মায়ার বন্ধন

মায়ার বন্ধন

আমার বাবা যখন আরেকটা নতুন বিয়ে করেছিলেন তখন আমি খুব ছোট।বাবা আমাদের বাড়িটা আমার মায়ের নামে লিখে দিয়ে চলে গিয়েছিলেন তার নতুন সংসারে।আর তাই আমার দায়িত্বও মার একাই নিতে হয়েছিলো।বাবা তার এই পুরোনো সংসারের খরচ চালিয়ে যাবেন কিন্তু এই সংসারের কোনোকিছুতে তিনি আর কখনো অংশ নিবেন না বলে মাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।বাবা তার কথামতো আমাদের জন্য প্রতিমাসে হাত খরচ পাঠিয়ে দিলেও মা সেটা কখনো গ্রহণ করেন নি।বাবার কাছ থেকে মা কখনো কোনো কারনে কিংবা প্রয়োজনে এক টাকাও নেন নি।আমাকে লালন পালন ও পড়াশোনার যতো খরচ ছিলো সব মা নিজে এবং একা করেছেন।

যখন মায়ের কাছে বাবার কথা জানতে চাইতাম তখন মা বলতেন আমার বাবা দেশের বাহিরে আছেন।সে আর কখনো আমাদেরকে দেখতে আসবেন না।তার না দেখতে আসার কারনটা আমি মাকে কখনো জিজ্ঞেস করি নি।একদিন মা নিজ থেকেই বললেন বাবা আমাদের পছন্দ করেন না বলে আর আসবেন না আমাদের কাছে।আমার জন্য বাবা নামক ব্যাক্তিটি জীবিত থেকেও ছিলো মৃত।বাবার চেহারা আমার এখনো মনে পরে না।হয়তো হঠাৎ একদিন দেখা হয়ে গেলেও বাবা আর আমি কেউ কাউকে চিনবো না।ভাবতেই কেমন যেন অদ্ভূত লাগে।মা একা আমাকে নিয়ে অনেক কঠিন সময় পার করেছেন আর এইটা আমি কখনো অস্বীকার করতে পারবো না।বাবা আমাদেরকে ছেড়ে যাওয়ার পর মা নিজে ভেঙে পরলেও আমাকে কিছু বুঝতে দেন নি।

মা তখন একটি চাকরি নিলেন এবং আমাকে পড়াশুনা শিখিয়ে বড় করলেন।আমার বড় হওয়াতে আমার বাবার বিন্দুমাত্র ভূমিকা নেই।প্রতিটা নারী মা হওয়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্মালেও প্রতিটা পুরুষ বাবা হওয়ার ক্ষমতা নিয়ে জন্মাতে পারে না।আমার বাবার বেলায়ও তাই ছিলো।এই পৃথিবীর কাছে একজন পুরুষ আমার জন্মদাতা হলেও আমার কাছে সে একজন বাবা কখনো হতে পারে নি।তিনি আমার জন্মদাতা আর এইটা চিরন্তন সত্য বলেই শত অবহেলার মাঝেও সেটা আমার মনে মনে মেনে নেওয়া।নয়তো যে আমার মায়ের এবং আমার অস্তিত্ব অস্বীকার করে অন্য সংসারে কারো না কারো স্বামী এবং বাবার ভূমিকা পালন করছেন আমিও তার অস্তিত্ব অস্বীকার করি।আমার মা অবশ্য বাবার বাড়িটা বাবাকে ফিরিয়ে দিয়ে নতুন বাড়ি করেছিলেন।আমার মা এবং আমি সেই বাড়িটাকেই সুন্দর করে সাজিয়ে নিয়ে নতুন সংসার বানিয়েছি।

মায়ের চেষ্টায় আমার বিয়েও হলো একজন অসাধারণ মানুষের সাথে।কিন্তু তবুও মা আমাকে নিয়ে ভয় পেতেন কেননা মায়ের সাথে যেমনটা হয়েছিলো আমার সাথে যদি তেমনটাই হয় এইটাই ছিলো আমার মায়ের ভয়। পড়াশোনা শেষ করিয়ে মা আমাকে তার মনের মতো করে বিয়ে দিলেন।আমি আজ দুই সন্তানের জননী।সেদিন আমার ছোট মেয়েটাকে স্কুল থেকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম হঠাৎ খেয়াল করলাম একটি বয়স্ক লোক রাস্তা পার হচ্ছেন কিন্তু তার রাস্তা পার হওয়ার ধরন দেখে মনে হচ্ছে যেকোনো সময় তার সাথে একটি দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।তাই আমি নিজেই লোকটির পাশে গিয়ে তার হাত ধরে অতি সাবধানে রাস্তা পার করে দিলাম।লোকটিকে আমি বললাম-

-রাস্তাঘাট পার হওয়ার সময় খুব সাবধানে পার হবেন।ভাগ্যিস দূর থেকে আমি আপনাকে দেখেছিলাম। লোকটি তার চশমা ঠিক করে বললো-
-আমি হারিয়ে গেছি মা।
-সে কি!আপনার ঠিকানা আমাকে বলুন।আমি আপনাকে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবো।বাড়ির মানুষ নিশ্চয়ই আপনাকে খুঁজছে।
-আমার কিছু মনে পরছে না।
-আপনি এখানে আসলেন কিভাবে?
-আমি একটা বৃদ্ধাশ্রম থেকে বের হয়েছিলাম আমার স্ত্রীকে খুঁজতে।কিন্তু হাটতে হাটতে কোথায় যে চলে এলাম বুঝতে পারছি না।

-বৃদ্ধাশ্রম থেকে বের হয়ে স্ত্রীকে খুঁজছেন কেন?আপনার স্ত্রী কোথায়?
-তুমি কি দীঘিরপার চেনো মা?
-হ্যা।আমার ছোটবেলা সেখানেই কেটেছে।
-সেখানে আমার স্ত্রী পুষ্পা আর আমার বাচ্চা মেয়ে পরী থাকে।তুমি কি আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারবে?

আমি থমকে গেলাম।পুষ্পা আমার মায়ের নাম।আর আমিই তো পরী।এর মানে এই লোক আমার বাবা যে অনেক বছর আগে আমাকে এবং আমার মা কে ফেলে চলে গিয়েছিলেন।লোকটি হুট করে কেঁদে দিয়ে বললেন-
-আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই মা।আমার মতো মানুষের সাথে এমনটা হওয়ার ছিলো।আমি খুব অসহায়।আমার স্ত্রী আর মেয়েকে একবার দেখতে পারলেই হয়তো আমি শান্তিতে মরতে পারবো।

মা আমাদের আগের বাড়িটা অনেক আগেই বাবাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।বাবার হয়তো সেটা মনে নেই।বছর বছর আগে স্ত্রী আর কন্যাকে যেই অবস্থায় ফেলে রেখে গিয়েছিলেন এই মুহূর্তে হয়তো সেটাই কল্পনা করছেন।তিনি হয়তো ভাবছেন যে তার সেই বাচ্চা মেয়েটা এখনো ছোটই রয়ে গেছে।তার স্মৃতিশক্তি আর আগের মতো নেই সেটাও বোঝা যাচ্ছে।আমি তাকে বাসায় নিয়ে গেলাম।যেই বাসায় আমি এবং আমার মা নতুন সংসার পেতেছিলাম সেই বাসায়।মা এসে বাবার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমাকে বললেন-

-কে এই লোক?অপরিচিত লোককে এখানে ধরে নিয়ে এসেছিস কেন? আমি কিছু বলার আগেই বাবা বলে উঠলেন-

-পুষ্পা,আমি চলে যাবো।আমি এখন বৃদ্ধাশ্রমে থাকি।তোমাদেরকে এক নজর দেখতে এসেছি।তোমাদের খুঁজতে বের হয়ে আমি পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম।এই মেয়েটা আমাকে সাহায্য করলো আর এখানে নিয়ে এলো।
মা বললেন-

-আপনি আমাদের সাথে অনেক আগেই সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে গিয়েছিলেন।এখন এতো মায়া নিয়ে ফিরে এলেন কি করে!

-আমি চলে যাবো।তুমি শুধু আমার পরীকে একবার ডেকে দেও।আমি আমার পরীকে আদর করেই চলে যাবো।
মা হঠাৎ কেঁদে দিলেন।আমাকে দেখিয়ে বললেন-

-ও তোমার পরী হলো কবে?ওকে আমিই জন্ম দিয়েছি,আমিই বড় করেছি।

বাবা আমার দিকে তাকালেন।তিনি হয়তো এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না কিছু।আমাকে কি বলবেন হয়তো সেটাই ভাবছেন।আমি কিছু বললাম না।আমার খুব মায়া লাগছিলো।মা কেঁদেই যাচ্ছেন। মুহূর্তের মধ্যেই যেন সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেলো।বাবা আমার দিকে তাকিয়ে ডাকলেন-

-আমার কাছে আসবি মা!আমি তোর কাছে ক্ষমা চাইবো। আমি চুপচাপ তার পাশে গিয়ে বসলাম।তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন।মানুষটা আজ খুব অসহায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত