নুড়ি ভক্ষক

নুড়ি ভক্ষক

আমাদের বাসার নিচে বেশ বড়সড় একটা ভীড় লেগে আছে। ভীড়টা একটা মানুষকে নিয়ে। কারণ এই মানুষটা যেমন তেমন মানুষ নয়, পাথর খাওয়া মানুষ! বুড়োমতো এক লোক, মাথার এলোমেলো সাদা চুল আর থুঁতনির লম্বা সাদা দাঁড়িতে এক হয়ে আছে। শুধুমাত্র ডাগর ডাগর রক্তচক্ষু দুইটা ভাসমান হয়ে আছে চেহারায়। মোটা করে সুরমা মেখে চোখগুলোকে আরো ভয়ঙ্কর করে সাজানো হয়েছে। পরনে বাদামী রঙের ময়লা একটা চাদর, তার মাঝ থেকে উঁকি দিচ্ছে ছেঁড়া মলিন একটা জামা। চওড়া কাঁধ থেকে লম্বা চাদরটা নেমে এসেছে হাঁটু পর্যন্ত। কাঁধে তার বিশাল একটা ঝুলি। রাস্তার উপর সে তার সামনে সেই চাদর বিছিয়ে বসেছে। ঝুলি থেকে বেশ কিছু নুড়ি পাথর বের করে আপনমনে খাচ্ছে। লোকজন আগ্রহ করে দেখছে। সবার চোখে বিষ্ময়!

ব্যপারটায় সবচেয়ে বেশি মজা পেয়েছে শিশুরা। আনাচে কানাচে থেকে ইটের টুকরা, নুড়ি পাথর, বালু মাটি এনে বৃদ্ধের সামনের চাদরে রাখছে। বৃদ্ধ কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে অবলীলায় সেগুলো পেটে চালান করে দিচ্ছে।
ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের বাড়িতেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বড়চাচা তাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার চিন্তাভাবনা করছেন। পারছেন না শুধু এলাকার লোকজনের জন্য। কোথাকার কোন পাগল ছাগল বাড়ির নিচে এসে ঠাঁই নিয়েছে, তা দেখার জন্য ভীড় জমিয়েছে আরো কতগুলো মানুষ।

এদের মধ্যে কে চোর-ছ্যাঁচ্চর আছে বলা যায়? আমার বাবা অবশ্য নীরব৷ বাবা সাধারণত বড়সড় ব্যাপারগুলোতে ঝিম মেরে থাকেন কিন্তু ছোটখাটো ব্যাপারগুলোতে তার বেশ আগ্রহ দেখা যায়। আমার মা জানালা দিয়ে ওই বৃদ্ধকে দেখার পর থেকে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। ঘনঘন আমাকে বলছেন, “দেখ না তুলি! বুড়োটা পাথর খাচ্ছে। মানুষ কখনো পাথর খায়?” আমি বিরক্ত কণ্ঠে বললাম, “খায় তো মা! তোমার চোখের সামনে খাচ্ছে। তুমি দেখতে পাচ্ছো না?” “তাই বলে পাথর খাবে? পাগল নাকি?” আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “পাগল ছাড়া আর কি হবে! কোন সুস্থ মানুষ কি এমন কাজ করতে পারে?” মা কাতরকণ্ঠে বললো, “দেখ না জিজ্ঞেস করে, পাগলটা ভাত খাবে কি না? মটরশুঁটির তরকারি রেঁধেছি৷ এক প্লেট ভাত নিয়ে দিয়ে আয়।” আমি মায়ের সামনে থেকে সরে এলাম। এসব ঘ্যানঘ্যান শুনতে ভালো লাগে না।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল এসে গেছে। বাঙালীরা যেমন কোন বিষয়ে খুব তাড়াতাড়ি উৎসুক হয়ে যায়, তেমনি কোন বিষয়ে তাদের উৎসাহ খুব তাড়াতাড়িই মিইয়ে যায়। পাথর খাওয়া এই বুড়োর কান্ড দেখে সবার আগ্রহ ফুরিয়ে গেছে। সবাই যার যার ঘরে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে ভাতঘুম দিচ্ছে। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম, শুণ্য রাস্তায় পাগল বৃদ্ধ চাদরের উপর কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এক প্লেট ভাত-তরকারি নিয়ে নিচে নামলাম। বাবা ইতস্তত করে বৃদ্ধকে ডাক দিলেন, “এই যে শুনেন।”

বৃদ্ধের কোন সাড়াশব্দ নেই। সে “ভোঁস ভোঁস” শব্দ তুলে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। বাবা এবার হাত দিয়ে বৃদ্ধকে আলতো করে নাড়া দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ বাবার দিকে পাশ ফিরে তাকালো। বাবা ভয় পেয়ে এক পা পিছিয়ে গেলেন। আমার হাতের প্লেটটি দেখিয়ে বললেন, “আপনার জন্য ভাত এনেছি। ভাত খাবেন?” আমি লোকটার দিকে প্লেট এগিয়ে দিলাম। সে রীতিমতো আমার থেকে প্লেট কেড়ে নিয়ে কব্জি ডুবিয়ে ভাত খাওয়া শুরু করলো। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে পুরোটা শেষ করে মোনাজাত ধরলেন তিনি। মোনাজাত শেষে চোখ মুছলেন। বাবা জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

– “করেন।” বৃদ্ধ জবাব দিলেন।
– আপনি পাথর খান কেন?
– সেইটা এক লম্বা কাহিনী।
– লম্বা কাহিনীটাই বলেন, আমি শুনবো।

বুড়ো এবার মাথা ঝাঁকিয়ে বলতে লাগলেন, “আমার স্তিরি (স্ত্রী) মারা গেছে সাত বচ্ছর হইলো। হে মারা যাওনের পর থেইকাই মাথাটা ক্যামন জানি হয়া গেল। এই শোক নিতে পারলাম না। সব বুইজাও যেন বুজি না। ঘরে আমি, আমার পোলা আর পোলার বউ। দুইজনের ঘাড়ে আমি হয়া গেলাম মুসিবত। একে তো গরীব সংসার, তার উপর কান্ধে পাগল ছাগল! সারাদিন ধ্যান্দা লাইগা বইসা থাকি। ভাত দিলে খাই না, খাইলেও মনে হয় যেন গলা দিয়া নামে না। সংসারের কোনো কাম মাথায় ঢুকে না।

আস্তে আস্তে ক্যামন যেন বাচ্চা পোলাপাইনের মতো হয়া গেলাম। আমার গায়ে আলগা বাতাস লাগছে ভাইবা পোলা আর পোলার বউ আমারে আলগা কইরা দিল। আলাদা ঘরে বাইন্ধা রাখে। একসময় তারা আমার লগে চেয়ার টেবিলের মতো আচরণ করা শুরু করলো। খাওন নাই, খোঁজ খবর নাই, বাঁইচা আছি নাকি সেটারও খোঁজ নাই। সারাদিন তাকায় থাকতাম, খিদা লাগলে কি খামু হুঁশ পাইতাম না। ঘরের দুয়ারে কয়টা নুড়িপাথর পইড়া আছিল। সেইগুলা টুকায়া মুখে দিলাম। কোনরকমে প্যাটে পাঠাইলাম। খুবই আচিয্য (আশ্চর্য) কথা পাথরগুলা আমার প্যাটে হজম হইয়া গেল। তারপর থেকা আস্তে আস্তে পাথর খাওয়াটা আমার অভ্যাস হয়া গেল।

একটাসময় মাথাটা ঠিক হয়া আসলো, কিন্তু অভ্যাসটা গেল না। পোলায় অহন আমারে নিয়া লোকসমাজে শরমায়। পাগল ভাইবা ঘরে রাখতে চায় না। আমিও বাড়ির মায়া ছাইড়া আইসা পড়ছি ঢাকায়। এই পাথর খাওয়ার কেরামতি দেখায়া লোকজনের থেকা ট্যাকা তুলি। যে যা পারে দেয়, কেউ দেয় না। তাই দিয়া দু’গা ভাত খাই। ডরে কুনো মানুষ আমার সামনে আসে না। আর আপনেরা আইজ নিজে আইসা ভাত খাওয়াইলেন। এডাই কপাল! ঘরের পোলায় ভাত দেয় না, ভাত খাইতে দেয় পরের পোলায়!” বলেই হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছলেন তিনি। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বাবাও চশমার কোণ দিয়ে চোখের পানি মুছছে। আমার মাথার মধ্যে শুধু বৃদ্ধের শেষ কথা দুটোই ঘুরছে, “ঘরের পোলায় ভাত দেয় না, ভাত খাইতে দেয় পরের পোলায়!”

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত