নিরু

নিরু

নিরু,আজ তোমায় খুব সুন্দর লাগছে।’ নিজের মনে কথাটা বলে নিজেই হেসে উঠলো নিরুপমা।তারপর হঠাৎ বিষণ্ন হয়ে গেলো।সত্যিই তাকে এ কথাটা বলার মতো কেউ নেই।তার রূপের প্রশংসা কেউ করে না।সে খুব চায় কেউ তাকে বলুক,’তুমি কি আমার মায়াবতী হবে?তোমার চোখের কাজলে আমার সমস্ত ভাবনাকে আটকে দেবে?শাড়ির কুঁচির ভাজের মতো যত্ন করে সামাল দেবে?কালো?রূপে কী যায় আসে।তুমি নাহয় আমার কৃষ্ণকলিই হলে!’

নিরুপমার অজান্তেই একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।কাঁধের ব্যাগটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে এলো।আজ একটা রিকশাও খালি পাওয়া যাচ্ছে না।নিজের ওপর নিজেই বিরক্ত হলো।একেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান,তার ওপর অনেক দেরি হয়ে গেছে।অনেকক্ষণ পর যা একটা রিকশা পেলো তাও দাম বাড়তি।নিরুপমার মেজাজ বিগড়ে গেলো,নেহাত দেরি হয়ে যাওয়ায় বাড়তি ভাড়াতেই উঠে পড়লো। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটে ঢুকতেই অরবিন্দের সাথে দেখা।অরবিন্দের চোখে চোখ পড়তেই অরবিন্দ হো হো করে হেসে উঠলো,’আরেহ,নিরুদেবী যে!আজ তো শাড়িও পড়েছিস।আমাকে কেমন লাগছে দেখ।রিনি অবশ্য বলেছে আমাকে এই পাঞ্জাবীতে দারুণ মানিয়েছে।রিনিরই তো পছন্দ।তা আজ কার নজর কাড়তে এভাবে সেজেছিস?’

নিরু লজ্জায় কুকড়ে গেলো।অরবিন্দ ওর সিনিয়র,সবসময় অরবিন্দ দা বলেই ডাকে।তার সামনাসামনি হলেই নিরু লজ্জায় কুকড়ে যায়,হয়তো কিছুটা কালো হবার গ্লানিও তাতে মিশে থাকে।মনে মনে বলে,’তোমার জন্যেই তো সাজলাম বিন্দু দা।তুমি কি দেখতে পাওনা আমায়?নাকি কালো বলে চোখেই পড়েনা?’ মুখে যদিও বললো,’কারো জন্যেই না।’

অরবিন্দ অন্যদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।নিরু একা একা ঘুরতে লাগলো ক্যাম্পাসে।আজকের অনুষ্ঠানে তার একটা গান দেওয়ার কথা।সম্ভবত এটাই তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম অংশগ্রহণ।আর শেষও এটাই।কারণ আগামী মাসেই তার বিয়ে,সে কাউকে এখনো জানায়নি।

আর জানাবেই বা কাকে,তার তো জানানোর মতো কেউ নেই।সবাই যার যার মতো ব্যস্ত,কারো সাথেই তেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব নেই যাকে প্রাণখুলে সব বলা যায়।এমন কোনো বন্ধু নেই যার কাছে সে বলতে পারে,’জানিস,আমার না বিন্দু দা কে খুব ভালো লাগে।’ বন্ধু হয়তো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতো,’বিন্দু দা আবার কে?’ নিরু তখন হেসে উত্তর দিতো,’কাউকে বলবি না বল।আমি অরবিন্দ দা কে বিন্দু দা বলে ডাকি।জানিস,বিন্দু দাকে কখনো বলতে পারিনি।হয়তো এটাও বলতে পারবো না যে,বিন্দু দা তোমার নিরুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।যার সাথে বিয়ে হচ্ছে তাকে সে কখনো দেখেনি।শুনেছে হবুবর কোটিপতি বিপত্নীক।নিরুর বয়সী এক ছেলেও আছে তার।’
নিরুর চোখ হঠাৎ ঝাপসা হয়ে আসে।

মুছতে গিয়ে কাজলটা বেখেয়ালে লেপ্টে যায়।নিরু মুচকি হাসে।তার কাজল লেপ্টে গেলেও কোনো সমস্যা নেই,সেটা খেয়াল করার মতো কেউ নেই।নিরু দেখলো দূরে বিন্দু দা গোলচত্বরে বসে গিটার বাজিয়ে গান গাইছে।চারপাশের বন্ধুরা অনেকেই তাতে গলা মেলাচ্ছে।নিরুর ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে বলে,’বিন্দু দা,তোমাদের গানে আমাকেও নাও না।আমারও খুব গাইতে ইচ্ছে করছে তোমার সাথে।’ নিরুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ গানটা ছিলো তারই জীবনের প্রহসন, আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান, আমি প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ। তারপর আর নিরুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও দেখা যায়নি।তবে যাবার আগে সে বিন্দু দাকে একটা চিঠি দিয়ে গিয়েছিলো।

বিন্দু দা হয়তো চিঠিটা পড়েছিলো।তাই যখন নিরুর চিতা সাজানো হচ্ছিলো তখন পাথর হয়ে গিয়েছিলো।কিছুদিন আগেও যে নিরু একটা শান্তশিষ্ট,অল্পভাষী সাধারণ মেয়ে ছিলো যার কোনো অস্তিত্বই অরবিন্দর জীবনে ছিলো না তার চলে যাওয়াতে হঠাৎ সবকিছুতেই শূন্যতা খুঁজে পেলো।তাই হয়তো এখনো সব কালো মেয়ের মাঝে সে নিরুকে খোঁজে,নিরুর সেই চিঠিটাকে এখনো প্রতিদিন বের করে দেখে। প্রিয় বিন্দু দা, তোমায় বিন্দু দা বলায় রাগ করোনি তো?রাগ করলেও অবশ্য কিছু যায় আসে না,কারণ তোমায় বিন্দু দা ডাকতেই আমার ভালো লাগে।

আচ্ছা তুমি এমন কেন বলতো?তোমার জন্যই যে আমি এমন সেজে এলাম তা কি তোমার চোখেই পড়লো না?
মনে আছে,তুমি একবার বলেছিলে,’নিরু,আ মার সবুজ রং পছন্দ।সবুজ শাড়ি,গাঢ় কাজল,একটা ছোট্ট কালো টিপ আর খোলা চুলে সব মেয়েকেই মায়াবতী লাগে।’ আমি তো মায়াবতীই সাজতে চেয়েছিলাম,তুমি কি তোমার মায়াবতীকে চিনতে পারোনি?নাকি তুমি কোনো কালো মেয়ের মাঝে মায়াবতীর সংজ্ঞা খুঁজে পাওনি?আমার অবশ্য তোমাকে সব রঙেই ভালো লাগে।প্রথম যেদিন তোমাকে খয়েরী রঙের শার্টে দেখেছিলাম সেদিনও ভালো লেগেছিলো।তোমায় চুপিচুপি ভালোবেসেছি বলে রাগ করোনি তো?

আমি একটু ওরকমই।আর ভালোবাসা কি প্রকাশ করা যায় নাকি?হয়তো যায়,রিনি প্রকাশ করতে পেরেছিলো হয়তো।আমি পারিনি এটা আমার ব্যর্থতা।কি করে করতাম বলো,আমি তো তোমায় দেখলেই লজ্জায় সিঁটিয়ে যেতাম,এই বুঝি তুমি আমায় দেখে বুঝে ফেললে সব।তোমার দিকে তাকানোর সাহস পেতাম না,পাছে তুমি চোখের ভাষা পড়ে ফেলো।আমি তোমার মায়াবতী হতে চেয়েছিলাম,কিন্তু তুমি আমার চোখের ভাষা বুঝতে পারোনি।খুব অভিমান জমা আছে তোমার ওপর।আমার অভিমান হয়তো তুমি সইতে পারবে না,তাই তোমায় মুক্তি দিলাম।
ইতি
তোমার নিরু

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত