যাপিত জীবন

যাপিত জীবন

নিতান্ত অপরিচিত লোকটি আমায় বলে। ইচ্ছে না থাকলেও আমায় হ্যা বলতে হয়। আমি হচ্ছি লক্ষিটাইপ একটা মেয়ে। বড়রা কিছু বললে সেটা হাজার কাজ থাকলেও শুনে যাই। আর উনি হচ্ছেন আমাদের বিশিষ্ট মেহমান। উনার বোনের সাথেই আমার ভাইয়ের বিয়ের কথা চলছে।

উনার বয়সটা আমি ঠিক আন্দাজ করতে পারছিনা তবে পঁচিশ থেকে চল্লিশের মধ্যেই হবে। গায়ের রঙ পাকা গমের মতো। সেই হিসেবে উনার বোন মাঝারি টাইপ সুন্দরী। আমাদের বাড়ির মুরুব্বীরা একদিন ঘটা করে উনার বোনকে দেখে এসেছে। মেয়েটি পেশায় ডাঃ এই বছরই ইন্টার্ন শেষ করেছে। আমার ভাই পাত্রী দেখে পছন্দ করেছে। তার বক্তব্য ডাক্তারি পাশ করতে গিয়ে মেয়েদের চেহারা আর সুন্দর থাকেনা। কিন্তু ছেলেদের থাকে কি করে বুঝলামনা। কারণ আমার ভাই বলিউডের নায়ক ঋতিক রোশনের কার্বন কপি। দেখলেই মায়া লাগে টাইপ।

বিয়েটা হচ্ছেই। আমাদের বাড়ি থেকে বড়ফুপু একটা সুতার মতো চেন পরিয়ে মেয়ে বেঁধে রেখে এসেছেন। আর মেয়ের ভাই এসেছেন আমাদের বাড়িতে পুরো দুই গাড়ি ফল আর মিষ্টি নিয়ে। ভাবে মনে হচ্ছে বোনের বিয়েতো হয়েছেই উনি মামা হওয়া উপলক্ষে এতো কিছু নিয়ে এসেছেন। এমন মানুষ যদি কিছু বলতে চায়, আমার উচিৎ ধৈর্য ধরে শোনা। আমি অপেক্ষা করছি। উনি হঠাৎ বারান্দায় গেলেন তারপরে হেঁটে সোজা আমার কাছে এলেন। বললেন শুনুন তাহলে – আমার বাবা ছিলেন টেম্পোরারি রিকশাচালক। কোনমতে জমার টাকা আর অল্প কিছু জুয়া খেলার টাকা হলেই উনি রিক্সা জমা দিয়ে জুয়া খেলতে বসে যেতেন। আমার মা পরের বাড়িতে কাজ করতেন। সেই অল্প আয়ে আমাদের একবেলা কদাচিৎ দুবেলা খাবার জুটতো। বাবা প্রায়ই আমাদের উপদেশ দিতেন। সুন্দর সুন্দর উপদেশ। অবশ্য উপদেশ ছাড়া উনার কাছে দেয়ার আর কিছু ছিলোনা। আমার বোনটি আমার এগারো বছরের ছোট। ওর জন্মের সময় আমি ক্লাস ফাইভে পড়তাম। বস্তির স্কুল।

তবে আমি হেরে যাইনি। একবেলা কাগজ কুড়িয়ে পড়ার খরচ যোগাতাম। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি অনুর বয়স দুই। মা ওকে সকালে কিছু খাইয়ে একটা কাঠি লজেন্স হাতে ধরিয়ে চলে যান। ও সারাদিন বস্তির বাচ্চাদের খেলা দেখে আর কাঠিটা চোষে। মা ফিরলে ভাত রাঁধার পরে আমাদের খাওয়া। আমার মা খাওয়ার বদলে একটু বেশি বেতনে দুই বাসায় কাজ করতেন। তাই আমরা সেই সল্প বেতনের বুয়ার যুগেও চারটি প্রানী একবেলা পেট পুরে খেতাম সকালে বাসি ভাত যা থাকতো ভাগ করে আধপেটা চলতো।

মা হঠাৎ বেশি সন্ধ্যায় ফিরতেন। এর মানে ওই বাসায় সেদিন মেহমান এসেছে প্রচুর ভালমন্দ রান্না হচ্ছে। মা আসার সময় তারা দয়া করে একটা বাটিতে একজন খাবার মতো পোলাউ একটা মাছ ভাজা আর দুইটুকরা গোসত দিতেন।
আমাদের বাড়িতে সেদিন ঈদ মনে হোতো। এদিকে মা পড়তেন বিপদে। মাছ ভেঙে ভেঙে মা সবাইকে একটু করে দিতেন কিন্তু দুইটুকরা মাংসের আর ভাগ করা যেতোনা। বাবাকে একটুকরো দিয়ে দাঁতে ছিড়ে আমাদের দু’ভাইবোনকে দিতেন। তাতে কারোই মাংসর স্বাদ বোঝা হোতোনা। মুখে দেবার আগেই মিলিয়ে যেতো। বাকিটা ভাত অল্প ঝোল মেখে খেতাম। আর মাকে প্রায়ই তাগাদা দিতাম। – মা এইবার বেতন পেলে মাংস আনবা কও? মা হেসে বলতেন – ঠিক আছে। কিন্তু তা আসলেই সম্ভব হোতোনা। ঘর ভাড়া আর দোকানের বাকি দেয়ার পরে হাতে আর কিছুই থাকতো না। সারা মাস আমরা আবার দোকানে বাকি খেতাম। দোকানদার দোকান বন্ধ রাখলে স্রেফ উপোস।

তখন আমার বাবার দার্শনিক কথা আরো বেরে যেতো। মা বাড়ি ফিরে ধারদেনা করে হয়তো শুধু চাল যোগাড় করতেন। স্রেফ লবণ মেখেই আমরা সেই ভাত খেতাম। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি অনু বসে বসে একটা হাড় চুষছে। সম্ভবত কেউ খেয়ে ডাস্টবিনে ফেলেছে। সেখান থেকে কোনভাবে ওর হাতে এসেছে। সাথে কিচ্ছু নেই। চুষে চুষে ও হাড়টা সাদা বানিয়ে ফেলেছে। আমি নিতে গেলাম। ও চিৎকার করে কান্না জুড়লো। মা এসে দেখে একটানে ফেলে দিলেন। আমি রাতে রাগ করে ভাত খেলাম না। আমার দেখাদেখি মাও খেলেন না। বাবা সেদিন দার্শনিক কথা না বলে চুপ থাকলেন।

পরদিন মা এলেন। মা এর হাতে এটা আস্ত মুরগী। আমরা রাতে মজা করে মুরগীর মাংস দিয়ে ভাত খেলাম। এরপরে মা মাঝেমাঝেই মুরগী আনতেন। কোথা থেকে আনতেন জানিনা। তবে একদিন বাবা সবার আগে মাংস দিয়ে ভাত খেতে গিয়ে ধরফর করতে করতে মরে গেলেন। এরপরে মা যেনো কেমন হয়ে গেলেন। এক খৃষ্টান সাহেবের বাসায় কাজ করতেন। তারা তিনবেলা খেতে দিতো। একদিন মা খুব অসুস্থ্য হাসপাতালে নেয়ার পরপরই মারা গেলেন। আমি তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবো। সাহেব আমাদের তার বাসায় উঠে আসতে বললেন। আমি গ্যারেজের পাশে জানালাহীন রুমটায় অনুকে নিয়ে চলে এলাম। টিউশনি করানো শিখলাম।

তারপর ভার্সিটি একসময় ব্যবসা আর আজ আমার বোনের বিয়েতে সবাইকে আস্ত মুরগির রোষ্ট খাওয়ানোর সামর্থ আছে। তবে দুঃখ কি জানেন? আমি আমার বাবাকে কখনো সামনে বসিয়ে একপ্লেট মাংস দিয়ে ভাত খাওয়াতে পারবোনা। আমার বাবা কি করে মারা গিয়েছিলো জানেন? আমি পরে অনেক ভেবে বের করেছি। আমাদের বস্তি থেকে একমাইল দূরে একটা মুরগির ফার্ম ছিলো। ফার্মে প্রায়ই মরক লাগে। মালিক সেই মরা মুরগি গুলো ফেলে দেন। আমার ধারণা মা সেই মুরগি কুড়িয়ে আমাদের জন্য নিয়ে আসতেন।

– কি কেমন লাগলো শুনতে? আমার কিন্তু বলে ভারি ভাল লাগছে। প্রথমত আমি দায়মুক্ত হলাম। দ্বিতীয়ত আপনিও একটা গল্পের প্লট পেলেন। আমার বোনের বিয়েতে আসছেন তো? মোরগ মুসাল্লাম খাওয়াবো আপনাকে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত