ইচ্ছেরা আজ স্বাধীন হোক

ইচ্ছেরা আজ স্বাধীন হোক

ব্যস্ত জীবনের মাঝে হঠাৎ করে পাওয়া একটা ছুটির দিন। কাল শিশুদিবসের অনুষ্ঠান হয়েছে স্কুলে, আজ তাই ছুটি। সাথে শনিবার -রবিবার মিলিয়ে বেশ লম্বা ছুটি একটা। সবে ক্লাস ওয়ানে উঠেছে দিওতিমা। বয়সে পুচকে হলে কী হবে এই বয়সেই মা বাবার লোকাল গার্জেন সে। লেগো বিল্ডিংয়ের কাজটা অসমাপ্ত রেখেই মাম্মামের কোলে উঠে এসে বসলো। মাম্মাম তখন ফোনে নিজের বান্ধবী রিয়ার সাথে কথা বলছিল। রিয়া আন্টি, আমি কাল তোমার বাড়ি যাবো বুঝলে, তুমি অ্যাপেল পাই আর ক্যারামেল পপকর্ন বানিয়ে রেখোতো।” এই দুষ্টু কাল তোকে কে নিয়ে যাবে রিয়া আন্টির বাড়ি। তাছাড়া পাপা ট্যুরে গেছে।” উফফ্ মাম্মাম, পাপা ট্যুরে গেছে তো কী হয়েছে। ওলা বুক করে নেবে, একটুখানি তো দূর আন্টির বাড়ি। আমারও তো ইচ্ছে করে একটু বুমবুমের সাথে খেলতে।”

বুমবুমের সাথে তুমি কত খেলো সেটা আমি জানি, আগেরবার ওকে কামড়ে দিয়েছিলে, কত ব্যাথা পেয়েছিল বলোতো।” প্রমিস মাম্মাম, দিউ ইজ নাও আ গুড গার্ল। প্লিজ চলো।” এই চলে আয় না রে। কতদিন আসিস নি। বুমবুমও বলে দিউর কথা। জমিয়ে আড্ডা দেবো দুজনে। ওরাও খেলবে। প্লিজ মালিনী না বলিসনা। চলে আয়।”ফোনের ওপ্রান্তে আব্দার করে বসে রিয়াও। তুইও দিয়ার কথায় তাল মেলাচ্ছিস।” অনেকদিন যদিও যাওয়া হয়নি, তাই মালিনীও খুব একটা আপত্তি জানায় না। প্লিজ আর এক্সকিউজ নয়। কাল দেখা হচ্ছে। আজ কাটি বুঝলি, দিউর অ্যাপেল পাই আর পপকর্ন না বানালে হবেনা।” সে আর বলতে। যা পাকাবুড়ি হয়েছে না, আর তুইও প্রশ্রয় দিস এত ওকে।” রিয়ার সাথে কথা বলে প্ল্যানটা বানিয়ে ফেললো মালিনী। ওর বাবা ট্যুরে অতএব সকালের জলখাবারের পরেই চলে যাবে ওরা। কিছু গোছগাছ করে নিলো, সারাটাদিন কাটিয়ে রাতে ফিরবে বলে। সেই ছোটবেলার বন্ধুত্ব রিয়া আর মালিনীর। একই শহরে বিয়ে হওয়ার সুবাদে বন্ধুত্বটা প্রায় ঝালিয়ে নেয় দু’জনেই। রিয়ার একমাত্র সন্তান বুমবুমের সাথে মালিনীর মেয়ে দিউ’য়ের বন্ধুত্বটাও বেশ।

অতঃপর পরেরদিন দিউয়ের আব্দারে মালিনী আর দিউ গিয়ে হাজির হলো রিয়ার রাজারহাটের বাড়িতে। অনিন্দ্য’দা, রিয়ার হাজব্যান্ডের হার্ডওয়্যারের বিজনেস। আজকে বাড়িতেই ছিলেন। পুচকে দুটোর দায়িত্ব নেবেন জানিয়েছেন আগেই। প্রায়ই দুটো পরিবার নিজেদের মতো করে সময় কাটায়। দস্যিদুটোর অত্যাচার তাই উপভোগ করেন উনি। ঋজু এলে বেশ হতো।” বাগানের কাজ করতে করতেই এগিয়ে এলো অনিন্দ্য। মালিনী ড্রাইভারকে টাকা দেওয়ার সময়টুকুও দিউ আর অপেক্ষা করলোনা। মালিনীর হাত ছাড়িয়ে একাই গেট অব্ধি এগিয়ে এসেছে। হ্যাঁ, ওই বললো যাও এবার দিউকে নিয়ে, আমি পরেরবার আসবো। কয়েকদিনের জন্য গুয়াহাটি গেছে।” অনিন্দ্য’র সাথে যখন কথা বলছিল ততক্ষণে দিউ সোজা রিয়ার কাছে এক দৌড়ে রান্নাঘরে।

বেশ কয়েকদিন পরেই দেখা দুই বান্ধবীর। কত গল্প যে জমে আছে। দুপুরের খাবারের মেনুটা রান্নার দিদিকে বুঝিয়ে দিয়ে দুই বান্ধবী বসলো চায়ের কাপ নিয়ে। দিউ আর বুমবুম ততক্ষণে বেডরুমের মেঝেতে রাশি রাশি খেলনা ছড়িয়েছে। মাঝেমধ্যে ঘরের মধ্যে থেকে দু’জনের কথা ভেসে আসছে। হঠাৎই বুমবুমের কান্নার শব্দে দুই বান্ধবীর গল্পের ছন্দ কাটলো। ব্যস্তপায়ে উঠে এলো ঘরের মধ্যে দু’জনেই। এই কি হয়েছে রে বুমবুম?” ঘরে ঢুকতেই রিয়া দেখে বুমবুম মেঝেয় বসে কাঁদছে। আর দিউ খেলনা গাড়িতে উঠে বসে আছে। সে যতই বলছে কাঁদিস না উঠে আয়, বুমবুমের কান্না ততই বেড়ে যাচ্ছে।

….”দেখো না আন্টি ওকে যতই বলছি আমি গাড়ি চালাবো, বুমবুম বলছে না গাড়ি নাকি মেয়েরা চালায় না। তাই ওকেই আমার গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছি। ওই পচা ছেলেকে আমি আমার গাড়িতে চাপাবোই না।” হাপুসনয়নে বুমবুমের কান্না চলছে তখনও আর দিউ মহানন্দে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। এই বুমবুম এইটুকু কারণে তুই কাঁদছিস?” এবার হেসে ফেললো দুজনেই। না মা, দিউ আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেই দিলো তো।” কান্না থামিয়ে এবার নালিশ জানালো বুমবুম। উফফ্ ননির পুতুল হয়েছে। একটা মেয়ের কাছে মার খেয়ে কাঁদছে, এই ছেলের আমার কী হবে রে মালিনী।” অনিন্দ্যও ওদের কথা শুনে ঘরের মধ্যে হাজির হয়েছে।

এই ছাড় তো ওদের, একটু পরেই দেখবি কত ভাব। চল আমরা গল্প করি।” অতঃপর দিউ আর বুমবুমের অভিযোগের পালা কাটিয়ে যে যার নিজের মতো গল্পে ব্যস্ত হলো। রান্নার মাসিকে নানারকম ইন্সট্রাকশন দিচ্ছিল অনিন্দ্য। আজকের সব দায়িত্ব সে নিজে নিয়েছে।

একটা কথা মনে আছে তোর রিয়া তোর ভাই নাচ শিখতো বলে কাকু কাকিমা কত রাগ করতো। তুই ওকে লুকিয়ে নিয়ে প্রশ্রয় দিতিস, ওকে কোচিং ক্লাসের নাম করে নাচের ক্লাসে যেতে সাহায্য করতিস, আর আজ তুই বুমবুমকে কাঁদতে বারণ করলি, ছেলেদের কান্নার অধিকারটা বোধহয় আমরাই ধীরে ধীরে মুছে দিই রে।” রিয়া আর মালিনী এসে বারান্দায় দাঁড়িয়েছে। ছোট একটা বাগান এই বারান্দায় আছে। অনিন্দ্য’র খুব বাগানের শখ দেখেই বোঝা যায়।

ভাই তো নিজের নাচের স্কুল খুলেছে জানিস, তবে বাবা আজও রাগ করে ছেলেটা মানুষ হলোনা বলে। ঠিকই বলেছিস রে, ছেলেদের মানুষ হওয়ার সংজ্ঞাটা বড্ডো জটিল করে ফেলেছি আমরাই।” একটা গাছে স্প্রেয়ার দিয়ে জল দিতে দিতেই বলে রিয়া।

সোশাল নেটওয়ার্কে জেন্ডার-ইকুয়ালিটি নিয়ে সরব হই আর নিকোটিন পোড়া ঠোঁট, হাওয়াই গিটার, সিক্স প্যাকে ক্রাশ খাই, নাদুসনুদুস চোখে চশমা আঁটা রোজ মনে করে দুধের প্যাকেট, চানাচুর, কিম্বা মায়ের ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফেরা লোকটা সাধারণ হয়ে যায় আমাদের কাছে। যার কাঁধে মাথা রেখে বিশ্রাম করা যায়, সে যখন অফিসে পলিটিক্সে জেরবার হয়ে ক্লান্ত হয় সেও কী আশ্রয় খোঁজেনা আমাদের মাঝে।” মালিনী প্রশ্নের উত্তর খোঁজে ওরা দু’জনেই। কী জানি রে, ছেলেটার জন্মানোর পরেই কেমন একটা নির্ভরশীল হয়ে পরেছি মা বাবা হয়ে। তোর ও বুঝি এমনটা হয়? নাকি মেয়ে বলে হয়না।” জিগ্যেস করে রিয়া।

জানিনা, রে, তবে শাশুড়ি প্রায় বলেন মেয়ের বিয়ে হলে দূরে চলে যাবে, তখন তোমাদের কে দেখবে? আর একটা সন্তান নাও। তখন মনে হয় এই যে আর একটা সন্তান নিলে সে যদি ছেলে হয় তবে ভাব তার ওপর জন্মের পর থেকেই কত এক্সট্রা প্রেশার পরবে। তাকে সময়মতো চাকরি পেতেই হবে, মা-বাবাকে দেখতেই হবে। আমরা দু’জনেই আপাতত দিউকে ঘিরেই তো আমাদের স্বপ্নগুলো বাস্তব করতে চাই। কোথাও কী ওরা আমাদের জন্য আমাদের মতো করে বাঁচতে শিখতে শুরু করে? দিউ ছেলে হলে হয়তো আমারও হতো। আঁকড়ে থাকতে চাইতাম ওকে। বারবার বোঝাতাম ছেলেদের কাঁদতে নেই, চোখের জলে তাদের মানায় না। আজকে একটা কথা মনে হচ্ছে বলি যে ওকে ওর মতোই বড়ো হতে দে। শিশুমনটা নিজের মতো ডানা মেলুক। এখন থেকেই সমাজের ছবিটা ওর সামনে এঁকে দিসনা। ওদের ইচ্ছেগুলোকে স্বাধীনতা আমরাই দিতে পারি যে।” মালিনীর কথার মাঝে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে অনিন্দ্যও।

ঠিক বলেছ মালিনী। জানো আমার খুব ইচ্ছে ছিল শেফ হবো। বাবা বললো ফ্যামিলি বিজনেস, এমবিএ করে সোজা বিজনেস জয়েন করো। রান্নাঘর নাকি ছেলেদের মানায় না। অথচ সেটাও তো একটা প্রফেশন বলো। পুত্র সন্তান হলেই আমরা ভাবি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার আর নাহলে স্পোর্টসম্যান হবেই। নাচ, গান রান্না-বান্নাটা “মেয়েলী” ট্যাগ দিয়ে আগেই নাকচ করে দিই। প্রফেশনেও এগিয়ে থাকে বৈষম্য।” আন্টি, ও আন্টি দেখো আমি কেমন আ্যপেল পাই বানিয়েছি। তুমি টেস্ট করো একটু।” বুমবুম উঠে এসেছে একটা খেলনার প্লেট আর চামচ নিয়ে।

আমি রান্নাঘরে গেলে ছেলেটাও যাবে জানিস। এখন থেকেই কত হেল্প করে আমাকে। কে জানে বাবার ইচ্ছেটা নিয়েই শেফ হবে কিনা।” রিয়া কথাগুলো বলেই অনিন্দ্য’র দিকে তাকিয়ে হাসে। হলে হবে। তাইনা। এক নিমেষে সব বদলে দিতে পারিনা তো, অন্তত কেরিয়ারের ক্ষেত্রে বৈষম্যটা বাদ দিতে পারি যদি। এই বুমবুম কী হবি তুই বড়ো হয়ে।” বাবার প্রশ্নটা বেশ চিন্তায় ফেলে দেয় বুমবুমকে। হাতে খেলনা বাটি নিয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে সে। বেশ হবে বুমবুম তুই শেফ হবি আর আমি ওলা ক্যাবের ড্রাইভার। কী মজা হবে বুমবুমের উত্তরের অপেক্ষা না করেই হাততালি দিয়ে ওঠে দিউ।

“শেষে ওলা ড্রাইভার। হায় কপাল। জানিস পুরো রাস্তা ওলার ড্রাইভারের সাথে কত গল্প করেছে। কেমন করে গাড়ি চালায়, এটা কোন রাস্তা, কত প্রশ্ন। আমার তো ভয় লাগছিল এই মেয়ের জন্য আমাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে না দেয়।” মুহূর্তে ঘরের পরিবেশটা বদলে যায় কোন এক মায়াবী ছোঁয়ায়। সবাই মিলে হেসে ওঠে। বুমবুম আর দিউয়ের মাঝেই ওরা তিনজন ফিরে পায় ওদের শৈশব।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত