জীবনের রং বদল

জীবনের রং বদল

“আচ্ছা কেমন মানুষ তুমি? তোমার কি আক্কেল জ্ঞান নেই নাকি? এতো করে বলি একটু সাবধানে চলো তা শুনো না। আমি তোমার শত্রু নাকি কওতো দেখি বাপু পানের খিলিটা মুখে নিয়ে গজগজ করতে লাগলেন রহিমা বেগম। শাশুড়ীর এমন কথায় রিপা যেন হকচকিয়ে গেলো, কি এমন করলো রিপা যে, উনি এমন করছেন তাই মনে দ্বিধা নিয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করেই বসলেন মা আমি কি কোন কাজে কিছু ভুল করেছি?” “না কোন ভুল করো নি কো তুমি? বার বার যে বলি বাপু একটু সাবধানে থাকো। কই শুনলে? শুনলে আমার কথা?”

– আচ্ছা মা বলবেন তো আমি কি করেছি?

– এই যে, সন্ধ্যাবেলায় বারান্দায় এসে দাঁড়ালে এটা কি ঠিক করলে? কিছু নিয়ম-কানুনতো মেনে চলতে হয় নাকি?

– আচ্ছা ঠিক আছে মা আর দাঁড়াব না।

– শুনো বাপু এতে তোমার ক্ষতি না হোক আমার বংশের যে আসতে চলেছে তারতো ক্ষতি হবে তাই বলছি আর কি।

– আচ্ছা মা আর কি কি নিয়ম মানতে হবে আমায় বলুন আমি সব করব।

– শুনো কাল থেকে, না এখন থেকে তোমার সব কাজ বন্ধ তুমি শুধু নিজের খাওয়া ঠিক রাখবে আর নিজের চলাফেরাটা সাবধানে করবে।

– কিন্তু মা সংসারের এতো কাজ কে করবে। রান্না-বান্না, কাপড়চোপড় ধোয়া, ঘর মোছা কাজতো কম নয়?

– সে তোমকে ভাবতে হবে না। আমি তোমার মামা শ্বশুরকে বলেছি একটা কাজের লোক এর কথা। কাল ও একটা মেয়ে নিয়ে আসবে ওই সব করে দিবে।

– কিন্তু মা রান্নাটা? ওটা আমিই করি?

– না না রান্নাটা আমিই করব। তুমি শুধু আমার নাতিটাকে ভালো রেখো।

– আচ্ছা মা আপনাদের দোয়া থাকলে আপনাদের বংশের সন্তান ভালো থাকবে ইনশাআল্লাহ।

মানুষ কত দ্রুত পাল্টে যায়! এইতো গতকাল ও মা সামান্য একটা কাজ নিয়ে কত বকাবকি করলো। আর আজ একটা রিপোর্টে সব বদলে গেছে। কত যত্ন শুরু হয়ে গেছে। তাদের বংশের প্রদীপ যে আমার গর্ভে। এইতো কিছুদিন আগেই বিয়ের দুই বছর হলো। হাতের মেহেদীর রঙ না মুছতেই পুরো সংসারের দায়িত্ব শ্বাশুড়ি তার উপর দিয়ে দিলো। সংসারের সব কাজ করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠলেও তা প্রকাশ করার উপায় ছিলো না। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। শ্বাশুড়ী,ননদ,দেবর,বর,শ্বশুর সবাই ব্যস্ত। একটু সহযোগিতা করার সময় কোথায় সবার। আনকোরা হাতে সব কাজ করতে কতই না হিমশিম খেতে হতো। হাত কেটে ফেলা,ভাতের মাড় হাতে পড়া, জামা-কাপড় ধোয়ার সাবান পানিতে পিছলে পড়া আরো কত কি?

অথচ দেখার কেউ ছিলো না। যেই মানুষটা দেখার কথা সেও দেখতো না। প্রচন্ড অভিমান হতো তখন তার উপর। কখনো কখনো না খেয়েও থাকতো অথচ কেউ জানতেও চাইতো না খেয়েছে কি না। অথচ আজ সব বদলে গেলো। জানালায় দাঁড়িয়ে আকশের দিকে তাকিয়ে আলতো করে নিজের পেটে হাত বুলিয়ে নিলো রিপা। আর বিড়বিড় করে বললো দেখলি বাবাই তোর পরিবারের সবাই কতো ভালো হয়ে গেলো তোর কথা শুনে। কি বলছো গো বিড়বিড় করে?” হাতের প্যাকেটটা টেবিলে রাখতে রাখতে বললো শাফিন।

– এইতো কিছু না, তুমি এ সময়ে বাসায়?

– অফিস শেষ করে সোজা বাসায় চলে আসলাম, আর হ্যাঁ এই যে, এখানে কিছু ফল আছে এগুলো রেখে দিও। বলে টেবলে রাখা প্যাকেটটা দেখালো ইঙ্গিত করে শাফিন।

– এখানে কেনো মায়ের কাছে দাও, মা ফ্রিজে রেখে দিবে। দাও আমি দিয়ে আসি।

– আরে না না, আমি মাকে দিয়ে এসেছি এগুলা এখানে থাকবে আর তুমি খাবে। না খেয়ে খেয়ে তো শরীরের কি হাল করছো? এমন হলে কি আমাদের সন্তান সুস্থ থাকবে?

নিজের কান,চোখ কি দেখছে? কি শুনছে? কিছুই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না রিপার! যে মানুষটা কখনো খেয়েছে কি না কখনো ভালো করে রিপাকে জিজ্ঞেস করে নাই। এই দুই বছরে একবার ও জানতে চায় নাই রিপার প্রিয় খাবার কি? সেই মানুষটা এসব বলছে? ফল কখনোই রিপার খেতে ভাল লাগে না। “শুনো না, আমি ফল খেতে পারি না। ফল খেতে আমার ভালো লাগে না।” রিপা করুণ কণ্ঠে বললো

– ভালো লাগে না বললে হবে না খেতে হবে। আর শুনো তুমি কি কি খেতে ভালোবাসো আমায় বলো সব নিয়ে আসব। আমাদের সন্তানকে ভালো থাকতে হবে নাকি?

এ বলেই রিপাকে পিছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো শাফিন। রিপার পেটের উপর হাতটা রেখে ছুঁয়ে দিতে চাইলো নিজের অস্তিত্বকে। রিপার কাঁধের চুলগুলো সরিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললো “জানো আজ আমার ফিলিংসটাই অন্যরকম লাগছে,আমার মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীর সব চাইতে সুখি মানুষ।” রিপা চোখ বুজে আছে, ফিল করতে চাচ্ছে তার জীবনে পাওয়া এতো সুখের সময়টাকে। এভাবে ভালোবেসে এতোটা কাছে এসে যে, শাফিন আর কখনোই রিপাকে স্পর্শ করে নাই। হাজার বার স্পর্শ করলেও এর আগে তাতে এতো সুখ ছিলো না,ভালোবাসা ছিলো না।

আসলে কখনোকখনো খুব ছোট কিছু কাজেও অনেক সুখ থাকে যা অন্য কিছুতে থাকে না। কেমন যেনো একটা ঘোর কাজ করছে রিপার মাঝে তাইতো সামনে ফিরে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো শাফিনকে। খুব আনন্দে ও মানুষের চোখে জল আসে। আর তাইতো দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো রিপার চোখ থেকে। একটু একটু করে সময় যাচ্ছে। শরীরটা একটু ভার লাগছে রিপার। একটু একটু করে বড় হচ্ছে রিপার গর্ভে শাফিন এর অস্তিত্ব। আজ সকাল থেকেই একটা হুলুস্থুল কান্ডকারখানা শুরু হয়ে গেলো। আজ রুটিন চেক-আপের জন্য মেডিকেলে যাওয়ার কথা। আর আজ আলট্রাস্নোগ্রাফি করলেই বুঝা যাবে গর্ভের বাচ্চার জেন্ডার।

” শুন ভাইয়া তুই যাই বলিস ভাবীর কিন্তু মেয়েই হবে আর আমরা ফুফি আর ভাইজি মিলে একসাথে সাজুগুজু করবো ” এই বলেই তিয়াসকে ভেংচি কাটলো সুপ্তি। ” আরে যা যা তুই বললেই হলো নাকি দেখিস আমার ভাইপো’ই হবে আর আমরা দুজনে ক্রিকেট খেলবো একসাথে ” এটা বলেই তিয়াস সুপ্তির চুল টেনে দিলো। “কি সব শুরু করলি তোরা বলতো? সব ভালো ভালোয় হোক আমার দাদুভাইটা সুস্থ থাকুক এসব না বলে আছে উনারা সাজুগুজু আর খেলার তালে।” ছেলে-মেয়েদের রেগে গিয়ে বললেন রহিমা বেগম।

“তুমিও কি কম যাও নাকি? বলেই তো দিলা দাদু ভাই আরে আমাদের বংশের প্রথম সন্তান যাই দেয় আল্লাহ তাতেই আমরা খুশী। আল্লাহ ভালো রাখলেই হলো বউমা আর বাচ্ছাটাকে।” স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন আশরাফ সাহেব। সবাই কতো ভাবনায় মগ্ন। সবাই আজকেই জেনে ফেলতে চায় সব কিন্তু রিপার মনটা কেন যেন এসব মানতে পারে না। আগে থেকে জানার চাইতে কেনো জানি ওর মনে হয় সন্তান একসাথে ভূমিষ্ট হলে জানাটাই অনেক বেশী আনন্দের। কিন্তু ওর চাওয়ায় কি হবে সবাই যা চায় তাই হবে।

রিপোর্ট এর জন্য অপেক্ষায় বসে বসে এসব ভাবছে রিপা। কি আসে রিপোর্টে কার মনের আশা পূরন হয়? কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। শাফিন আর তার মায়ের আশা তাদের যেন বংশ রক্ষাটা হয়। রিপার অবশ্য মনে মনে আশা ছিল ছোট্ট একটা পুতুল যে ছোট ছোট চুলে দুই বেনী করে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াবে। কিন্তু মনের আশাটা মনেই রেখে সেও চায় তার একটা ছেলেই হোক তাতে শাফিন আর তার মা খুশি হবে।

“কংগ্রাচুলেশনস শাফিন সাহেব মাশাল্লা আপনাদের তো টুইন বেবী।” চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক নিয়ে রিপোর্ট দেখতে দেখতে বললো ডা.

” সত্যি বলছেন আপনি আমারতো বিশ্বাস হচ্ছে না ” খুব বেশি উত্তেজনায় চিৎকার করে ফেললো শাফিন।

” আরে শাফিন সাহেব এটা শুনেই এতো খুশী কিন্তু ”

“কিন্তু কি ডা. সাহেব মুখে চিন্তার চাপ এনে জিজ্ঞেস করলো রিপা।

” আরে মিসেস শাফিন ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আর সবচাইতে সুখকর কথা হচ্ছে যে, একটা ছেলে আর মেয়ে বেড়ে উঠছে আপনার গর্ভে।”

” আলহামদুলিল্লাহ” রিপা আর শাফিন এক সাথে বলে উঠলো।

” তবে এই কয় মাস একটু সাবধানে থাকতে হবে। ভারী কাজ নিষেধ আর হাসি খুশী থাকতে হবে,পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। টেনশান মুক্ত থাকবেন আর কোন সমস্যা হলে অবশ্যই আমাকে জানাবেন।” রিপার দিকে তাকিয়ে বললো ডা।

বাসায় একটা খুশী খুশী আমেজ বয়ে যাচ্ছে। যতদিন যাচ্ছে ততই সবই এক্সাইটেড হয়ে যাচ্ছে। দু বছরের চেনা মানুষগুলো কতটা বদলে গেছে। শাফিন এতোটাই বদলে গেছে যে নিজের চাহিদাগুলোও ভুলে গেছে। রিপার আজকাল নিজের চলাচলেও কষ্ট হয়। শাফিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এখন বাড়ীতেই সময় কাটায়। রিপার প্রতিটা কাজের, খাবারের খেয়াল রাখে। রিপার মাকেও এখানে নিয়ে আসা হলো। যাতে কোন সমস্যা না হয় রিপার। কেউ এই পরিবার টাকে দেখলে নিঃসন্দেহে মনে করবে এটাই পৃথিবীর একমাত্র সুখি পরিবার।

তবুও একটা ভাবনা রিপাকে তাড়িয়ে বেড়ায় এসব যত্নআত্তি সব রিপাকে ঘিরে? নাকি তার গর্ভে বেড়ে উঠা এ পরিবারের অস্তিত্বকে ঘিরে? কালকেই ডেলিভারি ডেট দিলো ডা.। আজকেই কেনো যেন শরীরটা খুব খারাপ লাগছে রিপার। মনটা কেমন জানি করছে। খুব ইচ্ছে করছে শাফিন এর বুকে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকতে। শাফিন ঘরে ডুকেই রিপাকে বিষন্ন দেখে বললো ” কি হলো তেমার শরীর খারাপ লাগছে? ”

” না শরীর খারাপ না একটু বসবে এখানে?”

শাফিন রিপার পাশে বসতেই রিপা শাফিনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো আর বললো ” আমার কিছু হয়ে গেলে তুমি কি আমায় ভুলে যাবে?” রিপার কপালের এলোমেলো চুল সরিয়ে দিয়ে শাফিন বললো ” কি অলুক্ষণে কথা বলছো আরে সাহস রাখো, তোমার কিছু হয়ে গেলে তোমার পুতুল দুটোকে কে দেখবে শুনি?” “আর হ্যাঁ তুমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে জানো তো কতদিন তোমার হাতের বিরিয়ানি খাই না” ছলছল চোখে বললো শাফিন। এই প্রথম রিপা শাফিন এর চোখে ভালোবাসার চিহ্ন দেখলো রিপা। “আমার একটা কথা রাখবে?” আবদারের সুরে বললো রিপা।

– বলো কি কথা?
– না আগে বলো রাখবে?
– আচ্ছা রাখব বলো..
– আমাকে রান্না ঘরে নিয়ে চলো আমি তোমাদের জন্য বিরিয়ানি রান্না করব।
– তুমি কি পাগল হলে এই অবস্থায় তুমি রান্না করবে?
– তুমি কথা দিয়েছো রাখবে আর আমার কি হতে কি হয় বলা যায় না আমার এই শেষ কথাটা রাখো প্লিজ।

রিপা সবকিছু দেখিয়ে দিচ্ছে আর রিপার মা,শ্বাশুড়ি, শাফিন মিলে রান্না করছে বিরিয়ানি। এ যেন এক মায়ার বাঁধন যেখানে সবাই মায়ায় জড়িয়ে আছে।

” বউমা আমার অসুধটা দাওতো ” শ্বশুরের অসুধটা দিতে না দিতেই শ্বাশুড়ীর ডাক

” বউমা পানের বাটা টা দিয়ে যাও”

“ভাবী মাথা ধরেছে এককাপ চা দিও তো” দেবরের আবদার

” ভাবী আমার এই ড্রেসটা আয়রন করে দিও তো ” ননদের আবদার।

সবার সবটা শেষ করে রাতে রুমে আসতে বরের হুকুম “এককাপ কফি দিতে পারবে?” বরের জন্য কফি করে এনে শোবার সাথে সাথেই রাজপুত্র আর রাজকন্যার ঘুম ভেঙে যাওয়া। তাদের ঘুম পাড়িয়ে নিজের ঘুমাতে ঘুমাতে হয়ে যায় শেষ রাত্রি। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠা আবার নিয়ম করে সব কাজ শেষ করা ঠিক চার বছর আগে যেখান থেকে শুরু হয়েছে আবার সেখান থেকেই শুরু একি নিয়মে চলা। সব কিছুই আবার আগের নিয়মেই চলে। শুধু তার মাঝে যোগ হলো একটি রাজপুত্র আর একটি রাজকন্যার মিষ্টি হাসি আর দুষ্টু কান্না। যাদের মুখের দিকে তাকালে সব কষ্ট ভুলে থাকা যায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত