গুলতেকিনের বিয়ে

গুলতেকিনের বিয়ে

গুলতেকিন আবার বিয়ে করেছেন। লেখক হুমায়ুন আহমেদের সাবেক স্ত্রী গুলতেকিনের বর্তমান স্বামীও একজন লেখক। তিনি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। পাশাপাশি কবিতা লেখেন। ‘গুলতেকিনের বিয়ে’ ছিল কালকের অন্যতম আলোচিত টপিক। অনেকে যেমন একে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তেমনি অনেকে একে নিয়ে ব্যংগ বিদ্রুপ করেছেন। এই বয়সের একজন নারী নতুন করে ঘর বাঁধবেন, এটা অনেকেই মেনে নিতে পারেন না। পাক ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন হিন্দু সমাজে বেশ কিছু কঠোর নিয়ম কানুন ছিল। যেমন সতীদাহ প্রথা, বিধবা বিয়ে নিষিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি। দেখা যেত, অনেক মেয়ের বিয়ে হত ৬-৭ বছর বয়সে। আট বছর বয়সে বিধবা। জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে হতো বৈধব্যের বেশে। সাদা শাড়ি পরে। জীবনের সব হাসি আনন্দ ত্যাগ করে।

সমাজ তাকে শেখাত, স্বামীই নারীর দেবতা। স্বামী-ই তার সব। পতি বিনে নারীর কোন গতি নেই। স্বামী মারা গেলেও তার স্মৃতি বুকে নিয়ে বাকি জীবন কাটানোর মধ্যেই নারী জীবনের সার্থকতা। সমাজ অনেক এগিয়ে গেলেও আমরা এই মানসিকতা থেকে খুব একটা বেরুতে পারলাম কই? বিধবা নারীদের ২য় বিয়েকে সমাজ এখনো খুব একটা ভাল চোখে দেখে না। উচ্চবিত্ত সমাজে এর কিছু প্রচলন থাকলেও, মধ্যবিত্ত সমাজ একে স্বাগত জানায় কম। একটা বয়সের পরে কোন নারী বিয়ে করতে চাইলে তাকে ভাবা হয় নির্লজ্জ, বেহায়া। বলা হয়, তোমার এখন বাচ্চা কাচ্চা বড় হয়ে গেছে, তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। এই বয়সে এমন চিন্তা মানায়? ‘ছিঃ অমন কথা মুখেও এনো না। লজ্জা! লজ্জা! লজ্জা!” অধিকাংশ মানুষ এখনও ভাবে, বিয়ে মানেই যৌনতা। ভাবে, বিয়ে করতে চাওয়া মানে শারীরিক আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করার বাসনা।

অথচ বিয়ে তার চাইতেও অনেক বড় কিছু। বিয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল, সঙ্গ লাভ। মানুষ সঙ্গী ছাড়া বাচতে পারে না। সব মানুষই একজন সঙ্গী চায়। চায় সঙ্গীর সাথে মনের কথা, রাগ অনুরাগ শেয়ার করতে। তার সাথে নিজের সুখ দুঃখ হাসি কান্না ভাগাভাগি করে নিতে। একটা সময়ে ছেলে মেয়ে বড় হয়ে যায়। সবাই যার যার নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শেষ বয়সে স্বামী-স্ত্রী হয়ে উঠে একে অপরের আন্তরিক বন্ধু, সুহৃদ। বাচার অবলম্বন। নিঃসঙ্গতার যে কি যন্ত্রনা, সংগীহারা মানুষগুলোই তা ভাল জানেন। একলা রাতের যে বেদনা, বিপত্নীক/বিধবা স্বামী –স্ত্রীরাই তা ভাল টের পান।

এজন্য দেখা যায়, রাসুলের (সা.) যুগে ইসলামী সমাজে বিয়েকে খুব গুরুত্ব দেয়া হত। খুব কম মানুষই বিয়ে ছাড়া জীবন কাটাত। পুরুষ বা নারীর বয়স, বিয়ের ক্ষেত্রে কোন বাধাই ছিল না। তাইতো সাহাবী জায়েদ তার মায়ের বয়সী মহীয়সী নারী উম্মে আইমানকে নির্দ্বিধায় বিয়ে করেছিলেন। তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় বিখ্যাত সাহাবী উসামা বিন জায়েদ। সে সমাজে পুরুষেরা একাধিক বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতেন। স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা করে চলতেন। বিধবা হলে অনেক পুরুষ নেক নিয়তে সেই সব নারীদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতেন।

কখনও কখনও একজন বিধবা নারীর কাছে অসংখ্য প্রস্তাব আসত। সে-ই নারী ভেবে চিন্তে তাদের মধ্যে থেকে একজনকে স্বামী হিসেবে বেছে নিতেন। ফিরে আসি গুলতেকিনের কথায়। হুমায়ুন আহমেদ ভালবেসে গুলতেকিনকে বিয়ে করেছিলেন। হুমায়ুনের প্রথম দিকের লেখায় স্ত্রী গুলতেকিনের প্রতি গভীর ভালবাসা ঝরে পড়ত। মমতার প্রকাশ থাকত। শাওনকে বিয়ে করার আগে আগে দুজনের সম্পর্ক খারাপ হয়। এই সমাজে এক সাথে দুই স্ত্রী রাখা মানা। তাই হুমায়ুন গুলতেকিনকে তালাক দেন। বিয়ে করেন মেয়ের বয়সী শাওনকে। তালাকের নোটিশে হুমায়ুন লিখেন, বিয়ের পর থেকে কোনভাবেই তার (গুলতেকিন) সাথে আমার বনিবনা হচ্ছিল না।

কী আশ্চর্য বৈপরীত্য! বিয়ের শুরুতে যে নারীর প্রতি ছিল অগাধ ভালবাসা, ডিভোর্স লেটারেই সে নারী বড্ড অচেনা।যার সাথে কোনদিনই মনের মিল হয় নি (!!)। হুমায়ুনের বিয়ে নিয়েও কম জল ঘোলা হয় নি। সবাই এমনভাবে কথা বলছিল, যেন শাওন খুনের আসামীর চাইতেও বড় অপরাধী। হুমায়ুন নেহায়েতই দুগ্ধ পোষ্য শিশু। তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কালনাগিনী শাওন মায়ার জালে বন্দী করেছে। ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছে হুমায়ুনের সাজানো সংসার। হুমায়ুনের এতে কোনই দায় ছিল না। অথচ, হুমায়ুন শাওনের বিয়ে যদি কোন অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে তো দুজনই সমান অপরাধী। মানুষের বৈশিষ্ট্যই এমন। প্রিয়জনের অপরাধ কারও চোখে পড়ে না।

শাওনের সাথে বিয়েতে হুমায়ুনের পরিবারের সায় ছিল না। সবাই তার বিরুদ্ধে চলে যায়। গুলতেকিনের পক্ষ নেয়। ছেলে মেয়েরা তো বটেই, হুমায়ুনের ভাই বোনেরাও এই বিয়েকে সহজভাবে নেয় নি। হুমায়ুন গুলতেকিনকে ঠকিয়েছে, তার সাথে অন্যায্য আচরণ করেছে…এই ছিল তাদের মনোভাব। হুমায়ুন গত হয়েছেন অনেক দিন। ডিভোর্সের পরে গুলতেকিন অনেক দিন একাই ছিলেন। এখন তার মনে হয়েছে, তার একজন সঙ্গী দরকার। জীবন সঙ্গী। যার সাথে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটানো যায়। সুখ দুঃখ হাসি আনন্দ শেয়ার করা যায়। গুলতেকিনের জন্য শুভ কামনা। দোয়া করি, তার আগামী দিনগুলো সুখে কাটুক। আনন্দে কাটুক।

যারা এই নিয়ে বাজে কথা বলছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, দয়া করে চুপ থাকুন। তাকে তার মত বাঁচতে দিন। বিয়ে করে গুলতেকিন কোন অন্যায় করেন নি। বিয়ে করা, জীবন সংগী বেছে নেয়া কোন অপরাধ নয়। অপরাধ বিয়ে বহির্ভুত অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো। আসুন আমরা বিয়েকে সহজ করি। উতসাহ দেই। এমন সমাজ গড়ি, যেখানে কোন নারী পুরুষকে সংগীহারা হয়ে বৈধব্যের যন্ত্রনা বুকে নিয়ে দিনের পর দিন কাটাতে না হয়। এতেই আছে সমাজের, মানুষের সত্যিকারের কল্যান।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত