এই পাপের শেষ কোথায়

এই পাপের শেষ কোথায়

ঐশির ফোন পাওয়ার পর থেকে বুকের ভিতর কেমন যেন একটা ভয় চেপে বসেছে। কলিংবেলের শব্দে চমকে উঠলো রুমেলা, কয়েক সেকেন্ড লাগলো তার ধাতস্থ হতে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সকাল নয়টা পেরিয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি করে তৈরী হয়ে নিল সে। কলেজ ছেড়েছে প্রায় তিন বছর হয়ে গেলেও পুরোনো কিছু বন্ধুর সাথে যোগাযোগ আছে তার, তাই হয়তো নিলিমার অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর টা তার কাছে পৌঁছতে বেশী সময় লাগেনি।

খবরটা দিয়েছিলো ঐশি, রাতে তাকে ফোন করে বলেছিল শুনেছিস নিলিমা রোড আ্যক্সিডেন্টে মারা গেছে। ফাঁকা রাস্তায় এমন জোরে গাড়ি চালাচ্ছিলো যে ডিভাইডারে ধাক্কা মেরে উল্টে পড়ে গেছিলো, শুধু তাই নয় তিন চারবার পাল্টি খেয়েছে নাকি তার গাড়িটা! শুনে থম মেরে গেছিলো রুমেলা, তারপর বললো ইম্পসিবল! নিলিমা বড়লোক বাপ মায়ের একমাত্র মেয়ে, যখন যা চেয়েছে পেয়েছে, ছোট থেকে গাড়ি চালানো তার একটা প্যাশন ছিল, প্রায় চার পাঁচ রকমের গাড়ি ছিল তাদের। কলেজে আসতো নিজের গাড়ি নিয়ে, কোনখানে তারা বেড়াতে গেলে নিলিমার গাড়ি করেই যেত। নিলিমা, রুমেলা, শিবাঙ্গী, ঐশি ও পামেলা এরা কলেজে একসাথে একি স্ট্রিমে পড়তো। ঐশি ও রুমেলার বাড়ি কলকাতার অনেকটা ভেতরে হওয়ায় তারা দুজন কলেজ হস্টেলে থাকতো।

যখন মাঝে মাঝে নিলিমার বাবা মা কর্মসূত্রে বাইরে যেতেন তখন ঐ বাড়িতে তাদের আড্ডার আখড়া বসতো। অনলাইনে খাবার অর্ডার করে রসিয়ে কষিয়ে খেত তারা, তার সাথে চলত উত্তেজক পানীয়ের ফোয়ারা, হোষ্টেল ম্যানেজ করতে পারলে ঐশি ও রুমেলা সে রাতে নিলিমার বাড়িতে থেকে যেতো। যেহেতু তারা ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট ছিল, ও পড়াশোনায় ভালো ছিল তাই তাদের অতো বাধা নিষেধ ছিল না। আর তারাও সেই সুযোগ কে কাজে লাগিয়ে নানান অপকর্ম করতো। এরকমই এক ঝড়জলের রাতে তারা সবাই মিলে নিলিমার বাড়িতে ছিল, বাইরে থেকে মদ আনিয়ে তারা খেয়েছে, অনলাইনে খাবার ডেলিভারি দিতে আসে সূর্য নামে এক ডেলিভারি বয়। প্রায় সে এখানে খাবার ডেলিভারি দিতে আসতো, তাকে মোটা টাকার বকশিস দিয়ে মদ আনাতো তারা।

সেদিন সে খাবার নিয়ে আসার পর তারা তাকে থেকে যেতে বলে, সে রাজি না হলে তাকে পয়সার লোভ দেখিয়ে তাদের খুশি করতে বলে। সূর্য ভয় পায়, তাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে তার চাকরি চলে যাওয়ার ভয় দেখায়।
জোর করে তাকে সবাই মিলে দড়ি দিয়ে বিছানায় বেঁধে রাখে, জোর করে তাকে মদ খাওয়ায় তারপর তারা নিজেদের কামনা-বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য একে একে শরীরি খেলায় মেতে উঠে। পাশবিক এক উত্তেজনার খেলায় মেতে ওঠে ওরা পাঁচজন। এদিকে আকন্ঠ মদ খেয়ে ওদের অত্যাচারে জ্ঞান হারায় সূর্য। তারা ভাবে সূর্য হয়তো মরে গেছে, লোক জানাজানির আগে তার লাশকে গায়েব করার ফন্দি আঁটে।

তারা নিজেরা এমন ভয় পেয়ে গেছিলো যে সে যে বেঁচে আছে তা যাচাই না করে রাতারাতি তাকে বস্তায় মুড়ে গাড়িতে তুলে শহর থেকে অনেক দূরে গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে আসে। খুব ভয় পেয়ে গেছিলো ঐশি, যদি তারা ফেঁসে যায় তো… নিলিমা বলে যে এগুলো সবাইকে জানাতো সে বেঁচে থাকলে তো! তাকে এমন ঠিকানা লাগিয়ে দিয়েছি, সে কেন তার প্রেতাত্মা ও কোনদিন সামনে আসতে পারবে না। তার হাসির সাথে সবাই হেসে উঠেছিল। সত্যি সত্যি সূর্যের মৃত্যুটা থেকে গেছিলো সবার আড়ালে, দিন সাতেক পর খবরে তারা দেখেছিলো এক অজ্ঞাত পরিচয়ের যুবকের লাশ পাওয়া গেছে, আর সে দেহটি জলের মাছ, পোকা মাকড় এমন ভাবে খুবলে খেয়েছে যে তাকে দেখে চেনার উপায় নেই।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল তারা। তারপর শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত পেরিয়ে গেছে। রুমেলা, পামেলা, শিবাঙ্গী চাকরি পেয়েছে প্রাইভেট কোম্পানি তে, নিলিমা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে গেছে, ঐশি একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করছে। তাদের নিজেদের মধ্যে আর সচরাচর দেখা হয়না, নিলিমা বছরে দুবার বাড়ি আসে, তখন তাদের ডাক পড়ে, তারা হাজার অসুবিধা থাকলেও দেখা করে।

একবার নিলিমা এসেছে, সবার সাথে যোগাযোগ করেছে কিন্তু শিবাঙ্গীর কোনো খোঁজ পায়নি। তারা প্ল্যান করে সবাই মিলে শিবাঙ্গীর বাড়ি যাবে, সেখানে গিয়ে দেখে তার বাড়িতে তার বুড়ি ঠাকুমা ও চাকর বাকর ছাড়া বাড়িতে আর কেউ নেই। শিবাঙ্গীর শরীর খারাপ, অনেক ডাক্তার বদ্যি দেখিয়ে কোনো লাভ হয়নি, খেতে পারেনা, ঘুমোতে পারেনা, একা একা কি যেন সে বিড়বিড় করে, চিৎকার করে বলে আমি ভুল করেছি, ক্ষমা করে দাও আমায়! বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন তিনি, বললেন মেয়েটা আর আগের মতো নেই, শরীর শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। ওর বাবা মা এখন ওঝা, পীর বাবা করে বেড়াচ্ছে, ওরা বলেছে শিবাঙ্গীর ওপর কোনো প্রেতাত্মা ভর করেছে। তার বাবা মা তাকে নিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলার একটি গ্রামে গেছেন, সেখানে একটা ওঝার খোঁজ পেয়ে। ভয়ে তাদের মুখ শুকিয়ে উঠলো, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলো তারা, ঐশি বললো সেদিন আমরা এতোটা না করলেও পারতাম!

হোয়াট রাবিশ! বলে চেঁচিয়ে উঠলো নিলিমা। বললো কোন যুগে বাস করিস তোরা! এখন কিনা একটা ফালতু ছোকরার আত্মা এসে প্রতিশোধ নিচ্ছে এতোদিন পর! তোরাও যে ওর বাবা মায়ের মতো আত্মা, প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করছিস, ছিঃ! তার কথায় সবাই থেমে গেলেও আতঙ্কে তারা মুষড়ে পড়ে। নলিনী ফিরে যাওয়ার কুড়ি বাইশ দিন পর শিবাঙ্গীর মৃত্যুর খবর পায়, মরার সময় নাকি তার শরীরে কোনো কাপড় ছিলোনা, সারা শরীরে নখের অসংখ্য আঁচড় ছিল। ভয়ে তারা আর যায়নি সেখানে।

দিদিমণী, তোমার ভাত বাড়বো! এই কথা শুনে চমকে ওঠে রুমেলা। স্নান সেরে পোষাক পরে আয়নার সামনে বসে এতোক্ষণ সে এগুলি ভেবে যাচ্ছিলো। শিবাঙ্গীর মৃত্যুর পর থেকে সে ফ্ল্যাটে একা থাকতে ভয় পেতো, মনে হতো কেউ যেন সবসময় ওর ওপর নজর রাখছে, ঘুমের মধ্যে মনে হতো কেউ যেন ওর শরীরে হাত বোলাচ্ছে! তার পর সে কল্যাণীকে কাজের জন্য নিজের সাথে রেখেছে, একা থাকতে তার ভয় করে।

নিজের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে বেরিয়ে পড়ে। অফিস যেতে ইচ্ছা করছে না তার, এলোমেলো এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায় তবু তার মন থেকে ভয়টা কাটতেই চায়না। এরপর কি তার পালা! এভাবেই কি একে একে প্রতিশোধ নিচ্ছে সূর্যের আত্মা! হঠাৎ একটা ঠান্ডা বাতাস ছুঁয়ে যায় তাকে। ভয়ে কেঁপে ওঠে রুমেলা। মনে মনে সে ক্ষমা চায় তার কাছে।চলতে চলতে কখন যে নদীর ধারে চলে এসেছে খেয়াল করেনি, একজনের সাথে ধাক্কা লাগলো তার, লোকটি গজগজ করে উঠলো যাচ্ছাতাই ভাবে, বললো সকাল সকাল মাল টেনেছো নাকি, যত্তসব অকম্মার ঢেকি! অন্যসময় হলে তাকে দুকথা শুনিয়ে দিতো, তবে আজ আর মুখ লাগাতেই চাইলোনা। চুপচাপ গিয়ে বাঁধানো জায়গাটায় বসলো।

কলেজের দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিলো তার, নিলিমা, শিবাঙ্গীর মতো টাকা না পেলেও কোনসময় অভাব দেননি তার বাবা মা। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সে যেন বেশি স্বেচ্ছাচারিণী হয়ে গেছিলো। একমাত্র দাদা দিল্লিতে থাকায় মাকে ভুজুংভাজূং দিয়ে টাকা আদায় করতে বেশী ঝামেলা পোহাতে হতোনা তাকে। প্রেম এসেছিল জীবনে অনেক আগেই, সেটাকে ঠিক প্রেম বলা যায়না, অল্প বয়েসের দুটো ছেলেমেয়ের কাছে শারীরিক মেলামেশাটাই মুখ্য ছিল, তাই সেই স্বাদ সে আগেই পেয়ে গেছিলো, তবে একদিন ধরা পড়ার পর মা তাকে চরম শাস্তি দিয়েছিল। তাই মাকে সহ্য করতে পারতো না সে, চাকরি পাওয়ার পর থেকে সে নিজে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে একলাই থাকে।
সূর্যর মৃত্যুর জন্য তারা সবাই দায়ী ছিল, পর্ণ ছবি ও মদের উত্তেজনায় পাগল হয়ে গেছিলো সেদিন সে, হয়তো তার মতো অন্যরাও, তাই সূর্যকে খাবার নিয়ে আসতে দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি, নিলিমাকে সে বলে চল না একটু ওকে নিয়ে চাহিদাটা মিটিয়ে নি, ঐশী বলেছিল এটা কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে, তাকে ধমকে থামিয়ে দেয় তারা।

কিন্তু তাকে দিয়ে কামনা বাসনা মিটিয়ে অনেক টাকা দিয়ে তার মুখ বন্ধ রাখাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল, কিন্তু ছেলেটা এমন নখড়া-ঝকড়া করছিলো যে তাকে জোর করে মদ খাইয়ে বেঁধে রাখতে হয়, তারপর কে জানতো ওভাবে মরে যাবে.., তার শেষের দিকে কথাগুলো এখনো তার কানে বাজে। ছেড়ে দাও, আমার সাথে এমন অন্যায় করোনা, প্লিজ যেতে দাও আমায়, খুব কষ্ট হচ্ছে আমার!উফফ্ বোলে দু হাতে কান চেপে ধরে রুমেলা, তাকেও মেরে ফেলবে, ছাড়বে না কিছুতেই, সে হঠাৎ উঠে পড়ে চলতে শুরু করে আবার।

ঠিক তার দু’দিন পর.পুলিশের গাড়ি এসে থামে রুমেলার ফ্ল্যাটের সামনে, দরজা খুলে দিয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে কল্যাণী। পুলিশ তাকে জিজ্ঞেস করে তুমি কখন দেখলে বডিটা? কল্যাণী বলে সকালে চা দিতে গিয়ে দেখি দিদি ওভাবে ফ্যানের সাথে ঝুলছে, ওদিকে ইশারা করে সে। পুলিশ সে ঘরে গিয়ে দেখে ওড়না দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলছে রুমেলার দেহ, বিভৎস ভাবে বেরিয়ে এসেছে তার জিভ। কিছুক্ষণ মৃতদেহ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নামিয়ে নিয়ে দেহটা পাঠানো হয় ময়না তদন্তের জন্য, বেরিয়ে যেতে যেতে পুলিশ বলে কল্যাণীকে আপনিও আসুন আমাদের সাথে, কিছু জিজ্ঞেসা-বাদ করে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। পুলিশের গাড়ির সাথে সাথে শববাহী গাড়িটা রুমেলার নিথর দেহটা নিয়ে চলে যায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত