বৃদ্ধের একদিন

বৃদ্ধের একদিন

ভার্সিটিতে পড়ে মেয়েটাকে তাঁর বাবা বললো, “ মা তোর সাথে আজ ভার্সিটিতে যাবো৷ ” মেয়েটা বললো, “ তুমি এই বয়সে ভার্সিটিতে গিয়ে কী করবে? তাছাড়া আমার ক্লাস আছে। তোমাকে সময় দিতে পারবো না! ”

আচ্ছা, লোকটার মেজ ছেলে কলেজে পড়ে, “ তাঁকে বললো, “ বাপজান তোমার সাথে আমাকে কলেজে নিবা? একটু ঘুরতে মন চাচ্ছে। সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না! ” ছেলেটা জবাব দিলো, “ বাইরে যা ধুলাময়লা উড়ে! তুমি আবার অসুস্থ হয়ে পড়বা। তাছাড়া আমার সময় কই বলো? ক্লাসের পরে ক্লাস! ” আচ্ছা,

লোকটার বাঁকি তিন সন্তানের মধ্যে দুজনই স্কুলে পড়ে৷ একজন ছেলে, আরেকজন মেয়ে। দুজনকে একসাথে বললো, “ আম্মাজান আমার, বাজান আমার। তোমাগো লগে আমি আজকে স্কুলে যাব। তোমাদের হ্যাড মাস্টার আমার ছোট বেলার বন্ধু। ” দুজন বললো, “ আজকে স্কুলে অনুষ্ঠান বাবা! আমরাই তো দৌড়াদৌড়ির উপরে থাকবো! তোমার সাথে তো একজন থাকাই লাগে। তাহলে কীভাবে হবে বলো? ” আচ্ছা,

বারান্দা দিয়ে লোকটা ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে আসার সময় দেখলো তাঁর বড় ছেলে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। ছেলেটার ছোট ছোট দুটো ছেলেমেয়ে কান্না করছে। আব্বুর সাথে ঘুরতে যাবে। আব্বু তাঁদের কপালে চুমু দিয়ে বলছে, “ আমি বিকেলের দিকে এসেই নিয়ে যাবো। ” বাচ্চারা তো মানেই না। কান্না করেই চলেছে। কোনোরকমে লুকোচুরি করে সে অফিসে গেলো। ছোট বাচ্চা দুটো কান্না করছে। লোকটা নাতিনাতনিদের ডেকে আনলেন। শান্তনা দিচ্ছেন আর ভাবছেন কী অদ্ভুত ব্যাপার।

ওরা ছোট বলে চোখে পানি এনে শব্দ করে কাঁদতে পারছে৷ আর তাঁরও কান্না পাচ্ছে। একই কারণ। কিন্তু উনি কাঁদতে পারছেন না! চোখ দিয়ে দুফোঁটা পানি পড়লেই আবার হুমড়ি লেগে যাবে বাড়িতে! চোখে তিনি ভালো করে দেখেন না। নাহলে বাচ্চাদের নিয়ে বের হতেন! বাচ্চাদের মা থাকে সারাদিন রান্নাবান্না কাজ কর্ম নিয়ে ব্যস্ত! এদের দেখলেই উনার বড় হওয়া বাচ্চাদের কথা মনে হয়। কতই না কান্না করেছে বাবার সাথে একটু ঘুরতে যাবে বলে।

বাবা কতোদিন লুকিয়ে লুকিয়ে অফিসে গিয়েছে! কতোদিন অফিসে মিথ্যে বলে দুপুর বেলাতেই বাড়ি ফিরেছে তাঁদের জন্য চকলেট নিয়ে! বাড়িতে যে মেয়েটাকে রাখা হয়েছে কাজের জন্য। অবশেষে লোকটা তাঁকে বললো, “ তুইতো রাস্তাঘাট ভালোই চিনস। আমাদের নিয়া চল। ” মেয়েটা নগদে বলে দিলো, “ আইচ্চা খালু চলেন, তয় পিচ্চিগুলা খালি এইদিক ঐদিক দৌড় মারে। আমার ভয় লাগে! হারাইয়া গেলে আমারে বড় ভাইজান মাইরাই ফালাইবো! ”

এই ঢাকা শহরে মেয়েটার কেউই নেই বলতে গেলে। তার উপর যদি তাঁর হাত থেকে বাচ্চা হারিয়ে যায়। সে মহা বিপদে পড়বে। এ কথা চিন্তা করে লোকটা বললো, “ নাহ, তুই বেগুন ভর্তা কর। সাথে আলু দিস৷ ” আইচ্চা, এইযে বাচ্চাদের মা৷ তাঁকে লোকটার পছন্দ হয় না। কারণ বড় ছেলে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে। খুব ইচ্ছা ছিলো লোকটার, ছেলেটাকে নিজের পছন্দে বিয়ে করাবেন। হলো না। মেয়ে ডাক্তার, চেম্বার আছে। তবুও তাঁকে উনার পছন্দ হয় না!

চোখের কোণে পানি আসার আগেই তিনি টিভিটা ছেড়ে রিমোটটা বাচ্চাদের হাতে দিলেন। কার্টুন দেখে যদি আব্বুর কথা ভুলতে পারে! এর মাঝে দরজার খটখট শব্দ৷ বাচ্চাদের মা এসেছে। সে এমন সময় পরিপাটি থাকে না। বৃদ্ধ লোকটাকে বাচ্চাদের মা বললো, “ চলেন আব্বা, মানে সিফাত আর মুনের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে হবে তো। আপনিও চলেন না! ” বৃদ্ধ লোকটা সোজাসুজি মানা করে দিলো, “ নাহ, হর্নের শব্দে আমার মাথা ঘুরায়! ”

মেয়েটা নিঃশব্দে বাচ্চাদের নিয়ে বেরিয়ে গেলো। কেউ মুখের উপর না বলে দিলে অনেক কষ্ট লাগে। বৃদ্ধ লোকটা দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পানি গড়গড় করে পড়ছে। খুব ইচ্ছে করছিলো তাঁর বৌমার সাথে যেতে! কেনো যে এমন ঝারি মেরে মানা করে দিলো! বুকের ভেতরে যেন একটা পাথর হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেলো!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত