দেবদাস

দেবদাস

ক্লাস ফাইভে বুঝতে পারলাম বান্ধবী মাধবীলতার উপর আমার দূর্বলতা আছে। লাস্ট ব্রেঞ্চে এখন আর বসিনা। ফাস্ট ব্রেঞ্চে বসে বইয়ের আড়ালে আড়ালে মাধবীলতার মায়াবী সেই মুখটা দেখি “কি অপূর্ব দেখতে”।

সামনে আমাদের পি.এস.সি পরিক্ষা সবাই ২৪ ঘন্টাই বই নিয়ে পরে থাকে।এমনকি ক্লাসের নিয়মিত কান ধরে বাইরে দাড়িয়ে থাকা ছেলেটাও পর্যন্ত। কিন্তু আমি মাধবীলতা আর মাধবীলতা!একটা মিনিট তাকে ছাড়া ভাবতেই পারিনা।ঘুমের ঘোড়ে তাকে স্বপ্ন দেখি, বসে বসে গালে হাত দিয়ে স্বপ্ন দেখি, হাঁটতে হাঁটতে তাকে ভেবে দেওয়ালেও ধাক্কা খেয়ে পরেছিলাম। পরিক্ষায় মাধবীলতা এবার অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে ‘গোল্ডেন প্লাস’।নিজের থ্রি পয়েন্ট পেয়েও খুশি তার নরম হাতের মিষ্টি খাওয়ার আনন্দ।কিন্তু এখনো ভাগ্য সহায় দিলো না।আমার কাছে আসতেই মিষ্টি শেষ হয়ে গেলো।

– ইসস সোহান খুব আফসোস লাগছে তোমাকে মিষ্টি খাওয়াতে পারলাম না।নিজেরই কষ্ট লাগছে।
– মিষ্টি না হলো মিষ্টির ঝোল তা আছে।সেটাই না হয় দাও খাই।হাজার হলেও তোমার পাস করার মিষ্টি।
– স্যরি সোহান।একটুও রাখে নায় সব চেটেপুটে খেয়ে নিছে।

মনে মনে নিজেকে শান্তনা দিলাম।এবার খেতে পারিনি তো কি হয়ছে জে.এস.সি পরিক্ষায় ঠিকি মিষ্টি ভাগ্যে জুটবে। দেখতে দেখতেই কেটে গেলো কয়েকটা বছর এর মাঝে মনের কথাটা বলার সুযোগ হলো না।মনে সাহস না থাকলে কখনোই বলা যায় না।আমাকে অনেক বার অনেক রকম ইঙ্গিত ও দিয়ে ছিলো ‘ও আমাকে ভালোবাসে’।
জে.এস.এসি পরিক্ষা চলছে এমন সময় বারান্দায় একজন এসে বলল।

– মাধবীলতার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।আজ ওর বিয়ে। পরিক্ষার হল কাপানো চিৎকার দিয়ে দরজা কাছে ছুটে যেতেই স্যার হাত ধরে ফেলে।
– প্লিজ স্যার আমাকে যেতে দিন।আমার মনের মানুষটার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।
– ১ ঘন্টার আগে বের হওয়া নিষেধ।এটাই নিয়ম।
– স্যার আমি তাকে ভালোবাসি তাকে ছাড়া বাঁচবো না।মরে যাবো, মদ খাবো, আত্মহত্যা করে আপনাকে ভূত হয়ে রাতে জ্বালাতন করবো প্লিজ স্যার প্লিজ।
– যা জিলে আপনে জিন্দিগি।

স্যারের চোখে পানি হয়তো সেও ছ্যাঁকা খাইছে অথবা আমার কথায় ইমোশনাল হয়ে গেছে।বাসায় এসে ফোন থেকে মাধবীলতাকে কল করতেই ওপাশ থেকে বলল।

– কি চাস?
– মাধবীলতা আমি তোমাকে হারাতে চাই না।ভালোবাসি তোমাকে।
– গাঁধার বাচ্চা আগে বলতে কি হয়েছিলো? আমি তো এখন শশুগ বাড়ি চলে আসছি।

টু..টু! ফোন কলটা কেটে দিলো ওপাশ থেকে। এমন সময় ফেসবুকে কয়েকটা একটা স্যাড পোস্ট না দিলেই নয় ‘ভালোবাসা গুলো সব সময় ভুল মানুষদের সাথে হয়’।কিছু সহমত পোস্ট আর স্যাড রিয়েক্ট দেখে খুশি হলাম।কিন্তু মাধবীলতার জন্য মনটা কেমন কেমন করছে।বারে গিয়ে দুই তিন প্যাগ খেলাম তবুও কষ্ট কমলো না।

১ বছর পর তার একটা বাচ্চাও হলো। এই দুঃখ্য আর সহ্য করতে পারলো না আমার পোড়া হৃদয়।এখন আমি পড়ালেখার পাশাপাশি রোজ রাতে ড্রিংক করে আসি।কাজের মেয়ে মুখে শাড়ীর আঁচল মুখে গুজে কাঁদে সে নাকি আমার কষ্ট সহ্য করতে পারেনা।আমার কষ্ট নাকি তার কষ্ট। পড়ালেখা শেষ করে চাকরির খোঁজে নেমে পরলাম। চাকরি করবো ঠিকি তবুও বিয়ে করবো না।কারণ মন একজনকে দেওয়া যায় দুজনকে না।চাকরি পাওয়ার এক মাস পর থেকেই বাবা মা পাত্রী দেখা শুরু করে দিয়েছে এটা জানাতে সত্তেও যে আমি অন্য একজনকে ভালোবেসে ছিলাম।শুধু একটা কথায় বলতাম ‘না এই মেয়েটাকে দেখতে তেমন ভালো না’। ৩৩ পার হয়ে গেছে বয়স। এখনো বিয়ে করিনি বাবা তার মাথায় হাতে রেখে বলে।

– বিয়ে করবি নাকি আমার মরা মুখ দেখবি।
– আচ্ছা বিয়ে করবো।
– কেমন পাত্রী পছন্দ তোর?
– তোমরা যার সাথে বিয়ে দেবে তার সাথেই আমি বিয়ে করতে রাজি।

পাত্রী দেখতে গিয়ে দেখি স্কুল জীবনের মনের মানুষ, আমার স্বপ্নের রানী, এক সময়ের বান্ধবী ‘মাধবীলতা’।দুজনেই লজ্জায় কারো দিকে কেউ তাকাচ্ছি না।বাবা পরিচয় করিয়ে দিলো।

– এই হলো তোমার হবু শশুড় আর শাশুড়ি। মানে মাধবীলতা শেষমেশ আমার শাশুড়ি হতে যাচ্ছে ছিঃ এটা কিভাবে সম্ভব।তাকে তো আমি পছন্দ করতাম।মাধবীলতা তার মেয়েকে আড়ালে ডেকে বললো।

– এই ছেলের সাথে তোর বিয়ে হচ্ছে না।বয়স্ক লাগে।
– তুমিও এমনই ছেলেকে বিয়ে করছো।আর দেখে মোটেও বয়স্ক লাগে না।আমি তো এক পায়ে রাজি বিয়ে করতে।
মাধবীলতা হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো।তার বুঝি আর সম্মানটা থাকলো না কিভাবে মুখ দেখাবে সে জামাইয়ের সামনে ছিঃ। ধুমধাম করে বিয়ে হলো। কিছু দিন পর আমাকে আর নতুন বউকে শশুড় বাড়ির দাওয়াত শীতের।শাশুড়ি আম্মা ভাত বেরে দিতে দিতে বল।

– তুই করে বলব নাকি তুমি।যেহেতু ক্লাসমেট ছিলাম আমরা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত