সৎকার

সৎকার

যখন রাঁচি থেকে ট্রান্সফার হয়ে কলকাতায় ফিরলাম, তখন টুয়া চার মাসের পোয়াতি। আমার ছেলের বয়স তখন দুই হয়নি। পর পর দুটো বাচ্চা টুয়ার নিজের বয়সও কম, তাই দূরে থাকা নিয়ে দু বাড়ির লোকেদের খুব দুশ্চিন্তা ছিল। আমি নিজেও কলকাতায় ফিরে একটু যেন বেশি নিশ্চিন্ত হলাম। কলকাতার ছেলে না হলেও বাংলার ছেলে তো, বাংলা ভাষা, বাঙালি খাবার খুব মিস করতাম। এখন যদিও রাঁচিতে বাঙালি সংখ্যা অনেক তখন কিন্তু বেশ অল্প সংখ্যক ছিল।

যাইহোক শাশুড়ি মা এসে আমার সংসারের হাল ধরলেন, আমার মা এসে থাকলে টুয়া নিশ্চয়ই এতো খুশি হতোনা, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তাছাড়া মায়ের বয়স হয়েছে, বাবাকে ছেড়ে মা কতদিন থাকতে পারবে! মাস দেড়েকের মাথায় শাশুড়ি মায়ের গেলো হাত ভেঙে, অফিসে ছিলাম আমি, টুয়া ফোন করে বললো শিগগির্ এসো, মা টুল থেকে পড়ে গেছে। তিনি টুলে উঠে কি করছিলেন ভাবতে পারলাম না। গাড়ি যখন থামালাম, কমপ্লেক্স এর কেয়ারটেকার রামকৃষ্ণ বললো, মেম সাহেব ডাক্তারকে কল করেছিলেন, কেউ রেসপন্স করেনি, আমি কাছেই একটা ডাক্তারের চেম্বার আছে দেখি যদি ওনাকে আনতে বললাম থাক, দেখছি আমি! দেখি শাশুড়ি মা অঝোরে কেঁদে চলেছেন, টুয়া গামছায় বরফ নিয়ে তার ডান হাতে বোলাচ্ছে।

আমাকে দেখে বলে উঠলো, দেখেছো আদি কেমন দুরন্ত হয়েছে, মাকে টুল সুদ্ধু ধাক্কা দিয়েছে। আর এতো দেরী হলো তোমার, মা তো যন্ত্রণায় বললাম চল হাসপাতালে নিয়ে যাই আগে তারপর না হয় হাসপাতালে পরীক্ষা করে বোঝা গেল হাতের কব্জি ভেঙেছে, প্লাস্টার করে রেস্ট নিতে বললেন ডাক্তার। পরের দিন টুয়ার দাদা এসে তার মাকে নিয়ে গেল, তিনি যাওয়ার সময় বারবার করে বললেন একটা সবসময়ের জন্য কাজের মহিলা দেখ, এরপরতো টুয়া কিছুই পারবে না, ছেলেটা যা দুরন্ত হয়েছে, কোনদিন আবার অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে! রামকৃষ্ণ একদিন একটি মাঝ বয়েসী মহিলা এনে বললো রাখবেন একে, পাঁশকুড়ায় বাড়ি, সামনের বিল্ডিংএ সাহা বাবুদের বাড়ি কাজ করতো, ওরা দুদিন পরে দিল্লি চলে যাবেন, তাই কাজ খুঁজতে বেরিয়েছে।

বিনিতার চেহারা দেখে প্রথম আমার ভালো লাগেনি। সবকটা দাঁত বাইরে, হাঁসছে না কাঁদছে বোঝা মুশকিল, গায়ের রং কালোর রঙ উঠে গেলে যেমন লাগে দেখতে ঠিক তেমনই। আমি কিছু বলার আগে টুয়া ওকে কাজ বোঝাচ্ছে ভেতরে নিয়ে গিয়ে, আর তার কোলে আদি চড়ে তার মুখ মানে দাঁত ধরার চেষ্টা করছে, আর সে আদিকে এটা ওটা দেখিয়ে ভোলানোর চেষ্টা করছে, রামকৃষ্ণ সেদিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। বললাম তুমি এখন এসো রামকৃষ্ণ, কি হলো জানাবো তোমায়। সে যেতে যেতে বললো রেখেই দিন, খুব বিশ্বাসী! একটু পরে দেখলাম টুয়া বলছে রেখেই দি বলো, কথাবার্তা বেশ সুন্দর, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বেশ। বললাম চেহেরাটা দেখেছো একবার, মুখটা দাঁত সর্বস্ব যেন, আদি ভয় পাবে! ভয় পাবে না ছাই, যা গুন্ডা ছেলে তোমার, দেখবে চল কি করছে, বললাম যা দেখার তুমি দেখে নাও, আমি কতটুকু সময় বাড়ি থাকি। টাকা পয়সা মিটিয়ে নিও,বলার আগেই দেখি টুয়া চলে গেছে।

টুয়ার সাধে আত্মীয় স্বজন যারা এসেছিল তারা সবাই বিনিতার কাজের প্রশংসা করতে লাগল, তোয়া মানে আমার বড় শালি বললো তোমরা একে ছাড়ার আগে বলো, আমি একে মায়ের কাছে রেখে আসবো খুব কাজের মানুষ কিন্তু!
আমাদের বিনিতাকে ছাড়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, আমরা চাইছিলাম ও যেন আমাদের সাথে থেকে যাক। ওর থেকে পরে জেনেছিলাম ওর একটা ছেলে আছে, শাশুড়ি তাকে নিজের কাছে রেখে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে, বর উড়িষ্যায় রঙের কাজ করে, ওখানে আর একটা বিয়ে করে রয়ে গেছে, তাদের কোনো খোঁজ খবর করেনা। দু তিন মাস বাদে একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে বিনিতার শাশুড়ি এলো, ছেলের খাই খরচা নিতে, আগে যেখানে কাজ করতো সেখানেও যেতো টাকা নিতে। আমার বাড়ির ঠিকানা বোধ হয় বিনিতাই দিয়েছিল।

ছেলেটাকে দেখলে ও পাগলের মতো ছটফট করতো, কোলে নিয়ে আদর করতে চাইতো, কিন্তু সে আসতো না, আদি সেই সুযোগে ওর কোলে চড়ে ওকে আদর করতে বলতো। ও কোলে নিয়ে তাদের চোখের আড়ালে চলে যেত।
আমার মেয়েটাও ওর খুব নেওটা ছিল, টুয়া যখন সামলাতে পারতো না তখন ওর কোলে দিয়ে বলতো তোমার মেয়েকে সামলাও তুমি, আমার থেকে তোমার কাছেই ভালো থাকে। রেশম হওয়ার পর থেকে আদি বিনিতার কাছেই ঘুমোতো, চারজনের এক বিছানায় জায়গা হতো না।বিনিতার ছেলে একদিন এলো গলায় কাছা নিয়ে, বললো ঠাকুমার কাজ করবো টাকা লাগবে, পনেরো বছরের ছেলে, দেখে মনে হলো এ অনেক গুণ এরমধ্যেই রপ্ত করে নিয়েছে। বিনিতা তার সাথে যেতে চাইলে বললো না না তুমি গিয়ে কি করবে, টাকাটা দাও, আমি চলে যাবো। টুয়া কিছু বেশি টাকা দিয়ে জোর করে পাঠালো তার ছেলের সাথে, বললো যাক না মা, ঠাকুমার কাজ সেরে চলে আসবে।

কাজ মিটিয়ে ফিরে এসেছিলো বিনিতা, আমার মেয়ে তখন ক্লাস টু, আদি ফাইভে, ওদের যত না অসুবিধা হলো তার চেয়ে বেশি অসুবিধা হলো টুয়ার! বিনিতার হাতেই তখন পুরো সংসার, ওকে ছাড়া অচল আমরা। সংসারে যাবতীয় কাজ সে করে, আর বেশ গুছিয়ে করে, প্রতি বছর ওর টাকা বাড়িয়ে দিচ্ছিল টুয়া, কম দিলেও ও হয়তো কিছু বলতো না। পরে একদিন টুয়ার থেকে জানতে পারলাম, ওকে শাশুড়ি কাজে কেউ ও বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি, ও পাড়ার একজনের বাড়িতে তিন দিন ছিল। তার পরের মাসেই ওর ছেলে এসেছিলো বিনিতার মাইনে নিতে, বললো ঠাকুমা মরার পর ওকে কেউ দেখেনা, খেতে পরতে দেয়না, ও বাইরে যাচ্ছে কাজের সন্ধানে।

বিনিতা বললো যাসনা বাবা, আমি টাকা দেবো তোকে, আমি বললাম আর তোমার ভবিষ্যৎ! সে বললো ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়ালে, আমার আর চিন্তা কিসের, সে দেখবে, আদি দেখবে, রেশম দেখবে। এভাবেই কাটছিল দিনগুলো, ওকে বাড়িতে রেখে আমরা প্রায় বাইরে যেতাম, সেবারের গিয়েছিলাম রাজস্থানে, বেশ কিছু দিন ছিলাম না। ফিরে এসে দেখলাম বিনিতা কেমন যেন একটু চুপচাপ, মন মেজাজ খারাপ। জিগ্যেস করায় বললো ছেলেটাকে নিয়ে চিন্তায় আছি, একটা কাজ পেয়েছে, তবে আমার মন সাই দিচ্ছে না। রামকৃষ্ণ পরে আমায় বলেছিলো, আমরা যখন ছিলাম না, তখন ওর ছেলে এসে আমাদের বাড়িতে ছিল। শুনে খুব রাগ হয়ে ছিল, ভাবলাম জিগ্যেস করি, টুয়া বললো থাক, ওর খারাপ লাগবে, হাজার হোক মা তো! আসলে ও ভাবছিল ও যদি কাজ ছেড়ে দেয় তো!

আদি উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ওকে একটা ট্যাব দিয়েছিল ওর মাসি, হঠাৎ করে ওটা ঘর থেকে উধাও, আমার মনে হয়েছিল ওটা বিনিতার ছেলের কাজ, তখন তখন খোঁজ পড়লে কিছু বলা যেত, তবে এতোদিন পর, আজকালকার ছেলেমেয়েরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস পেয়ে যায় বলে কোনো জিনিসের যত্ন করতে শেখেনি বলে টুয়া আদিকেই দোষ দিলো। কয়েকদিন পরে টুয়ার পার্স থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট গায়েব, আমার পকেট থেকেও টাকা হারিয়েছে, তবে গুনে রাখিনি বলে কাউকে কিছু বলতে পারিনি।

পরে গুনে রেখে ও কম পড়াতে সন্দেহ হলো বিনিতা নয়তো! বছর খানেক যেতে না যেতেই ওর ছেলে বিয়ে করে বৌ নিয়ে মায়ের আশীর্বাদ নিতে এলো, বিনিতা বললো বৌকে খাওয়াবি কি করে! তার ছেলে বললো আমি এখন আলাদা থাকি, সব্জির ব্যবসা করছি, কিছু টাকা লাগবে, বাকিটা আমি ম্যানেজ করে নেব।কত টাকা লাগবে জিগ্যেস করায় বললো পঁচিশ হাজার টাকা লাগবে। এককথায় তাকে কুড়ি হাজার টাকা বের করে দিল বিনিতা, আমায় পাঁচ হাজার টাকা চাইছিল, বললাম এখন আমার কাছে নেই, টুয়ার মুখ দেখে বুঝলাম ও আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে।

বৌয়ের বাচ্চা হবে শুনে ও ছুটি নিয়ে চলে গেলো। বয়েসের জন্য কাজ ও আর করতে পারছিলনা, টুয়া অনেক বার বলেছে ওকে দিয়ে আর কাজ হয়না, অন্য লোক দেখি এবার। মানবিকতার খাতিরে না বলতে পারছিলাম না, ওর সুগার, প্রেশার সব ধরেছিল। ও যেতে চাইলে ওকে আর আটকাইনি, বেশ কিছু টাকা পয়সা দিয়ে ওকে বিদায় দিলাম, ও হাসিমুখে চলে গেল। আমাদের খুব ফাঁকা লাগছিল ওকে ছাড়া। রেশম কেঁদে ফেলেছিল খেতে বসে। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সিগন্যালে গাড়ি দাঁড়াতে দেখি বিনিতা রাস্তার ধারে একটা থালা নিয়ে বসে ভিক্ষা করছে, দেখে ভাবলাম নেমে কাছে যাই, তারপর ভাবলাম থাক ও যখন নিজে বাড়ি আসেনি, কিছু জানায়নি, আগ বাড়িয়ে সহানুভূতি দেখিয়ে লাভ নেই।

রাতে খেতে বসে বিনিতার কথা বললাম, টুয়া বললো ও বাড়িতে এসেছিলো, আমায় বললো ছেলে তাড়িয়ে দিয়েছে, এখন পাঁশকুড়া স্টেশনের কাছে থাকে, মাঝে মধ্যে কলকাতায় আসে কাজ খুঁজতে। আদি বললো রেখে দাওনা ওকে আমাদের বাড়িতে, টুয়া বললো অভাবে ওর স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে, চুরি করে কেটে পড়বে সুযোগ পেলে। আমিও একমত তার সাথে। ওর ছেলে আবার একদিন এলো, বললো মায়ের খুব অসুখ, টাকা লাগবে, হাসপাতালে মাকে ভর্তি করেছি। ঠিকানা চাইতে দোনামনা করে একটা ঠিকানা দিলো, হাজার টাকা নিয়ে চলে গেলো সে। পরের দিন হাসপাতালে গিয়ে ঐ নামে কাউকে পেলাম না, টুয়া বললো ছেলেটা একদম লম্পট হয়ে গেছে, অসুখের নাম করে কতগুলো টাকা হাতিয়ে নিলো।

কয়েক দিন পরে গেলাম তার খোঁজ করতে, অসুখ শুনে একটু খারাপ লাগছিল, সঠিক ঠিকানা ছিলোনা, পাঁশকুড়া স্টেশনে ভালো করে খুঁজলাম, নাহ্ ওকে পেলাম না। বেশ কয়েক মাস পরে শীতের শুরুতে ওর ছেলে এসে হাজির সাথে আরও কয়েকজন, আমি বাড়িতে ছিলাম, বললাম কি ব্যাপার! ছেলেটি বেশ রোয়াব দেখিয়ে বললো, মা মরেছে, সৎকার করতে হবে, দুহাজার টাকা লাগবে। বাইরে ম্যাটাডোরে বডি রাখা আছে।

ছেলেটার কথা শুনে রাগ হলেও, মানুষ যেখানে মারা গেছে, সেখানে কোনো কথা বলা সাজেনা। রেশম কেঁদে ফেললো বিনিতা মারা গেছে শুনে, টুয়া ছুটে বারান্দায় চলে গেল। আমি ওকে টাকা দিয়ে বললাম আর কোনোদিন এখানে এসো না। ও যেন কিছু একটা বলতে চাইছিল, পাশের একটা ছেলে বললো চল চল, শ্মশানে লাইনে পড়ে যাবো। চলে গেল তারা, আমি বারান্দায় এলাম। ওরা বল হরি ধ্বনি দিতে দিতে নিয়ে চললো বিনিতার দেহ। সাদা পুটলিতে মোড়া, গ্যাঁদা ফুলের মালা জড়ানো বিনিতার দেহ চললো সৎকারে।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত