ভয়ের বিষ

ভয়ের বিষ

আমার প্রথম সেলিং, সদ্য কিছুদিন হলো জাহাজে পা রেখেছি।নীল ছবির মতো বিস্তীর্ণ সমুদ্র, মাথার ওপর খোলা নীল আকাশ তাতে নরম তুলোর মতো মেঘের ছেঁড়া টুকরো। ডিউটির ফাঁকে সময় পেলেই প্রাণ ভরে সমুদ্রের বিশুদ্ধ টাটকা বাতাসে শ্বাস নিই আর কখনো কখনো সমুদ্রের গভীরতার সাথে সাথে নিজেকে মাপার চেষ্টা করি। তখনো সমুদ্রগর্ভের সামুদ্রিক প্রাণী কিংবা জাহাজের ভেতরে থাকা আমার সহকর্মী বা সিনিয়রদের কাউকেই সেভাবে বুঝে উঠিনি।

একদিন আমার জাহাজের সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ারদের উদ্যোগে(বিশেষ করে সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারের উদ্যোগে)ঠিক করা হলো ডিউটি শেষে সমুদ্রে মাছ ধরা হবে,বছরের পর বছর ধরে মাছ ধরাটা একটা বিনোদন হয়ে এসেছে জাহাজীদের কাছে। আমি তো আনন্দে আত্মহারা,জাহাজ থেকে সমুদ্রে মাছ ধরা তাও আবার জীবনে প্রথমবার।স্বচ্ছ পরিস্কার জল, মাঝে মাঝেই মাছেদের দেখা যাচ্ছে জাহাজের ডেক থেকে।ফিসিং লাইন যোগাড় করে ,গেলি থেকে টপের জন্য মাংসের ছোট টুকরো এনে সব একদম রেডি।

ইতিমধ্যেই অনেকে ডেকে এসে হাজির মাছ ধরা দেখতে ।ফিশিং লাইনটার দায়িত্ব আমাকেই দিয়েছেন আমার সিনিয়র ইঞ্জিনিয়াররা ,কারণ আমি বাঙালী আর তাদের বিশ্বাস মাছ আর বাঙালী এক আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ ,যাই হোক আমি তো উত্তেজিত এই দায়িত্ব পেয়ে ।শুরু হলো ফিশিং ,মাংসের ছোটো টুকরো কাঁটায় গুঁজে ইয়া জোরে ছুঁড়ে দিলাম,সেটা টুপ করে পড়লো গভীর নীল সমুদ্রে। হঠাৎ একটা টান অনুভব করলাম ফিসিং লাইনে,গ্রামে ছিপে মাছ ধরেছি বহুবার এরকম টান অনুভব করিনি কখনো, তারপর টান বেড়েই চলেছে, এবার ফিশিং লাইনটা টেনে তুলতে শুরু করেছি অমনি নীচে দেখতে পাচ্ছি সুতোটা জলের মধ্যে এদিক ওদিক যাচ্ছে ,তখনও মাছের দেখা নেই ।

সুতোটা তুলতে তুলতে দেখতে পেলাম প্রায় এক হাত লম্বা একটা মাছ, জল থেকে তুলতেই প্রচন্ড লাফালাফি করছে ,সুতো টেনে যখন ডেকে তুলে রেখেছি – চাক্ষুষ দেখতে পেলাম ,আগে কখনো দেখিনি নাম ও জানি না, জাহাজের বাকি লোকজন ও জানে না এর নাম । জল থেকে তোলার সময় মনে হচ্ছিলো মাছটার রং নীল, এনে দেখছি রং টা নীল নয় সাদা আর হালকা কালো, মাথায় ওপরে জুতোর সোলের মতো থাপ্পা লাগানো আছে, পর্যবেক্ষনে বুঝতে পারলাম ওটা শ্বাসপ্রশ্বাস এর জন্য,মাথায় কানকো অদ্ভুত তাই না। এই সব দেখে জাহাজের বাকি লোকজন বলতে শুরু করেছে বিষাক্ত মাছ,বিষাক্ত মাছ। বিষাক্ত মাছ শুনে পাত্তা না দিয়ে , টুপ টাপ করে একের পর আরেক মাছ তুলতে শুরু করেছি ,আটটা মাছ ধরা হয়েছিল মোট।

মাছ ধরা এখানেই শেষ আর আসল গল্প এখান থেকেই শুরু। একটা বাকেটে আটটা মাছ নিয়ে গেলিতে কুকের কাছে দিতে গেছি অমনি সে বলতে শুরু করেছে ,এইগুলো বিষাক্ত মাছ, রান্না করা যাবে না ,কেউ খাবে না,আমি হাত দেবো না এই মাছে। বুঝলাম বিষাক্ত মাছের খবর তার কানেও পৌঁছে গেছে । মাছ গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখি রং টা পরিবর্তন হয়েগেছে ইতিমধ্যে,রঙটা আরো সাদা হয়ে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। কুক একটা গল্প শোনালো , বিএসএম কোম্পানির এক জাহাজে একজন এরকম অদ্ভূত মাছ ধরেছিলো ,জাহাজের সবাই খেতে না করেছিলো,কিন্তু যে মাছ ধরেছিলো তার মন মানেনি, সে নিজেই কেটে -ধুয়ে রান্না করে খেয়েছিলো সেই মাছ ,তারপর সে নাকি মারা যায় জাহাজেই।

সবার কথা শুনে আমি যতটা বিশ্বাস করিনি কথা টা কুকের গল্প শুনে আমিও ভাবতে শুরু করলাম সত্যিই হয়তো বিষাক্ত মাছ। কথপোকথন এর মাঝে একজন এসে বললো যে মাছ খাওয়া যাবে না ,মাছ ধরতে নেই তাতে পাপ হয়, শুধুমাত্র তোমার সামান্য খুশির জন্য আট আটটা সামুদ্রিক প্রানের বলী কি ঠিক ? এবার আমার খারাপ লাগা শুরু ভাবলাম সমুদ্র আমাকে ক্ষমা করবে না হয়তো, পাপ করলাম হয়তো। একটু পরে সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার এসে আমাকে বললো বাঙালী দাদা ,কুক তো রান্না করবে না বলছে ,তুমি একটা মাছ কেটে ভাজা করো দেখি ,টেস্ট করা যাক,খারাপ খেতে হলে খাবো না।

বাঙালী বলে কি এবার বিষাক্ত মাছটাও আমাকে কেটে রান্না করতে হবে! আমার মনের একটা অংশ চাইছে না মাছগুলো কেটে ধুয়ে রান্না করতে ,আর একটা অংশ চাইছে এতো কষ্টে ধরা হলো একবার টেস্ট করা তো দরকার, খারাপ হলে ফেলে দেওয়া যাবে। ভাবতে ভাবতে কেটে ধুয়ে মাছ ভাজা করেই ফেললাম । ডিনারের সময় হলো,আমি মেস রুমে আসা মাত্রই দেখি সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারের ডিনার শেষ করে বসে ছিলো ,সে বললো বাঙালী দাদা মাছ টা খুব টেস্টি তোমার জন্য দু পিস রাখা আছে ভেতরে নিয়ে নাও,আমার মন চাইছিলো না খেতে ,কুক এর গল্পটা মনে হচ্ছিলো বারবার। আমি সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার কে জিগ্যেস করল “স্যার আপনি খেলেন ? কেমন খেতে?” বললো নাকি দারুন খেতে ,কষ্টেসৃষ্টে এক পিস খেতে হলো সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারের সামনে।

ডিনার শেষে খোঁজ নিয়ে দেখলাম সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার মাছ ভাজাটা খাননি,একে ওকে তাকে খাইয়েছেন শুধু, এটা বলে যে খুব টেস্টি খাও। বুঝলাম আমাদের ওপরে পরীক্ষা করা হয়েছে নিজেকে ক্লাস সেভেনের জীবন বিজ্ঞান বইয়ের গিনিপিগ মনে হচ্ছিলো তখন। রাতে ঘুমাতে গিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা আসছিলো ,যদি মরে যাই, দেশ থেকে এতো দূরে,প্রিয়জনেরা আমার ফিরে আসার দিন গুনছে, জীবনে কত কি করতে চেয়েছিলাম,এক রাতে এক পিস মাছ যদি সব কিছু কেড়ে নেয়! ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ,পরদিন সকালে সব ঠিকঠাকি ছিলো, ভাবলাম যাক সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারের গিনিপিগের পরীক্ষায় পাশ করলাম। মাছটায় সত্যিই ভয়ের বিষ ছিলো, আর কি শেষ পর্যন্ত ভয় জয় হলো ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত