প্রকৃতির ঋণ

প্রকৃতির ঋণ

-ম্যাম আমি আমার হ্যাসবান্ড কে ডিভোর্স দিতে চাই।
-তো এই সামান্য কেইসের জন্য আপনি চার ঘন্টা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন?
-আসলে ম্যাম আমার ডিভোর্স টা খুব প্রয়োজন।আমি ওর সাথে আর এক মুহূর্ত ও থাকতে পারছিনা।
-দেখুন এভাবে তো ডিভোর্স হয়না। আপনি আমাকে সমস্যাটা খুলে বলুন।
-ম্যাম আমার হ্যাসবান্ড খুব বাজে একজন মানুষ। এমন খারাপ কোনো খারাপ স্বভাব নেই যেটা ওর মধ্যে নেই।আমি যাস্ট আর নিতে পারতেছিনা। ম্যাম আপনি প্লিজ একটা কিছু করুন যত টাকার প্রয়োজন হয় আমি দেবো আপনাকে।

-দেখুন আমার এতোদিনের অভিজ্ঞতা থেকে অন্তত এতটুকু জানি শুধুমাত্র খারাপ অভ্যাসের জন্য আপনি ডিভোর্স চান না।অন্য কোনো কারণ আছে।আপনাকে একটা কথা বলি ডাক্তার আর উকিল এই দুই পেশার লোকের কাছে কথা লুকালে আপনারই ক্ষতি। ডাক্তারের কাছে রোগের সকল কথা খুলে না বললে যেমন রোগ সারবেনা ঠিক তেমনি আপনার উকিলের কাছে সব কথা না বললে কোনো কাজ হবেনা।আর বাকি রইলো টাকার কথা,আপনি কি জানেন কার সামনে বসে কথা বলছেন?এই শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত আইনজীবী মায়া রেহজান এর কাছে। আশা করি পরিচয় টা জেনে এসেই, কথা বলছেন।ধন্যবাদ,এবার আপনি আসতে পারেন।

-ম্যাম আমি খুবই দুঃখিত, আপনার সাথে দেখা করবো বলেই আমি ছয় মাস আগে এপোয়েন্টমেন্ট দিয়েছি।এতোদিন অপেক্ষা করেছি। প্লিজ ম্যাম আমার কেইস টা আপনাকেই সলভ করতে হবে।এবার আমি সব খুলে বলছি।

-আচ্ছা মিস তন্দ্রা বলুন।
-ম্যাম আমার সাথে আমার হ্যাসবান্ড এর বিয়ের বয়স তিন বছর। কিন্তু ওর সাথে বিয়ে হওয়ার পর আমার জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের বিয়ের আগে আমি জব করতাম, সেখানেই আমাদের পরিচয় হয়েছিল। বিয়ের কিছুদিন পর ও আর চাইতোনা আমি জব করি।আমি কিছুদিন কান্না করেও লাভ হয়নি।ও বাসা থেকে বের হতো সকাল আটটায়, বাসায় ফিরতো রাত নয়টায়।মাঝখানে এই এতোগুলা সময় আমি পুরোপুরি একা।যেহেতু আমাদের বিয়েটা ওর বাসায় মেনে নেয়নি তাই আমার শাশুড়ী ও কখনো আসেনি।প্রচন্ড একাকী সময় কাটতো।এভাবেই তিন/চার মাস কেটে গেলো।

একদিন শায়ান নামের একটা ছেলের সাথে আমার অনলাইনে পরিচয় হলো।প্রথমে টুকটাক কথা হতো।শায়ান আমার প্রচন্ড খেয়াল রাখতো। একটা সময় আমি ওকে সব খুলে বললাম।শায়ান আমার প্রতি প্রচন্ড দুর্বল হয়ে পড়েছিলো তাই আমার সবকিছু মেনে নিলো।আমার হ্যাসবান্ড এর অগোচরেই আমিও শায়ানের সাথে জড়িয়ে পড়লাম।আর ওর সাথে দূরত্ব আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো। আমি বেশিরভাগ সময়ই বাবার বাসায় গিয়ে থাকতাম কারণ ও থাকলে শায়ান এর সাথে কথা বলতে পারতাম না রাতে।এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিলো। ও ড্রিংক করা শুরু করে দিলো কিছুদিন আগে থেকে।মাতাল হয়ে এসে চিৎকার চেঁচামেচি করে।কিছুদিন আগে একটা থাপ্পড় মেরেছে।তাই আমি আর এ সম্পর্কে থাকতে চাইনা কিন্তু ওকে ডিভোর্স না দিলে শায়ান কে বিয়ে করতে পারবোনা।তাই আপনাকে খুব প্রয়োজন ম্যাম।প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন।

-আচ্ছা সবই শুনলাম। কিন্তু আপনার হ্যাসবান্ড কি চায়?সে কি আপনাকে ডিভোর্স দিতে রাজি?
-সে রাজি কারণ আমি ওর উপর অনেক প্রেসার ক্রিয়েট করেছি।
-ঠিকাছে আপনি এক সপ্তাহ পর আপনার হ্যাসবান্ড কে নিয়ে আসুন। আমি সব কাগজ রেডি করে রাখবো।
-ধন্যবাদ ম্যাম। আসি
-আসুন এক সপ্তাহ পর ম্যাম আপনার কাছে মিস তন্দ্রা আর উনার হ্যাসবান্ড এসেছেন।উনাদের কি ভেতরে পাঠিয়ে দেব?

-দিতে পারো।আর তুমি কি ডিভোর্সের কাগজগুলো রেডি করেছ তানহা?
-জ্বি ম্যাম সব রেডি।
-আচ্ছা উনাদের নিয়ে এসো।
-ম্যাম,উনাদের নিয়ে এসেছি।আসুন মিস্টার শুভ্র এন্ড মিস তন্দ্রা।
-শুভ্র! শুভ্র নামটা শুনেই মায়া হঠাৎ করেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।মায়া দেখলো সেই মানুষটাই, হ্যাঁ সেই মানুষটাই যে একসময় ওর জীবনের সবকিছু ছিলো।

শুভ্র তখন চোখের চশমা টা খুলে ওর চোখের কোণে লেগে থাকা পানি মুছতেছিলো।হঠাৎ করে কি যেন হলো শুভ্রর মায়াকে না দেখেই তন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে বলতে শুরু করলো প্লিজ তন্দ্রা আমাকে ছেড়ে যেওনা। যা বলবে তুমি তাই হবে,তুমি জব করবে, তোমার যা মন চায় তাই করবে কিন্তু প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেওনা। তুমি চলে গেলে আমি কিভাবে থাকবো বলে?প্লিজ যেওনা। তন্দ্রা এক ঝটকায় ওকে সরিয়ে দিয়ে বললো,জাহান্নামে যাও তুমি,আমার জীবনটা বরবাদ করে দিয়েছো তুমি বিয়ে করে।এবার আমার মুক্তি চাই,আমি শায়ান কে ভালোবাসি।এই যে কাগজে সাইন করে দিলাম।বলে সাইন করে একবারও শুভ্রর দিকে না তাকে হনহন করে চলে গেলো।

মায়া এতক্ষণে স্তম্ভিত হয়ে এসব দেখছিলো।তারপর নিজেকে যথাসম্ভব স্থির রেখে বললো। মিস্টার শুভ্র, আপনি এবার সাইন টা তাড়াতাড়ি করে দিন।আমার আরও ক্লায়েন্ট বাইরে অপেক্ষা করছে। শুভ্র কাঁদতে কাঁদতেই হঠাৎ চমকে উঠে ওর সেই প্লাস জিরো পয়েন্ট ফাইভ চশমাটা চোখে দিয়ে আস্তে করে মায়ার দিকে তাকালো। শুভ্র কিছু বলতে যাবে সেই মুহুর্তেই মায়া ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো ওর পারসোনাল এসিস্ট্যান্ট তানহার উদ্দেশ্যে, তানহা উনার সাইন নিয়ে নিও,আমার শরীর হঠাৎ খারাপ করেছে, আজ আর কারও সাথে কথা বলবো না। মায়ার পিছনে পিছনে শুভ্র ও বের হয়ে আসলো। মায়া গাড়ি না নিয়েই হাঁটতে শুরু করে দিলো,যেন এক অন্য জগতে আছে ও, যে জগতে আর কারোর স্থান নেই।

শুভ্র হাপাতে হাপাতে সামনে এসে দাঁড়ালো সেই তখনকার মতো যখন মায়া রাগ করে হনহন করে চলে যেতো।
মায়া শুভ্র কে থামিয়ে দিয়ে বললো,কিছু বলতে যেওনা।আমি আর কিছু শুনতে চাইনা।আমাকে যেতে দাও।
শুভ্র বললো, মায়া আমাকে ক্ষমা করে দিও।আর কিছু বলার মতো নেই। আমার শাস্তি আমি পেয়ে গেছি।
মায়া বললো,শুভ্র তোমাকেও আমি এভাবেই আটকাতে চেয়েছিলাম ঠিক এভাবেই যেভাবে তন্দ্রা কে আটকাতে চাইলে তুমি।ডিভোর্স পেপারে সাইন করার আগ মুহুর্তে এসে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম আমার পৃথিবী তুমি,তোমাকে ছাড়া আমি শুন্য,আমাকে শুন্য করে দিওনা প্লিজ।তুমি যা বলবে তাই হবে আমি পড়াশোনা ছেড়ে দেব।
তুমি সেদিন তন্দ্রার মতো ঠিক এভাবেই বলেছিলে, যে তুমি তন্দ্রাকে ভালোবাসো।ওই তোমার পৃথিবী।

শুভ্র আজ কি বুঝতে পেরেছো?নিজের পৃথিবী শুন্য হয়ে গেলে কেমন লাগে?আমি তোমাকে কখনো অভিশাপ দেইনি শুভ্র।সবসময় চেয়েছি তুমি অনেক ভালো থাকো।আমার মতো তোমার পৃথিবীও যেনো শুন্য না হয়ে যায় কিন্তু প্রকৃতি কিছু ভুলেনা শুভ্র।ঠিক সময়ে সুদেআসলে ফেরত দিয়ে যায়।প্রকৃতি এক জীবনের কৃতকর্মের ফল ঠিক ঠিক ফেরত দিয়ে দেয় সে ঋনী থাকতে পছন্দ করেনা কারোর কাছেই।পথ ছেড়ে দাও।এই পথ আগলাবার অধিকার তুমি নিজেই শেষ করেছো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত