রাসেল ভাই

রাসেল ভাই

রাসেল ভাইকে প্রথম দেখেছিলাম মনে হয় আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন। একদিন প্রাইভেট থেকে বাসায় এসে দেখি ভাইয়ার রুমের দরজা বেশ খানিকটা ফাঁকা উকিঁ দিয়ে দেখি গাট্টাগোট্টা একটা ছেলে বসে আছে ভাইয়ার রুমে। আমি এক পলক দেখেই সরে গিয়েছিলাম কেমন জানি ভয় করতেছিল ওই লোকটাকে দেখে। এর পর মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় আসা শুরু করল সে। প্রায় এসে মিলিরে কোলে বসিয়ে আদর করত আর আমার দিকে কেমন কেমন করে জানি তাকাতো।

বড় আপুরেও মাঝে মাঝে পড়ার নানান বিষয় নিয়ে কথা বলত। কিন্তু আমি বুঝতাম না মানুষটার আমার সাথে কি সমস্যা ছিল। আমাকে দেখলেই চোখ গরম করে তাকাতো কথা বলত ক্সলে ভাদ্রে। এমন করে চলতে চলতে আমি ক্লাস এইটে যে বছর উঠলাম তখন প্রতিদিন সাড়ে ছয়টার সময় বের হতাম বাসা থেকে। আমি মিলি জিমি তিনজন স্কুলে যেতাম আর হঠাৎ করেই একদিন খেয়াল করলাম রাসেল ভাই আমাদের পিছ পিছ যাওয়া শুরু করল। এত সকাল বেলা ভাইয়ারে বোম মারলেও উঠে না সেখানে সে সাড়ে ছয়টার সময় আমাদের পিছ পিছ স্কুলে যেত আর স্কুল ছুটি দিলে আবার আসতো। একদিন মিলি রেগে মেগে খালাকে বলল,

___ ” আম্মা তোমার পোলার বন্ধু আমাদের পিছ পিছ স্কুলে যায় আর আসে।”
___ ” তাইলে তো ভালই হইল আমার টেনশন কমলো তোদের স্কুলে যাওয়া নিয়ে।”

খালা হাই তুলতে তুলতে বলল। খালার উওর শুনে মিলি তো ভালই আমি আর বড় আপুও হাঁ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের স্কুলে মেয়েরা সকালের শিফটে আর ছেলেরা দুপুরের শিফটে ক্লাস করত। ছুটির সময় বের হইছি আর হঠাৎ এক ছেলে এসে হাটু গেড়ে বসে বলল,

___ ” নুপুর আই লাভ ইউ “।

আমি যেন ভয়ে জমে গিয়েছিলাম। সাথে সাথে উলটো ঘুরে এক পর্যায়ের দৌড় শুরু করলাম আর দৌড় শেষ হল আমাদের বাসার নিচে এসে। পিছনে দেখি মিলি জিমিও দৌড়ে এসেছে। আমি মিলিরে জড়ায়ে ধরে হায়রে কান্না। পরের দিন বহুত পায়তারা করেছি স্কুলে না যাওয়ার কিন্তু খালা জোর করে পাঠিয়ে দিল। স্কুলে ক্লাস কি ভাবে করেছিলাম জানি না। স্কুল থেকে ভয়ে ভয়ে বের হতেই দেখি সেই ছেলে আমার পা জড়ায়ে ধরে সবার সামনে মাফ চাচ্ছে। আমি অবাক হওয়ার সাথে সাথে ভয়ও পেলাম। কি হচ্ছে কি কিছুই যেন বুঝতে পারছিলাম না। বেশকিছুক্ষন পরে ছেলেরে বুঝায়ে শুনায়ে পা ছাড়ালাম। ছেলে তখন আমারে বলল,

___ ” আপু রাসেল ভাইয়ারে একটু কষ্ট করে বলবেন আপনি আমারে মাফ করে দিয়েছেন। ”

তখন আমার আরেক দফা অবাক হওয়ার পালা।আমি সেই ভিড়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে রাসেল ভাইকে খুঁজতে লাগলাম কিন্তু পেলাম না। ক্লাস নাইনে উঠলে ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হল। তখন রাসেল ভাই পারমানেন্ট আমাদের বাসায় চলে এলো ভাইয়ার বিয়ে উপলক্ষে। গায়ে হলুদে শাড়ি পরেছিলাম বেশ স্টাইল করেই। যখনই আমি ছাদে গেলাম হলুদের স্টেজে রাসেল ভাই বেশ কিছুক্ষন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে সোজা হনহনিয়ে আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। ভাবলাম হয়ত কিছু বলবে কিন্তু ও আল্লাহ কিছু না বলেই আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। এক পর্যায়ে হেঁচড়ে নিচে নিয়ে এসে বাসার লক খোলালো আমারে দিয়ে। ভয়ে তখন আমি আধমরা প্রায়। সোজা আমার থুঁতনি সজোরে উঁচু করে বলল,

___ ” দশ মিনিট টাইম দিলাম তোরে এক্ষুনি শাড়ি খুলে থ্রিপিস পরে বের হবি। ”
___ ” সবাই শাড়ি পরেছে আমিও একটু পরেছি তাতে কি হয়েছে? ” আমি কোন মতে শব্দগুলো গলা দিয়ে বের করতেই আমার খোঁপার মুঠি চেপে ধরে বলল,

___ ” সবাই ছাদ থেকে লাফ দিলে তুইও দিবি লাফ?? কতগুলো মানুষের মধ্যে ডিস্কো ড্যান্সার সেজে ঘুরতেছেন উনি। যা তাড়াতাড়ি যেমন বলেছি তেমন করে আয়।”

ড্রাগনের মত চোখ দিয়ে আগুনের হল্কা বের করতে করতে বলল রাসেল ভাই। কি আর করার ভাইয়ার পুরো হলুদের প্রোগ্রাম আমি ক্যাটকেটে সবুজ থ্রিপিস পরে ঘুরেছি। এখনও পিক দেখি আর আফসোস করি সবাই শাড়ি পরে স্মাইলি ফেসে পোজ দিছে আর আমি কাজের বেডি রহিমার মত এক কোনায় দাঁড়ানো। ভাইয়ার বিয়েতেও রাসেল ভাই এক কথায় আমার বডিগার্ড হয়ে ঘুরেছে। কোন ছেলে কথা বলতে আসলেই আমার ভয়ে হাত পা ঠান্ডা যেত। আর সে বিশাল রাগী ফেসে আমার দিকে তাকাতো। যেন আমিই ছেলেটাকে দাওয়াত করে এনেছি আমার সাথে কথা বলতে। বড় আপুর বিয়ের সময় ভাইয়ার আর উনি দুই হাতে রাজ্যের রঙ লাগিয়ে বসে আছে। আমি প্লেটে ভাত নিয়ে খাচ্ছি ওদের পাশে বসেই। তখন ভাইয়া বলল,

___ ” বাবু এক কাজ করত তো প্রচুর ক্ষিধে পেয়েছে আমার মুখে ভাত দে “। ভাইয়া আমার হাতে প্রায় ভাত খায় এটা কমন ব্যাপার তাই আমিও ভাত মেখে মেখে ভাইয়ার মুখে ঢুকাচ্ছি। ঠিক তখন হঠাভাইয়া,রাসেল ভাইয়ের দিকে ঘুরে প্রশ্ন করল,

___ ” রাসেল তুই খাবি “?

আমি হঠাৎ উনার দিকে ঘুরে দেখি বেচারা শীতের মধ্যেও ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা। আমি এক লোকমা ভাত রাসেল ভাইয়ের মুখে দেই কাপা হাতে আর উনি যেন আরো বেশি করে ঘামে। সে এক যা তা অবস্থা। এমন করেই যাচ্ছিল দিন। ভাইয়ার ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যে অনেকেই ভাবী ডাকা শুরু করল। ইভেন ভাইয়া পর্যন্ত জানত যে রাসেল ভাই আমাকে পছন্দ করে। আমার অভ্যাস হল রাত জেগে পড়া। পড়া শেষ করে দুইটা আড়াইটায় ডেইলি বারান্দায় যেয়ে বসতাম। এর পরে খেয়াল করা শুরু করলাম ওই রাত্রে বেলায় রাসেল ভাই ল্যামপোষ্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকত। এত রাতের বেলায় উনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বুকের কোনায় কেমন জানি চিনচিনে ব্যাথা করত। যাতে উনি না আসে রাতে তাই বারান্দায় যাওয়াই বন্ধ করে দিলাম। তারপরও জানলার আড়ালে উঁকি দিয়ে দেখতাম মানুষটা ঠিকই দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটে চেপে হাসতাম আর ভাবতাম মানুষটা এত পাগল কেন? একবার আমার জন্মদিনে মিলি জিমি আমার চোখ বেঁধে ছাদে নিয়ে যায় রাত বারোটার কাছাকাছি সময়ে। এত বার জিজ্ঞেস করতেছি যে,

___ ” কই নিয়ে যাচ্ছিস আমাকে? ”
___ ” বাবু আপু একটু থামো তো। এমন করতেছ মনে হচ্ছে জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছি।”

মিলি আমার চেয়ে জোরে ঝাড়ি দিয়ে বলল। টের পেলাম আমাকে ছাদে নিয়ে এসেছে ওরা দুইটা মিলে। আমাকে ছেড়ে দিতেই আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম চোখ বাঁধা অবস্থায়। বেশ কিছুক্ষন পরে ওদের সাড়া শব্দ না পেয়ে যেই চোখ খুলেছি তখন চোখের সাথে আমার মুখও হাঁ হয়ে গেল। সারা ছাদ বেলুন দিয়ে ভরা। অনেক গুলো মোম জ্বলছে আর মাঝে ছোট্ট একটা টেবিলে একটা কেক রাখা। কেকের ওপাশে সাদা পাঞ্জাবি গায়ে রাসেল ভাই দাঁড়ানো। আমাকে এমন হাঁ করে থাকতে দেখে বিশাল এক ঝাড়ি দিয়ে বলল,

___ ” এমন করে তাকিয়ে আছিস যেন পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য দেখতেছিস। তাড়াতাড়ি কেক কেটে আমারে উদ্ধার কর”। আমার চোখ থেকে তখন অঝোরে পানি গড়াচ্ছে টপটপ করে। কিছু না বলে মানুষটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম,

___ ” ভালবাসি অনেক “।
___ ” সেন্টি মার্কা কথা না বলে কেক কাট। শীত করতেছে অনেক।”

এই হল আমার রাসেল ভাই। সারাজীবন কখনও বলে নি যে ভালবাসে আমাকে। কিন্তু আমি জানি আমার চেয়ে বেশি ভালবাসে সে আমাকে। অদৃশ্য এক ছাতা আমার জন্য ওই মানুষটা। যত রাগ যত অভিমান সব আমার উপরে কিন্তু দিন শেষে তার সবটুকু ভালবাসাও আমায় ঘিরে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত