সাপলুডু

সাপলুডু

ছোট বোনকে নিজের স্বামীর সাথে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে যে কোন নারী‌র‌ই মেজাজের পারদ তুঙ্গে উঠে যাবে এটাই স্বাভাবিক। জেসমিনের ও ঠিক তাই পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলন্ত আগুনে, হাঁড়ির ফুটন্ত পানির মতো রাগে টগবগ করছে। যেকোনো মুহূর্তেই উপচে পড়ে যাবে। ডিম লাইটের নীলচে আলোয় পারভিনের সাদা কোমর কেমন চোখ রাঙিয়ে চেয়ে আছে,যেন প্রতি মূহুর্তেই জেসমিনের দিকে বৃদ্ধাআঙ্গুলি উঁচিয়ে বলছে, “তুই হেরে গেলি আপা,তুই হেরে গেলি”

নিজের রাগটা প্রাণপণে সামলে বেডরুমের দরজা আস্তে করে লাগিয়ে আবার নিজের রুমে চলে এলো জেসমিন। নিজের মনকে যেন প্রতি নিঃশ্বাসে বুঝিয়ে চলেছে এই মাত্র যেটা দেখেছে সেটা মিথ্যা অথবা দুঃস্বপ্ন। এতো বড় সত্যটাকে এতো সহজেই পোষ মানিয়ে মিথ্যে বলে চালানো অসম্ভব।মনের উল্টো পিঠে যতোই ঘুরতে চেষ্টা চালাচ্ছে জেসমিন, ততো‌ই যেন অপ্রিয় দৃশ্যগুলোর পুনঃমিলন ঘটছে।চোখ‌ও তার মিথ্যে সায় দিচ্ছে না। জেসমিন দেয়ালের সাথে পিঠ এলিয়ে মেঝেতে বসে আছে, চোখের অজান্তেই শিশির বিন্দু জমেছে কোন জুড়ে, শাড়ির আঁচল তুলে মুছতে যাবে ওমনি পেটের ভেতরে থাকা অস্তিত্ব তাকে জানান দিল ওই অপ্রিয় ঘটনার সেও একজন সাক্ষী। পেটের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে আলতো ভাবে হাত রাখল।ছোট ছোট পদাঘাত অনুভব করছে।আজ‌ই প্রথম অনুভব করল। নিমিষেই চোখ বেয়ে নামা স্রোত ওষ্ঠে স্পর্শ করে নিয়েছে।

বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির ফোঁটা আঁকড়ে ধরে আছে জানলার কাঁচ। বৃষ্টি ঝড়ে গেছে অনেক আগেই এখন আকাশ অনেকটা পরিচ্ছন্ন। দুচারটে ক্ষুদ্র তারার দেখা মিলে।খানিক বাদে বাদেই দমকা হাওয়া পর্দা নাড়িয়ে যাচ্ছে। হাওয়ার দাপটে পর্দাটা বারবার হুমড়ি খেয়ে জেসমিনের মুখের উপর পরছে কিন্তু সেদিকে কোন খেয়াল নেই।বিস্বাদের মুখমন্ডলে একরাশ বিরক্তি,ঘৃণা,রাগ উপচে উঠেছে।আর হঠাৎই ড্রয়িংরুমের ওয়াল ক্লোকটা গলা ছাড়লো, ডং,ডং।রাত দুটো।আবছায়াতেই জেসমিন রুম্মানকে দেখতে পেল। শব্দহীন ছোটো ছোটো কদমে সাবধানে এগিয়ে আসছে, সঙ্গে সঙ্গে জেসমিন বাল্ব জ্বলে দিলো। অনাকাঙ্ক্ষিত আলোতে রুম্মান ঝলসে যাবার উপক্রম। জেসমিনের রক্তরাঙ্গা চোখে চোখ পড়তেই শিশিরের উঠে,

-একি জেসমিন, তুমি জেগে আছো? তেতো হয়ে থাকা গলায় কেমন শান্ত স্বরে জেসমিন বলল,
-কোথায় গিয়েছিলে?
-কোথায় আবার ওয়াশ রুমে। তুমি শুয়ে পড়। আমি বাল্ব বন্ধ করে দিচ্ছি।

কথা বলার কোন সুযোগ না দিয়েই চালিয়ে গেল নষ্ট মুখের মিষ্টি কথার ফুলঝুরি। “ আহ্ জেসমিন তোমাকে না কতবার বলেছি,রাত জাগবে না।এই সময় তোমার ফুল রেস্ট দরকার।আসলে তোমাকে নিয়ে আমি আর পারলাম না।দিনদিনই কেমন অমনোযোগী হয়ে যাচ্ছ তুমি।”

কথাগুলো যেন আগ্নেয়গিরি জ্বালামুখ হতে গড়িয়ে পড়া লাভার মতো জেসমিনের সমস্ত শরীর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে কয়লা করে দিচ্ছে।একটা মানুষ দিনের পর দিন এভাবে নিজেকে সৎ বানাতে ব্যস্ত নানান কথাবার্তায় মিথ্যে ভালোবাসায়। সত্যি এতদিন অব্দি একবার জন্যে ও সন্দেহ হয়নি জেসমিনের। হয়তো সে বোকা বলে নয়তো ওই বিশ্বাসঘাতক মানুষটি বুদ্ধিতে খুবই ধূর্ত। জেসমিন সেখানেই পাথুরে মূর্তিতে রুপান্তরিত হয়েছে। রুম্মান এগিয়ে গিয়ে জেসমিনের দু কাঁধের উপর তার দুহাত রাখল।এরপর জেসমিনের চোখের দিকে চেয়ে বললো,

-তোমার শরীর খারাপ লাগছে? আর হঠাৎই জেসমিন মুখ সামলাতে না পেরে বিস্ফোরিত কন্ঠে জানতে চাইলে,

– আমাকে এভাবে ঠকালে কেন? হঠাৎই রুম্মানের মুখে বিষন্নতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চোখ দুটোতে অপরাধের দায় সামলানো সহজ কাজ নয় তবুও চেষ্টা চালিয়ে গেল,

-কি বলছো জেসমিন?আমি তোমাকে ঠেকাতে যাব কেন? জেসমিন রুম্মানের হাতটা আলতো করে ধরে তার তলপেটের উপর বসিয়ে বললো,

-তুমি আমাকে ঠকিয়েছো কি না বল? আমার চোখ তো আর মিথ্যা দেখেনি। রুম্মানান হাত নামিয়ে নিলো।ধরা পড়ে গেছে জেসমিনের কাছে।যে সন্তান এখনো ভূমিষ্ঠ হতে পারেনি তাকে ছুঁয়ে মিথ্যা বলার সাহস তার নেই। রুম্মান মুখ লুকাতে নিচে নামিয়ে নিলো। জেসমিনের চোখ আর কোন বাঁধা মানেনি। উচ্চ স্বরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে,

-কি? পারলে না তো? জানতাম তুমি পারবেনা।কেন তুমি আমার সাথে এমন করলে? আমার ছোট বোনটার জীবন তুমি নষ্ট করে দিচ্ছো। কেন রুম্মান? কেন?

অন্ধকারে মধ্যে পারভিন দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছে।মন চাইছে দৌড়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে আপার দু’পা জড়িয়ে বলতে,“আমাকে মাফ করে’দে আপা, আমি রুম্মানকে খুব ভালোবাসে ফেলেছি।তুই আমাকে ক্ষমা করে দে।তুই চাইলে আমি আর কখনও তোদের বাড়িতে আসব না তবুও তুই রুম্মান কে কিছু বলিস না ”

এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতেই রুম্মানের উচ্চ স্বরের আওয়াজে পারভিনের ভাবনায় ছেদ পড়ল। রুম্মান কর্কশ কন্ঠে বলছে, “ আরে আমি কি ঠেকিয়েছি ঠকিয়েছে তো তোমার বাপ। সুন্দরী ছোট মেয়ে পারভিন কে দেখিয়ে বিয়ের দিন তুলে দিয়েছে ডিস্টার্বিং, বোরিং সেকেলের তোমাকে।যে তিলে তিলে আমার স্বপ্ন গুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিয়েছে। বিয়ের দিন নেহাত আমার মায়ের সন্মান রক্ষায় কিচ্ছুটি বলিনি নয়তো আজীবন তোমাকে আইবুড়ো হয়ে কাটাতে হতো।কে নেবে এই কুৎসিত চেহারার তোমাকে।বিয়ের দিন‌ই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম,আমার সাথে করা অন্যায়ের বদলা আমি নেব‌ই। এবং আমি ঠিক তাই করলাম, তোমার বোনকে আমি আমার ভালোবাসার জালে জড়িয়ে নিলাম।আর ওর সরলতার সুযোগ নিয়ে তোমার ও তোমার বাবার বিশ্বাসের খুলিতে গুলি ঠুকে দিয়েছি। আই এম সাকসেস।”

পারভিন কোনভাবেই নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। তারমানে এতো দিন রুম্মান তার সাথে যা যা করেছে সবটা বদলা নেয়ার জন্যই, এখানে কোন ভালোবাসা ছিল না।তাকেও ঠকিয়েছে।এটা কিছুতেই হতে পারে না। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে অন্ধকারের মধ্যেই হেঁটে হেঁটে রুমে চলে গেল।একবুক কষ্ট নিয়ে টেবিলের চেয়ারটা টেনে বসল। ল্যাম্পশেডে আলো জ্বেলে একটা খাতা ও কলম নিয়ে লিখতে শুরু করলো।কাঁপা কাঁপা হাতে অক্ষর গুলো
যেন চেয়ে আছে পলকহীন চোখে। ফোঁটায় ফোঁটায় চোখের জল পড়ছে সেই সাদা কাগজের উপর।

যৌবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের কাছে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল সেটা নির্ণয় করার সুযোগ থাকেনা। ঠিক তেমনি আমিও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারিনি,তোর স্বামির মিথ্যে প্ররোচনায় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। এখন যে কথা গুলো বলতে যাচ্ছি হতে পারে এটাই আমার জীবনের শেষ কথা।তাই আমার মনে হয়েছে এই কথা গুলো তোকে বলা দরকার।

যেদিন প্রথম আমি রুম্মানের উপর দূর্বল হয়ে পড়ি সেদিন ছিল এমনি বৃষ্টি ভেজা দিন। হ্যাঁ তোকে দেখতে এসেছিল ওরা। তখন পর্যন্ত জানতাম না তোর জন্য এমন একজন সুপুরুষ আসবে। কিন্তু আম্মা তোর বদলে আমাকে সাজিয়ে দিলেন। মনের কোণে জেঁকে বসেছিল বিয়ের মালাটা বুঝি আমার গলায় ঝুলবে। অজান্তেই রুম্মান কে ভালোবাসে ফেলি। আমাকে দেখে তাদের পছন্দ হয়েছে জানান, এই কথা শুনে চোখের কোনে জল চলে এসেছিল।

আমি বারবার ঘোমটার আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে রুম্মানের মুখটা দেখেছি। নিষ্পাপ মুখখানিতে উজ্জ্বলতা দেখেছিলাম সেদিন। কিন্তু আমি কখনো ভাবিনি এই মানুষটা আসলে মানুষ নয় একজন বিশ্বাস ঘাতক দানব।
এরপর তারা চলে গেলেন। সর্বক্ষণ শুধু মনের মাঝে শুধুই একটি মুখের চিত্র অংকন করে গেছি শতবার। আর ভাবতে লাগলাম পাড়ার সেইসব মহিলাদের মুখের কি হাল হবে যারা দিনরাত আমাদের দুই বোনের চিন্তায় বিভোর ছিল,

–সোলেমান বেপারীর মাইয়া দুইটার কোন গতিই হ‌ইল না।বড় মাইয়াডা তো পাইকা গেছেই এহন আবার ছোটডারেও কিন্তু হঠাৎই আমি থমকে দাঁড়ালাম বড় ভাবীর কথা শুনে,

–কি পারভিন তুমি এতো লাফাইতাছো কেন? তোমার লাফ দেইখা তো মনে হয় বিয়া জেসমিনের না তোমার।
আমি তাজ্জব বনে গেলাম।এ আবার কেমন কথা? কৌতূহল দমিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করি?
–কি কন ভাবী?কিছুই তো বুতাছি না।

এরপর ভাবীর পিশাচি হাসিও কথার যাতাকলে নিষ্পেষিত হয়েগেল আমার সমস্ত সত্তা। কিন্তু এতো দিনে বিয়ে নামক যে বীজ হৃদয়ে রোপণ করেছিলাম সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে দিব্বি বড় হয়ে গেছে। চাইলেই তা বিনষ্ট করতে পারিনা।

একবার ভাবলাম এই সমস্ত ঘটনাবলি রুম্মান ও তার পরিবারের সবাইকে বলে দেব। এরপর আমি আর রুম্মান পালিয়ে যাব দূর, বহুদূর। কিন্তু সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে ছিন্ন হতে পারিনি। একদিকে নিজের পরিবার আর অন্যদিকে..!জানিস আপা তোর বিয়ের দিন রাতে দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। শুধু ভেবে ছিলাম কার স্থানে কে দখলদারি চালায়।এভাবে দিন কাটে যাচ্ছিল, মন থেকে যতটা সম্ভব মুছে ফেলেছিলাম রুম্মান নামক মরীচিকা কে।

কিন্তু যখন‌ই ওরা বুঝতে পারল বিয়ের আগে যাকে দেখে গিয়েছিল সে তুই না আমি, তখনই বুঝে গেছিলাম আমাদের পরিবারের জন্য কিছু একটা ধামাকা অপেক্ষা করছে।তুই যখন রুম্মানের সাথে রাগ করে আমাদের বাড়িতে চলে আসতি, মনের মাঝে কেন জানি কিঞ্চিৎ সুখের অনুভুতি হতো, এটাকেই বুঝি হিংসা বলে।তখন থেকেই মনের মাঝে জমে থাকা ভালোবাসার ধুতুরা ফুলটা বিষ হতে থাকে। আমার সাথে রুম্মানের যোগাযোগ টা আবার শুরু হয়।মা খানিকটা আঁচ করতে পেরেছিলেন কিন্তু তলায় পৌঁছাতে পারেনি,তবে আমাকে অনেক শাসিয়েছেন।

কিন্তু তোকে কখনো বলেনি কারণ তুই কষ্ট পাবি। এরপর মা তোকে যে বুদ্ধিটা দিলেন সেটাই আমার আর রুম্মানের মাঝে কাল হয়ে দাঁড়ায়, তোকে বাচ্চা নিতে বল্লেন।তুই ঠিক তাই করলি।আর রুম্মান ও তোর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। আবার আমাদের সম্পর্কের মাঝে ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। এরপর তুই যখন অসুস্থ তখন মা আমাকে তোর দেখাশোনার জন্য তোদের বাড়িতে পাঠায়। এখন আর আমাদের মাঝে কোন বাধাই র‌ইলো না।তবে রুম্মান কে বাহবা দিতেই হয় লোকটা বড় একজন অভিনেতা।তোকে ম্যানেজ করে আমার সাথে সম্পর্ক বল আর অবৈধ সম্পর্ক বল করাটা খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল।আজ সত্যি আমি ফেসে গেছি। রুম্মান আমার সাথেও অভিনয় করেছে। আমিও কিচ্ছুটি বুঝিনি। আমার দেহটা নিয়ে শুধু খেলাই করেছে একটুও ভালোবাসেনি।সবটাই বদলা নেয়ার জন্য।আমাকে মাফ করে দিস আপা।আই এম সরি।

-পারভিন

দেয়াল ঘড়িটার শব্দে ঘুম ভাঙল জেসমিনের।ভোর সাতটা। জেসমিন মাঝেতে দেয়ালের সাথেই ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।চোখ মেলে রুম্মন কে বিছানায় দেখেনি।আজ পর্যন্ত যতবারই তার সাথে ঝগড়া হয়েছে কখনো সকালে রুম্মানকে ঘরে দেখেনি জেসমিন।তার মায়ের রুমে গিয়ে থাকে।

জেসমিন দ্রুত পায়ে হেঁটে পারভিনের রুমের দিকে ছুটলো। না এভাবে চলতে থাকলে এর ভবিষ্যৎ অন্ধকার।আজ‌ই পারভিন কে এই বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দেবে। এরপর এই ঘটনা লোক জানাজানি হলে সারাজীবনের জন্য মাথাকাটা যাবে জেসমিনের বাবা মায়ের। পারভিনের দরজায় পৌঁছে ধাক্কা দিল। কিন্তু দরজা বন্ধ। দুচারটে দরজায় চাপড় মাতেই পায়ের তলায় তরল কিছু অনুভব করতে পেল। সন্দেহ এড়াতে ভালোভাবে লক্ষ্য করতেই শিউরে ওঠে জেসমিন।একি এতো রক্ত। দরজার নিচ থেকে গড়িয়ে এসেছে। উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো জেসমিন। আতঙ্কের হুল ক্রমাগত ফুটিয়ে যাচ্ছে জেসমিনের সমস্ত শরীর জুড়ে।হাত-পা অসার হয়ে প্রভাব ফেলছে শ্বাস প্রশ্বাসের গতির উপর। জমাট বাঁধা রক্ত পায়ের নিচে চটচটে হয়ে আছে। জেসমিন কাঁপা কাঁপা হাতে দরজা ধাক্কাতে শুধু করে, বারংবার চেষ্টা ও ব্যর্থ হয়ে শেষ বারের মত জোরে একটা ধাক্কা দিতেই হঠাৎ ভেতর থেকে লক খুলে গেল।দ্রুততার সাথে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে যাবে অমনি রুম্মান কে দেখতে পেল।

মুহূর্তেই ভুলে গেল সব। বুকের ভেতর জমে থাকা গতরাতে সেই নিকৃষ্টতম স্মৃতিটা মাথা উঁচিয়ে উঁকি দিয়ে উঠলো। রুম্মান আবার পারভিনের রুমের এসেছে‌। এতো করে বোঝালাম তার পরেও। ঘৃণায় গলাটা ভাড়ি হয়ে আসছে জেসমিনের। ছিঃ ছিঃ।

রুম্মান চেয়ারে বসে টেবিলের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু পারভিন কোথায়? টেবিলের উপর একটা সাদা কাগজ দেখতে পেল জেসমিন, কাগজটা দেখতে সামনে এগুতেই পা’টা কিসে যেন আটকে গেল।টাল সামলে নিচে তাকাতেই দেখল, ল্যাম্পশেড টা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ল্যাম্পশেডের কাঁচের ছাউনীটা ভেঙে গুঁড়িয়ে চারদিকের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। সাবধানে পা ফেলে সামনে গেল ভালো ভালোভাবে দেখার জন্য

কাছে গিয়ে দেখতেই শিউরে উঠে।একি! ল্যাম্পশেডটা রক্তে মাখামাখি অবস্থায় পড়ে আছে।আর তখনই দরজার ওপাশের রক্তের কথা মনে পড়ে গেল। চমকে গিয়ে রুম্মানের কাছে এগিয়ে এসে দেখে রুম্মানের মাথা থেকেই ওই রক্তের উৎপত্তি। কৌতূহলের চোখ যেন বিস্ময় চিকচিক করছে।কি হয়েছে রুম্মানের?

মাথার পেছনের দিকটায় রক্তে একদম চটচটে হয়ে আছে,আর সেখান থেকেই টেবিলের পায়া বেয়ে নেমে গেছে রক্তের স্রোত দরজার ওপাশ পর্যন্ত। জেসমিন কিছু না বুঝতে পেরে চিৎকারের সাথে দৌড়ে গিয়ে রুম্মান কে জড়িয়ে ধরতে চাইল, কিন্তু রুম্মান কে ছুঁতেই চেয়ার থেকে নিথর দেডহটা ফসকে মেঝেতে পড়ে যায়।

নিজেকে কোনমতে সামলে নিয়ে রুম্মানের মাথাটা নিজের কোলে তুলে বলতে লাগলো, “রুম্মান,রুম্মান কি হয়েছে তোমার?কথা বলো” কিন্তু নিশ্চুপ রুম্মান কোন সারাই দেয়নি। রুম্মানের সমস্ত শরীর বরফ গলা জলের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। নিস্তেজ হয়ে থাকা শরীরটাকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে জেসমিন কথা বলার চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু তাতে কোন ফল পাওয়া গেল না।

জেসমিনের মুখ দিয়ে আর কোন কথা বেরুচ্ছে না।শুধু অবাক দৃষ্টিতে বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে কি হচ্ছে এসব।আর পারভিন কোথায়? কোথা থেকে যেন ছোটো ছোটো নিঃশ্বাসে সাথে কান্না মেশানো শব্দ ভেসে আসছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। কান্নাটা খুব কানে বাঁধছে। জেসমিন এদিক ওদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল।মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। কান্নার শব্দটা যেন বেড়েই চলেছে।

কোল থেকে রুম্মানের মাথাটা খুব সাবধানে নিচে নামিয়ে,কান্নার শব্দটা অনুসরণ করে ঘরের দক্ষিণ দিকটাতে এগুতে লাগলো। সামনেই একটা বড় আলমারি।এখান থেকেই শব্দটা এসেছে। জেসমিন তার বোনের নাম নাম ধরে ডাকতে ডাকতে এগিয়ে গেল সেদিকে। ভয়ে ভয়ে আলমারির দরজাটায় হাত রাখল। বুকের ভেতর ভয়টা জেঁকে বসেছে। আলমারির দরজাটা খুলতেই পারভিন একটা চিৎকার দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো।পারভিনের সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গেছে। থরথরিয়ে কাঁপছে। খুব শক্ত করে তাকে জড়িয়ে আছে। জেসমিন নিজেকে কোনমতে ছাড়িয়ে, পারভিন কে টেনে তুলে জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছে তোর?আর রুম্মানের এই অবস্থা কি করে হলো?”

পারভিনের মুখে কোন কথা নেই। এখনো কাঁপছে। পারভিন তাকে বারবার জিজ্ঞেস করলেও কোন উত্তর পেল না। এরপর জেসমিন, পারভিন কে টেনে রুম্মানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। রুম্মান কে দেখেই পারভিন চেঁচিয়ে উঠলো। জেসমিন পারভিনের মুখটা চেপে ধরে বলল।চুপ! চুপ। পাশের ঘরেই ওর মা আছে এখন‌ই যে কোন মুহুর্তেই চলে আসতে পারে। এবার বল “তুই ওকে মারলি কিভাবে?” পারভিন কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “মরে গেছে?” “হুঁ,মাথার পেছনটায় আঘাত পেয়েছে ভিশন।প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে।আর বেঁচে নেই।”

পারভিন আবার হুহু করে কেঁদে উঠলো।এই দৃশ্যটা যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেনা সে। কিন্তু আরেকটা বিষয় দেখে পারভিন সত্যি অবাক হয়ে গেল।জেসমিন কিভাবে এতো সহজে এই বিষয়টা নিচ্ছে।ওর স্বামী যে কিনা নিষ্প্রাণ দেহ মেঝেতে পড়ে আছে আর জেসমিন সেটা এড়িয়ে উল্টো ধামা চাপা দেয়ার জন্য, পারভিনের মুখ চেপে ধরে বলছে পাশের রুমে রুম্মানের মা আছে। জেসমিনের চোখে কেমন একটা উচ্ছাস লক্ষ্য করল পারভিন। জেসমিন এগিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে দরজাটা লক করে দিল।তার কপাল জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম শাড়ির আঁচল তুলে সেই ঘাম মুছে নিল। এরপর আবার পারভিনের কাছে সেই একই প্রশ্ন ছুড়ল,

–কিভাবে মারলি রুম্মান কে? এরপর পারভিন চোখ বুজে নিজেকে কোনমতে শান্ত করে বলতে শুরু করল,

“দেখ আপা আমি রুম্মান কে মারতে চাইনি। এটা একটা দুর্ঘটনা। গতকাল তোদের ঝগড়াটা আমি শুনে নিয়েছিলাম। নিজের অপরাধের পরিমাণটা উপলব্ধি করি, রুম্মানের ভালবাসার অভিনয় আমার কাছে জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে গিয়েছিল।ও শুধু আমাকে প্রতিশোধের জন্য ব্যবহার করেছে। এসব শুনে আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না ছুটে চলে এলাম। এরপর ডিসিশন নিলাম আমি সুইসাইড করব।” পারভিন টেবিলের উপরে রাখা কাগজটা একটানে তুলে জেসমিনের হাতে তুলে দেয়। এরপর পারভিন হাত উঁচু করে সিলিংয়ের ফ্যানটার সাথে ঝুলতে থাকা ওরনাটা দেখাল, বললো,

–আমি পারিনি আপা। মৃত্যু যে কতটা ভয়াবহ তা আঁচ করতে পেরে ছিলাম।গলায় হাজার বার ওরনাটা পরিয়েছি কিন্তু সাহস হয়নি।যে মা আমাকে দশমাস দশদিন গর্ভে ধারণ করে জন্ম দিয়েছিলেন তার মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।বাবার কথা মনে পড়ছিল।আর যে মানুষটা ছোট থেকে অবহেলা বড় হয়েছিল তার কথাটাও মনে হচ্ছিল।যাকে আমি সেই ছোট্ট থেকে জ্বালিয়ে এসেছি আর এখন তার খেয়ে তাকেই ছোবল মেরেছিলাম এই তোর ছবিই বারবার আমার মনটাকে নাড়িয়ে তুলেছিল। আর হঠাৎই দরজায় টোকার আওয়াজ আসে। ভাবলাম তুই এসেছিস। শেষবারের মতো তোর মুখটা দেখতে মনে হলো। মৃত্যুর আগে তোর কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতাম। আমি নিচে নেমে এলাম। কিন্তু দরজা খুলতেই দেখি ওই পশুটা আবার এসেছে।আমার সমস্ত শরীর জ্বলে যাচ্ছিল ওর মুখটা দেখে।যে মানুষটাকে আমি এতো ভালোবেসেছিলাম সে শুধু আমাকে ব্যবহার করেছে। আমি তিক্ত ভাষায় জানতে চাইলাম,

–কি চাই এখানে?
–কি চাই মানে? তোমাকে দেখতে এসেছি।

এরপর‌ই সে এই কাগজটা দেখতে পেল।এটা দেখে এমন ভাবে হাসছিল যেটা দেখে আমার মাথায় আগুন ধরে যায়। তারপরেও আমি নিজেকে সামলে বললাম,এখান থেকে চেলে যান। প্রতি উত্তরে বললো,

— এসেছি যখন, তখন কিছু না নিয়েই কি যাব?

এই বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে। তখন রুম্মানের স্পর্শ আমার সমস্ত শরীরে কাঁটার মতো বিঁধছিল।এর আগেও কতবার ওর হাত আমাকে স্পর্শ করেছে কিন্তু এমন নোংরা অনুভূতি কখনো হয়নি।তাই আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। কিন্তু রুম্মানের সাথে আমি কোন মতেই পেরে উঠছিলাম না‌। এরপর নিজেকে বাঁচাতে টেবিলের উপরে থাকা ল্যাম্পশেডটা হাতে তুলে সোজা রুম্মানের মাথায় বসিয়ে দিলাম। আপা আমি ইচ্ছে করে এটা করিনি। আমাকে বিশ্বাস কর‌। এরপর রুম্মানের মাথা থেকে রক্ত ঝরতে শুরু হয় তার সাথে মরন ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো।আমি ভয় পেয়ে ওই আলমারিতে লুকিয়ে পড়ি।আমি কখনোই ভাবিনি রুম্মান মরে যাবে। এই বলেই পারভিন আবার উচ্চ স্বরে কেঁদে ওঠে। জেসমিনের চোখের কোনে জল কিন্তু ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি।

“ড্রাইভার গাড়ি বের করো, এক্ষুনি!”
“ম্যাডাম এতো রাতে? স্যার জানতে পারলে আস্ত রাখবে না।”
“আমি বলছি গাড়ি বের করতে তার মানে তুমি গাড়ি বের করবে।”
“কিন্তু ম্যাডাম,এতো রাতে কোথায় যাবেন?তা ছাড়া আপনি তো অসুস্থ!”
“আবার প্রশ্ন করছো?আমাকে তুমি শেখাবে সুস্থ অসুস্থের পার্থক্য?”

জেসমিনের রক্তরাঙ্গা মুখ দেখে রাগের উত্তাপ আঁচ করতে পারল ড্রাইভার রমেশ।নিরবে ভীতু মুখখানা নামিয়ে নিয়েছে সেই কখন। এরপর গাড়ির উদ্দেশ্যে দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ।

এই ড্রাইভারদের হলো আরেক জ্বালা! মনিবের যখন যা ইচ্ছা তখন সেই হুকুম তামিল করতে হবে আর তা না হলে দুর্ব্যবহার শুরু।এমনটা হবে না টাকার কেনা গোলাম যে। নিজেদের কোন স্বাধীনতা নেই। মাত্র বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল।আর অমনি কিছুক্ষণ আগেই রমেশ বাড়ির দেয়াল ঘড়ির আওয়াজ শুনেছে।একটানা বারোটা ঘন্টা বাজিয়েছে। অথচ ম্যাডামের কাছে রাত বারোটা কোন প্রভাবই ফেলছে না। যেখানে ম্যাডাম শারীরিক ভাবে অসুস্থ।স্যার যদি কোন ভাবে জানতে পারে।

জেসমিন কে এমন ভাবে কথা বলতে কখনও দেখেনি রমেশ।আজ হঠাৎ আবার কি হলো? বাড়ির একমাত্র এই মানুষটি‌ই সবচেয়ে সহজ সরল আর নিশ্চুপ ছিল, কখনো মুখ খুলতে দেখেনি। সাহেবের অমানবিক নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করে গিয়েছে প্রতিনিয়ত।বাগানে থেকে ওপরে দোতলার কান্নার আওয়াজ শুনতে শুনতে পুরোনো হয়ে গেছে।নিচ থেকে দোতলার কাঁচের জানালার অবয়বে স্পষ্ট দেখা না গেলেও শারীরিক নির্যাতনের পরিমাণ বোঝা যায় তার সাথে ওই করুন স্বরের চিৎকার নিত্যদিনের ঘটনা। নিচে দাঁড়িয়ে আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলনা রামেশের।

কিন্তু আজকের এমন হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ খুঁজতে চায়‌ও না রমেশ।আজ তাকে ম্যাডাম যেভাবে কথাগুলো শুনিয়েছেন, এমন তাচ্ছিল্যের স্বরে এবাড়ির কেউ কখনো বলেছে কি না সেটার‌ই প্রশ্নবোধক চিহ্ন মনের মাঝে এঁটে চলেছে সর্বক্ষণ।চাবি নিয়ে গাড়ি বের করতে চলে গেল রমেশ। টার্নিং পয়েন্ট “আপা কাজটা খুব শক্ত।বিষয়টা মনকে এখনো পর্যন্ত বোঝাতে পারছিনা।আমরা পারবো তো?” “ দেখ পারভিন এই মুহূর্তে এসে এসব কথা বলিস না। নিচে ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে এসেছি। তাছাড়া লাশ পচতে শুরু করেছে। কতক্ষণ পারফিউম দিয়ে লুকিয়ে রাখবি?”

–কিন্তু আপা।
–আর কোন কিন্তু নয়।যা বস্তার মুখটা বেঁধে ফেল। শুধু শুধু সময় নষ্ট করে নিজের বিপদ বাড়িয়ে কি লাভ?
–তুই বেঁধে ফেল আমার প্রচন্ড ভয় লাগছে।
–আমার শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো না।এই মুহূর্তে আমি কিছুই করতে পারব না।
–কিছুই করতে পারবি না মানে?তুই যাবি না।
–এই মূহুর্তে আমার যাওয়া সম্ভব হবে না। দেখছিস না,কখন কি হয়ে যায়।
–আপা,আমি পারবো তো?
–মেরে ছিলি কেমনে?তখন তো কাউরে ডাকোস নাই।
–তুই তো জানোসই ইচ্ছে করে,,

পারভিনের কথা শেষ হ‌ওয়ার আগেই তাকে থামিয়ে দেয় জেসমিন। ধাক্কা দিয়ে পাঠিয়ে দেয় একটু সামনেই রাখা একটা চটের বস্তার কাছে। এরপর পারভিন নাকের উপর ওরনা চেপে খুব দ্রুত দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে বস্তার মুখটা। ইতিমধ্যে নিচ থেকে কয়েকবার গাড়ির হর্ণের শব্দ এসেছে। জেসমিন বললো,

–ড্রাইভারকে একটু উপরে ডাক দে।বস্তাটা নামিয়ে গাড়িতে নিয়ে রাখুক। পারভিন দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে গলা ছাড়লো, “এই যে ভাই, একটু এদিকে আসেন তো” কি যেন বিড়বিড় করতে করতে রমেশ উপরে উঠে এলো। জেসমিন ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বলল,

–বস্তাটা নিয়ে গাড়িতে রাখো।
–ম্যাডাম এই বস্তায় কি আছে?
–প্রশ্ন করতে বারণ করেছিলাম।

রমেশ অপরাধ স্বীকার করে বস্তাটা কাঁধে তুলে নিতে চেষ্টা করল, কিন্তু গন্ধটা তার নাক জ্বালিয়ে দিয়ে পেটে পৌঁছে যাচ্ছে, আবার একটা প্রশ্ন উঁকি দিয়ে উঠলো,এতো দুর্গন্ধ কেন? কিন্তু ম্যাডামের তিক্ত কথার ভয়ে চেপে গেল। পেছনে পেছনে পারভিন ও জেসমিন।নিচে নামার সময় একবার জেসমিনের শ্বাশুড়ির রুমটা উঁকি দিয়ে দেখে নিল।না কড়া ডোজের ঔষধ। ঘুম এতো সহজে ভাঙ্গা সম্ভব নয়।

“আমি ড্রাইভারকে সব বলে দিচ্ছি,তুই গাড়িতে গিয়ে বস।আর সাবধান, কাজটা যেন ভালোয় ভালোয় শেষ করে আসতে পারিস।” “আপা আমার প্রচন্ড ভয় করছে। আমি পারবো তো?” “পারতে তো তোকে হবেই। ভরসা রাখ।যা গাড়িতে গিয়ে বোস।” পারভিন গাড়িতে গিয়ে বসলো। এতো বড় একটা কাজ একা একা বড্ড ভয় করছে তার। গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল, জেসমিন ও ড্রাইভার কথা বলছে। পারভিন নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে না শেষ পর্যন্ত রুম্মান কে খুন করে ফেলা। বিশ্বাসের অযোগ্য। এখন আবার খুনের চিহ্ন লোপাটের ব্যবস্থা করছে। আইনের জাল থেকে নিজেকে বাঁচাতে যতটা সম্ভব আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে দুইবোন।

কিন্তু পারভিনের এটা মাথায় আসছেনা স্বামীর মৃত্যুতে কোন নারীর ভেতরে কি শোকের ছায়া পড়ে না।যেখানে রুম্মানের জন্য তার নিজেরই খুব খারাপ লাগছে।এই বলে নিজের মনকে সায় দিল যে জেসমিন বড়ো শক্ত মনের মানুষ। গাড়ি ছাড়তেই জেসমিন হাত উঁচু করে পারভিনকে বিদায় জানালো। বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বললো,
“সাবধানে,বেস্ট অফ লাক” মনের ভেতর থেকে একটি পাথর নিঃসন্দেহে নেমে গেল। আবার ঠোঁটের কোণে সেই অদৃশ্য হাসিটা যেন ভুলিয়ে দিল সব কিছু। এতক্ষণে নিজেকে খুব হালকা হালকা মনে হচ্ছে এতোটাই হালকা লাগছে যেন হাওয়ায় ভেসে উঠেছে।

হঠাৎই তলপেটের ডান দিকটাতে একটা চিকন ব্যথার অনুভূতি।ব্যথাটা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। খুব দ্রুত উপরে উঠতে লাগল জেসমিন। সমস্ত শরীর যেন মুচড়ে যাচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে মনে হলো তার তলপেটের নিচে কে যেন হাজারো ছুরির আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করছে। পা দিয়ে কদম ফেলবার একটুও জোর নেই। কোনমতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে শ্বাশুড়ির রুমে ঢুকে তাকে ডাকতে লাগল জেসমিন।

গাড়ির ভেতরটা কেমন গন্ধে ছেয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতেই কষ্ট হচ্ছে। পারভিনের ইতিমধ্যে দুবার বমি হয়েছে। ড্রাইভার ও গাড়ি থামিয়ে কিছুক্ষণ পর পর বাইরে গিয়ে ওয়াক্ ওয়াক্ করছে‌। দুজনেরই মুখ জুড়ে বিরক্তির ছাপ। দুর্গন্ধ এড়াতে জানালার কাঁচ খুলে দিল রমেশ। পারভিন খোলা জানালা দিয়ে রাতের পৃথিবীটাকে দেখছে।সমস্থ ল্যাম্পপোস্ট গুলো দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ হয়ে। আশেপাশের নির্জন জায়গায় জুড়ে শুধু শুনশান নীরবতা। মুহূর্তেই সব ভুলে গিয়ে, চোখ দুটো নিশ্চুপ হয়ে গেল জানলা ফাঁক থেকে আসা ফুরফুরে বাতাসে। দুজন নার্স দ্রুত ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে বেড টাকে।বেডের উপর জেসমিন হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে চিৎকার দিচ্ছে অনবরত। চিৎকারের শব্দ মধ্যরাতের হসপিটালটাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিল।বেডের পেছন পেছন টলতে টলতে এগিয়ে আসছিলেন জেসমিনের শ্বাশুড়ির। এরপর তিনি ইমারজেন্সি রুমের সামনে এসে দাড়িয়ে পড়লেন, জেসমিন কে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।

ড্রাইভার গাড়িটা ব্রেক কষে থামালেন পুলিশ স্টেশনের সামনে।গাড়ি থামায় পারভিনের ঘুমের চোখ খুললো। তাকিয়েই চমকে উঠে, লোহার হ্যান্ডকাফ দুটো তার চোখের সামনে ঝুলন্ত অবস্থায়। কিছু বুঝতে না পেরে ড্রাইভারের দিকে তাকালে ড্রাইভার মুচকি হেসে বলল, “অপরাধী কখনো সম্পর্কে বোন হয় না। তোমার বোন আমাকে এখানেই নিয়ে আসতে বলেছিলেন সাথে ডকুমেন্ট তো আছেই।” পারভিনের চোখ নিমিষেই লাল হয়ে ওঠে।ভাবছে “আমি আরো একবার ঠকে গেলাম।”

কাঙ্ক্ষিত কান্নার শব্দ শোনার অপেক্ষাই করছিল মূর্ছারত জেসমিন।কি পেয়েছে এই জীবনে। না পেয়েছে স্বামীর সুখ,না পেয়েছে পরিবারের সুখ। নির্মম নির্যাতন প্রতিনিয়ত সহ্য করে গেছে। ভালোবাসা নামক অদৃশ্য বিষয়টির জন্য মরিয়া হয়ে ছুটেছে দিনরাত স্বামীর পেছনে কিন্তু ফল স্বরূপ বোনকে দিতে হয়েছে স্বামীর ভাগ। আর সেইদিন‌ই প্রতিজ্ঞা করেছিল জেসমিন, স্বামী আর বোনকে কোনভাবেই শান্তিতে থাকতে দেবে না।তার বুকে যতটা তাপ অনুভূতি হয়েছে সে তা কড়ায়গণ্ডায় বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু মাঝখান থেকে রুম্মান‌ই মরে গেল পারভিনের হাতে। এবার পারভিনের চালটাও চেলে দিয়েছে জেসমিন।

উচ্চ স্বরে কেঁদে উঠলো সদ্যজাত কন্যাশিশুটি। কান্নার শব্দ কানে যেতেই পাশ ফিরে তাকাতে গিয়ে জেসমিন খেয়াল করল তার সমস্ত শরীর অদৃশ্য কোন হাত জাপটে ধরে আছে কোনভাবেই নড়তে পারছে না এমনকি চোখ মেলে তাকাতেও পারছে না। কেমন শিতল এক অনুভূতি।বন্ধ চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে আসা জলস্রোত ধুয়ে দিল সকল কষ্ট বেদনা দুঃখ কে। একজন নার্স বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বাইরে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো মহিলাটিকে বললেন,

–মেয়ে হয়েছে, তবে আমরা আন্তরিকভাবে ভাবে দুঃখিত মাকে বাঁচাতে পারলাম না।উই আর ভেরি সরি। মহিলাটি বাচ্চাটিকে আলতো করে কোলে নিয়েই চোখ আটকে গেল ছোট মুখখানায়,একদম বাবার মতো হয়েছে।

জেলখানার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির কাছে রুম্মানের প্রতি ভালবাসা ফিকে হয়ে গেছে।এই অনিশ্চিত জীবন থেকে বাইরের পৃথিবী দেখার সম্ভাবনা খুব কমই রয়েছে। মার্ডার কেসের আসামি। শেষমুহূর্তে বোনের চালাকি রং মোটেও বোঝার উপায় ছিল না। জেলখানার শিকের ফাঁক দিয়ে মনটা স্পর্শ করে নিয়েছে অতীত স্মৃতি। মন চাইছে বড়ো বোন জেসমিনের পিঠ চাপড়ে বলতে,,“সত্যি তুই বড় শক্ত মনের মানুষ” মূহুর্তেই নীরব স্বপ্ন গুলো কোনঠাসা হয়ে অদৃশ্য গর্ভধারিনী মায়ের বুক জড়িয়ে ধরলো। কতদিন মাকে দেখেননি এই অশ্রুসিক্ত আঁখি দুটি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত