পাশের বাসার আন্টি

পাশের বাসার আন্টি

আমাদের পাশের বাসার আন্টির মতে আমার মতো খারাপ মানুষ এই দুনিয়াতে আর একটাও নাই। তার চোখে আহসান হাবীব পেয়ারও আমার চেয়ে ভালো মানুষ।

ছোটবেলায় কোনোভাবেই তার ছেলেমেয়েদের আমার সাথে মিশতে দিতেন না। সবসময় বুঝাতেন এইসব বাজে ছেলেদের সাথে মিশতে নেই। তার ভাবটা এমন আমার সাথে মিশলেই তার ছেলে একেবারে পঁচে গোবর হয়ে যাবে। অথচ ব্লুফিল্ম জিনিশটা কী তার থিওরিটিক্যাল আর প্র্যাকটিকাল ব্যাখা কিন্তু জীবনে প্রথম আমি তার ছেলের কাছ থেকেই জেনেছিলাম।

কোনো কারনে তার ছেলের জ্বর আসলেও তিনি সেখানে আমার দোষ খুঁজতেন। ভাবতেন আমার সাথে বোধহয় রোদে-রোদে ক্রিকেট খেলে তার ছেলের জ্বর এসেছে। তার ছেলের জ্বর, সর্দি, আমাশা, ডাইরিয়া, যা-ই হোক সবকিছুতেই আমার দোষ। এমনকি পেন্টের চেইনে ঐটা আটকে গেলেও আমার দোষ। ছোটবেলার পর একটু বড়বেলায়, মানে যখন নাইন টেন-এ পড়ি, তার মেয়ে পিয়াস নামে আমার এক বন্ধুর সাথে চুটিয়ে প্রেম করে। সেই মেয়ে না-কি আসলে আমার বন্ধু পিয়াস না, আমাকেই ভালোবাসত।

যেই মহিলারে মহল্লার এক রাস্তায় দেখলে আমি আরেক রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরি সেই মহিলার মেয়ের সাথে প্রেম! ভাবা গো ভাবা, কী কপাল আমার! পিয়াসের মুখে ঐ কথা শুনার সাথে-সাথেই আমি কয়েক হাজার ভোল্টের একটা শক খেয়েছিলাম এবং সাথে-সাথে নমস্কার বলে দিয়েছিলাম। অন্যদিকে বন্ধু পিয়াস আমার প্রেমের ঘটকালি করতে গিয়ে একসময় নিজেই প্রেমিক হয়ে যায়।  পিয়াসের মা, আর আমার পাশের বাসার আন্টি আবার ছোটবেলার বান্ধবী। সেই হিসেবে তাদের বাসায় পিয়াসের যাতায়াত। আর সেখান থেকেই এতসব ঘটনা।

কিন্তু এই ঘটনা যেদিন রটনা হয়ে গেল আন্টি সেদিন সোজাসুজি আমাদের বাসায় চলে এলেন। পিয়াসের মা তার বান্ধবী তাতে কিছু যায়-আসে না। পিয়াস আমার বন্ধু তাতেই যতো দোষ। তার এক কথা আমি পাড়ার মোড়ে সব বাজে ছেলেদের নিয়ে আড্ডা দেই, আর সেজন্যই আজ তার মেয়ের এমন সর্বনাশটা হলো। অথচ অন্যদিকে আমি যে তার মতো একটা দজ্জাল শাশুড়ী পাবার ভয়ে আমার অতটুকু বয়সে আমার প্রথম ভালবাসাটা ঐভাবে বন্ধুর কাছে বিসর্জন দিয়ে দিলাম সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ নেই।

যাইহোক তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। রাত গেছে। বছর গেছে। বুড়িগঙ্গার কালো জল আরো কালো হয়েছে। কিন্তু আন্টি একটুও বদলায়নি। এখনো তিনি আমার দোষ খুঁজেন। চোখে আগের মতো ভালো দেখেন না, চশমা লাগে। আর সেই ঘোলা চশমা নিয়েও তিনি আমার দোষ খুঁজেন।

তার ছেলে এসএসসি-তে সাইন্স নিয়ে রেজাল্ট খারাপ করল। সেটা আমার দোষ। কারণ আমার দেখাদেখি না-কি সে সাইন্স নিয়েছে। ইন্টারে কমার্স নিয়ে আবারো খারাপ করল, সেটাও আমার দোষ। কারণ আমার পরামর্শে না-কি কমার্স নিয়েছে। অনার্সে ইংরেজি পড়তে গিয়ে খারাপ করেছে। সেটাও আমার দোষ। কারন আমিই নাকি তার ইংরেজিতে কাঁচা ছেলেটাকে জেনেশুনে ইংরেজিতে পড়ার কু-পরামর্শ দিয়েছি। মাস্টার্সে বাংলা নিয়ে পড়তে গিয়ে তার ছেলের রেজাল্ট আবার খারাপ হলো। সেখানেও আমার দোষ। কারণ আমি-ই নাকি তাকে বাংলার মতো কঠিন একটা সাবজেক্টে পড়তে বলেছি।

যাইহোক কিছুদিন আগে আন্টির ছেলের এত বছরের কষ্ট কিছুটা লাঘব হলো। সারাদিন একরকম দম আর ঘর বন্ধ করে পড়াশোনা করার ফলে কিছুদিন আগে তার একটা সরকারি ব্যাংকে চাকুরী হয়েছে। বান্দরবান পোস্টিং।

এদিকে দু’বছর আগে বুয়েট থেকে বের হয়েও আমি বেকার। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল পুলিশে চাকরি করবার। তাই একের পর এক বিসিএস দিয়ে যাচ্ছি। আমার বন্ধু-বান্ধবরা প্রায় সবাই যেখানে কোনো-না-কোনো আইটি ফার্মে জয়েন করে ফেলেছে সেখানে আমি এখন পর্যন্ত কোথাও এপ্লাই পর্যন্ত করিনি।

আমি আমার চাকুরির ব্যাপারে নিরুত্তাপ হলেও আমার পাশের বাসার আন্টি কিন্তু চুপচাপ বসে নেই। তিনি গোটা এলাকায় সদর্পে বলে বেড়াচ্ছেন— আমার পাপের জন্যই না-কি আমার চাকুরি হচ্ছে না। এতদিন ধরে তার ছেলেমেয়েদের অনেক ক্ষতি করেছি, এখন না-কি সেইগুলারই শাস্তি পাচ্ছি।

নাহ্…এই আন্টির যন্ত্রণা আর নেয়া যাচ্ছে না। সেই ছোটবেলা থেকে সহ্য করে আসছি। এবার এর একটা বিহিত করা দরকার। কী করা যায়? কী করা যায়? ওমম্..আইডিয়া। একটু আগে আনারস খেয়েছি। এখন দুধ খেয়ে মরে গেলেই হয়। পাশের বাসার আন্টির এমন যন্ত্রণা থেকে আনারস আর দুধ খেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।

আর দেরি না করে দুধ আনতে কিচেনে গেলাম। কিচেনে ঢুকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই আন্টিদের বাসার সামনে ছোটখাটো একটা জটলা চোখে পড়ল। সেই জটলা আস্তে-আস্তে বড় হচ্ছে। এখন কিচেন থেকেও শোরগোল শুনা যাচ্ছে। ঘটনা কী?

সুইসাইড প্ল্যান ক্যান্সেল করে ঘটনা জানতে বাসার নিচে গেলাম। এ-কান ও-কান করে একটু পরে আসল ঘটনা জানতে পারলাম। আমাদের পাশের বাসার আন্টির মেয়ে নিধির কিছুদিন আগে বিয়ে ঠিক হয়েছিল। কিন্তু গতকাল না-কি নিধি হঠাৎ সেন্সলেস হয়ে পড়ে যায়। পরে সবাই ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার বিভিন্ন টেস্ট করতে দেয়। আর সেইসব টেস্ট থেকে আজ জানা যায় নিধি নাকি মা হতে চলেছে, তার পেটে কয়েক মাসের বাচ্চা।

এই ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে ছেলেপক্ষ বিয়ে বাতিল করে দেয়। আর ছেলেপক্ষ বিয়ে বাতিল করেছে শুনে নিধি গলায় দড়ি দিতে যায়। বাড়ির কজের মেয়েটা সেটা দেখে ফেললে চিল্লাচিল্লি করে লোক জড়ো করে ফেলে।

আচ্ছা, নিধি নাহয় বেঁচে গেল। কিন্তু এই বাচ্চাটা কার? কে এর বাবা? আন্টি কার কথা ভাবছে? কাকে সন্দেহ করছে? ও মোর খোদা! যে মহিলা তার মেয়ে একদিন স্কুল পালালে আমার দোষ দিত, তার নিজের বান্ধবীর ছেলের সাথে প্রেম করার পরেও সেখানে আমার দোষ খুঁজত, একদিন রাতে তার মেয়ে একটু দেরি করে ঘুমালেও যেখানে আমার দোষ খুঁজেন, সেখানে সেই মহিলা তার মেয়ের পেটের বাচ্চার জন্য আর কাকে দায়ী করতে পারেন! না…না, না, এখানে আর কিছুতেই থাকা যাবে না। এখন আমার জন্য বাসায় থাকার চেয়ে সুন্দরবন থাকাও বেশী নিরাপদ। এমনকি পাশের বাসার আন্টির চেয়ে সুন্দরবনের বাঘও এখন আমার কাছে কম হিংস্র। আর দেরি না, কিছুতেই না। যেভাবেই হোক আজকে রাতের ট্রেনেই আমাকে সুন্দরবন চলে যেতে হবে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত