নিয়তি

নিয়তি

আয়ানকে বর বেসে দেখার ইচ্ছেটা এতোটাই ছিল যে আমি আর লোভ সামলাতে পারিনি। তাই লোকজনের ভীর ঠেলে স্বয়ং দেখতে চলেছি। যদিও আয়ান আমাকে দেখতে পাচ্ছেনা ততটা দূরত্ব মেইন্টেন করে ওকে দেখছি। কিন্তু ও আমার মনের মতো আজ সাজেনি। সাদামাটা এক পাঞ্জাবি আর টুপি পরেই বিয়ের পিরিতে বসে পরেছে। অথচ একসময় ওকে আমি বলতাম নীলচে শেরওয়ানি, কালো পাজামাতে আর সুন্দর একটা পাগড়ী পড়ে বর সাজে দেখতে চাই।

আমাদের রিলেশনটা ছিল প্রায় ৪ বছরের কাছাকাছি। একদিন আমার সাথে কথা বলা অবস্থায় হুট করেই ও ওর ভাবির কাছে ধরা পরে যায়। ভাবি তখন সবে মাত্র কয় মাস হয়েছিল নতুন বউ হয়ে ও বাড়িতে গিয়েছে। ধরা পরার পর থেকে আয়ানের ভাবি মানে মৌ ভাবির সাথে আমার ভালো একটা বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আয়ানের উপর রাগ অভিমান করলে ভাবি তখন নাপা এক্সট্রার মতো পাশে দাঁড়াত। খুব করে শাসন করতো। আয়ানও বাদ যেতনা ভাবির কড়া শাসন থেকে। ভাবি আমাদের সমবয়সী হওয়ার কারনে ৩জনের বন্ধুত্বটা খুব জমে উঠে।

একবার আয়ানের সাথে অন্যবারের অনেক চেয়ে বেশি ঝগড়া হয়। বিয়েটে কি পরবো না পরবো নিয়ে। আমি চাই ও নীলচে শেরওয়ানি পড়বে বিয়েতে কিন্তু ও বলেছিল ওর নীল রঙ পছন্দ না। কিন্তু আমি যতবার বলি ওকে নীলই পরতে হবে নয়তো আমি বিয়েই করবো না। ও জানাই দরকার পরলে বিয়ে করবেনা তবুও সে নীল পড়বে না। ব্যাস এক কথায় দুকথায় ঝগড়া ভীষণ অবস্থায় রূপ নিলো।

ভাবিও কোনোভাবে আমাদের মানাতে পারেনি। মৌ ভাবি তখন কেবল মাত্র ৩ মাসের প্রেগন্যান্ট। সে এই অবস্থায় বাসা থেকে বের হয় আমার সাথে দেখা করতে। ওইদিকে আয়ানকেও ফোন দিয়ে বলে সে বাহিরে বের হয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে তাই যেনো তার বলা ঠিকানা মতো এসে নিয়ে যায়। আমার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ভাবি ফোনে ওকে এসব বলতে থাকে। তারপর একটা ক্যাফে বসিয়ে রাখে আমাকে। একটু পর দেখি আয়ান। আবারো বাধে আমাদের তুমুল ঝগড়া। ভাবি তখন আমাদের দুজনকে কানে ধরিয়ে একটা ট্যাক্সিতে উঠাই। দুজনেই জিজ্ঞেস করি “কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমাদের?” কিন্তু ভাবি কোনো কথা বলেন না। একটু পর কাজী অফিসের সামনে নামিয়ে দুজনের হাত ধরে ভিতরে নিয়ে যায় তারপর আয়ানের বন্ধু আর ভাবি মিলে সাক্ষি হয়ে বিয়ে দিয়ে দেয় আমাদের।

ভাবি নিজ দায়ীত্বে আয়ানের মাকে আমাদের ব্যাপারে জানালে আয়ানের মা তার কয়দিন পরেই আমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। দিন তারিখ ঠিক ঠাক হয়, তবে ভাবির কথানুযায়ী ভাবির ডেলিভারির পর ডেট ফিক্স করা হয়। আর আমরা যে আগেই বিয়ে করে বসে আছি এটা সেদিন বিয়েতে যারা উপস্থিত ছিল এর বাহিরে কেউ কেউ জানতো না। বিয়ে ঠিক ঠাক হয়ে যাওয়া কিংবা বিয়ে হয়ে যাওয়াতে আমাদের দেখা করা আরো সহজ হয়ে যায়। মাঝে বেস কয়েকদিন আয়ানের বাসাতেও যেতাম ভাবিকে দেখতে, ভাবির সাথে গল্প করতে।

ও বাড়ির প্রতি আলাদা টান থাকাই হাজারটা বাহানা বানিয়ে ইচ্ছে করতো ওইবাড়ি পরে থাকতে। তাইতো আজ ভাবির জন্য সুজির হালুয়া তো কাল গাজরের হালুয়া বানিয়ে ছুটতাম শশুড় বাড়ি। ভাবি প্রেগন্যান্ট থাকায় আমার সুবিধা ছিল বলাই চলে। সব ঠিক ঠাক যাচ্ছিল কিন্তু ভাবির ৬ মাস প্রেগনেন্সির সময় হঠাৎই হার্ট এটাকে আয়ানের বড় ভাই আরিফ ভাইয়া মারা যান। তাদের জীবনে একরকম অন্ধকার নেমে আসে। সেই মুহূর্তে আমার পরিবারের যতটা পাশে থাকা প্রয়োজন ছিল তারচে বেশি পাশে ছিল তাদের। এরপর একদিন আয়ানের মা বাবা আমাদের বাসায় আসেন। আমাকে পাশে বসিয়ে বেস কিছুক্ষণ আদর করছিলেন আয়ানের মা। আমিও খানিকটা লজ্জা পেয়ে চায়ের প্রসঙ্গ উঠাই

–আন্টি বসুন আমি চা আনছি
–না মা চা খাবো না। তোমার আম্মু আব্বুকে ডাকো। আম্মু আব্বুকে ডেকে আমিও পাশে বসেছিলাম
–তিথি তো মাশাআল্লাহ্‌ অনেক সুন্দর আছে। আপনারা আয়ানের থেকেও ভালো কোনো ছেলে ওর জন্য ঠিক পেয়ে যাবেন। উনি কথা শেষ করতে না করতে বাবা মা সহ আমি রিতিমত থ হয়ে গেলাম। উনি শাড়ির আচল টেনে চোখের পানি মুছতে মুছতে কাঁদোকাঁদো অবস্থায় বলেছিলেন

— বড় ছেলের বউ কেবল ৬ মাসের প্রেগন্যান্ট, আর কিছুদিন পর ডেলিভারি হবে, জন্মের পরই ওর সন্তান এতিম হয়ে রবে। এটা আমরা দাদা দাদি হয়ে কি করে মেনে নিতে পারি? বউমা নিজেও পাথর হয়ে গেছে আরিফের শোকে। চাইলেই বোউমার বাবা মা ওকে নিয়ে অন্যথায় বিয়ে দিতে পারেন, এক্ষেত্রে বোউমা হয়তো স্বামী পাবে কিন্তু তার সন্তান বাবা পাবে না। আমি চাই আয়ানের সাথে ওর বিয়ে দিয়ে ওই বাড়িতেই ওকে রাখতে। আমার মৃত ছেলের সন্তানও তার এক বাবাকে পাবে।

একসাথে এতকিছু বলার পর উনি আবারো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। আর ততক্ষনে আমার চোখেও পানি। উনি একজন মা তাই এমনটা ভেবেছেন। কিন্তু আমি কোনো কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। সেখান থেকে রুমে ছুটে যায়। সারাবছরেও না যতটুকু কেঁদেছি, সেদিন তারচে কয়েকগুণ কেঁদেছি। তবুও মন হালকা করতে পারনি। পারবোইবা কি করে? মনে মনে সংসার যার সাথে পেতেছি, কালেমা পরে যাকে বিয়ে করেছি কি করে এক মুহুর্তে ভুলে যাবো? কি করে মেনে নিবো সে আমার কখনওই হবে না? আয়ানের মা বাবা যাওয়ার ২দিন পর উনাদের বাসার কাজের খালাটা আমাদের বাড়ি আসেন। মা বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলেন

–তাড়াতাড়ি সই কইরা দেন আমার আবার যাওন লাগবো। বুঝতে বাকি ছিলনা সেটা যে ডিভোর্স পেপার ছিল। কলমের খাপ খুলতে খুলতে বললাম
–খালা বিয়ে কবে?
–আজ তো বিষুদবার, কালকাই বিয়া হইবো। শুভ দিনে।

আমি সই করে খালার হাতে দিয়ে দিলাম। যদিও কয়েকবার হাত কেপে কেপে উঠেছিল। কিন্তু মনে এক প্রকার সাহস রেখেই সইটা করে ফেলি। ঠুনকো এই সম্পর্ক রেখেইবা লাভ কি? ডিভোর্স পেপারের সাথে একটা চিরকুটও ছিল তাতে কয়েক লাইন লেখা ছিল “তিথি, তোমার আর আয়ানের বিয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়ে দিয়েছিলাম আর আজ নিজেই সেই বিয়ে ভেঙে দিলাম। অপরাধীর চোখে নিও না। আমি চাইনা কখনো এই সম্পর্কের জেদ ধরে আমার সন্তানের থেকে তার এই বাবাকেও কেড়ে নাও। আমিতো মা তাই কোনো রিস্ক নিতে চাইছিনা ভালো থেকো” মায়েরা তাদের সন্তানের মঙ্গলকামনায় কত কিছু করে, দিব্যি গড়ে উঠা সম্পর্কটাও নিমিষে শেষ করে দিলো অথচ আমার মা আমার মঙ্গল যেমন তেমন, নিজের মঙ্গলের কথাও ভাবছেনা। সারাদিন রাত কেঁদে চোখের নিচে কালি করে ফেলছে তাও আমারই জন্য। কিন্তু আমি তখনও শক্ত ছিলাম। হয়তো এসব আমার দুঃস্বপ্ন। আয়ান ঠিকি ফিরে আসবে আমার কাছে।

আয়ানের সাথে আমার আর দেখা হয়নি ওর ভাই মারা যাওয়ার পর। আজ ও বর সেজেছে তাই আমি আর বাড়িতে বসে থাকতে পারিনি। চলে আসি ওদের বাসায়। মোটামুটি ওদের বাসায় লোকজন থাকায় ঢুকতে সুবিধা হয় আমার। চোখের সামনে মেঝেতে বসে আছে আয়ান পরনে সাদামাটা পাঞ্জাবি আর টুপি। পাশে বসে আছে মেরুন রঙের শাড়িতে মৌ ভাবি।

জানালার এপাশ থেকে উকি দিয়ে দেখছি আমি আর বেহাইয়ার মতো তখনো ওকে চেয়ে যাচ্ছি। মনে মনে জপ করছি “আল্লাহ্‌ আয়ান যেনো কবুল না বলে” আয়ানকে পাবো না জেনেও এক টুকরো আশা নিয়ে পাগলের মতো পথ চেয়ে আছি। কিন্তু না নিয়তি আমাকে সাই দেয়নি বিন্দুমাত্র। মৌ ভাবির বলার পরপর ই ৩বার ওর কন্ঠ থেকে “কবুল” ধ্বনি চারিদিক ছড়িয়ে পরে। আমিও হাসি মুখে ফিরে আসি আমার গন্তব্যে ভালো থাকুক ওরা ভালো থাকুক ওদের সন্তান।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত