। বিশাল সাপটিও সাহেলের পুরো শরীর পেঁচিয়ে ফেলে৷ সাহেল আর নড়তে পারে না।

হাসিবুরের খুবই ভংকর অবস্থা৷ অনবরত নাক মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। শ্বাস নিতে পারছে না। সবাই সামনে গোল হয়ে বসে আছে। যার যে সূরা ইচ্ছে তেলাওয়াত করছে। তিথি জায়নামাজে সেজদায় পড়ে কান্নাকাটি করছে। একা একটি অন্ধকার রুমে রাফসান উদ্দিন যুদ্ধ করছেন অশুভ শক্তির সাথে।

সাহেল এক হাতে সাপের গলা এখনও চেপে আছে। আরেক হাতে তলোয়ার। কেউ কারো সাথে পেরে উঠছে না। হঠাৎ সাপটি সাহেলকে নিয়ে পুকুরে পড়ে যায়। সাপ আর তার ওজনে নীচের দিকে যেতে থাকে৷ সাহেলের আর শ্বাসে কুলাচ্ছে না। নাক মুখে পানি ঢুকতে শুরু করেছে৷ এখনও বাম হাতে সাপের গলা আর আরেক হাতে তলোয়ার চেপে ধরা। ডান হাত কোনোভাবে সাপের পেচ থেকে বের করতে পারলে হয়। সাহেলের মনে হচ্ছে এবার মরেই যাবে। সে আল্লাহু আকবার বলে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ডান হাত টেনে মুচড়ে বের করা শুরু করল। সাপ আরও শক্ত করে চেপে ধরে। সাহেলের এবার মনে হচ্ছে বাম হাত সাপের গলা থেকে ছুটে যাবে। তাহলে হবে মহাবিপদ৷ খেতে হবে বিষাক্ত সাপের ছোবল। কিন্তু তার হাতে দ্বিতীয় কোনো পথ নেই। সে আবার আল্লাহ আকবার বলে টান মারে। ডান হাত বের হওয়ার সঙ্গে তলোয়ার লেগে সাহেলের পা অনেকটা কেটে যায়। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে সাহেল। কিন্তু সে থেমে থাকে না। খুব কষ্টে সাপের মাথায় তলোয়ার চালায়।

সাপটি খসে পড়ে শরীর থেকে। সে লাফিয়ে উঠে পানি থেকে। দৌড়ে গিয়ে তরোয়াল দিয়ে মাটি সরায় সে। তারপর দেখতে পায় একটি তাবিজ, অন্তর্বাস, কালো একটি মুরগীর মাথা। সাহেল পকেটে থেকে লাইটার বের করে। আশ্চর্য লাইটার পানিতে ভিজে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন সে কী করবে? কোনো কিছুই মাথায় ঢুকছে না। হঠাৎ দেখতে পেলো পায়রা একটি মাথার উপর। ঠোঁটে চিরকুট। সেখানে লেখা তাবিজ আর অন্তর্বাস তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলে দাও। আর মুরগীর মাথা পুকুরে। সাহেল তাড়াতাড়ি তাবিজ টুকরো টুকরো করে ফেলে৷ তারপর অন্তর্বাস তলোয়ার দিয়ে ফালাফালা। মুরগির মাথা পুকুরের মাঝখানে। হঠাৎ সাহেল দেখে সে মিলিয়ে যাচ্ছে।

হাসিবুর রক্তবমি করতে করতে প্রায় মরে যাচ্ছিল। হঠাৎ রক্ত বন্ধ হয়ে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। রাফসান উদ্দিন তাড়াতাড়ি অন্ধকার রুম থেকে বের হয়ে বলেন, ‘ছেলেটিকে দ্রুত হসপিটাল নিয়ে যান। হাসিবুর হসপিটাল গিয়ে এখন পুরোপুরি সুস্থ। ডাক্তার বলেছে বাড়িতে এসে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে। তিথি ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ছোটবেলার নানান গল্প করে ওর হাসু ভাইকে মাতিয়ে রাখছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত