আব্বুর জন্য আম্মু

আব্বুর জন্য আম্মু

“আপুউউউউউউউউ”, বলে দৌড়ে এসে ধুপ করে মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরল। একটুও জন্য মনে হচ্ছিল আমার প্রজাপতির প্রাণটা যেন, বুকের পাঁজর ছেড়ে উড়ে যাবে। কিন্তু ডানা ভেজা ছিল বলে, হয়তো উড়ে গেলো না। তো আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বললাম-

-পাখি, কী হয়েছে তোমার? শান্ত হয়ে বলো।

– আপু, আপনাকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকবো? এটা সম্ভব না। কী দিয়ে বানিয়েছে আল্লাহ আপনাকে?

আমি বুঝলাম আমাকে ছাড়া তার থাকা সম্ভব না, কিন্তু এটা বুঝলাম না এখানে কি দিয়ে আল্লাহ বানিয়েছে এর কী সম্পর্ক!! তো এত বুঝা না বুঝা রেখে বললাম-

আমাকে এবার ছাড়ো, একটু বসি আসো এটা বলে ড্রইং রুমের দরজা খুলে লাইট অন করে সোফাতে বসলাম। আমার বসা নিয়েও তার সমস্যা, তাই বলতে লাগল- না আপু আপনি ঐ সোফাতে না, আমার সাথে এই সোফাতে আমার পাশে বসবেন।

আমি বললাম- আচ্ছা, আমাকে এক গ্লাস পানি দেবে? হেঁটে এসেছি।

সে ব্যস্ত হয়ে, পানি নিয়ে এলো। তারপর তার নির্ধারিত সোফাতে নিয়ে বসালো। এখন একদম শান্ত পরিবেশ, কোনো হৈ চৈ নেই। ৫/৬ মিন এভাবে দুজন চুপচাপ, সে আমার দুহাত তার হাতের ভেতর নিয়ে আঙ্গুল দিয়ে মাসাজ করছে আর চোখ নিচু।

আমি বললাম- তুমি কিছু বলবে? এত আর্জেন্ট কেন ডেকেছ?

সে মাথা নিচু করেই উত্তর দিল- আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি তাই না আপু? কিন্তু এটা ছাড়া আর উপায় ছিল না, প্রায় আধা ঘণ্টা আপনাকে কল মেসেজ দিয়ে যাচ্ছি আপনি ফোন তুলছেন না।

– মোবাইল সাইলেন্ট থাকে আমার। আর আমি তো ব্যস্ত ছিলাম একটু।

আপু রাজি হবেন না আপনি? হঠাৎ এই টাইপের কথা শুনে, আমার ব্রেইন কিছু সময় অবশ হয়ে গিয়েছিল মনে হয়। “এই আপু, রাজি হয়ে যান। আমার ছোট আব্বু ! আমি তাঁকে কথা শেষ করতে না দিয়েই, পাগলি তোমার পাশেই বসে আছি, ডেইলি দুবার দেখা হচ্ছে। আর কি চাও? “এই বিয়েটা যদি না হয়, আপনাকে আমি চিরতরে হারিয়ে ফেলবো, আপনার অন্য কারো সাথে বিয়ে হলে তখন আমি কীভাবে থাকবো? প্লিজ আ….

-তুমি ছোট মেয়ে, এসব কেন ভাবছ? তোমাকে কি আমি ভুলে যাব কখনো? এখন হয়তো ভালো লাগছে, তোমার পরিবারের কেউ হলে তো তখন তুমি আমাকে আর এভাবে আপু বলে জড়িয়ে ধরবে না”।

– তখন আম্মু বলে জড়িয়ে ধরবো আর কি। ছোট আব্বুর বউ হলে আপনি তো আমার আম্মুই হবেন।

আমি- তুমি আমার মাত্র কয়েক বছরের ছোট, আমাকে এত তাড়াতাড়ি আম্মু বানিয়ে বুড়ি করে দিতে চাচ্ছ?  অন্যায় খুব অন্যায়…

না, তখন এখানের সবাইকে বলতে পারবো, আমার ছোট আম্মু কত ইয়াং জানো? আপনাকে তো দেখতে আমার চেয়ে ছোট লাগে।

আমি- না না, এসব গভীর ষড়যন্ত্র। তুমি আমাকে তাড়াতাড়ি বুড়ি করে দিতে চাও, আম্মু বানিয়ে।

সে রেগে গিয়ে- কেন আপনি কি বিয়ে করবেন না? আমার ছোট আব্বুকে না করলেও, কি আপনার অন্য কারো সাথে বিয়ে হবে না? বলুন তো আমাকে, বিয়ে কি করবেন না? এর মধ্যে তার ছোট ভাই, আমার বিচ্চু ছাত্র ঢুকল, অর্ধেক কথা শুনেই খিচুড়ি রেধে দিতে শুরু-

– কি? কে বিয়ে করবে না? কাকে করবে না? একশ বার করবে, আমার মতো ছেলে হয় নাকি আর? দেখো, কত স্মার্ট সুন্দর তোমার ভাই নিজের গালে নিজে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আ-বকা বকে যাচ্ছে সে।

আমি- কি বলেছ তাসির তুমি? তোমার সামনে আমি তোমার মেম বসে আছি, দেখা যাচ্ছে না?

সে- এত বড় একটা জ্যান্ত মানুষ আপনি, আপনাকে আমি কেন একটা এক চোখ কানারও সবার আগে চোখে পড়বে, এটা একটা কথা বললেন মেম? বিয়ে কি আপনি করবেন না? আমিও তো একদিন করবো, এটা বলতে আবার আপনাকে দেখতে হয় নাকি?

এর কথা শুনে, আমি যেন কুয়োর তলে অন্ধকারে সাঁতরাচ্ছি মনে হচ্ছে। তো আমাকে একহাতে টেনে তুলে নিয়ে আসলো সেই তল থেকে তার বোন-

-আপু, এই ছাগলের কথা বাদ দেন, আমাকে বলেন আপনি রাজি? ছোট আব্বু তো, একটা মেয়েকেও পছন্দ করছে না, আপনার দুঃখে সিগারেট..

বিচ্চু ছাত্র- ও হ্যাঁ, আমিও দেখছি ভাই কালকে রাতে ছোট আব্বু সিগারেটের ধোঁয়া আচ্ছা কার সাথে বিয়ে বলতেছ যে তুমি?

দাতে দাঁত চেপে তার বোন উত্তর দিল- আপুর সাথে ছোট আব্বুর তুমি যাও।

– কি?????? আল্লাহ টিচার। হাসতে হাসতে লাফানোও শুরু করে দিল ছেলেটা তারপর দাঁতে আঙ্গুল কামড়ে-

– আপনাকে আমি তাহলে আম্মু ডাকবো, টিচার… আল্লাহ কি হবে! কেমন লাগবে! আমি অবাক দৃষ্টিতে এই পাগলের লজ্জা পাওয়া লাল মুখ দেখছি

এরমধ্যে- ছোট বিচ্ছুর প্রবেশ,

-তোমরা এইভাবে চিল্লাই চিল্লাই কি বলতেছ যে, বেয়াদব। আমি খেলতে পারতেছি না।

ওর হাত ধরে তাসির টেনে ভেতরে নিয়ে এসে বলল- দেখো, দি অনলি ওয়ান আমাদের ছোট আম্মু। দুহাত আমার দিকে তাক করে তাসিদ বলে যাচ্ছে।

– এ????????? সত্যি, আল্লাহ আমি তো লজ্জা পাচ্ছি ভাইয়া, সেজো আব্বুর বিয়েতে বউ দেখতে আমার কি যে লজ্জা লাগছিল, টিচার আপনি বউ হলে আমি তো লজ্জায় আর আপনার সাথে কথা বলতে পারবো। আমি চলে যাচ্ছি লজ্জা লাগতেছে। দুহাতে পুরো চোখ মুখ ঢেকে বের হয়ে গেলো সে। আমি হাসতে হাসতে বেহুশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম, কিন্তু হলাম না।

– ও আপুরে, বলেন না রাজি? এবার আমি মুখ খুললাম-

– আচ্ছা, তাসিফা আমাকে তুমি বলো তো পাত্রী দেখার দায়িত্ব কি তোমাদের ছোটদের দিয়েছে?

সে- আরে, আব্বুর জন্য আম্মু আনবো তো আমাদের মন মতো হবে না?

আমি- ওহ আব্বুর জন্য তাহলে আম্মু আনবে তোমরা, পাত্রী আনবে না। ঠিক আছে পাখি ঠিক আছে তোমার আব্বু চাইলে আমাকে আম্মু ডাকতে পারে। অসুবিধে নেই… আসি এখন কেমন? সে আমার হাত টেনে ধরে- না না, আমাদের জন্য আম্মু, আব্বুর জন্য বউ আনবো আপনাকে। না আপু, এভাবে হবে না, এটা মিস্টেক আমি গেইট দিয়ে বের হতে হতে- আমি কারো বউ না তো, কেউ তো তার বউ তোমার আব্বুকে দেবে না সে চিৎকার করে- আল্লাহ না, আব্বু, না আম্মু না, বউ না, আপু, না মেয়ে আনব…ব ব…

আমি- ৩য় বিশ্ব যুদ্ধ শেষ…

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত