কফি হাউজ

কফি হাউজ

ছোটখাটো একটা কফি হাউজে কাজ করি আমি । সোজা কথায় ওয়েটার আরকি । সারাদিন অর্ডার নেই, আর প্রয়োজনমত কফি সাপ্লাই দেই কাস্টমারদেরকে । কফি হাউজটার নাম “রংতুলি কফি হাউজ” । ছোট হলেও এই কফি হাউজে মানুষের আনাগোনা কম নয় । সারাদিন একটুও বসে থাকতে পারি না । মাঝে মাঝে দুপুর বেলার দিকে প্রানভরে একটা কফি খাওয়ার সুযোগ হয় ।

সারাদিনের কাস্টমারদের মধ্যে বেশিরভাগই কাপল । কাপল ছাড়া কফি খেয়ে সময় নষ্ট করার মতো কেই বা আছে এই ব্যাস্ত শহরে । অনেক ধরণের কাপলের দেখা মেলে, স্কুল পড়ুয়া, কলেজ পড়ুয়া, ভার্সিটি পড়ুয়া, সকলের অনুপাতই সমান । সারাদিন অনেক গল্প দেখি । সবগুলো গল্প ভালবাসার । কেউ কথা বলে, কেউ ছবি তুলে, কেউ হাত ধরে বসে থাকে, কাউকে আবার ঝগড়া করতেও দেখা যায় । সকলের যত জমে থাকা আবেগ, যত অভিমান সবকিছু প্রকাশ করা হয় এই কফি হাউজে । মজার বিষয় কফিটুকু কেউ আর ঠিকমত খায় না ।

এত এত ভালোবাসার গল্পের মাঝে আমার গল্পটাই আড়ালে থেকে যায় । ব্যাস্ততা কমলে হঠাৎ মনে পড়ে যায় আমার ভালোবাসার মানুষটার কথা । কাস্টমারদের কোন একটা সিটে বসেই আনমনে ভাবতে থাকি । গলির বাঁকে, দোতলা বাসার নীল উড়না পড়া মেয়েটাকে । মেয়েটির নাম “শিমু” । সপ্তাহের ছুটিতে পুরনো সাইকেলটা নিয়ে একবার হলেও তাকে দেখতে যাই । শাড়ি পড়লে তাকে বেশ মানায় । তার শান্তশিষ্ট স্বভাব, একলা বসে থাকা, বাসার ছাদে মৃদু বাতাসে তার লম্বা চুল উড়তে থাকা, আকাশপানে তার একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকা । এইসব ভাবতে থাকি । মন চায় তার একলা থাকার সঙ্গী হই আমি । ভাবনাগুলো শেষ হতে না হতেই, কার যেন ডাক… এই ওয়েটার, দুইটা কোল্ড কফি !! আবার ব্যাস্ত হয়ে যাই ।

একদিন হঠাৎ ব্যাস্ততার ফাঁকে খেয়াল করলাম মেয়েটি এই কফি হাউজে । একলা বসে আছে । এমন রূপবতীদের একলা আসতে খুব কমই দেখা যায় । মেয়েটাকে বাসা থেকেই বের হতে দেখি না, কিন্তু আজকে আমার কফি হাউজ পর্যন্ত চলে আসলো দেখে অবাক হলাম । বেশ সুন্দর লাগছিলো । আমাকে দেখেই ডাক দিয়ে বললো, এই শুভ্র একটা কফি । আশ্চর্য! মেয়েটা আমার নাম জানে কি করে ! তড়িগড়ি করে কফি আনতে গেলাম । কোনটা খাবে বললো নাতো, হট না কোল্ড ? জিজ্ঞেস করবো কি আবার ? না থাক । এইসব ভেবে কোল্ড কফি নিয়ে গেলাম । একটু দেরী হয়ে গেলো । আমার সবচেয়ে ফেভারিট কফিমগে করে তাকে কফি দিলাম ।

শিমু । এত দেরী হল কেন ? আমি । উত্তর করলাম না । শিমু । চুলগুলো একটু আছড়াতে পারো না ? সাইকেলটা একটু চেঞ্জ করতে পারো না ? আমি । নিজেকে দেখাতে যাই না, তোমাকে দেখতে যাই । শিমু । তুমার এত সুন্দর কফি হাউজটাতে একটা কফি খাওয়ার দাওয়াত তো দিতে পারো ? আমি । একলা আসলে কেন ? শিমু । পরে বলব, সামনের শুক্রবারে বিকালে বাসার নিচে থাকবা । আর আমি কোল্ড কফি খাই না, তুমি আনলে বলে খাচ্ছি ।

প্রতি সপ্তাহের মতো পরের শুক্রবার বিকালে চলে গেলাম তার বাসার নিচে । আজকে সে শাড়ী পড়েছে । আমাকে দেখে আজকে প্রথমবারের মতো ভালোভাবে তাকালো । ফিলিংসটা ছিলো অন্যরকম । উপর থেকে একটা কাগজ নিচে ফেলল । রঙিন খাম । উপরে লিখা “এখানে দেখা যাবে না, বাসায় গিয়ে দেখতে হবে” । তাড়াতাড়ি বাসায় চলে এলাম । খামের ভিতরে দুইটা কাগজ । তার দেয়া ক্রমিক নং অনুযায়ী প্রথম কাগজটা খুললাম । কাগজে আমার ছবি । সাইকেলে বসে আছি, সবুজ গেঞ্জি, আর চুলগুলো এলোমেলো । সে এত সুন্দর ছবি আঁকতে পারে দেখে অবাক হলাম । ছবির নিচে লিখা, “ছবিটা সুন্দর হয়নি ? আরেকটা আছে ঐ কাগজে” ।

ঐ কাগজটাও খুললাম । কিন্তু ওখানে কোন ছবি নাই । আছে কিছু লিখা । লিখাগুলো হচ্ছে, “আরেকটা ছবি খুঁজছো, তাইতো ? এখানে পাবে না । কারণ ঐ ছবিটা এঁকেছি আমার মনে । ঐ ছবিটা আরও সুন্দর । খুঁজে নিতে পারলে দেখতে পারবা । আর ঐদিন জিজ্ঞেস করেছিলে কফি হাউজে একলা কেন আসলাম ? কারণ, আমার মানুষটার কফি খাওয়ার সময় নাই, সে কফি বানায় ।” আরেকটু নিচে লিখেছে, “গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছি । তুমার সাথে তিন মাস পরে দেখা হবে” । তিন মাস পরে একটা তারিখে তার বাসার নিচে আসতে বলল । তিন মাস পর দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল । আগে জানলে আরেকটু ভালো করে দেখে আসতাম ।

তিনমাস পর, তার দেওয়া তারিখে আবার গেলাম । এইবার সে বাসার নিচেই দাড়িয়ে ছিলো । অনার্স পড়ি আমি । চাকরি না পাওয়ার কারণে কফি হাউজটাতেই কাজ করতাম । তিনমাসের মধ্যে আমার একটা ভালো চাকরিও হয়ে গেলো । শিমুকে এইসব ব্যাপারে সবকিছু বললাম । সেও অনেক কথা বলল । আমি । চলো কোথাও ঘুরে আসি । শিমু । কোথায় ? আমি । “রংতুলি কফি হাউজ” ।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত