রানির সংসার

রানির সংসার

কাল রানির বিয়ে।পারিবারিক ভাবেই হচ্ছে ওর বিয়েটা।পাত্র, বাবা মা পরিবারের সকলের পছন্দের।যদিও রানিরও পছন্দের।তার হবু বরের নাম সম্রাট।সম্রাটের ভালো চাকরি আর সুন্দর পরিবার দেখেই নাকি রানির বাবা বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গিয়েছেন।রানিরও খারাপ লাগেনি।রানি বাড়ির একটি মাত্র মেয়ে।তাই বাবা মা আর দাদা এমনকি বৌমণিরও প্রিয় পাত্রী সে।যেমন তার রূপ তেমনই গুণ।

সকলে বলে কীভাবে মানুষকে আপন করে নিতে হয় তা নাকি রানির থেকে ভালো কেউ জানেনা।পড়াশোনার পর্ব শেষ হতেই বাড়িতে বিয়ের কথা শুরু হয়।কোনো এক আত্মীয়া এই সম্বন্ধটি তাদের বাড়িতে আনেন।সম্রাটদের বাড়ি থেকে যেদিন প্রথম দেখতে আসে রানিকে সেদিন ভয়ে চিন্তায় তো রানি একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছিল।সেদিন তার প্রাণাধিক প্রিয় বন্ধু বৌমণিই তাকে সামলে ছিল।সুন্দরী রানিকে প্রথমবার দেখেই সম্রাটের বাড়ির সকলের পছন্দ হয়ে গিয়েছিল।যাওয়া আসা কথার্বাতা শেষে বৈশাখের এক শুভ দিন রানি আর সম্রাটের বিয়ের দিন হিসেবে স্থির হয়।

কাল সেই দিন।শুধুমাত্র রাতটুকু শেষ হওয়ার অপেক্ষা।কিন্তু আজ তো রানির ঘুমই আসছে না।মাথার মধ্যে দুপুরের মৌয়ের মুখে শোনা কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।আজ মা আই বুড়ো ভাত খাইয়েছে।সেই উপলক্ষেই ছেলেবেলা আর বড়বেলা সবেতেই থাকা প্রিয় দুই বান্ধবী মৌ আর মনাকে নিমন্ত্রণ করেছিল রানি।তার মধ্যে মৌ-এর যদিও বিয়ে হয়ে গেছে তার সেই প্রথম ও শেষ প্রেমিক অভির সাথে।আর মনা এখনও হবু বরের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।একদিনের ছুটি পেয়ে মৌ মনে চেপে রাখা কষ্টগুলোকে বলেই ফেললো প্রিয় দুই বান্ধবীর কাছে।গরীবের মেয়ে হওয়ার দোষে রোজই গঞ্জনা শুনতে হয় শাশুড়ীর কাছে।ছোটোখাটো বিষয়ে নিজের মেয়েকে ক্ষমা করে দিলেও কথার চাবুকে মৌ-এর চোখে জল ঝরাতে ছাড়েন না।প্রায়ই কথার প্যাঁচে মৌয়ের বাপের বাড়ি নিয়ে খোঁটা দেন।কথায় কথায় বুঝিয়ে দেন যে এই বিয়েতে তার মত ছিল না।ছেলের জোরেই হয়েছে।

মৌ শখ করে একটা সালোয়ার কামিজ পরলেও বাঁকা চোখে দেখেন।অভি কখনও প্রতিবাদ করতে গেলে তার আঁচও এসে পড়ে মৌয়ের ওপর।মৌ-ই নাকি মায়ের থেকে ছেলেকে আলাদা করে দিয়েছে,মায়ের বিরুদ্ধে নিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু মা হারা মৌ চেয়েছিল শ্বাশুড়িমাকে তার মায়ের জায়গা দিতে।তা আর হল কোথায়।রানি খেয়াল করেছিল কথাগুলো বলতে বলতে মৌয়ের চোখ ছলছল করে ওঠাকে।আজ রানি বুঝতে পারলো আর সেই ছোট্টোবেলার সহজ সরল বন্ধু মৌ নেই।আজ একজন মেয়ে,দিদি,স্ত্রী,বাড়ির বউ হওয়ার সাথে সাথে একজন অভিনেত্রীও হয়ে গেছে মৌ।কত সহজে এত কষ্ট, চোখের জল চেপে হাসি মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।ও না বললে তো বুঝতেও পারতাম না।মেয়েরা বোধহয় এমনই হয়।

রানি ছোটো থেকেই শুনেছে মেয়ে হলে মানিয়ে নিতে হয়,মেনে নিতে হয়।বড় হওয়ার পর আরো বেশি করে শুনেছে,জেনেছে।কিন্তু আজ মৌকে দেখে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করছে।আর তাতেই ওর ভয়টা আরও বেড়ে গেছে।কারণ আজ ওর নিজের ভাগ্যও সেই চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে।কেমন হবে সেই বাড়ি?নতুন লোকজন?তারাও কি এরকমই হবে নাকি মেয়ের মতো আপন করে নেবে ওকে?আর সম্রাট সেই বা কেমন হবে?এক দুইদিন যদিও রানি আর সম্রাট বেরিয়েছিল বাড়ির সকলের মত নিয়েই।দেখে তো সেরকম মনে হয়নি ওর।এক অজানা ভয় যেন রানিকে গ্রাস করছিল।ভাবতে ভাবতে ওর চোখে ঘুম জড়িয়ে এল।

ভোর হতেই মা রানিকে তুলে দিল।শুরু হয়ে গেল বিয়ের প্রস্তুতি।সারাদিন কাটছে সকলের সাথে হাসি ঠাট্টার মাঝে।কিন্তু মনের একদিকে ও ভাবছে কীভাবে ও এই বাড়ি এই মানুষগুলোকে ছেড়ে যাবে আর অন্যদিকে ভাবছে নতুন বাড়ি,অচেনা লোকজন।ও পারবেতো মানিয়ে নিতে?একদিকে আনন্দ আর একদিকে ভয় এই নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসল।কী এক অদ্ভুত লাগছে ওর।যা কাউকে বোঝাতে পারবেনা।বিয়ে হয়ে সারারাত কাটতেই বাড়িতে দুঃখের ছায়া।মা,বাবা,দাদা,বৌমণে সকলের চোখেই জল।রানির মনে হচ্ছে ও যেন ওর জীবনের সব ছেড়ে যাচ্ছে এখানে।ওর সেই খেলার উঠোন,বাবার সাথে খেলা,মায়ের গলা জড়িয়ে আদর,দাদার সাথে চকলেট নিয়ে টানাটানি আর বৌমণির সাথে প্রথম বন্ধুত্ব সব যেন ওর চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে।অনেক কান্নাকাটির পর দাদা আর বৌমণি প্রায় জোর করেই রানিকে গাড়িতে তুলে দিল।

নতুন বাড়িতে পৌঁছাতেই রানির মনে শুরু হল নতুন এক ভয়।বরণ করে শাশুড়িমা ঘরে তুললেন রানিকে।রানিও আলতা রাঙা পা নিয়ে চলে গেল ওর ঘরে।সারাদিন নিয়মকানুন সেরে রাত্রে খুব ক্লান্ত হয়ে গেল রানি।কিন্তু কি আর করবে এটা তো আর বাড়ি না যে মন চাইলেই শুয়ে পড়বে।আজ আবার কালরাত্রি।শাশুড়িমা রানিকে নিজের ঘরে শুতে বলে ছেলেকে অন্য ঘরে শুতে বললেন।একমাত্র জা আর একটিমাত্র ননদ নতুন বউয়ের সাথে ভাব জমাবে বলে রানির কাছে শুতে চাইলো।কিন্তু শাশুড়িমা কড়াভাবে মানা করে দিলেন।সবাই চলে যেতে দরজাটা বন্ধ করে শুয়ে মনে মনে রানি ভাবতে লাগলো মা এরকম কেন করলেন?আমি কি কোনোভাবে ভুল করে ফেললাম?নাকি মায়ের আমাকে পছন্দ নয়?তাহলে কী মৌয়ের মতো আমারও একই দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনে রানি ভাবলো এত রাতে কে?সবাই তো শুয়ে পড়ল।

কে হতে পারে ভাবতে ভাবতে দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে শাশুড়িমা ঘরে ঢুকে আবার দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।একটা নাইট ড্রেস রানির হাতে তুলে দিয়ে বললেন “এটা তোমার ননদের।চেঞ্জ করে শুয়ে পড়ো।আমি জানি আজ তুমি খুব ক্লান্ত।আর এই সব শাড়ি গয়না পড়ে ঘুমাবার অভ্যেস হয়তো তোমার নেই।আর হ্যাঁ,সকালে উঠে তৈরী হয়ে তবেই বাইরে এসো।এই জন্যই তোমার ননদ আর জা-কে এখানে থাকতে দিলাম না।আর তাছাড়া ওরা থাকলে ওদের গল্পের মাঝে তোমার আর ঘুম হতো না।” রানি এতক্ষন অবাক হয়ে শুনছিল।ও সব বেমালুম ভুলেই গেল।হঠাৎ করে শাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরল।শাশুড়ীমা হেসে রানির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো থাক্,এবার ঘুমিয়ে পড়।কাল ভোর ভোর উঠবি।রানির মনটা এবার অনেক হালকা হয়ে গেল।

ভোরে উঠে তৈরী হয়ে বাইরে এলো রানি।সারাদিন জা আর ননদ রানির পাশে পাশে থাকলো।আর সাথে দেওর আর নতুন বউকে নিয়ে ঠাট্টা করতে ছাড়লো না বড়জা। সন্ধ্যা হতেই বাড়তে থাকে অতিথিদের সমাগম।সেজেগুজে তৈরী হয়ে বসে রানি।সকলে এসে উপহার দিয়ে যায় ওর হাতে।শেষের দিকটায় আর ভালো লাগে না ওর বসে থাকতে।অতিথিরা চলে গেলে খাওয়ার পর্ব মিটিয়ে ঠাট্টা করতে করতে রানিকে ওর ঘরে নিয়ে যায় ওর জা।রানিও দিদিভাই দিদিভাই করে গল্প জুড়ে দেয়।ইতিমধ্যেই খুব ভাব জমে গিয়েছে রানির জা আর ননদের সাথে।জা চলে যেতেই রানি মনে মনে ভাবে দুইদিনেই কত আপন হয়ে গিয়েছো গো দিদিভাই তোমরা।সম্রাট এসে দরজা বন্ধ করতেই তার আওয়াজে ভাবনায় ছেদ পড়ে রানির।রানির কাছে এসে একটা উপহার ওর হাতে তুলে দেয় সম্রাট।কি আছে জিঞ্জাসা করেও কৌতূহল না চাপতে পেরে উপহারটা খুলে দেখে রানি।আর দেখেই রানির চোখে জল চলে আসে।

বাবা,মা,দাদা,বৌমণি আর ওর একসঙ্গে তোলা একটা ছবি।বাবা,মায়ের বিবাহবার্ষিকীতে তোলা হয়েছিল।সেটাকে ফ্রেমে বন্দী করে এনেছে সম্রাট শুধু তার রানির মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।রানি খুশিতে কী বলবে না ভেবে পেয়ে ধন্যবাদ জানালো সম্রাটকে। দ্বিরাগমনে বাপের বাড়িতে আসতেই মৌ আর মনা দেখা করতে আসে রানির সাথে।মৌকে দেখে রানি মনে মনে ভাবে এক সারিতে বসিয়ে সকলকে বিচার করাটা কখওনই ঠিক নয়।সবাই সমান হয় না।আমার সংসারে তো সকলেই ভালোবাসার এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত