অপেক্ষা

অপেক্ষা

ভার্সিটির টপক্লাস কয়েকজন সুন্দরীদের মধ্যে একজন হয়ে যখন আমি সবার সামনে রাতুলকে প্রপোজ করলাম। সবাই সেটা দেখে আশ্চর্য কিংবা খুশি হওয়ার বদলে উল্টো রাতুলকে নিয়ে ঠাট্টা করতে লাগল। এর যথেষ্ট কারণ আছে। রাতুল গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলে। পড়নে কাপড়ের বাহার, পায়ের স্যান্ডেল, চুলের সাদাসিদা তেল দেওয়া একপাশে আনা চুল আর গায়ের তামাটে রঙে তাকে দেখলে কেউ বলবে না সে এখানকার স্টুডেন্ট। কিন্তু আমি জানি না কি জন্য কি দেখে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তার কথাবার্তা তেমন গুছানো নয়। শান্ত, নিরব চেহারা তারমধ্যে মুখের সেই ভুবন ভুলানো হাসিটাই হয়ত আমার এমন হওয়ার কারণ। ঠিক জানি না।

প্রপোজ করার সাথে সাথে আশেপাশে তাকিয়ে ঠাট্টা শুনে আমাকে কোনো উত্তর না দিয়ে ই রাতুল চলে যায়। আমি তখন অনার্স লাইফের শেষের দিকে। এই চার বছরে অনেক প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছি কিন্তু গ্রহন করিনি মন সায় দেয় নি। বাবা মায়ের অনেক আদরে বড় হয়েছি। কোনো দিন কোনো কিছুর অভাব বুঝতে পারিনি। কিন্তু রাতুলের এমন নিশ্চুপ চলে যাওয়াটা কেন জানি আমি মেনে নিতে পারছিলাম না।

ভার্সিটি তে যাই কিন্তু রাতুলকে কোথাও আর খোঁজে পাই না। একসময়ে আমাকে প্রপোজ করা ছেলেরা সামনে এসে অনেক কথা শুনিয়ে যায়। কি দেখে, কিসের জন্য, কি আছে যার জন্য রাতুলকে আমি বেছে নিয়েছি। কোনো উত্তর দিতে পারিনি। ভালোবাসি কি জন্য ভালোবাসি তা জানি না সব মিলিয়ে তাকে ভালোবাসি। কি জন্য ভালোবাসি এই উত্তর জানি না বলে ই এত ভালোবাসি। সেটা জানলে ভালোবাসা টা একটা নির্দিষ্ট কারণে আবদ্ধ থাকত সীমানা পেত কিন্তু আমার ভালোবাসার সীমানা চাই না অসীমতা ই আমার ভালোবাসা।

ফাইনাল ইয়ারের শেষের দিকে এক পর্যায়ে পরিক্ষা টাও শেষ হয়ে যায়। রাতুলের দেখা আর মিলে না। আমি কি কোনো ভুল করলাম, এরকম সবার সামনে এসব কথা বলে তাকে কি লজ্জা দিয়ে দিলাম। নাকি আমার উপর রাগ করে হারিয়ে গেছে। নাহ, রাগ করবে কেন রাগ করার মত তো এমন কেউ হইনি এখনো আমি। তাহলে কি তার সম্মানে আঘাত করলাম আমি!

নানা রকম চিন্তা করতে লাগলাম, অনেক খোঁজাখুজি করলাম কোথাও পেলাম না তাকে। এদিকে অনার্স শেষ মাস্টারস শেষ হওয়ার পথে বাবা মা বিয়ের জন্য একপ্রকার জোর করছে। কিন্তু আমি মানা করে দিয়েছি। আমি বিয়ে করব না। যেহেতু বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান তাই তেমন জোর খাটাতে পারলেন না। পড়াশোনা শেষ করে বাবার অফিস জয়েন করলাম এটা বাবার ইচ্ছা একটা কথা রাখিনি এই কথাটা রাখতে ই হল। এভাবে ৫ টা বছর কেটে গেল। একটা দিনের জন্যেও রাতুলকে ভুলতে পারিনি। এই শীতে মামাবাড়ি বেড়াতে আসি হঠাৎ করে মামা তার এক পরিচিত মেহমানের সাথে আলাপ করতে বলেন। আমার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও গেলাম। বাবা মা বলছিলেন শুধু তো দেখা করবি যা না হয়।

সন্ধ্যায় দেখা করতে গেলাম। দুজন মহিলা একজন পুরুষ। পরিচয় হওয়ার পাঁচ মিনিট পর একজন মহিলা আমার হাত কাছে নিয়ে আংটি পরিয়ে দিলেন। এসব দেখে আমার রাগ হচ্ছিল। রেগে কিছু বলতে যাব তার আগে ই পিছন থেকে আওয়াজ আসল, আমিও তোমাকে ভালোবাসি। তাকিয়ে দেখি রাতুল! কি ভেবেছিলে হারিয়ে গেছি। নাহ, ভালোবাসা রেখে মানুষ হারিয়ে যায়? যখন তুমি ভালোবাসার কথা বলেছিলে তখন আমার কিছু ই ছিল না। না ছিল গুড লুক, না অবস্থা না ছিল যোগ্যতা।

আর আশেপাশের হাসি ঠাট্টা দেখে খুব ক্ষোভ হয়েছিল মনে আমার জন্য নয় তোমার জন্য ! তুমি আমাকে বেছে নিয়েছ তোমার উপর সবাই হাসছে। এটা মেনে নিতে পারিনি। তাই কাউকে কিছু না বলে লাস্ট ইয়ার ভার্সিটি ট্রান্সফার হয়ে যাই। স্কলারশিপে আবেদন করি ভাগ্যক্রমে হয়েও যায়। কারণ মন থেকে যে চেয়েছিলাম। কানাডা যাই সেখানে পড়াশোনা করে সেই ভার্সিটি তে এখন রিসার্চে আছি। শুধু তোমার জন্য যোগ্য হয়ে উঠব বলে। আর আমি যদি হারিয়ে যেতাম। যদি আমাকে এভাবে না পেতে?

আমি জানতাম, চিনতাম তোমাকে তুমি অপেক্ষায় থাকবে আমার সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত। আর তুমি বলার আগে থেকে ই আমি তোমাকে ভালোবেসে ছিলাম। তবে বলার সাহস হয়নি কি করে বলি ! কি এমন আছে আমার ! তুমি যখন অন্যদের রিজেক্ট করতে সেখান থেকে বিশ্বাস টা হয়েছিল। আজ আমি তোমাকে আমার করতে এসেছি। ডেইট ফিক্সড কিন্তু। যারা আমাদের নিয়ে হেসেছিল তাদের সবার কাছে কার্ড পৌছে গেছে। তৈরি তো? কবে থেকে তৈরি হয়ে আছি এই দিনটার জন্য। সত্যিকার মন থেকে ভালোবাসা গুলো হয়ত এমন ই হয়। মুখে বলা লাগে না। মনের পবিত্রতা আর আত্মবিশ্বাস আর ভরসা দিয়ে কাছে টেনে আনে। শুধু একটু সত্য মনের প্রার্থনা থাকা চাই। গভীর ভালোবাসার বহমানতা।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত