বাবা

বাবা

আমি যখন নবম শ্রেণিতে তখন একদিন আমি আমার বান্ধবীকে নিয়ে আমাদের বাড়ি আসছিলাম।। তখন আমার বাবা উঠানে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন ! আমাকে বাবা চিনতে পারেন নি,,আমাদেরকেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন তোমরা কে গো? আমার মেয়েটা টাকে কি দেখেছো??

আমি আর আমার বান্ধবী সেদিন খুব মজা করেছিলাম বাবার এই কথা নিয়ে! কারণ উনি যে আমাকেই চিনতে পারেন নি!! আমি তখন মজা করে বাবা কে বলেছিলাম আপনার মেয়ে স্কুলে,,পরে আসবে!! আর মজা করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আচ্ছা আপনার মেয়ের নাম কি?? বাবা বলেছিলেন কেন আমার মেয়ের নাম বাবুনি আমার ছোট মেয়ে ! (আদর করে বাবা আমাকে বাবুনি ডাকতেন)বাবা বলল সে কই গেলো আল্লাহ জানে,,আমার চিন্তা হচ্ছে! আমি তখন ও হাসছিলাম আর বাবার মাথায় হাত রেখে বলেছিলাম আব্বা আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি ই তো আপনার মেয়ে বাবুনি! সেদিন বাবা ২ মিনিট এক দৃষ্টে তাকিয়ে কান্না করে দিছিলেন আর বলছিলেন,,, দেখো মা আমার মাথা কি হয়ে গেছে,, আমি যে তোমাকেই চিনতে পারলাম না! আমার ভেতর টা তখন মুচড় দিয়ে উঠেছিলো বাবার কান্নার শব্দে! বাবাকে শান্ত করে আমার বান্ধবীকে বিদায় দিয়ে সেদিন আমি খুব কান্না করেছিলাম!

কারণ আমার বাবা এমন একজন মানুষ ছিলেন যাকে দেখলে আমাদের পুরো গ্রামের মানুষ ভয় পেতো! সবাই সম্মান করতো! কারণ বাবা যে এমন একজন ই ছিলেন! বাবা ই যে আমাদের গ্রাম টা নিয়ন্ত্রণ করতেন! বাবাকে সবাই ভালোবাসতো আর শ্রদ্ধা করতো! আমার মা ও কখনো বেশি কথা বলতে পারতো না ভয়ে! বাবা একটু রাগি ছিলেন।। কিন্তু আজ বাবা অসুস্থ হওয়ায় আমি একটা পুচকো মেয়ে উনার সাথে মজা করলাম!কথা নিয়ে হাসলাম! খুব খারাপ লাগছিলো সেদিন!

আর যখন আমি ক্লাস ফাইভে বাবা ব্রেইন স্ট্রোক করেছিলেন,, তিনি এরপর সব কিছু ভুলে যেতেন। কিন্তু স্ট্রোক করার আগের সব মনে ছিলো,, এরপরের সব কিছু যেন বাবার কাছে কয়েক মিনিটের মতো ছিলো!
আমি পঞ্চম শ্রেণীতে ছোট ছিলাম আরো ,, বাবা তখন আমাকে দেখেছিলেন বলেই মনে করেন আমি এখনো ছোট। কারণ এই কয়েক বছরে যে বড় হয়ে গেছি সেটা বুঝতে পারেন নি! তাইতো আমাকেই চিনতে পারেন নি তখন! আমি যতক্ষন স্কুলে থাকতাম বাবা বার বার আম্মাকে বলতেন আমি এখনো আসি না কেন,,,এমনও হতো ৫ মিনিটে ৫ বার জিজ্ঞাসা করতেন,,, মানে আমি না আসা পর্যন্ত মা কে বাবা একটু ও রেহাই দিতেন না,,প্রশ্ন করেই যেতেন।

আমি আসলে মাঝে মাঝে চিনতেন,, আবার মাঝে মাঝে ভুলে যেতেন! আর খাইছি কিনা সেটা বাবা ঘন্টায় কম হলে ও ১০ থেকে ২০ বার জিজ্ঞাসা করতেন,,কারণ উনার মনে থাকতো না। ঘুরেফিরে বাবা একটা প্রশ্নই করতেন। মাঝে মাঝে আম্মা বিরক্ত হয়ে বলতেন, আপনি একটু ঘুমান,,এত খোজ খবর আপনাকে নিতে হবে না। কিন্তু আমি সারাক্ষণ বাবার সাথে গল্প করেই যেতাম,, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম। আর বাবা আমাকে পেলে যদি মা কে না দেখতেন বার বার জিজ্ঞাসা করতেন তোমার আম্মা কই,,,, আমি বলতাম আম্মা রান্না করে,, এখানে আছে সেখানে আছে এসব বলতাম,,বাবা যেমন ক্লান্ত হতেন না বলে বলে,, আমি ও তেমন বিরক্ত হতাম না।।

আর বাবা আমি গল্প করে যেতাম! আমি ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট,,আমার ভাইবোনেরা শাসন পেয়ে পেয়ে বড় হয়ছে বাবার,,,,কিন্তু আমি শুধু বাবার আদর আর ভালোবাসা! বাবা আমাকে একটা ধমক ও দেন নাই,,মা বলতেন বাবার কলিজা টাই নাকি আমি ছিলাম! এভাবেই কেটে গেলো কয়েকমাস বাবা আগের মতোই ছিলেন,,সব ভুলে যেতেন !কিন্তু একটু দূর্বল হয়ে গেছে শরীর। একদিন বিকাল বেলা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম,,বাবা এসে দেখলেন আর ভাবলেন আমি অসুস্থ! তাই শুয়ে আছি। বাবা একা একা অসুস্থ শরীর নিয়ে দোকানে চলে গেলেন,, গিয়ে ডাক্তার নিয়ে আসলেন,,,এসব দেখে আম্মা আর আমি অনেক হেসেছিলাম। ডাক্তার চলে গেলেন,, উনি আবার আমাদের পরিচিত ই ছিলেন। তাই কিছু বলেন নি উল্টো আরো অনেকক্ষন হাসলেন।

এর মাত্র ৬ দিন পর বাবা অসুস্থ হয়ে গেলেন,,,বাবার হাত পা ফুলে গেছিলো! বাবার পাশে সেদিন সারারাত জেগে ছিলাম আমি আর আম্মা,আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম,আর কান্না করছিলাম। কিন্তু বাবা বুঝে ফেলেছিলেন আমি কান্না করছি,আমার দিকে তাকিয়ে বললেন আরে পাগলি কেঁদো না এসব ঠিক হয়ে যাবে ড্ক্টরের কাছে গেলে। আর বালিশ টা এগিয়ে দিয়ে বলেছিলেন তুমি এখানে ঘুমাও বাবার কাছে! কিচ্ছু হবে না বাবার!! কিন্তু বাবা যে সেদিন আমায় মিথ্যা কথা বলেছিলেন!! আমাকে বাবা মিথ্যা শান্তনা দিয়েছিলেন! পরদিন বাবা ডক্টরের কাছে গিয়েছিলেন মাইক্রো দিয়ে কিন্তু এম্বুল্যান্সে লাশ হয়ে এসেছিলেন আমার সামনে! বাবা যাওয়ার আমার শেষ কয়টা কথা হয়েছিলো, বলেছিলেন মা স্কুলে যাচ্ছো যাও।মন দিয়ে পড়বে! তুমি যে আমার শেষ সম্মান।বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে তুমি। আর বাবা চলে আসবো তারাতাড়ি ই।।আসলেই বাবা তারাতাড়ি ফিরে এসেছেন কিন্তু মৃত!

আমি সেদিন যেতে চাই নি স্কুলে কিন্তু পরিক্ষা ছিলো। তাই আমাকে যে যেতেই হলো বাবাকে জীবন্ত অবস্থায় শেষ বার দেখে! স্কুলে গিয়ে ও বার বার মনে হয়েছিলো আমি আর বাবাকে দেখতে পারবো তো,,আমার বাবা সুস্থ হবে তো?? বার বার বাবার শেষ কথা গুলো কানে বাজছিলো! আমার বাবা একেবারে চলে গিয়েছিলেন! আর কখনো আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না! আজ প্রায় ৩ বছর হয়ে গেলো বাবা সবাইকে রেখে চলে গেছেন।কিন্তু এখনো প্রতি টা সকালে ঘুম ভাঙলে মনে হয় বাবা বলছে,, এতো সময় কেউ ঘুমায় নাকি??

সকালে তারাতাড়ি উঠে নামাজ পড়ে পড়তে বসতে হয়! কারণ এই কথা যে প্রতিদিন সকালেই বাবা আমাকে বলতেন! আজ আমি কলেজে পড়তে কতো দূরে থাকি কিন্তু আম্মাকে আমার কথা বার বার জিজ্ঞাসা করে কেউ আর বিভোর করে তুলে না! বার বার কেন একবার বলার মতো ও কেউ নেই আর!!বাড়িটা পুরো ফাঁকা লাগে এখন!! শূন্যতায় হাহাকার করে চারদিকটা। বাবা মা যে পৃথিবীর সেরা সম্পদ! যে হারায় সে বুঝে তার যন্ত্রণা! প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন পৃথিবীর প্রত্যেকটা মা বাবাকে ভালো রাখে!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত