মুক্তি

মুক্তি

মেঝেতে রক্তের দাগ, জমাট বেধে কালচে হয়ে আছে। উঠে বসার শক্তিটা পর্যন্ত নেই নীতির। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে মেঝেতে পড়ে রয়েছে৷ মুখ, চোখ ফুলে গিয়েছে। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরিয়ে সেটা শুকিয়ে গেছে। হাত দুটো বাঁধা, বেল্টের আঘাতে সারা শরীরে কালচে দাগ হয়ে গেছে। আঘাতগুলো অবশ্য অন্য কেউ করে নি, করেছে তারই অতি আপনজন, কবির। কবির নীতির হাসবেন্ড, ওদের বিয়েটা হয়েছে আজ দুই বছর হবে। দোষ নীতি করেছিলো বটে, কবিরের বারণ অমান্য করেছে সে। তাই আজ তাকে এই ভোগান্তির শিকার হতে হলো।

কবির আর নীতির বিয়েটা লাভ ম্যারেজ। বাবা-মায়ের অমতে যেয়ে নীতি কবিরকে বিয়ে করেছে। তাদের রিলেশন দেড় বছরের ছিলো। কবির সবসময় ই এমন ছিলো।কবিরের সাথে ওর পরিচয় হয়েছিলো এক বান্ধবীর বার্থডে পার্টিতে। সেখান থেকে চেনা জানা তারপর প্রেম। রিলেশনের প্রথমে নীতির মনে হতো কবির বুঝি ওকে একটু বেশিই ভালোবাসে তাই এতো ডোমিনেট করে। কবিরের নীতির অন্য ছেলেদের সাথে কথা বলা পছন্দ ছিলো না। নীতি যদি কোনোদিন সেজেগুজে আসতো তাতেও তার আপত্তি ছিলো। সবসময় এখানে যাবে না ওখানে যাবে না। কোনোদিন বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গেলে কবিরের পারমিশন নিতে হতো। নীতির এক বন্ধু ছিল সাব্বির, ছোটবেলার বন্ধু। কবিরের সাথে রিলেশনের পর সাব্বিরের সাথে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তাতে অবশ্য নীতির কোনো আপত্তি ছিলো না কারন কবির নীতিকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। ওর ভালোবাসা যে কখন নীতির জন্য শিকলে পরিণত হলো, এটা নীতির অজানা ছিলো।

একবার সাব্বিরের সাথে নীতির রাস্তায় দেখা হয়ে গিয়েছিলো, সেখান থেকে তারা একটা ক্যাফেতে যায়। এতোদিন পর দেখা তাই সাব্বির ও নীতিকে জোর করেই নিয়ে গিয়েছিলো। কবিরের কাছে পারমিশন না নিয়েই নীতি চলে যায় সাব্বিরের সাথে। পরে কবিরকে নীতি সাব্বিরের সাথে ঘোরার কথা যখন বলে তখন কবির বলে উঠে,

– আমার অজান্তে অন্য ছেলেদের সাথে ঘুরতে তোমার অনেক ভালো লাগে তাই না?
– মানে?
– আচ্ছা তোমার কয়জন লাগে?
– কি বলছো এসব?
– বুঝতে পারছো না? বললাম তোর কয়জন লাগে মন ভরাতে? আমাকে দিয়ে হচ্ছে না নাকি?? ক্যাফেতে অন্য ছেলেদের সাথে ফষ্টি নষ্টি করতে ভালো লাগে তাই না?? তোদের মতো মেয়েদের তো একটাতে হয় না। তাই তো বলি কলেজে এতো সাজের ঘটা।

– আর একটা বাজে কথা বলবে না কবির। অনেক হয়েছে। যা মুখে আসছে তাই বলছো।
– হুম আমি বললে দোষ আর তোর করাতে দোষ না, ব্য***

নীতি সহ্য না করতে পেরে ফোন কেটে দিলো। এরপর কবিরের সাথে সাতদিন কোনো কথা বলে নি। হুট করে ওর বান্ধবীর কাছ থেকে জানতে পারে কবির নাকি সুইসাইড করতে গিয়েছিলো। যত যাই করুক কবিরকে তো ভালোবাসে, সব ভুলে দৌড়ে হসপিটালে চলে যায়। এরপর আর কি কবিরের চোখের পানিতে ওর দ্বারা করা সব অপমান ভুলে যায়।

এভাবে প্রায়ই কবির আর নীতির মধ্যে ঝগড়া লাগতো, নীতিকে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করতো তারপর কেদে কেটে সরি বলতো। নীতি ভাবতো হয়তো ইনসিকিউরড তাই এমন রিয়েক্ট করে। বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। নীতি অবশ্য দেখতেও সুন্দর ছিলো। তাই বাবা – মায়ের না করা সত্ত্বেও কবিরকে বিয়েটা করে। বাবা মা ও মেয়ের জন্য রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। বিয়ের পর ভালোর বদলে যেন খারাপটাই বেশি হলো। কবির নীতিকে নিয়ে আলাদা সংসার করা আরম্ভ করলো। নীতির আশেপাশে যেনো একটা বলয় তৈরি করে দিলো, কেউ নীতির ধারে কাছেও যাতে না ঘেষতে পারে সেই বলয় ভেদ করে৷ নীতি প্রথমে না বুঝলেও পরে ঠিক না অনুভব করতে পারছিলো।

নীতির ইচ্ছে ছিলো চাকরি করার, কবির সাফ মানা করে দেয়। নীতি কথা বাড়াতে গেলে কবির প্রথম বার নীতির উপর হাত তুলে। নীতি তো কাদতে কাদতে ঘর ছেড়ে চলে যাবার কথা বলে দেয়। কবিরের কোনো কথাই যেন নীতির কানে যাচ্ছে না। যাবে না এটাই স্বাভাবিক। কবিরের রাগ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। এবার মানুষ থেকে পশুতে পরিণত হলো কবির। নিজের ভালোবাসাগুলোর বহিঃপ্রকাশ করলো কবির হিংস্রতার সাথে। নীতির ভেতরটা যেন দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিলো। শেষরাতে নীতির কানের কাছে বললো,

– আমার কাছ থেকে তোমার নিস্তার নেই, শুধু মৃত্যুই আমাদের আলাদা করবে। তারপর থেকেই কবিরের প্রতি নীতির এক রকম ঘৃণা আর ভয় কাজ করতে লাগলো। কবির যতই ভালোবাসা দেখাক না কেনো যতই আগডুম বাগডুম বুঝাক, নীতির ভয়টা দৃঢ় হতে লাগলো।

দিন কেটে যায় আর বাড়তে থাকে কবিরের ভালোবাসা নামের অত্যাচার। নীতির বাবা-মার কাছে যেতে পারে না কারন বাবা- মাকে মেরে ফেলার হুমকি ও দেয় কবির। এক সময় যেনো নীতি একটা জলজ্যান্ত রোবটে পরিণত হয়। একদিন ঘরের কাজ করতে যেয়ে ফুলদানির গায়ে ছোট কিছু লাগানো দেখতে পেলো নীতি। খুব খুটে খেয়াল করে দেখে এটা এক ধরণের ক্যামেরা। কবিরই সারা ঘরে জায়গায় জায়গায় ক্যামেরা ফিট করে রেখেছে যাতে নীতি কি করে তার খেয়াল থাকে। কবিরের এই জেলখানায় আটকে রাখার ভালোবাসা ধীরে ধীরে যেনো নীতিকে পাগল করে দিতে লাগে। এভাবেই দুই বছর কাটিয়ে এসেছে নীতি। সবসময় যেনো মনে হয় কবির তাকে দেখছে। কারোর সাথে কথা অবধি বলতে দেয় না প্রতিটা ফোন টেপ করা। নীতিকে ঘর থেকে বের হতে অবধি দেয় না। আজকের ঘটনাটা ঘটেছে খুব সামান্য কারনে। না পারতে একটা বিজনেস ইভেন্টে কবির নীতিকে নিয়ে যায় কারণ সেখানে পার্টনারকে নিয়ে যেতে হবে। নীতি এমনেই সুন্দরী তার উপর সাদা শাড়ি পরে যেনো আরো সুন্দর লাগছে। বেপারটা প্রথম থেকেই মেজাজ খারাপ করে দেয় কবিরের।

ইভেন্টে কবিরের এক বিজনেজ পার্টনার নীতিকে প্রিটি বলে হ্যান্ডশেক করতে চায়। নীতিও তার সাথে হাত মিলায় সৌজন্যের খাতিরে। কবিরের যেনো রাগ মাথায় উঠে যায়, তাও কিছু বলে নি। ওই লোক যখন যেচে পড়ে নীতির সাথে খাজুরে আলাপ শুরু করে তখন আর কবির এক মিনিট ও ওখানে দাড়ায় নি। বাসায় এসে পুরো ঝালটা পড়লো।অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হলো নীতিকে সাথে পতিতা পদবি ও পেলো কবিরের কাছ থেকে।নীতির যেনো মরে যেতে ইচ্ছে করছে। এমন পশুকে কিনা সে ভালোবেসেছিল। বাবা-মার কথা বেশি করে মনে পড়ছে তার। রাতে যখন অসার শরীরটা বিছানায় ফেলে নিজের ভুল গুলো ভাবছিলো তখন কবির মলম পট্টি নিয়ে আসে। নীতি যখন মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন বলতে থাকে,

– জান, তুমি অনেক রেগে আছো না। আসলে কি বলো তো, তোমাকে প্রচুর ভালোবাসি কি না। কেউ তোমাকে যদি আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয় এই ভয়ে থাকি। আমি আসলে তোমাকে মারতে চাই নি। কি বলো তো তখন মাথা কাজ করছিলো না। তুমি আমায় মারো, যতো খুশি মারো। কিন্তু এভাবে কথা না বলে থেকো না প্লিজ। বলেই বাচ্চাদের মতো নীতিকে জরিয়ে ধরে কাদতে থাকে। নীতির খুব মায়া লাগছে। কেনই বা লাগবে না ভালো তো বাসে এখনো।

বেশ কিছুদিন পর নীতি বুঝতে পারছে সে আর একা নয়। তার মধ্যে কবিরের অস্তিত্ব বড় হচ্ছে। নীতির নিজেকে যেনো পরিপূর্ণ লাগছে।কবিরকে বলতেই কবিরের চেয়ে খুশি মানুষ যেনো আর কেউ নয়। বাবুর যত যা দরকার সব কিনে নি ভর্তি যেন শুধু বাবুরই জিনিস। অনেক দিন ধরে নীতি কবিরের মধ্যে একটা পরিবর্তন খেয়াল করলো। ওর পাগলামিগুলো যেনো কমে গেছে। নীতিকে ওর বাবা বাড়ি নিয়ে গেলো। বেশ কিছুদিন থাকলোও সেখানে। নীতির যেনো বিশ্বাস ই হচ্ছে না কবির সুস্থ মানুষের মতো আচরণ করছে। নীতি জানতো না যে মানুষ বদলায়, কিন্তু পশু পশুই থাকে। নীতির যখন সাড়ে পাঁচ মাস চলে, নীতি নিজের বাচ্চার প্রতি প্রচুর দূর্বল হতে থাকে। কবিরের প্রতি খেয়াল কম রাখা আরম্ভ করলে কবিরের সেটা পছন্দ হয় না। ওর মনে হতে থাকে নীতি কবিরের থেকে ওর বাচ্চাকে বেশি ভালোবাসে। কবিরের মনে হতে থাকে এই বাচ্চা ওর কাছ থেকে নীতিকে সরিয়ে ফেলবে। নীতির প্রতি ওর পাগলের মতো ভালোবাসা নিজের বাচ্চাকে মেরে ফেলতেও দু বার ভাবায় নি।

বাচ্চাটা হারাবার পর নীতি পাগলপ্রায় হয়ে যায়। নিজেকে দোষ দিতে থাকে কেনো সে ভালো মা হতে পারে নি। কবিরকে যেনো আরোও বেশি আকড়ে ধরতে চায়। কবির এতে বেশ খুশি, কারন এখন আর কেউ নীতিকে ওর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। নীতি ধীরে ধীরে যেনো পাল্টে যেতে থাকে, কবিরকে বাদে তার কাউকে পছন্দ না। বেশ কয়েকমাস পড়ে একদিন হুট করেই কবিরের ল্যাপটপ ঘাটতে ঘাটতে ঘরে লাগানো ক্যামেরা গুলোর ফুটেজ পায়। দেখতে দেখতে খেয়াল করলো, কবির নিজেই তার খাবারে কিছু ঔষধ মিশায় আর সিড়ির কাছে তেল আর সাবান কবির নিজেই ফেলে যাতে নীতি পা পিছলে পড়ে যায়। নীতির কাছে যেন সবকিছু কেমন পরিষ্কার। কবির ই তার নিজের অনাগত সন্তানকে মেরে ফেলেছে। নীতির যেনো বাঁচার ইচ্ছেটুকু শেষ হয়ে গেছে।

নীতি আজ কবিরের ভালো মানুষের মুখোশের আড়ালের অসুস্থ,মানুষিক রোগীটাকে চিনে গেছে। কবিরের প্রতি যাও একটু ভালোবাসা ছিলো সব শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু ঘৃণা। কবিরের এই জেলখানা থেকে মুক্তি চায় সে। মুক্তি যা তাকে কেবল একটা জিনিস ই দিতে পারে,তা হলো মৃত্যু। এই জেলখানায় প্রতিদিন নতুন করে মরাটা আর সহ্য হচ্ছিলো নীতির। অফিস থেকে ফিরে কবির দেখলো নীতি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। নীল রঙের একটা সুতির শাড়ি পড়ে। আজ নীতিকে খুব স্নিগ্ধ লাগছে। এতোদিনের দুঃখ কষ্ট যেনো আর তার মধ্যে নেই। কবিরের আজ নতুন করে তার নীতিকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে।

পেছন থেকে জরিয়ে ধরলো সে নীতিকে। নীতিও মুচকি হেসে তার দিকে তাকালো। আজ নীতির হাসিতেও যেনো একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। বারান্দায় কোনো রেলিং নেই আর কবিরদের বাসাটা ৯ তলায়। আর নীতি রেলিং এর গা ঘেষে দাঁড়িয়ে ছিলো। কবির আজ নীতিতে এতোই মত্ত যে তার সেটা খেয়াল ই নেই। চোখের পলকেই নীতি তার আচলে লুকানো ছুরিটা বের করে কবিরের বুকে বসিয়ে দেয়। তারপর ধাক্কা দিয়ে রেলিং এর কাছে ফেলে দিতেই কবির টাল সামলাতে না পেরে নিচে পড়ে যায়। কবিরের মৃত্যুতে যেন নীতির কোনো আক্ষেপ নেই। পাগলের মতো হাসতে লাগলো,

– আজ আমি মুক্ত, আমি মুক্ত। আমি মুক্তি পেয়েছি কবির। আমি তোমার থেকে মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু আসলেই কি মুক্তি পেয়েছে নীতি?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত