লাউ বিরিয়ানি

লাউ বিরিয়ানি

গ্রামের ফুপি শ্বাশুড়ি যতবার উনার ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে আসে ততোবার লাউ ছাড়া কিছুই আনেনা।উনি ১০০ কি.মি. দূর থেকে গাড়িতে ছড়িয়ে লাউ নিয়ে বেড়াতে আসে।আমার বিয়ে হয়েছে একমাস হলো।এই একমাসে উনি সাতবার আমার শ্বশুর মশাই কে দেখতে এসেছেন।আর প্রতিবার হাতে করে নাস্তার বদলে লাউয়ের থলে নিয়ে এসেছেন।শ্বশুরবাড়ির লোকজনের চেহারা দেখে বুঝতে পারি তারা ফুপি জানের লাউয়ের উপর সবাই বেশ বিরক্ত।উনি অনেক সচেতন মানুষ।শাক সবজি খেলে নাকি স্বাস্থ্য ভালো থাকে তাই ফরমালিন মুক্ত লাউ নিয়ে ভাইকে দেখতে আসে।কেউ খেতে না চাইলে তার প্লেটে জোর করে অল্প হলেও লাউ তুলে দেয়।উনার কথা হচ্ছে, শহরের মানুষ শাক-সবজি কম খাই বলে বেশি অসুস্থ হয়।

আর যা খাই সবগুলোতে ফরমালিন যুক্ত।তাই উনি সবাইকে ফরমালিন মুক্ত গ্রামের তাজা লাউ খাওয়াই।উনার আমার শ্বাশুড়ির লাউ রান্না অনেক পছন্দের।তাই উনি লাউ এনে আমার শ্বাশুড়ির হাতে দেন।কারণ শ্বাশুিড় আম্মার লাউ রান্না নাকি অনেক মজা হয়।একথালা ভাত কখন যে শেষ হয়ে যায় টেরই পায়না।তবে আজ লাউ রান্নার ভারটা আমার ঘাড়ে চাপালেন শ্বাশুড়ি।আমি কোনদিন লাউ যেমন খাইনি তেমন রান্নাও করেনি। লাউ কেমনে কুটে তাও জানিনা।শ্বাশুড়ি আম্মা বেশ ঝামেলায় ফেলে দিলেন।কোন উপায়ন্তর না দেখে ইউটিউবে ভিডিও সার্চ দিলাম,লাউ কুটে কেমনে?অনেকগুলো ভিডিও চলে এসেছে।সবচেয়ে বেশি ভিউ পাওয়া এক রাধুনি আপার ভিডিও দেখা শুরু করেছি।

প্রায় তিন মিলিয়ন ভিউ,লাইক ষাট হাজারের উপরে।আত্মবিশ্বাসের সাথে ওনার ভিডিও ফলো করে লাউ গুলো প্রথমে ছোট ছোট করে কেটে নিলাম।তারপর রান্নার ভিডিও দেখা সার্চ দিলাম।অনেক গুলো ভিডিও চলে আসল।মশুর ডাল আর আলু দিয়ে লাউ রেসিপি যা একবার খেলে বারবার খেতে মন চাইবে,ইলিশ মাছ দিয়ে লাউ রান্নার রেসিপি,খেলে বুঝবেন কখন যে একথালা ভাত নিমিষেই শেষ হয়ে যাবে বুঝতেই পারবেন না,চিংড়ি দিয়ে লাউ রেসিপি,খেলে মনে হবে রেস্টুরেন্টের খাবার খাচ্ছেন। এরকম অনেকগুলো ভিডিও থেকে চিংড়ি মাছ দিয়ে লাউ রেসিপি অনুযায়ী রান্না শুরু করলাম।শ্বাশুড়ির এদিকে আসার নাম গন্ধ ও নাই।তাই নিজ থেকে ভিডিও দেখে দেখে রান্নাটা করছি।

মাঝখানে একবার ফুপি শ্বাশুড়ি এসে রান্নার গন্ধটা নিয়ে গেলেন।তখন শুধু চিংড়ি মাছ আর আর লাউ গুলো চুলায় বসিয়েছি মাত্র। উনি আসাতে পরবর্তী স্টেপ দেখতে পারিনাই। চলে যাওয়ার পর আবার দেখা শুরু করলাম। রাধুনি আপা তখন এক কেজি চিনি গুঁড়া চাল লাউয়ে মেশাচ্ছে।জীবনে লাউ না রাধলেও মিষ্টি কুমড়া রেধেছি।কিন্তু এতে কিছু মিশাতে দেখিনাই।আজ প্রথম লাউ রাধতে এসে আমিও রাধুনি আপার মতো চাল ,টক দই এবং বিরিয়ানির মশালা লাউয়ে মিশালাম।সব ভালো করে মিক্সড হয়ে গেলে পানি দিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতে বললেন। আমিও ১৫ মিনিট অপেক্ষা করলাম।অল্প আঁচে রান্না শেষে ঢাকনাটা তুলতে কি রকম একটা গন্ধ এলো।

ফুপিজানের ঘ্রাণ শক্তি আবার অনেক বেশি।উনি ড্রয়িংরুম থেকে গল্পগুজব ছেড়ে রান্না ঘরে ছুটে আসলেন। আমি তখন ভাবছি লাউ রান্না কি দেখতে বিরিয়ানির মতো হয়?আবার টু মারলাম ইউটিউবের হিস্টোরিতে।দেখলাম,প্রথম যে দুইটা ভিডিও দেখেছি প্রথমটা বিরিয়ানি রান্নার,আর দ্বিতীয়টা লাউ রান্নার।মানে আমি অর্ধেক লাউ রান্নার ভিডিও দেখেছি কিন্তু ফুপি যখন এসেছিলেন তখন তাড়াহুড়া করে স্টপ দিতে গিয়ে বিরিয়ানি রান্নার ভিডিওতে ক্লিক করে ফেললাম। আর সাউন্ড মিউট করে দিলাম।তাই আবার বাকি অর্ধেক বিরিয়ানির ভিডিও দেখে লাউকে লাউ বিরিয়ানি বানিয়ে ফেললাম।

নতুন বউ হিসেবে আমি অনেক ভয়ে আছি।ফুপির ঠোঁটে কোন কথা আটকায় না।একবার চা য়ে রং কম হয়েছিলো বলে সবার সামনে বলেছিল,এ যোগের মেয়েরা নাকি শুধু জামাই চিনে,রান্নাঘরের কোন পাতিলে কি রান্না হয় তাও চিনেনা।

ফুপিজান ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে এক চামচ লাউ বিরিয়ানি টেস্ট করে বললেন, বউমা এবার থেকে তোমার শ্বশুড়ি বাদ।তোমার হাতের রান্না ভাবির রান্নার চেয়ে ভালো।তোমার হাতে রান্না লাউ বিরিয়ানি খেতে অনেক টেস্ট হয়েছে।ফুপি এক প্লেট লাউ বিরিয়ানি নিয়ে ড্রয়িংরুমে সবার মাঝখানে রাখলেন। সবাই এক চামচ এক চামচ বিরিয়ানি খেতে খেতে সিদ্ধান্ত নিলেন,এবার থেকে প্রতি শুক্রবারে খাসির মাংস বাদ, এবার থেকে লাউ বিরিয়ানি খাবে।যে মানুষগুলা লাউ দেখলে বলত পেটে গ্যাস জমেছে,তারা লাউ খেতে পারবেনা।আজ তারাও সিদ্ধান্ত নিলো সপ্তাহে একবার আমার ভুলে ভালে করা লাউ বিরিয়ানি খাবে।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত