হটলাইন: ৪. জুলহাজের মাথাটা দপ দপ করতে থাকে

হটলাইন: ৪. জুলহাজের মাথাটা দপ দপ করতে থাকে

৪. জুলহাজের মাথাটা দপ দপ করতে থাকে

জুলহাজের মাথাটা দপ দপ করতে থাকে। হঠাৎ করে তার পুরো দৃশ্যটা মনে পড়ে যায়। গাড়ীটার স্টিয়ারিং ডান হাতে, বাম হাতটা পাশের সীটে। সেখানে নীলা বসে আছে। জানালা খোলা। বাতাসে নীলার চুল উড়ছে। ড্যাশ বোর্ডে একটা গান বাজছে। প্রেমের গান। জুলহাজ আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে তাল দিচ্ছে। গাড়ী চালাতে চালাতে সে মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো টুটুল গভীর মনোযোগ দিয়ে তার ছবির বইটা দেখছে। ছেলেটা তার মায়ের মত শান্ত হয়েছে। কোনো কিছু নিয়ে বিরক্ত করে না। হাতে একটা বই ধরিয়ে দিলে গভীর মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলো দেখতে থাকে। ছবি দেখতে দেখতে কী যেন ভাবে। এইটুকু মানুষ যখন মুখ গম্ভীর করে কিছু একটা ভাবে সেই দৃশ্যটা দেখে জুলহাজের হাসি পেয়ে যায়।

জুলহাজ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বাইরে তাকালো। দুইপাশে ধানক্ষেত। আর কিছুক্ষণ গেলেই চা বাগানে ঢুকে যাবে। চা বাগানের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা, দেখতে খুব ভালো লাগে। রঙিন শাড়ী পরে। চা শ্রমিকেরা মাথায় বড় বড় ঝাঁকাতে করে চা পাতা নিয়ে হাঁটছে। রাস্তাটা নিরিবিলি এখানে হাইওয়ের মতো বড় বড় বাস ট্রাক নেই।

নীলা কিছু একটা বলল, জুলহাজ ঠিক শুনতে পেলো না, একটা ছোট গাড়ীকে পাশ কাটিয়ে সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী বলছ নীলা?”

নীলা আবার বলল, আর ঠিক তখন দৈত্যের মত বিশাল একটা বাস তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় তার গাড়ীটাকে ধাক্কা দিল। জুলহাজের ছোট গাড়ীটা কেমন যেন বাতাসে উড়ে গেলো। গাড়ীটা শূন্যে পাক খাচ্ছে, একবার, দুইবার, তিনবার। রাস্তা থেকে উড়ে গিয়ে নিচে পড়েছে মুহূর্তের মাঝে সবকিছু ওলট পালট হয়ে গেলো। প্রচণ্ড একটা আঘাত, সবকিছু ভেঙেচুরে যাওয়ার শব্দ তারপর হঠাৎ চারিদিক নিঃশব্দ হয়ে গেলো, শুধু ড্যাশবোর্ডের সিডি প্লেয়ারে প্রেমের গানটি বেজে যাচ্ছে, এক বৈশাখে দেখা হলো দুজনে জষ্ঠিতে হলো পরিচয়…।

জুলহাজ মাথা ঘুরিয়ে নীলাকে দেখার চেষ্টা করল, পারল না। পেছনে টুটুলকে দেখতে চাইলো কিন্তু কিছু বোঝার আগেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।

আবছা আবছা ভাবে কখনো কখনো জ্ঞান এসেছে কখনো আবার

অচেতন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে যখন জ্ঞান এসেছে তখন বুঝতে পেরেছে সে হাসপাতালে, তাকে ঘিরে ডাক্তার, নার্স আর মানুষ। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় তার বুক ফেটে যাচ্ছে, সে বলতে চাইছে ”পানি! পানি! একটু পানি।” কিন্তু সে বলতে পারছে না। যখনই একটু নড়ার চেষ্টা করেছে তখনই প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সে থরথর করে উঠেছে। সে কিছু মনে করতে পারে না, তার কী হয়েছে সে জানে না একদিন সে শুনল কেউ একজন তাকে ডাকছে, “জুলহাজ! এই জুলহাজ! চোখ খুলবি? তাকাবি একবার?” জুলহাজ চোখ খুললো। তাকালো, তার মুখের উপর সুজিত ঝুঁকে আছে। সুজিতের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। তাকে ঝাঁপসা ঝাঁপসা দেখা যাচ্ছে।

জুলহাজ জিজ্ঞেস করল, “আমি কোথায়? কী হয়েছে আমার?”

“এক্সিডেন্ট হয়েছে। তুই, তুই হাসপাতালে-”

সুজিতের কথা শুনে হঠাৎ করে জুলহাজের সব কথা মনে পড়ে গেলো। জুলহাজ গাড়ী নিয়ে যাচ্ছিল, তার পাশে বসে ছিল নীলা। পিছনে ছিল টুটুল। টুটুলের হাতে ছিল ছবির একটা বই। ড্যাশবোর্ড থেকে গানের সুর ভেসে আসছিল, ‘এক বৈশাখে দেখা হলো দুজনার’-জুলহাজ তখন বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের মত চমকে উঠল, নীলা আর টুটুল কেমন আছে?

জুলহাজ ধড়মড় করে উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। শুয়ে থেকে প্রায় চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, “নীলা আর টুটুল? নীলা আর টুটুল কেমন আছে? নীলা”

সুজিত তার দৃষ্টি এড়িয়ে ফিস ফিস করে বলল, “তুই অনেক বড় বিপদ থেকে বেঁচে এসেছিস। ডাক্তাররা তোর আশা ছেড়ে দিয়েছিল।“

জুলহাজ অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, “নীলা? টুটুল?”

সুজিত বলল, “তুই বেঁচে যাবি কেউ ভাবে নাই। খুবই খারাপ অবস্থা ছিল-”

জুলহাজ এবারে চিৎকার করে উঠল, “নীলা? টুটুল?”

সুজিত অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। কোনো কথা বলল না।

জুলহাজের নাকে অক্সিজেনের টিউব, গলায় কেনোলাতে স্যালাইনের টিউব। শরীরের নানা জায়গায় সেন্সর। জুলহাজ টান দিয়ে সব খুলে ফেলে হাহাকার করে উঠল। সুজিত ভয় পেয়ে চিৎকার করে বলল, “সিস্টার! সিস্টার!”

কয়েকজন তার দিকে ছুটে এলো। কয়েকজন তাকে চেপে ধরে রাখে, একজন কোথায় জানি তাকে একটা ইনজেকশান দিল। জুলহাজ থরথর করে কাঁপতে থাকে। থরথর করে কাঁপতে থাকে।

.

ছয়তলা বিল্ডিংয়ের কার্নিশে দাঁড়িয়ে জুলহাজ থরথর করে কাঁপতে থাকে। কানে একটা ফোন ধরে রেখেছে। ফোনে কেউ একজন কথা বলছে। বাচ্চা একটা মেয়ের রিনরিনে গলা। মেয়েটা কিছু একটা বলছে। কী বলছে?

“আপনি কি বলবেন, আপনি কেমন করে আপনার ওয়াইফ আর ছেলেকে খুন করেছেন?”

জুলহাজ কোনো কথা বলল না। তার শরীর কাঁপছে। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে।

“বলবেন? বলবেন আপনি?”

জুলহাজ একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “গাড়ী দিয়ে! আমি গাড়ী চালাচ্ছিলাম-”

“গাড়ী? গাড়ী চালাচ্ছিলেন? আপনার ওয়াইফ আর ছেলে গাড়ীতে ছিল?”

“হ্যাঁ।”

“তার মানে তারা গাড়ী একসিডেন্টে মারা গেছে! আপনি আসলে খুন করেননি-আসলে এক্সিডেন্ট-”

“একই কথা।” জুলহাজ শুনল, মেয়েটা একটু হাসির মত শব্দ করল। নার্ভাস হাসি, তারপর বলল, “মোটেও একই কথা না। মার্ডার আর এক্সিডেন্ট একই কথা না-কখনোই এক কথা না।”

মেয়েটার ছেলেমানুষী কথা শুনে জুলহাজের রেগে ওঠার কথা ছিল, জুলহাজ কেন জানি রাগতে পারল না। নরম গলায় বলল, “একই কথা। আমার কারণে দুজনে মারা গেছে। শুধু মাত্র আমার কারণে।”

অন্য পাশে মেয়েটা চুপ করে রইল। তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলল, বলল, “আপনি যদি এভাবে ভাবেন আমার কিছু বলার নেই। আমি আসলে আপনার সাথে তর্ক করতে চাই না।”

“আমার কথা না মানলেও তর্ক করবে না?”

“না।”

“কেন না?”

“কারণ-কারণ, আমার আপনার সাথে তর্ক করার কথা না।”

“কী করার কথা?”

“আপনার কথা শোনার কথা।”

“কী কথা?”

“আপনি যেটা বলতে চান। যা ইচ্ছা-”

“কেন?”

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনি যদি কথা বলেন তাহলে মনটা একটু হালকা হবে। যখন মনটা হালকা হবে তখন তখন-”

“তখন আমি আমার মাইন্ড চেঞ্জ করব?”

মেয়েটা চুপ করে রইল।

জুলহাজ বলল, “আমার মাইন্ড চেঞ্জ করার কোনো স্কোপ নাই। আমি অনেকদিন প্ল্যান করে আজকের দিনটা ঠিক করেছি।”

মেয়েটা এবারেও চুপ করে রইল।

জুলহাজ বলল, “বেঁচে থাকাটাই সব না। বেঁচে থাকাটা যদি খুব কষ্টের হয় তাহলে শুধু শুধু বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। বুঝেছ?”

মেয়েটা এবারেও কোনো কথা বলল না।

জুলহাজ আবার জিজ্ঞেস করল, “বুঝেছ?”

“হ্যাঁ বুঝেছি। কিন্তু—”

”কিন্তু কী?”

“একটা কিছু বুঝলেই সেটা মেনে নেয়া যায় না। বোঝা আর মেনে নেয়া আলাদা জিনিস।”

জুলহাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তোমার বয়স কতো বলেছিলে?”

“আঠারো। আঠারো বছরের কম হলে ভলান্টিয়ার হওয়া যায় না।”

“আঠারো বছর বয়সের জন্যে তুমি বেশ গুছিয়ে কথা বল।”

“থ্যাংক ইউ।”।

“ঠিক আছে, পরী। নিচে এখন কোনো গাড়ী নাই-লাফ দেওয়ার জন্যে আইডিয়াল। আমি গেলাম-”

মেয়েটা ব্যস্ত হয়ে বলল, “এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড-”

“কী হল?”

“আপনার কি ভয় করছে?”

“না। ভয় করছে না।”

“দুঃখ লাগছে?”

“মরে যাব সেই জন্যে দুঃখ?”

“হ্যাঁ।”

“না, দুঃখ লাগছে না। আমার কিছুই লাগছে নাড়”

“সুইসাইড করার আগে শেষবার কিছু একটা করার ইচ্ছা করছে?”

“না করছে না।”

“আপনার কী করতে ভালো লাগতো?”

জুলহাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তোমার নাম কী বলেছিলে, পরী?”

“হ্যাঁ, পরী।”

“পরী, তুমি খামোখা সময় নষ্ট করছ। শুধু শুধু আজে বাজে কথা বলে আমার সময় নষ্ট করছ। তাই না।”

পরী নামের মেয়েটা চুপ করে রইল।

”আমি ঠিক বলেছি কিনা?”

“হ্যাঁ। ঠিক বলেছেন।”

“শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নাই। বুঝেছ? আমি একজন বড় মানুষ। ম্যাচিওর্ড মানুষ। তুমি একটা বাচ্চা মেয়ে। আমার টুটুল থেকে তুমি খুব বেশী বড় না। বুঝেছ পরী?”

“আমার পরী নামটা আপনার কেমন লাগে?”

জুলহাজ একটু থতমত খেয়ে গেল। বলল, “কী বললে?”

আমি জিজ্ঞেস করেছি, “আমার পরী নামটা আপনার কেমন লাগে?”

“তুমি কেন এসব জিজ্ঞেস করছ? শুধু কথা বাড়ানোর চেষ্টা করছ?”

পরী নামের মেয়েটা বলল, “না, এটা কথা বাড়ানোর জন্যে জিজ্ঞেস করছি না। এটা সত্যি সত্যি জানতে চাইছি।”

“সত্যি কথা বলব?”

“বলেন।”

“নামটা ক্লিশে।”

“ক্লিশে?”

“হ্যাঁ।”

“ক্লিশে মানে কী?”

“অতি ব্যবহারে জীর্ণ।”

“কী আশ্চর্য!”

“কোন জিনিসটা আশ্চর্য?”

“এই যে অতি ব্যবহারে জীর্ণ এর জন্যে একটা শব্দ আছে।”

“যাই হোক তুমি আমার কথা শুনে মনে দুঃখ পেয়েছ?”

“না। বেশী দুঃখ পাই নাই। আপনি যে এ রকম একটা অবস্থায় আমার কথার উত্তর দিয়েছেন সেই জন্যে আপনাকে থ্যাংক ইউ।

“ইউ আর ওয়েলকাম। তাছাড়া তোমার নামটা ক্লিশে সেটা তো তোমার দোষ হতে পারে না। তোমার নাম তো তুমি রাখো নাই।”

“আসলে এই নামটা আমিই রেখেছি।”

জুলহাজ ভুরু কুঁচকালো, “তুমি রেখেছ?”

“হ্যাঁ। এইটা আমার আসল নাম না। এইটা বানানো নাম। আমরা আসল নাম বলি না। একটা বানানো নাম বলি।”

“ও।”

“হ্যাঁ। আমাদের আসল পরিচয় কেউ জানতে পারে না। এটা গোপন রাখতে হয়।”

“ও।”

“আমারও পরী নামটা পছন্দ না।”

“তাহলে রেখেছ কেন?”

“আসলে চিন্তা করার বেশী সময় পাই না। যখন আপনার ফোন এসেছে তখন যেই নামটা প্রথমে মনে এসেছে সেইটাই বলে দিয়েছি।”

“এই নামটা প্রথমে মনে এসেছে?”

“হ্যাঁ। একটা উপন্যাস পড়ছিলাম সেইটার নায়িকার নাম পরী।”

“কার লেখা উপন্যাস?”

“হুমায়ূন আহমেদ।”

“আমিও তাই ভেবেছিলাম।”

“কিন্তু আপনি যেহেতু নামটা পছন্দ করেন নাই এটা চেঞ্জ করে ফেলব।”

“কী নাম রাখবে?”

“আপনি রাগ হবেন না তো?”

জুলহাজ একটু অবাক হলো ”আমি কেন রাগ হব?”

“কারণ নামটা একটু আগে আপনার কাছ থেকে পেয়েছি। আপনার ওয়াইফের নাম। নীলা।”

“নীলা?”

“হ্যাঁ, নীলা।”

জুলহাজ আবার বলল, “নীলা?”

মেয়েটা বলল, “হ্যাঁ। নীলা।” একটু পরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি.আমার উপরে রাগ হয়েছেন কিংবা বিরক্ত হয়েছেন?”

“রাগ হব কেন? বিরক্ত হব কেন?”

“গুড। থ্যাংক ইউ।” মেয়েটা হঠাৎ করে বলল, “আপনাকে একটা কথা বলি?”

“বল।”

“আমি আপনার ওয়াইফের নামটা নিয়েছি কিন্তু আমি তার সম্পর্কে কিছুই জানি না।”

“অফ কোর্স জান। শি ইজ ডেড।”

“না না সেইটা না। আপনার ওয়াইফ মানুষটা কী রকম-দেখতে কী রকম এই সব আর কী।”

“আবার কথা বাড়ানোর চেষ্টা করছ?”

অন্য পাশ থেকে মেয়েটা একটু ব্যস্ত হয়ে বলল, “না, না-আমি এইবারে কথা বাড়ানোর চেষ্টা করছি না। এইবার আসলেই জানতে চাচ্ছি। একজন মানুষের নামটা ব্যবহার করব তার সম্পর্কে কিছু তো জানা উচিত। ঠিক কিনা?”

জুলহাজ কিছু বলল না।

মেয়েটা বলল, “একটু পরে তো আর আপনার সাথে যোগাযোগ করা যাবে না। এখনই একটু বলেন। এই একটুখানি প্লীজ।”

জুলহাজ ফোনটা কানে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। নীলার কথা সে চাইলে একটুখানি না অনেকখানি বলতে পারে। অনেকখানি মানে আসলেই অনেকখানি। কিন্তু সে তো আর এখন অনেকখানি বলে শেষ করতে পারবে না।

কোথা থেকে শুরু করবে?

শুরু করবে?

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত