স্ত্রী সেতু

স্ত্রী সেতু

মাঝে মাঝে আমার বৌ মুখ গোমড়া করে বলে, কেন তাঁর ছবি আমার প্রফাইলে নাই? কেনো মাঝে মাঝে আমি তাঁর জন্য কিটক্যাট, ফিটক্যাট, ফ্যাটক্যাট ইত্যাদি আনি না। সে ছবি তুলে পোস্ট করতে পারে না! সেদিন পাশের গ্রামের এক ঐতিহাসিক সেতুতে তাঁকে নিয়ে গেলাম। বৌ খুব দুঃখের সাথে বললো, “ এমনভাবে তৈরি হইতে কইছেন, মনে করছি আইফেল টাওয়ার দেখাইতে নিয়া যাইবেন! আর এইখানে! আহ রে কপাল! ”

তাঁকে আমি কীভাবে বুঝাবো, এইযে সেতুটির কী গভীর ইতিহাস। এখানে এক হিন্দু ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মারা গিয়েছিলেন। স্ত্রীর জ্বর ছিলো, নৌকার মাঝিকে সে ডাকছিলো, মাঝি সারা দেয়নি। গ্রামের জমিদারের আদেশ। একমাত্র জমিদার বংশের কোনো লোকের জন্য নৌকাটি ব্যবহার করা হবে! রামবাবু সেদিন স্ত্রীর চোখের দিকে তাকাতে পারেননি। দুজনে আর এপারে আসতে পারেননি। জড়াজড়ি অবস্থায় তাঁদের পরদিন নদীর ঠিক মাখখানটায় পাওয়া যায়। মৃত অবস্থায়!

বাড়িতে এসে সে যে কী রাগ করেছে। খাবে না, খাবে না, খাবেই না। আম্মা জিজ্ঞেস করলো, “ কীরে ছেড়ি, এমুন ভাব মাইরা রইছস ক্যান? ” সে সরাসরি বলে দিয়েছে, “ আপনার পোলার লাইগা! সে আমারে সাজুগুজু করাইয়া নিয়া গেছে রাম-স্ত্রী সেতু দেখাইতে। আপনেই কন আম্মা, এই সেতু কী আমি দেখিনাই? ঐ সেতুর পাশের স্কুলটাতেই তো আমি পাঁছ বছর লেখাপড়া করছি! ” আম্মা আর জবাব দিতে পারলেন না! মাঝেমধ্যে দেখি পাটশাকের মাঝে জলজ্যান্ত রশুন দেয়া! যদি বলি “ এটা আবার কেমন শাকের ভর্তা হইলো? ”

বৌ উত্তর দেয়, “ আপনার মন যেমন! ” তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে নাকের নিচ দিয়ে খেতে থাকি! প্রতি সপ্তাহে সে মনে করিয়ে দিবে। তাঁর মোবাইলের ক্যামেরা বেশি ভালো না। এতো কষ্ট করে রান্না করার পর ফটু তুললে ভালো আসে না। একটা ভালো ক্যামেরার ফোন দরকার। সেজন্যই তাঁর জন্মদিনে একটি নয়শো ত্রিশ টাকার একটা বাটন ফোন কিনে দিলাম। সে উপহার বাক্সটা খুলার পরে আম্মা, কাকীম্মার সামনেই বলে দিয়েছে, কিপ্টার কিপ্টা!

রাতে সে আমার পাশে ঘুমাইতে আসে না! এতো বড় হয়েছি। বৌ ছাড়া থাকাটা একটু মুশকিলই। আম্মাকে ডাকছি, “ আম্মা, আলমারির চাবিটা দেও একটু! ” উনি ভালো করে বুঝেন আমি কেনো চাবির কথা বলছি। উত্তর দিয়ে দেন, “ আয়না ঘুমাইয়া পড়ছে। ডাকাডাকি কইরা লাভ নাই! ” ঘরের জানালা খুলে আমি চাঁদের আলো বৌয়ের মুখে পড়তে দেই। সে পটাশ করে জানালা বন্ধ করে দিয়ে বলে, “ বেহুইত্তা পাগলামি। ভূত দেখাইয়া মারবার চায়! ”

তাঁর চুলগুলো মাশাল্লাহ। এখন আমি যদি বলি, “ তোমার চুলগুলো খুব সুন্দর গো। ” তাহলে সে কালকেই কেটে ফেলার জন্য মোচড়ামুচড়ি করবে। তাই বলি, তোমার চুলগুলো তোমার মুখের সাথে মানায় না। সে এখন বেশি বেশি চুলের যত্ন নেয়। বাজার করার সময় চুলের এই, চুলেই হেই লিখে দেয়। দিনের মধ্যে কয়েকবার আম্মার হাতে তেলের কৌটা দিয়ে বলে, “ আমি আপনের কেঁথা সিলাই, আপনে আমার চুলে তেল দিয়া দেন! ” সেদিন মাইকেল মধুসূদন দত্তের একটা কবিতার বই কিনে নিয়ে আসলাম। বাড়ির পাশের স্কুলে বইমেলা হচ্ছিলো। সেই কবিতার বইটি এনে আয়নার হাতে দিলাম। সে তখন আরামসে খিচুড়ি খাচ্ছিলো। “ কম খাইয়া, কবিটা’টবিতা একটু পড়ো। সাস্থ চেহারা ঠিক থাকবো। ”

সে ধরে নিলো আমি তাঁরে খোঁটা দিয়েছি। কান্নাকাটি আরম্ব করে দিলো। বাপের বাড়ি চলেই যাবে। আম্মা লুকিয়ে লুকিয়ে হাসে। আরো কয়েক বাসন খিচুড়ি আয়নার সামনে দিয়ে বলে, “ তুই খা, দেখি কে কী কয়। আমি শ্বাশুড়ির লগে একদিক দিয়া কাইজ্জা লাগতাম। আরেক দিক দিয়া খাইতাম। আর তুই জামাইয়ের লগে রাগ কইরা খাস না। বলদ ছেরি। না খাইয়া হুকনা হইয়া গেলে দেখবি জামাই টানামানা শুরু কইরা দিছে! ” খুব কষ্টে তাঁরে মানানো গেলো। তিন দিন পড়ে রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে আমার, দেখি সে টেবিলে বসে কবিতা পড়ছে, তৃণমূল তোমার মনের কথা, কেহ নাহি জানে। তুমিই তো প্রাণ দিয়েছো, সবারই পানে!

আমি বিছানা ছেড়ে তাঁর সামনে গেলাম। খুব আনন্দ লাগছিলো কেনো জানি। বাসর রাতেও আমার এতো আনন্দ লাগেনি। জীবনের প্রথম কোনো মেয়ের হাতে চুমু খেয়েছিলাম। তবুও সেই আনন্দের চেয়ে এই আনন্দ আমাকে বেশি স্বস্তি দিচ্ছে! তবে আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। দত্ত সাহেব কবে, কোন কবিতায় এমন একটি লাইন লিখেছিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, “ কি গো, কোন কবিতার লাইন এইটা? দত্ত সাহেবের কবিতার বইটা থাইকাই তো পড়তাছো না? ”

সে আমার দিকে চোখ রাঙিয়ে বললো, “ কচুর বই আনছেন! দাঁত পইড়া যাইতাছে। তাই নিজেই ভনভন করতাছি নিজের মতন! ” আমার চোখে পানি এসে গেলো। তাঁর শাড়ির আঁচল ধরে বললাম, “ এই জীবনে আমার কোনো উপহার তোমারে আগ্রহী করলো। আমি তো সুখে মইরাই যাইতাছি! ” বৌ গাল টানা দিয়ে বললো, “ আপনে মনে হয় ভুইলা গেছেন। কাইল সবুজের স্কুলে অনুষ্ঠান, সেইখানে আমি কবিতা আবৃত্তি করার চিন্তা করতাছি! ”

নিমিষেই আমি নিমি’শেষ হয়ে গেলাম! তবুও তাঁরে বাহবা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। সবুজ তাঁর দেবর হয়৷ আমার সবচেয়ে ছোট ভাই। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠলে সে কড়া করে বলে দেয়। আমাদের বাচ্চা হলে তাঁকে যেন দত্ত সাহেবের বই না দেই পড়তে। দাঁত পড়ে গেলে একটা গোলমালই লেগে যাবে! হঠাৎ একদিন প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এর মাঝে আমি আয়নার হাত ধরে বললাম, “ চলো বৃষ্টিতে ভিজি? ” সে হাত সরিয়ে নিয়ে বললো, “ ঠাডায় ফালাইয়া মারতে চাইতাছেন না? ” “ আরেহ না, বৃষ্টি থাইমা যাইবো। দুইজনে হাঁইটা হাঁইটা একটা জায়গায় যামু। অনেক সুন্দর একটা জায়গা! ”

সে এই বৃষ্টিতে কোনোভাবেই বাইরে যাবে না। তবে বৃষ্টি থামতেই মাশাল্লাহ সেজেগুজে বসে আছে! আমি তাঁকে নিয়ে নৌকায় উঠলাম। আমাদের এখান থেকে আবার নদী না পেরিয়ে কোথাও যাওয়া যায় না। মানে শহরের দিকে। নৌকাটা গিয়ে সেই রাম-স্ত্রী সেতুর নিচে থামলো। সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “ এইখানে থামাইলো কেনো নৌকা? ”

আমি তাঁর হাত ধরে বললাম, “ এই সেতুটার একটা ইতিহাস আছে। কিন্তু ইতিহাস বলতে গেলে তুমি ধাক্কা মাইরা আমারে পানিতে ফালাইয়া দিবা। অনেক বড় ইতিহাস। ছোট্ট কইরা তোমারে এইটুকু কইতে চাই। আমি তোমার হাতটা মরার আগ পর্যন্ত ধইরা রাখতে চাই! ” সে এবার আমার কথায় মন না দিয়ে বললো, “ আপনে কইতে চাইতাছেন আমার ধৈর্য কম? ইতিহাসটা কী আগে কন। অক্ষণই কন। ” আমি কপালে হাত দিয়ে মাঝিরে বললাম, “ ভাই ঘাটে নিয়া চলেন তো! ”

তাঁর ভাই একদিন মিস্টি নিয়ে তাঁরে দেখতে আসলো। তো একটা গোল্লা আমি মুখে দিয়ে বললাম, শালায় বাসি গোল্লা আনলো! এরপরে যে কী তুমুল কিলাকিলি হয়েছে। সেটা বলতে গেলে অনেক সময়ের দরকার। প্যারিসে তাঁর এক খালাতো বোন থাকে। উনার স্বামী সেখানে চাকরী করেন। গত সেপ্টেম্বরে তিনি আয়নার কাছে এলেন এবং একটা সুখবর দিলেন। আয়নাকে এবার নিয়ে যাবে। আইফেল টাওয়ার দেখিয়ে নিয়ে আসবে। আমার কোনো আপত্তি আছে কিনা।

সে রাতে আয়না বেশ চুপচাপ ছিলো। খুব মন খারাপ করে বসে ছিলো। আমি যদি না বলি। সকালে উনার সঙ্গে আয়নাকে যেতে দিলাম। তাঁর খুব ইচ্ছে আইফেল টাওয়ারটা কাছ থেকে দেখবে। বোন শুধু গল্প শোনায়। তারপর হলো কী, সে সেখানে গেলো। বোন তাঁকে আইফেল টাওয়ার দেখাতে নিয়ে গেলো। সে টাওয়ার দেখে বললো, “ আশেপাশের মাইনসের দেহি লজ্জাশরম বলতে কিচ্ছু নাই। ” সেখানকার কালচার তো আর এখানকার মতো না। একটা ছেলে একটা মেয়েকে প্রকাশ্যে চুমু খেলে কেউ ফিরেও তাকায় না।

রাতে ফোন করে বললো, “ সকাল হইবার আগে আমারে এইখান থাইকা নিয়া যান। কচু থুঁথুঁ ফালাইলেও নাকি জরিমানা করে। জেল কাটতে হয়। ” তাঁর বোনের স্বামীর ছুটি হবে কদিন পর। তারপর সবাই একসাথে ঘুরতে বের হবে। কে শুনে কার কথা? সে কান্না করে। খায় না। মাটির চুলা নাই! ধনিয়াপাতা পাওয়া গেলেও সেটাতে কোনো তেজ থাকে না। রোজ ধনিয়াপাতা দিয়ে ভর্তা খাওয়া তাঁর অভ্যাস! অতঃপর প্রায় এক মাস পরে সে দেশে ফিরলো। এসেই সবার আগে আমাকে বললো, “ চলেন নৌকা দিয়া রাম-স্ত্রী সেতুতে যাই। ” আমি অবাক হয়ে বললাম, কেনো?

সে প্রায় কান্না করে দিয়ে বললো, “ একলা একলা আইফেল টাওয়ার দেইখা কোনো মজা নাই। যে মজা আছে আপনের সাথে রাম-স্ত্রী সেতু দেখায়! ” বলতে না বলতেই প্রচন্ড হাওয়ার সাথে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো! আমি বললাম, “ এই দেখো আবার বৃষ্টি শুরু হইয়া গেলো। তোমার আরেকটা বায়না অপূর্ণ থাইকা গেলো! ” সে মাথা নাড়িয়ে সাজুগুজু করতে যাওয়ার আগে বললো, “ জ্বী না, বৃষ্টি থামলেই যামু। ”

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত