চাকুরি অভিজ্ঞতা

চাকুরি অভিজ্ঞতা

৫ বছরের উপরে ব্যাংকিং করি।আর সব মিলে চাকুরির অভিজ্ঞতার ঝুলিতে বছরের সংখ্যা ৭ এর মতো! বাংলালিংকে যখন ছিলাম তখন ছিলাম কেয়ারলাইন অফিসার হিসেবে কল সেন্টারে আবার ব্যাংকেও আছি রিটেইলে ক্রেডিট কার্ডের লোন সেকশনে।দুটো জায়গাতেই ক্লায়েন্টদের একদম কাছ থেকে জেনেছি, চিনেছি বা উপলব্ধি করেছি।অনেক ক্লাইন্টেরই আস্থার জায়গা এই আমি! কিছু ক্লায়েন্টতো বিদেশি এই ব্যাংক বলতে আমাকেই বুঝে! তাদের ধারনা, আমি যা বলবো তাই বেস্ট!

খুব আদুরে কিছু বয়স্ক ক্লায়েন্ট আছেন যারা “মা” ডেকে কথা বললে মন ভরে যায় আবার বিপরীতভাবে কিছু উদ্ভট মস্তিষ্কের পাগল ক্লায়েন্টদেরও দেখেছি আমি।যে কারনে এতগুলো কথা বলা তা হলো- আজ এক ক্লায়েন্ট আমাকে আমার অফিস নাম্বারে কল করে বলছে,

– আফরিন মান ইজ্জত পুরা শেষ করে দিলা তুমি!

– কেনো স্যার? আমি কি করেছি?? খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম উনাকে।

– এই যে তুমি আমাকে চিঠিগুলা পাঠাইছো, গুনে দেখছো একবার কয়টা চিঠি ছিলো? ২১ টা চিঠি আফরিন, ২১ টা।ভাবা যায়? কুরিয়ার সার্ভিস যখন আমার বাসার ঠিকানায় চিঠিগুলো হ্যান্ডওভার করতে এলো , তখন আমার বাসা ভর্তি শশুর বাড়ির লোকজন! মান ইজ্জত থাকলো কিছু? দারোয়ান এসে আমার হাতে চিঠিগুলো দিয়ে বললো, স্যার নেন আপনার লোনের কাগজ! ওরা ভাববেনা আমি শুধু লোনের উপরেই চলি??

– আমি তখনো মনোযোগ দিয়ে উনার কথা শুনে যাচ্ছি।কারন আমি ঘটনার আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছিলামনা।ভদ্রলোকের বয়স ৬০ এর কাছাকাছি! তো উনাকে ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার চিঠির উপর কি লিখা ছিলো??

– কনফিডিন্সিয়াল !!

– অহ খুলে দেখেননি? আমাকে একটু পড়ে শোনাতে পারবেন এখন স্যার!

– তো উনি পড়া শুরু করলেন! অল্প একটু পড়ার পরেই আমার কাছে ঘটনা পানির মতো ক্লিয়ার! তারপরো উনার একটা চিঠি পড়া শেষ হবার পর আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম, স্যার আপনি কি কখনো কল সেন্টারে কল দিয়ে আপনার শপিং করা এমাউন্টগুলোকে কিস্তি বা EMI করে নিয়েছিলেন?

– অহ হ্যাঁ , তোমাদের ওখান থেকে কে যেনো কি করে দিয়েছিলো! ওয়েট ওয়েট, এই চিঠিগুলো কি সেই EMI এর?

– জ্বী স্যার, কারন আমিতো আপনাকে চিঠি পাঠাতে পারবোনা স্যার।আপনার সুবিধার জন্যই ব্যাংক এই চিঠিগুলো পাঠিয়েছে! আর ভালোইতো হলো স্যার শশুর বাড়ির লোকেরা জেনে গেলো, আপনি স্টিল কতো স্মার্টলি ক্রেডিট কার্ড ডিল করেন।তাও আবার SCB এর কার্ড, তাইনা স্যার?

– ইয়েস ইয়েস, থ্যাংক ইউ আফরিন!

– ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম স্যার।

তো উনাকে সব বোঝাতে পারলেও আরেকজনকে কিছুতেই বোঝাতে পারছিলামনা যে, ক্রেডিট কার্ডের ফুল স্ট্যাটমেন্টে প্রত্যেকটা ইনডিভিজুয়াল ট্রানজেকশন এমাউন্টই দেখা যাবে।ভদ্রলোকের এতে ঘোরতর আপত্তি! সে আমাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো, হোটেল বিলগুলো কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন? আমার বৌ যদি স্ট্যাটমেন্ট হাতে পায় সে কি বুঝতে পারবে কোথায় কোথায় কার্ড ইউজ করেছি?

– অবশ্যই পারবে স্যার! আপনি এক কাজ করতে পারেন, হার্ডকপি না নিয়ে ইমেইলে নেয়ার রিকুয়েস্ট রাখতে পারেন আমাদের কল সেন্টারে।

– ভদ্রলোক মন খারাপ করে উত্তর দিলেন, বৌ মেইলের পাসওয়ার্ড জানে!

– আমি ফিক করে হেসে দিতে গিয়েও থেমে গেলাম, চাকুরির নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ ভাব গাম্ভীর্য বজায় রেখে উনাকে উত্তর দিলাম, তাহলে এখন কি করতে পারি স্যার?

– কার্ড বন্ধ করে দিবো!!

কি আর করা!! ব্যাংকের ক্লায়েন্টগুলো সামলাতে সামলাতে বাংলালিংকের ক্লায়েন্টগুলোর কথা মনে পড়তেই মনে মনে হো হো করে হেসে দিলাম!! ২০১৩ এর ঘটনা।আমার দ্বিতীয় চাকুরি এটা। একদিন ভোরের শিফটে এক ক্লায়েন্টের ফোন এলো! সে হন্তদন্ত হয়ে ফোন করেই বলতে লাগলো..

– আফা, আমারে চাবিডা দেন! আমার মোবাইলো তো তালা লাইগ্গা গেছেগা! ঐ যে মোবাইলের উফরে তালার মতো চিহ্ন দেহা যাইতাছে..
– চাবি? তালা???
অনেকক্ষন কথা বলে, উনাকে অনেক বুঝিয়ে, সমস্যার সমাধানে সক্ষম হলাম! ঘটনা হলো, উনি একজন রিকশাওয়ালা ছিলেন! সিমে সমস্যা ছিলোনা কিন্তু উনার মোবাইল লক হয়ে গিয়েছিলো! এই আর কি অবস্থা! আবার আরেকদিন, এক ক্লায়েন্ট বাংলালিংক কল সেন্টারে কল দিয়ে বললো, পুক কোডটা একটু দিবেন??

– পুক কোড কি?
– এনো দেহাইতাছে.. PUK পুক।বুঝছেন আফা? যাইহউক আবারো, অনেকক্ষন কথা বলে, উনাকে অনেক বুঝিয়ে, সমস্যার সমাধানে সক্ষম হলাম!

ঘটনা হলো PIN আর PUK কোড নিয়ে উনি প্যাঁচ লাগিয়ে ফেলেছিলেন। ঘটনাচক্রে আরেকদিন আমার একটু ঠান্ডা লাগায়, বাংলালিংক কল সেন্টারে এক ক্লায়েন্ট তার সার্ভিস নেয়া শেষ করে আমাকে তেজপাতা দিয়া বিড়ি বানাইয়া টাইনা টাইনা খাইতে বলছেন।এতে করে নাকি আমার ঠান্ডা ভালো হয়ে যাবে। আমি অবশ্য পরে কোনদিন এই জিনিস ট্রাই করে দেখিনি।আপনাদের কারো এ ব্যাপারে কোন অভিজ্ঞতা থাকলে আমাকে অবশ্যই জানাবেন প্লিজ!

আবার, আরেক ক্লায়েন্ট কল সেন্টারে কল করে তার বৌয়ের নাম্বারের কল লিস্ট আর কার সাথে কথা বলে তার নাম জানতে চেয়েছিলো!! সে লোক কাঁদতে কাঁদতে শেষ।আহারে! কেউ কেউ ফ্রেন্ড ফাইন্ডার সার্ভিস নিয়াতো সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে কল সেন্টারে কল দিয়ে মিলাদের মিষ্টি খাওয়াতে চেয়েছিলো! কারন সে ঐ সার্ভিস নিয়েই নাকি প্রেমিকার চিটিং ধরে ফেলছিলো তাই সে বেজায় খুশি!

কারো কারো ওয়েলকাম টিউন সেট করতে গিয়েতো হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেতো! এমন এমন গানের নাম বলতো… আর নাইবা বললাম! আচ্ছা ১/২ টা বলি— তোমার মাথার উপর ঠাডা পড়ুক কেনো করছো বেইমানি, সুখের চোটে কিলিক লাগে মনে, পরান বন্ধু তুমি আমার জীবন নদীর ভরা ঢেউ!! আমাকে ধরেন কেউ!! আমি হাসতে হাসতে নিজেই মরে যাচ্ছি পুরানো স্মৃতি মনে করে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত