আবাসিক

আবাসিক

মুরাদ ক্লান্ত শরীরে হোটেলে প্রবেশ করলো। সারাদিন জার্নির পর এখন একটু বিশ্রামের প্রয়োজন।কিন্তু সাথে বিনোদনে ব্যবস্থা হলে মন্দ হয় না। বিষয়টা নিয়ে হোটেলের ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে হবে।বেশিরভাগ হোটেলে ম্যানেজাদের সাথে পতিতার আলাদা লেনদেন থাকে।তাদের সামান্য টাকা দিলে ভালো মেয়ে ব্যবস্থা করে দেয়।

মুরাদ দেরি করলো না।ম্যানেজারকে ডেকে বললো “আপনাদের এখানে কি নাইট পার্টনারের আয়োজন আছে?”
ম্যানেজার সাদামাটা মুখ করে বললেন “সরি স্যার।বুঝলাম না।” “কল গার্ল পাওয়া যাবে?” ম্যানেজার হেসে ফেললো।মুরাদ হাসির মানে জানে।পকেট থেকে হাজার টাকার নোট ম্যানেজারের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো “প্রডাক্ট ভালো হলে টিপস পাবেন।” ম্যানেজার চলে গেলেন। এদিকে মুরাদ অপেক্ষা করতে পারছে না।প্রতিটা মুহূর্ত আজেবাজে চিন্তার মধ্যে কাটছে। মানুষ মূলত একটা বিষয় ঘিরে বাঁচতে চায়। শান্তি। মনে অফুরন্ত শান্তি থাকলে কুঁড়েঘরেও সুখ পাওয়া সম্ভব। মুরাদ এই শান্তির খোঁজে দিশেহারা।

মদ, জুয়া, নারী বিলাসিতা সবকিছুতে খুঁজেছে।পায়নি তা না।কিন্তু সেটা ক্ষণিকের। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সে উপভোগ করতে পারেনি। পরক্ষণে কলিংবেল বেজে উঠলো। মুরাদ তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে দিলো। সামনে নীল ড্রেস পড়া এক মেয়ে দাঁড়িয়ে।মেয়ে বললে ভুল হবে।অল্পবয়সী মহিলা।মুখে গাঢ় মেকয়াপ।চুলগুলো খোলা।হাতে লাল-নীল চুড়ি।শরীর থেকে তীব্র সেন্টের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। মুরাদ হা হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো “ফাহিয়া?” মেয়েটা হকচকিয়ে গেলো।তাহলে কি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা সত্যি মুরাদ? হতে পারে।আট বছরে মানুষের সম্পূর্ণ পরিবর্তন সম্ভব।তবু নিজেকে তুলে না ধরতে ফাহিয়া বললো “ফুল নাইট।পাঁচ হাজার।”

“টাকা যা চাও পাবা।কিন্তু আগে আমার সন্দেহ দূর করো।তুমি ফাহিয়া না?”
“না।” বলে ফাহিয়া পেছন ঘুরে হাঁটা দিলো। মুরাদ হাত টেনে ধরে বললো “তুমি ফাহিয়া।”
“সমস্যা কি আপনার?কে আপনি?”
“তুমি এই পথে?”
“আজব!আপনি জেনে কি কবেন?আপনাকে আমি চিনি না।” মুরাদ শার্টের বোতাম খুলে বুকে লেখা নাম দেখিয়ে বললো “মুরাদকে চেনো?”

ভাগ্যক্রমে ওপাশ থেকে কোন জবাব এলো না।মেয়েটার চোখে ক্রমশ জল জমতে শুরু করেছে।বুকে হালকা আঘাল পেলে টুপ করে ঝরে পড়বে। কোন কারণে মেয়েরা কাঁদায় পারদর্শী।তাদের কান্নার জন্য বড় ধরণের ইশু লাগে না।ছোট বিষয় নিয়ে নানান ভাবে কাঁদতে পারে। মুরাদ ফাহিয়াকে রুমে ঢুকিয়ে দরজা লক করে দিলো।ফাহিয়া নিচু স্বরে বললো “কি চাচ্ছেন আপনি?” “একটা মেয়ে সাধারণত কি দিতে পারে?সর্বোচ্চ তাঁর দেহ।ফাহিয়া এই বাজারে তোমার দেহ নিলামে।আর ক্রেতা হিসাবে যথেষ্ট টাকা আমার আছে।সুতরাং ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।”

“হুম।”

“আমি কি ভুল ছিলাম?” ফাহিয়া চোখের জল আটকাতে পারলো না।নীরবে বিনা মেঘে বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। মুরাদ তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে বললো “ব্রেকয়াপের দিনের কথা মনে পড়ে ফাহিয়া?” আকাশ মেঘাচ্ছন্ন।অনবরত বৃষ্টি পড়ছে।খুব সহজে এই বৃষ্টি থমবার নয়। সাধারণত এরকম পরিবেশ কাপলরা দারুণ উপভোগ করে।একে অপরকে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে।স্বপ্ন বুনে।দুজন দুজনকে ছোয়াছুয়ি করে। কিন্তু ফাহিয়া রেগে আছে।মুরাদের সাথে যেন ঠিক মানিয়ে নিতে পারছে না। মুরাদ বিরক্তির সুরে বললো “তোমাকে আমি শেষবারের মতন বলতেছি, ছেলে ফ্রেন্ড বাদ দাও।”

“থাকলে সমস্যা কোথায়?ওরা তো কোন ক্ষতি করতেছে না।”
“আজ করতেছে না, কাল করবে না এর কি গ্যারান্টি আছে?”
“আমি জানি ওরা কোন ক্ষতি করবে না।”
“প্লিজ!ছেলেদের সম্পর্কে তোমার কোন ধারণা নেই।”
“সবাই তোর মতন না ওকে।”
“তুই করে বলতেছো কেন?”

“তাহলে কি করবো?কথা বলতে গেলে ছেলে ফ্রেন্ড বাদ দাও।ওই শালা সবাই কি ক্যারেক্টারলেস?” “ছেলে ফ্রেন্ড দিয়ে কি করবা তুমি?” “লাগে।” মুরাদ নিজের রাগ ধরে রাখতে পারলো না।ফাহিয়ার গালে চড় মেরে বললো “লাগবেই তো।লাগবে না?দিনে লাগে রাতে লাগে।থাক তুই তোর ছেলে ফ্রেন্ড নিয়ে থাক।” “তোর মতন ছেলের সাথে থাকার চেয়ে ওদের সাথে থাকা অনেক ভালো।” মুরাদ ফাহিয়ার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো “Today or tomorrow, এর প্রতিদান তুই পাবি।হয়তো তখন খুব দেরি হয়ে যাবে।” “Just go to hell.” দুজন দুপথে চলে গেলো।এরপর আর তাদের দেখা হয়নি।

ফাহিয়া চোখের পানি মুছে বললো “তুমি ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আরও অনেক গুলো ফ্রেন্ড যোগ হয়েছিলো।তোমাকে ভুলে থাকতে ওদের সাথে বেশি সময় কাটাতাম।তারপর একদিন এক ফ্রেন্ড বললো হোটেলে ওর সাথে থাকার কথা।রাতে পরীক্ষার পড়া পড়বে।ও ভালো ছাত্র ছিলো।প্লাস অনেক ভদ্র।আমিও কিভাবে যেন হ্যা বলে দেই।বাকিটা বুঝতে পারছো।কেমন যেন হেপনোটাইস করে ফেলেছিলো আমাকে। পরবর্তীতে মাঝে মধ্যে পড়ার নাম করে হোটেলে থাকতাম।এভাবে কিছুদিন চলার পর ওর নতুন একজন ফ্রেন্ড এড হয়।আমিও মেতে উঠতে থাকি।মাতামাতির পর্যায় যেন থামবার নয়। কিন্তু ফাইনাল ইয়ারে উঠে আব্বু-আম্মু কিছুটা আচ করতে পারে।তাই বিয়ে দিয়ে দেয়।অবশ্য বিয়েটা বেশিদিনের জন্য ছিলো না।

ওদের সাথে কাটানো মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দী করে রেখেছিলো।ফলস্বরূপ মাঝেমধ্যে আমাকে চাহিদা পূরণের খাতে পেতে চাইতো।প্রথমে মানা করলেও পরে চাপের সম্মুখীন হয়ে রাজি হই।এবং প্রথম দিনে ধরা খেয়ে যাই। ব্যস! একদিক থেকে ডিভোর্স।অন্যদিক থেকে ত্যাজ্য কন্যা। যাওয়ার পথ নেই।পাপীর চেয়েও নিকৃষ্টতম পাপী হয়ে উঠি।পেটের দায়ে নাম লেখাই পতিতার খাতায়।” মুরাদ হেসে বললো “আমায় ফোন করে দেখতা?” ফাহিয়া বিষ্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো “ফোন?যোগ্যতা নিজ হাতে ধ্বংস করেছিলাম।” মুরাদ পকেট থেকে সিগারেট বের করে জ্বালিয়ে বললো “বাসায় চলে আসার পর দেড় বছর ডিপ্রেশনে ছিলাম।

সারাক্ষণ তোমার কথা ভাবতাম।কিন্তু খোঁজ নিয়ে যখন জামলাম তুমি বিগড়ে গেছো তখন বড় ধরনের আঘাত পাই।ভালবাসার মানুষ হাজারটা ছেলের সাথে শুলে ঠিক কেমন অনুভূতি হতে পারে তা আমার চেয়ে ভালো হয়তো কেউ জানেনা।যাইহোক, আঘাত কাটিয়ে উঠতে সিঙ্গাপুর চলে যাই।সেখানে কয়েকবছর থেকে আয়ের উৎস চোখে পড়ে।সেই উৎস কাজে লাগিয়ে ছোট্ট রেস্টুরেন্টে দেই। ব্যস! আপাতত বড় দুইটা রেস্টুরেন্টে একটা হোটেল আছে।” “বিয়ে করোনি?” “না।” দুজনেই চুপ হয়ে গেলো। ফাহিয়া কথা খুঁজে পাচ্ছে না।যে কোন কথা বলতে নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে। পরক্ষণে মুরাদ বললো “তুমি আমাকে বিয়ে করবে?” ফাহিয়া থমকে গেলো।গলা শুকিয়ে আসছে। মুরাদ! মুরাদ মজা করছে হয়তো। কোন জবাব না পেয়ে মুরাদ আবার বললো “তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?”

“মজা করছো?”
“না।”
“তুমি জানো আমি কি?”

“আমি বা ভালো কোথায়?তুমি যতজন ক্রেতাকে দেহ দিয়েছো আমি তার দ্বিগুণ মেয়ের দেহ লুফে নিয়েছি।”
বাক্যটা শুনে ফাহিয়ার মন খারাপ হয়ে গেলো? তাঁর এরকম লাগছে কেন? তাহলে কি মনের কোথাও না কোথাও আজও ভালবাসা জমা পড়ে আছে? ফাহিয়া আচমকা মুরাদের পা জড়িয়ে ধরে বললো “আমাকে ক্ষমা করে দাও।সবকিছুর জন্য আমি দায়ী।” মুরাদ ফাহিয়াকে তুললো না। কষ্ট জমে পাথর হয়ে গেলে সামান্য কষ্টে কিছু মনে হয় না। তবে কষ্টের শেষে হয়তো সুখের দেখা পাওয়া যায়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত