গোলাপ বাঁধা চিঠির খামে

গোলাপ বাঁধা চিঠির খামে

আনিকা আমাদের পাশের বাড়ির মেয়ে। সে প্রায়শই বোরখা পরে আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে যায়,, বিষয়টি কয়েকদিন আমার চোখে পরলো। জানার আগ্রহ নিয়ে আমি একদিন মাগরিবের নামাজ আদায় করে ইমাম সাহেবের কামরায় গিয়ে বসলাম। যথার্থ সময়ে তিনি কামরায় এসেই আমাকে বললেন,, “আরে! মারুফ ভাই! জানেন না, আপনার সাথে কত গল্প জমে আছে! আপনি এসে ভালোই করেছেন।। হুজুরের কথা শুনে আমার জানতে আসার বিষয়টি গোপন করে হুজুরকে বললাম,, “সত্যিই নাকি! তাহলে আপনার সব কথা আজ আমাকে খুলে বলুন! “তার আগে আপনি বলুন তো! এতদিন পর কি মনে করে এলেন??

আমি হুজুরের কাছে কেনো এলাম এটার আসল কারণটা এড়িয়ে হুজুরকে বললাম,, “আমি ব্যক্তিগত কিছু মাসায়েল জানার জন্য এসেছিলাম। আগে আপনার গল্প শেষ করুন। তারপর বলব। হুজুর আমাকে বসিয়ে রেখে বাহিরে গিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন। বুঝতে পেরেছিলাম উনি চায়ের জন্য কোন ছাত্রকে পাঠাবেন। হুজুর ফিরে এসে বলতে শুরু করলেন,, মারুফ ভাই! আপনাদের পাশের বাড়ির আনিকা নামের মেয়েটা বড় দিলওয়ালী। সে প্রায়সময় আমার কাছে “প্রতিবেশীর হক্ব” (দায়িত্ব) সম্পর্কে জানতে আসে। তার জন্য আমার প্রচুর পরিমাণে রিসার্চ করতে হয় জানেন??

“জ্বি হুজুর! এইতো মাত্রই আপনার থেকে জানলাম। তা আনিকা কি আর কিছু জানতে আসেনা?? “আর বইলেন না। আমাকে বলে কি জানেন? তাকে নাকি মানুষকে বশ করার আমল বলে দিতাম! হুজুরের কথা শুনে খুব হাসলাম। এরপর বিভিন্ন আলোচনা করে চলে এলাম। কারণ আমার উত্তর জানা হয়ে গিয়েছিল। কথায় থাকে না?? “সাহেবও খাড়া শিন্নিও বাড়া! ঠিক ওরকমই হয়েছে। আমিও গেলাম প্রশ্নের আগেই উত্তরও পেয়ে গেলাম। বাড়ি এসে আম্মাকে বললাম,, “আম্মা! আনিকা দিনে কতবার আমাদের ঘরে আসে?? “কেল্লেইজ্ঞা?? এইডা জাইন্না তর কি??

“দরকার আছে আম্মা কও তুমি! “জানিনা। ছেড়িডা যথেষ্ট ভদ্র। তুই কু’নজড় দিলে তর বাপেরে সুজা জানাইবাম। “আরে আম্মা! আব্বাকে জানানোর কি আছে এখানে?? “ছেড়ার পুত বালা অইয়া যা সময় আছে এখনো। মনে মনে ভাবলাম,, বুঝলাম না আম্মা রেগে গেলো কেনো! এরপর আবারও মনে হল,, না রাগার যুক্তিও দেখছিনা। কারণ আনিকা আম্মার বান্ধবি হলেও এত আপন হতো বলে মনে হয়না। আনিকা যতক্ষণ না তার নিজ বাড়িতে থাকে! এরচেয়ে বেশি মনে হয় আমাদের বাড়িতেই থাকে। গত শুক্রবার রাতে আমি শহর থেকে ফেরার পথে ফাঁড়ির রাস্তা ধরে আনিকাদের বাড়ির উঠুন বেয়ে আমাদের বাড়ি ফিরছিলাম। এমনসময় আনিকার মায়ের চেঁচামেচি শুনে কানপেতে শুনতে চেষ্টা করলাম,,

“তুই যে বড় হইছস এই খবর কি তোর আছে?? দিনে আমার কয়ডা কাম হইরা দেস?? হারাডাদিন মোল্লাবাড়িতে গিয়া পইরা থাহস। কারন্ডা কি?? আনিকা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকায় হয়তো তার মা ঠপাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়েছিল গাল বড়াবর। অমনি আনিকা বলতে শুরু করলো,, “খুশি কাকি অনেক ভালো মানুষ। উনার সাথে গল্প করতে যাই। আর তুমি কি জানোনা! পাড়াপড়শির খুঁজ নেয়ার কথা হাদিসে আছে?? সেদিন রাতে খুব হেসেছিলাম। ঘটনাটা এসে আম্মাকে বলেছিলাম। আম্মা সেদিন ভাত বেড়ে দিতে দিতে বলেছিল,,

“তরা কেউ বাড়িতে তাহস না। ছেড়িডা আমারে কত মহব্বত করে। আইসা আমারে সময় দেয়। এইডার লাইজ্ঞা ওর মা এইভাবে মারবো? আমার লগে তো ওর মার কোনদিন কাইজ্জা ঝগড়াও হইল না! আমি সেদিন বিষয়টা তেমনিভাবে নেইনাই। আজ হুজুরের কথা গুলো শুনে মনে হল, আনিকা কোন রহস্য নিয়েই আমাদের বাড়িতে এসে পরে থাকে। আমি ছাড়া তো আর এ-বাড়িতে কোন ছেলে মানুষ নাই। তাহলে সে কাকে বশ করার আমল আনতে হুজুরের কাছে যায়?? সেদিন রাতে আনিকাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন সকালে চোখ কচলাতে কচলাতে রান্নাঘরের পাশ কেটে পুকুরপাড় যাচ্ছিলাম মুখ ধুইতে। অমনি দেখি আনিকা রান্নাঘরে হাতে একটা পাতিল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নাস্তা করতে এসে জানলাম “আনিকা আমাদের জন্য পিঠা নিয়ে এসেছে। আম্মাকে রাগানোর ছলে বললাম,, “আম্মা! আনিকা আমাদের জন্য পিঠা আনেনাই। আমি বাড়িতে আসছি তো! তাই শুধু আমার জন্য আনছে। কথাটা শোনামাত্রই আম্মা পিঠার পাতিলটা আমার সামনে থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। এরপর আমাকে একগুচ্ছ গালি দিল। মায়েদের গালি একগুচ্ছ ফুলের মতই।

সেদিনই চিন্তা করলাম আনিকাকে মানুষ বশ করার আমলটা আমি নিজেই লিখে দেব। ভেবেচিন্তে বিষয়টা আমার ছোটবোনকে ফোনে শেয়ার করলাম। ছোটবোন সবকিছু শুনে গুটিবাজি বুদ্ধি করে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করলো। বলল যে, সবকিছু আম্মাকে বলে দেবে, তাকে তার পাওনা টাকা ফেরত না দিলে। আমি তারথেকে প্রায়শই ধারকর্জ নিতাম। মেসের খরচের টাকা থেকে যা বেড়েছিল সবগুলো টাকা তাকে বিকাশ করে দিয়ে দিলাম বাধ্য হয়ে।

কপালে যেন যন্ত্রণা কিনে আনলাম ওরে জানিয়ে। ওর ফোনে যে অটু কল রেকর্ড থাকে এটা আমি জানতাম। তাই টাকা ফেরত না দিয়েও উপায় ছিলনা। আম্মা আমার এসব কথা শুনলে নিশ্চিত আমাকে জুতাপেটা করবে। যাইহোক, শূন্যপকেটে বাড়ি ফিরলাম। অবশ্য পকেটে যে দশ টাকা ছিল,, সেই দশ টাকাও মুন্সী বাড়ির খবির কাকা গোলাপের দাম হিসেবে রেখে দিয়েছেন। শালা এত কিপটা লোক! আমার জীবনে দেখিনি। মাত্র একটা গোলাপ নিয়েছি! পাড়ার ছেলে হিসেবে তো ফ্রিতেও পাই আমি?? বাড়ি এসে লুকিয়ে লুকিয়ে একটা কাগজে চিঠি লিখলাম,, প্রিয় আনিকা! জানি এই চিঠি পড়ে তুমি খুব অবাক হবে। কারণ তোমাকে যা বলা হবে! তার বিপরীত এখানে লিখা থাকবে। এরজন্য আমি খুবই লজ্জিত।

শুনেছি তুমি মহল্লা মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে মানুষ বশ করার আমল খুঁজো। এগুলো একদমই ভালো না। তুমি এখন বড় হয়েছো। আর কক্ষনো ইমাম সাহেবের কাছে যাবেনা। আর শুনো! আমি কিন্তু ‘তোমাকে ভীষণ পছন্দ করি। খবরদার! আজ থেকে অন্যকোন ছেলেকে বশ করার জন্য কোন আমল তুমি খুঁজবে না। আরে পাগলি! আজকাল ছেলেদের বশ করতে কি আমল খুঁজতে হয়! শুনো! আমাকে বশ করতে তোমার খুব বেশিকিছুর প্রয়োজন নেই। মাঝেমধ্যে পায়ে নূপুর পড়বে। ইচ্ছে করেই আমার বারান্দার সামনে দিয়ে পা দুলিয়ে শব্দ করে হাঁটবে। তোমার নূপুরনিক্বণের আওয়াজে আমি তোমার প্রেমে পরবো।

মাঝেমধ্যে কাজল পড়ে আমাদের বাড়ি আসবে। আম্মাকে আমার পাশের রুমের আয়নার সামনে নিয়ে এসে বলবে,,
কাকি! আজ না আমাকে দেখতে এসেছিল। তাই সেজেগুজেই আমি চলে এলাম। আমাকে দেখতে কেমন লাগছে গো?? তখন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তোমায় দেখে প্রেমে পরবো। মাঝেমধ্যে বৃষ্টির দিনে শাড়ী পড়বে। আমাদের বাড়ি এসে আম্মাকে বলবে,, কাকি! গতকাল আমার সব কাপড় রাতের বেলা ধুইয়ে দিয়েছিলাম। না শুকানোয় মায়ের শাড়িটা পড়েই আপনাকে দেখতে চলে এলাম। ঠিক তখনই তোমার শাড়ীর কুচির ভাঁজে আমি তোমার প্রেমে পরবো। আমাকে বশ করতে এরচেয়ে বেশি কোন আমলের প্রয়োজন আছে কি??

চিঠিটা লিখে বাবার বিছানার নিচে পরে থাকা পুরনো এক ধুলোমাখা চিঠির খামে ভরে নিলাম। গোলাপটাকে সুঁই সুতোতে চিঠির খামের সাথে বেঁধে বাড়ির চারপাশে ঘুরাফেরা শুরু করলাম। কখন আনিকা আমাদের বাড়ি আসে সেই অপেক্ষায়। মনে মনে ভাবছিলাম আনিকা এলেই চিঠির খামটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলব,, “শুনো আনিকা! মানুষ বশ করার কিছু আমল লিখা আছে এই খামে রাখা চিরকুটে। তুমি নিয়ে যাও! কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আম্মার কাছে “গোলাপ বাঁধা চিঠির খামে” হাতেনাতে ধরা খেয়ে গেলাম। আম্মা চিঠি পড়ছে আর আমি দৌড়াচ্ছি।

মসজিদ থেকে বাবা নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। বাবা আমার দৌড়ানো দেখে আমাকে ডেকে বসলেন। পরলাম মহাবিপদে। বাবাকে এখন কি বলে দৌড়ানোর কারণ লুকাবো সেটাই ভাবছিলাম। হঠাৎ দেখলাম ইমাম সাহেব বাবার বিপরীত পথে বাইসাইকেলে কোথাও যাচ্ছেন। অমনি বাবাকে বললাম,, “বাবা! হুজুরকে একটু দরকার ছিলো। উনি তো চলে গেলেন,,, “এমনই তো হবে! তোমাকে কতবার বলেছি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করবে। আমার কথা কি শুনেছো কখনো?? শুনলে হুজুরকে দৌড়ে এসে ধরতে হতো!! আমি নিশ্চুপ গলায় বাবার সামনে থেকে কেটে পরলাম।

আমার গ্রামটা খুবই মনোরম। আঁকাবাঁকা মেঠো পথের কোলে সারিবদ্ধভাবে তাল খেজুরের সৌন্দর্যরূপ, যে কাউকে মুগ্ধ করবে। সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করবে জোয়ারভাটার মত ক্ষণেক্ষণে বৈশাখী বাতাসে দুলিয়ে যাওয়া তালপাতায় ঝুলন্ত বাবুইঘর গুলো। আবার এদিকওদিক থেকে ক্ষণেক্ষণেই মাঠের কোন থেকে ভেসে আসছে রাখালিয়ার বাঁশীর সুর। মাঝেমধ্যে মেঘের খুঁজে আকাশ দেখলেই ঘনঘন চোখে পরছে গ্রাম বালকের চিলেঘুড়ি।

খানিকদূর এগিয়ে ঠিক বিলের ধারে যেতেই মনে হল বিকেল নেমেছে। পুরো বিলের মাঝেই ছড়িয়ে আছে লাল সবুজের পদ্মপাতা। ঘুমিয়ে কাটানো দিবালোক শেষে সন্ধ্যামণির ছোঁয়ায় জাগতে শুরু করেছে পদ্মপুষ্প গুলো। চাঁদ দেখতেই বোধহয় এরা দিনে ঘুমাবে, গায়ে চাঁদোয়ারঝালর জড়িয়ে রাত জাগবে।

আমার গ্রামের সৌন্দর্য আমাকে উদাসীন করে রাখে সন্ধ্যা পর্যন্ত। হুট করে মনে হলো বাড়ি ফেরা উচিত। আম্মা নয়তো ভীষণ রেগে যাবে। সেই কখন এলাম। একমাত্র ছেলেদের প্রতি মায়েদের অনুরাগও যেমন! হারিয়ে ফেলার ভয়ও তেমনই থাকে। তাই আমি কোথাও গিয়ে মায়ের চোখের আড়ালে দূরদেশী হয়ে থাকতে পারিনা।

বাড়ি ফিরতেই আম্মা আবারও একগুচ্ছ বকে দিলো। হাত পা ধুইয়ে ঘরে যাবো! অমনি দেখি হারিকেন হাতে আনিকা এসে আমাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে লজ্জিত কণ্ঠের ঘোমটাপরা নুয়ানো মাথায় বলল,, “মারুফ ভাই! আমাদের ছাগলটা খুঁজে বের করে দেবেন?? বাবা হাটে চলে যাওয়ায়,,,, এটুকো বলেই থেমে গেল আনিকা।

আমি কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে বললাম,, “আচ্ছা, তুমি চিন্তা করোনা। আমি এখনই ছাগল খুঁজতে বের হবো। তুমি তোমাদের বাড়ি ফিরে যাও। আম্মা যদি দেখে আমি তোমার সাথে কথা বলছি! তাহলে খুব রেগে যাবে। আনিকা চলে গেলো। রুমে গিয়ে চার্জ থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে ছাগল খুঁজতে বেড়িয়ে পরলাম। হুট করে মনে হল পেছন থেকে মেয়েলী কণ্ঠে কেউ একজন ডেকে বসেছে আমাকে। তাকিয়ে দেখি আনিকা। জিজ্ঞেস করলাম,,

” আনিকা তুমি!! বাড়ি যাওনি এখনো??

“নাহ, যাইনি তো!

“কিন্তু কেনো??

“আমি আপনার চিঠিটা পড়েছি। এটুকো বলেই আনিকা দৌড়ে বাড়ি চলে গেলো। আমি যে হাত বাড়িয়ে ডেকে কিছু জানবো, সেই সুযোগটাও পেলাম না। ছাগল টা কি আসলেই হারিয়েছে?? না সম্পূর্ণটাই তালবাহানা ছিল?

বেশ চিন্তায় ফেলে দিল আনিকা। আমি ছাগল খুঁজতে না গিয়ে আম্মার কাছে চলে এলাম। আমি এটা জানি যে, আম্মার কাছে বসে একটু আহ্লাদ করলেই আম্মার থেকে রহস্য বেড় করা যাবে আনিকা এই চিঠিটা পড়লো কি করে। “আম্মা! কি রান্না করেছো! “হুন! তুই আমার লগে সুলালতি (আলগা-দরদ) বাটবি না। যা এইহান তে। “আম্মা এত রাগলে কিন্তু সকালের ট্রেনেই ময়মনসিংহ চলে যাবো!

“যাইজ্ঞা। তুই আমার সামনেত্তে যা অহন। সামনে আইস্না। “বুঝিও কিন্তু! মাসের পর মাস বাড়ি আসব না। তুমি তোমার ঐ দরদী মেয়ে আনিকারে নিয়াই দিন কাটাইবা। এবার আম্মা আমার কথা শুনে কিছুটা নরম হয়ে বলল,, “তুই আনিকারে লইয়া এইতা না লেইক্কা আমারে কইলেই পারতি?? “কেনো আম্মা! বললেই কি তুমি মেনে নিতা নাকি?? “চুপ কর তুই। আমার চশমাটা কই রাখছস?? চশমাটা খুইজ্জা না পাইয়াই তো পরে আনিকারে দিয়া চিডিডা পড়াইছিলাম। কি লেখছস হুনবার লাইজ্ঞা। ছেড়িডা আমার সামনে লজ্জায় কান্দন শুরু কইরা দিছে। কালকাত্তে মনে অয়না আর আমার বাড়ি আইবো। মন্ডায় খুব দুঃখ দিছস তুই।

আম্মার কথায় কিছুটা ইমুশোনাল হয়ে পরলাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আম্মা। মনে হল আম্মার অনেক কাছের কেউ হারিয়ে গিয়েছে। তবুও আম্মাকে আনিকার ছাগল খুঁজার গল্পটা লুকিয়ে বললাম,, “আম্মা কাল থেকে যদি আনিকা না আসে! আমি নিজে গিয়ে আনিকার কাছে মাফ চাইবো। তুমি এসব চিন্তা বাদ দাও। পরদিন সকালে আম্মার ফুঁপানো কান্নায় ঘুম ভাঙলো আমার। আমি থতমত খেয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলাম,, “আম্মা তোমার কি হয়েছে?? কাঁদছো কেনো?? “আনিকা আজকা অহনো আইলো না। এমনে কত সহালে আয়া পরে। ছেড়িডা ত নিয়মিত ফজরের নামাজের বাদে আমার এইনো কোরা’আন শরিফ পড়তে আইতো।

“আম্মা তুমি কান্নাকাটি অফ করো। আমি গিয়ে দেখছি ব্যাপারটা আসলে কি হয়েছে। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আনিকাদের বাড়িতে গেলাম। যেতেই আনিকার মা এগিয়ে এসে বললেন,, “মারুফ! সারাটাদিন তোমাদের বাড়ি গিয়ে আমার মেয়েটা পরে থাকে। কোনদিন কিচ্ছু বলিনা,, এটুকো বলতেই বাড়ির ভেতর থেকে আনিকার বাবা আনিকার মাকে ধমকীর সুরে ডাকলেন। উনি কথা থামিয়ে আনিকার বাবার উত্তর দিয়ে বললেন,, “আইতাছি” এরপর আবারও আমাকে বললেন,,

“তোমাকে কি কাল আনিকা বলেনি! আমাদের যে ছাগলটা হারিয়েছে?? তুমি কেন একটুও খুঁজতে গেলে না?? আর যদি গিয়েই থাকো তাহলে রাতে এসে কিছুই বললে না কেনো?? আমি গিয়েছিলাম আনিকা আমাদের বাড়িতে না আসার কারণ জানতে। এতক্ষণে সেটা আমার জানা হয়ে গিয়েছে। সাথে সাথেই মাথায় একটা বুদ্ধিটা এঁটে বললাম,,

“কাকি! আমি রাত দশটা পর্যন্ত আপনাদের ছাগল খুঁজেছি। রাতেই বলতে এসেছিলাম। এসে দেখি ঘরে একদম কোন মানুষের আওয়াজ নেই। ভাবলাম ঘুমিয়ে পরেছেন। তাই সকালে বলব বলে চলে গিয়েছিলাম।

“তোমাকে আনিকা বলেনি মসজিদের মাইকে এলান করে দেয়ার কথা??

“না তো! সে তো এমনকিছু বলেনি আমাকে! শুধুই ছাগল খুঁজতে বলেছিল। আর আমার মাথায়ও এটা আসেনি।

“দুইক্কা (দুঃখু মিয়া) বেডার খোয়ারে গিয়া খুঁজ নিছিলা??

“জ্বি কাকি! ওখানে গিয়েই তো যত সময়টা ফুরালাম। রাতের অন্ধকারে বাড়ি ফিরতে ভয় পাচ্ছিলাম খুব। আমাদের এলাকার কাউকে পেলে সাথে ফেরার অপেক্ষায় চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম দীর্ঘক্ষণ। তাই সময় গড়িয়েছিল অনেকটাই।

“আচ্ছা বাজান তাইলে খুবই লজ্জিত তোমার কাছে। সত্যি বলতে মাথাটা সকাল থেকে ঠিক আছিলনা।

“আরে কাকি এসব কি বলছেন?? আমি আপনার ছেলের মত।

“দেখছিলা না আমাগো ছাগলটা কত বড়?? এতবড় ছাগল এই পুরো ইউনিয়নে একটাও আছে??

“জ্বি কাকি দেখেছিলাম। সত্যিই এতবড় ছাগল আমার জীবনে এটাই প্রথম দেখেছি। খুব কষ্ট হচ্ছে ছাগলটার জন্য। কথাবার্তা শেষ করে দৌড়ে এসে আম্মাকে সব খুলে বললাম। আম্মা আমাকে একশত টাকার একটা নোট দিয়ে বললেন,, “বাবা না বালা আমার! দৈড়া যা খোয়ারও। ছাগলডা পাইলে লইয়াইজ্ঞা। আমার কি যে খারাপ লাগতাছে এই খবর হুইন্না।

সকাল ঠিক দশটার দিকে ছাগলটা খোয়ার থেকে পঞ্চাশ টাকায় ছাড়িয়ে আনলাম। দুঃখু মিয়ার খোয়ারেই ছিলো। মুন্সী বাড়ির খবির চাচার ধান খেয়েছিলো। এই কিপটা লোক আমার থেকে গতকাল এক গোলাপের দাম রেখেছিল দশ টাকা। ছাগল ফিরে পেয়ে আনিকার আম্মু খুবই আনন্দিত হলেন। ছাগল সাথে করে নিয়েই আনিকা সহ তিনি আমাদের বাড়ি এলেন। যাঁতাকলে আম্মা আমার জন্য শুকনো মুশুর ডাল গুঁড়ো করছিলো। আম্মা তাদের মা মেয়েকে কাছে পেয়ে যাঁতাকলে ডাল মুড়ানো বন্ধ করে খুশগল্পে মেতে উঠলো।

এরমধ্য আমি সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলাম,, “আম্মা! ডালের গুঁড়ো করা ভুসি গুলো ছাগলের সামনে নাস্তা সরূপ পেশ করা হোক। বেচারা জেল হাজতে একটা রাত খুব কষ্টে কাটিয়ে এলো। আমার কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল। সবচেয়ে বেশি সম্ভবত আনিকাই হেসেছে। আমাদের বাড়ির সবাই আমার আম্মার কাছে এসে নানানরকম গল্প করেন। আমার ছোট কাকা সেই গল্প আড্ডার নাম দিয়েছেন “ভাবি মিটিং”। আমি ছোট কাকার ঘরে গিয়ে কাকিমাকে বললাম,, “কাকিমা! আমাদের ঘরে আপনাদের ভাবি মিটিং শুরু হয়েছে। যাবেন না???

কাকিমা আমার কথা শুনে পানটা মুখে গুঁজেই দ্রুত চলে গেলেন আমাদের ঘরে। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকে ছোট কাকার বাগানে একটা বকুল গাছ আছে। সকালে সেই গাছের নিচে ঝরাফুলে সাদামাটা হয়ে থাকে। শিউলি-বকুল আমার খুবই প্রিয় ফুল। আজ সকালে প্রতিদিনের মত এই ফুল গাছের নিচে আমার আসা হলনা। ছাগলের পেরায় কেটে গেলো পুরোটা সকাল। গেলাম বেলাদুপুরে। ফুল গুলো ততক্ষণে মৃতপ্রায়। তবুও কিছু ফুল কুড়িয়ে আমার বারান্দার সামনে বসে বসে ঘ্রাণ নিচ্ছিলাম। সম্ভবত আনিকাকে তার মা তাদের বাড়িতে কোন কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন। আনিকা আমার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে তখন বলে বসলো,,

“মারুফ ভাই! আমি জানি আপনার হাতে কি??

“কি হাতে বলো তো??

“বকুল।

“আরে নাহ! শিমুল।

“আপনি কিন্তু ময়মনসিংহ গিয়া অনেক মজা শিখেছেন। আমি জানি বকুল ফুল আপনার খুব প্রিয়।

“কি করে জানলে??

“একদিন লুকিয়ে বসে আপনার ডায়েরীতে পড়েছিলাম।

এটুকো বলেই আনিকা আবার চলে গেলো। এত লজ্জাবতী নারী আমার জীবনে এটাই প্রথম। কলেজ ভার্সিটিতে কত মেয়ের সাথে উঠাবসা আমার। আমি ধরেই নিয়েছিলাম এমন একটা যুগেও এমন লজ্জাবতীরা গ্রাম-শহরে আর হয়তো নেই। ভাবনাটা শেষ না হতেই হুট করে চেয়ে দেখি খবির চাচা আমাদের বাড়ি এসে হাজির। চাচা এসেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,,

“কি গো বেডা! তোমার আব্বা বাইত আছেনি??

“জ্বি না চাচা! বাবা তো বাড়ি নেই।

“তোমগোর নাঙল আর মৈয়াডা এট্টু দিতারবা?? হাইঞ্জাবালা (সন্ধ্যাবেলা) আবার দিয়া যাইবাম। চাচার কথায় এবার মনে মনে ভাবলাম প্রতিশোধগ্রহণের সময় এসেছে। তাই চাচাকে বললাম,,

“দেখেন চাচা অন্যের উপকার করতে না পারেন, অন্ততপক্ষে কারোর ক্ষতিটা করবেন না।

“কি কইলা বাজান??

“গতকাল যে আনুয়ার চাচার ছাগল খোয়ারে দিলেন! সেই কাজটা কি ভালো হয়েছে?

“আমার ক্ষেতের ধান খাইবো আর আমি খোয়ারে দিতাম না??

“চাচা মামলা করার আগে শত্রুপক্ষকে মামলার হুমকি দিতে হয়। শতর্ক করতে হয়। আপনি শতর্ক না করেই খোয়ারে দিয়ে আসলেন। এদিকে ছাগলের জন্য কত কষ্ট হয়েছে তাদের জানেন কি?? “আচ্ছা বাজান ভুল অইছে আর দিতাম না। “চাচা পুরো খোয়ারের জরিমানার টাকাটা যদি দিতে পারেন তাহলে নাঙল আর মৈয়া এসে নিয়ে যাবেন। “তোমার আব্বা আইলে ঠিহি লইয়া যাইবাম। ফিরাইও তহন। “ঠিক আছে নিয়েন! সবার আগে আমার গল্প পড়তে চাইলে “নীল ক্যাফের ভালোবাসা” পেজে পাবেন। সেদিন খবির চাচা আর নাঙল নিতে আসেনি। পরদিন সকালের ট্রেনে ময়মনসিংহ চলে গেলাম।

ময়মনসিংহ যাবার ঠিক সাতদিন পর আম্মা আমাকে হঠাৎ ফোনে করে বলল,, “তুই আজকেই বাড়ি আয়। জরুরি দরকার। আমার যতই কাজ থাকুক আমি আম্মার ডাকামাত্রই বাড়ি চলে আসি। বাড়ি এসে আম্মার কাছে যা শুনলাম তার জন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। সবেমাত্র এস-এস-সি পরিক্ষা দেবে আনিকা। তাকে কিনা এখনই বিয়ে দেবে তার পরিবার! বিয়ের ঘটকালি টা নাকি করেছেন মুন্সী বাড়ির কিপটে লোক খবির চাচা। বাংলাদেশ সেনা বিভাগে অফিসার পদে সরকারি চাকরি করে ছেলেটা।

আম্মা আমাকে আরও বলল,, “বাবা তুই কষ্ট পাইস না। আমি তরে খুব সুন্দরি মেয়ে বিয়ে করাইবাম। আনিকারেই আমি নিয়া আইতাম। কিন্তু তুই তো কিছুই করস না। কি নিয়া প্রস্তাব দিবার যাইতাম?? আমি আম্মার কথা শুনে খুবই হাসলাম। গ্রাম্য মানুষের সরল মনের সাথে আম্মা বোধহয় আমার মনের তুলনা করেছিলো। ভেবেছিলো আনিকার বিয়ের খবরে আমি ভেঙে পরবো। কিন্তু আম্মার কথা শুনে খুবই হাসলাম আমি। আম্মাও বেশ অবাকই হলো আমার এমন আচরণে। আম্মাকে আমি বললাম,, “আম্মা! এমন তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে তুমি এত জরুরী তলব না করে, ব্যাপারটা ফোনে বললেও পারতে? “এটা তর কাছে তুচ্ছ ব্যাপার?

“হ্যাঁ আম্মা! এটা খুবই তুচ্ছ ব্যাপার। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম অন্যকিছু। যাইহোক শুনো! যদি দাওয়াত পাই! আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে আসব। আমি আবার কাল সকালের ট্রেনে চলে যাবো। অবশ্য দু’চারটা দিন বাড়িতে থেকে গেলে কোন সমস্যা হতনা। কিন্তু আমি আর মায়া বাড়াতে চাইনি। পরদিন সকালে ব্যাগপত্র গুছিয়ে বেড়িয়ে পরলাম। আমার বারান্দার সামনে আনিকাকে দেখে একটু দাঁড়ালাম। কিন্তু কথা না বলে আবারও হাঁটা শুরু করলে আনিকা ডেকে বসলো,, ” মারুফ ভাই! একটু শুনুন?? “কিছু বলবে?? আরে! কি হলো?? তোমার চোখ ভেজা কেনো?? “আপনার জন্য কিছু বকুল এনেছি। নিয়ে যাবেন??

লক্ষ করলাম আনিকার আঁচলভরা বকুল ফুল। আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নাকাটিও করছে। তার এই দৃশ্যটা দেখে কবি নজরুলের একটি গানের কথা মনে পরে গেলো। “নয়ন ভরা জল গো তোমার, আঁচল ভরা ফুল। ফুল নেবো না অশ্রু নেবো, ভেবে হই আকুল।। ফুল যদি নিই তোমার হাতে, জল রবে গো নয়ন পাতে। অশ্রু নিলে ফুটবে না আর প্রেমেরই মুকুল। মালা যখন গাঁথো তখন, পাওয়ার সাধ যে জাগে। মোর বিরহে কাঁদো যখন, আরও ভালো লাগে। পেয়ে তোমায় যদি হারাই, দূরে দূরে থাকি গো তাই। ফুল ফোটায়ে যায় গো চলে, চঞ্চলও বুলবুল।।”

গানের কথা গুলো আনিকাকে একদমে বলে গেলাম। মনে হচ্ছিল আমার চোখ দু’টো ভিজে যাচ্ছে। আনিকাকে বললাম,, “সে কিছু নয়। চোখে পোকা পরলেই আমার জল গড়ায়। তুমি কাঁদতে থাকো। মন ফ্রেশ হবে। এটুকো বলেই চলে এলাম। বকুল গুলো তার আঁচলেই রেখে এলাম। অবশ্য বিয়ের দাওয়াত আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু পরিক্ষার কথা বলে বিয়েতে আসিনি। আনিকার বিয়ের পর আজই প্রথম বাড়ি এলাম। আম্মা আমায় জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁন্নাকাটি করেছে। আম্মা অনেকটা আনমনা হয়ে পরেছে। আম্মাকে ভীষণ একাকীত্ব আকড়ে ধরেছে।

আম্মাদের “ভাবি মিটিং” এর সময়টুকো ছাড়া, আম্মার মত একলা মানুষ আমাদের পুরো বাড়িতে আর নেই দু’জনও। একজন আনিকার অস্তিত্ব, পাগলামো, ছেলেমিপনা, আমার মাকে এতটা একা করে দেবে জানলে! আমি হয়তো সেদিন আনিকার চোখ দু’টো মুছে দিয়ে বলতাম,, “আনিকা! চলো আজ সকালের ট্রেনে আমার ছোটবোনের বাসায়’ তোমায় নিয়ে লুকিয়ে রাখি??

ঠিক সময়টা হারিয়ে আমরা হারানো জিনিসের মূল্যায়ন বুঝি। আমার মনে হচ্ছে আমার এই ছোট্ট বুকে কেউ যেন প্রতিনিয়ত টুকরো টুকরো পাথর দিয়ে আঘাত করছে। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করছে পালিয়ে গিয়ে দূরদেশী হই।কিন্তু পারছিনা কিছুই। সকাল হলে এখন আর বকুল কুড়াতে বাগানে যাওয়া হয়না। ইচ্ছে করে বকুল গাছটাই কেটে ফেলি। বকুল দেখলেই এখন আমার চোখ ভিজে যায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত