মুখোসধারী বন্ধু

মুখোসধারী বন্ধু

“এই টাকা’টা নিয়ে বাজার থেকে এক কেজি গরুর গোস্ত কিনে নিয়ে আসো।” “তিনশত টাকা দিয়ে কী আর গরুর গোস্ত খাওয়া যাবে! খেতে হলে আরও দুইশ লাগবে।” কামরুল সাহেব দুপুরের খাবার খেয়ে শীতল পাটিতে বসে বসে সিগারেট টানছিল আর বিশ্রাম করছিল। তার স্ত্রী আমেনা বেগম হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললো, গোস্ত নিয়ে আসার জন্য। বর্তমান বাজারে গরুর গোস্তের দাম খুব চড়া। এ টাকায় গোস্ত পাওয়া যাবে না বলে আমেনা বেগম আবার ঘরে যায় টাকা আনতে। কিছুক্ষণ পর হাসি মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে বললো, “তিনশত টাকার যা পাও তাই নিয়ে আসো।” কামরুল সাহেব খানিক অবাক হয়ে বললো, “অনেক খেতে ইচ্ছে করছে তোমার তাইনা?”

আমেনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, “আজ মা বাবা, তিতলি ও তার জামাই আসবে। ওদের জন্য ভালো কিছু রান্না না করতে পারলে কেমন দেখায় বলো!” কামরুল সাহেব কিছু সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে বললো, “আম্মা আব্বা তো জানেই আমাদের আর্থিক অবস্থার কথা। এর মাঝে আবার শালীকার জামাইকে নিয়ে আসার কি দরকার ছিল?” আমেনা বেগম স্বামীর কথা শোনে রাগান্বিত হয়ে বললো, “সে তো আর প্রতিদিন আসবে না। তিতলির জামাই-এর জন্যই তো এসব করতে হচ্ছে। যাও বাজারে যাও। শুনেছি তারা রওনা দিয়েছে।”

কামরুল সাহেব তার বন্ধু ফরিদের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ব্যবসার লাভের চার ভাগের এক অংশ দিতো কামরুল সাহেবকে। মোটামুটি দিন এনে দিন খাওয়ার মতো অবস্থা হলেও বেশ স্বাচ্ছন্দ্য জীবন কাটাতেন। দুই বন্ধু মিলে ব্যবসায় বেশ সফল হয়ে ওঠে। ব্যবসার কাজের জন্য সপ্তাহে তিন দিন ফরিদের বাড়ির বাহিরে কাটাতে হয়। এদিকে ওর অনুপস্থিতিতে ব্যবসার সব ঝামেলা কামরুলের উপর এসে পড়ে।

শীতের মাঝে টাংগাইলে শাল চাদরের ব্যবসাটা যেন আরও ফুঁটে ওঠে। মঙ্গলবার বিকেলে কামরুল সাহেব সিএনজি ভর্তি শাল চাদর নিয়ে নিয়ে করটিয়া হাটে বিক্রি করতে যায়। ফরিদের বাসা থেকে বেরিয়ে হাট অবদি চাদর নিয়ে পৌঁছায়। কামরুল সাহেবকে বরাবরের মতই বলতো এবারের বছর তুই আমার সাথেই কাজ কর, সামনে বছর তোকে আলাদা ব্যবসা ধরিয়ে দিবো।

এই আশাতেই ফরিদের ব্যবসায় লেগে থাকা। কামরুল সাহেব কাষ্টমারের জন্য বসে আছে। কিছুক্ষণ পর ফরিদ এসে বললো, “কামরুল তুই যা খেয়ে আয়। আমি বসি।” কামরুল খেতে যায়। কামরুল খাচ্ছে হঠাৎ ফরিদের ফোন বেজে ওঠে। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ফরিদ চেঁচিয়ে বলছে, “বিস্কুট কালার শাল চাদরের বান্ডিলটা কি বিক্রি করেছিস?” কামরুলের খাওয়াটা যেন বন্ধ হয়ে গেল কথা শোনে। বললো, “না তো, আমি ওখানেই মাত্র রেখে খেতে আসলাম। ভালো করে খুঁজে দেখ।” ফোনেই আরও রাগান্বিত হয়ে বললো, “বিক্রি করিস নাই তো কোথায় গেলো? তুই এখনি এখানে আয়।”

কামরুল সাহেব সঙ্গে সঙ্গে খাবার ছেড়ে মার্কেটে যায়। ঢুকেই দেখে মার্কেটের প্রায় সমস্থ মানুষ জন ফরিদের দোকানে ভীড় করছে। দোকানের সামনে দাঁড়াতেই সব লোক বললো, “বিস্কুট কালার শালের বান্ডিলটা কি করেছো?” সবার হৈচৈ শোনে কামরুল খুব ভয় পেয়ে যায়। ইতস্তত হয়ে আমতা আমতা সুরে বললো, “এতো গুলোর ভীড়ে হয়তো নিচে পড়ে আছে।”

কামরুল সাহেব কথা বলছে আর হাত পা কাঁপুনি দিচ্ছে। কথা গুলো সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে পারছে না। ফরিদ রাগ চোখে তাকিয়ে বললো, “তুই আমার ব্যবসাটা এভাবে ধ্বংস করতেছিস। ব্যবসায় ইঁদুর ঢুকলে সেই ব্যবসা টিকে না। টাকা দিবি নয়তো চাদরের বান্ডিল দিবি।” একজনকে বুঝানো সম্ভব হলেও দশ মাথাকে বুঝানো সম্ভব না। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। চুপচাপ থাকা মানে দোষ স্বীকার করা। মাথা নতো করে সব মেনে নেয়া। মুখে কিছু বলতেও পারছেন না ভয়ে। মনে মনে বলতেছে, “যার ব্যবসা সাফল্যের জন্য গাধার মতো পরিশ্রম করে যাচ্ছি, সেই আজ সবার সামনে চোর বানিয়ে দিলো।”

কামরুল সাহেব মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দেখে ফরিদ বললো,”কথা বলছিস না কেনো? এখানে এক বান্ডিল, আরেক বান্ডিল বিক্রি করে টাকা কি করেছিস?” কামরুল সাহেব কাঁপা কাঁপা সুরে বললো, “তুই না আমার বাল্যকালের বন্ধু! এই চিনলি তুই আমাকে? মনে তো হলো দুই বান্ডিল-ই নিয়ে এসেছি। এমনতো হতে পারে মনভোলা হয়ে আরেক বান্ডিলটা তোদের বাড়িতেই রেখে আসছি! তুই ভাবীকে ফোন করে জিজ্ঞেস কর।” ফরিদ কিছু বলবে পরক্ষণেই পাশে থাকা লোকজন বললো, “বউ-এর কাছে কি ফোন দিবে! ফোন দিয়েছিল। বললো তুমিই নাকি নিয়ে এসেছো।”

কামরুল মনে মনে ভাবতেছে, “দশ মাথা আমাকে ভুল বুঝলেও কোনো কষ্ট লাগবে না, যদি ফরিদ বিশ্বাস করে। কিন্তু ফরিদ-ই যে অবিশ্বাস করে চোর বানিয়ে দিলো।” কামরুল গম্ভীর কণ্ঠে বললো, “ফরিদ, তোর কাছে আমার দশ হাজার টাকার মতো হবে, সেই টাকা’টা তোর কাছেই রেখে দে। ওটা আমায় দিতে হবে না।” ফরিদ চেঁচিয়ে বললো, “তোর কি মনে হয়, আমি লোভী? তোর এই দশ হাজার টাকা দিয়ে কি আর সব সমস্যার সমাধান হবে?” পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন বললো, “রাখোতো, রেখে দাও। নিজের ক্যাশ অন্যকে দেখালে লোভ সামলাতে পারে না। কামরুলও এমনটা করেছে।”

রাত প্রায় ১০ টার মত হবে। কয়েক ফোঁটা চোখের পানি ফেলে কামরুল সাহেব বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। পকেটে একশত টাকার নোট। করটিয়া সিএনজি স্টান্ডের পাশে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছে। মাথায় প্রচণ্ড চিন্তা। শহীদ মিনারের পাশে টং এর দোকানে গিয়ে একটা নেভী সিগারেট টানছে আর রঙ চা খাচ্ছে। পর পর পাঁচ’টা সিগারেট টানলেও চিন্তাটা কমছে না। কিছুক্ষণ পর খালি সিএনজিতে করে বাসায় যায়।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঠক ঠক করে কয়েকবার আওয়াজ করার পর আমেনা বেগম চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুললো। দেখে তার স্বামী দাঁড়ানো। অবাক হয়ে ঘুম ঘুম কণ্ঠে বললো, “আজ এতো তাড়াতাড়ি করে বাসায় এলে যে?” উত্তরে কিছু বললো না। রুমে ঢুকে চৌকির উপর পা ঝুলিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। পাশে আমেনা বেগমও বসে আবার জিজ্ঞেস করলো, “কি হয়েছে তোমার? কখনো তো এভাবে থাকো না! চোখ লাল কেনো?” কামরুল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, “জানো আমেনা, কারো আশায় উৎপেতে বসে থাকতে নেই।

নিজ কর্ম নিজের করতে হয়।” আমেনা বেগম স্বামীর হাতের উপর হাত রেখে বললো, “বলো আমাকে কি হয়েছে তোমার? বোধই কান্না করছো, তার জন্য চোখ এমন লাল। কিছু লুকাবে না। স্ত্রীর কাছে কিছু লুকাতে হয়না।” কামরুল সাহেব হাফ ছেড়ে বললো, “ফরিদ আজ সবার সামনে চোর বানিয়েছে আমাকে। তুমি তো জানই, তোমার স্বামী কেমন।” আমেনা বেগম বললো, “তোমাকে এর আগে একদিন বলেছিলাম, “ফরিদ ভাই ভালো না। তার জন্য আমার সাথে হৈচৈ করলে। বন্ধুর জন্য এত দরদ দেখি নাই আমি। শুধু তোমাকে দেখেই বুঝতে পারলাম বন্ধুদের দায়িত্ব সবাই পালন করতে পারে না।” রাতে না খেয়ে কামরুল স্ত্রীর পাশে মুখোমুখি হয়ে শুয়ে আছে আর ঘটে যাওয়া সব কিছু বলছে।

দুপুরের খাবার খেয়ে সিগারেট হাতে নিয়ে বসে আছে। হঠাৎ আমেনা বেগম এসে বলে বাজার থেকে গরুর গোস্ত নিয়ে আসার জন্য। কামরুল সাহেব সিগারেট অর্ধেক টেনে নিভিয়ে বাজারে গেল গোস্ত কেনার জন্য। এদিকে আমেনা বেগম মশলা বাটতেছে। হঠাৎ সে খেয়াল করলো তার স্বামীর মোবাইলে ফোন বাজছে। মশলা বাটা রেখে দৌড়ে ঘরে যায়। দেখে ফরিদের ফোন। রিসিভ করেই আমেনা বেগম বললো, “আমার চোর স্বামীর সাথে আপনারা কি সম্পর্ক? আপনারা বড় লোক মানুষ, আপনাদের বন্ধু কেবল টাকা। কোনো মানুষ আপনাদের বন্ধু হতে পারে না।” ফরিদ সাহেব নরম স্বরে বললো, “ভাবী ভুল হয়েছে আমার।

আসলে চাদরের বান্ডিলটা বাড়িতেই ছিল। ভুল হয়েছে ভাবী। ক্ষমা করে দেন।” আমেনা বেগম আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা রেখে দিল। তার কিছুক্ষণ পর কামরুল সাহেব তিনশত টাকার গরুর গোস্ত নিয়ে বাসায় আসে। কামরুল সাহেব লক্ষ্য করলো তার স্ত্রী বিরবির করে কি যেনো একা একা বলতেছে। “একা একা কার সাথে কথা বলো?” তার কথা শোনে আমেনা বেগম আরও দ্রতগতিতে বললো, “তোমার নামধারী বন্ধু ফরিদ ফোন করেছিল। চাদরের বান্ডিল নাকি বাড়িতেই ছিল। তাই সে এখন ক্ষমা চায়তে ফোন দিয়েছিল। তুমি তার সাথে আর কখনো চলাফেরা করবে না।” কামরুল সাহেব মুচকি হেসে বললো, “অপরিচিত কোনো ব্যক্তি ভুল করলে ক্ষমা করা যায়। কিন্তু আত্মার আত্মা যদি বৈমানি করে তাকে ক্ষমা করাটাও অন্যায় হবে।”

গোস্ত রান্না করে স্বামী-স্ত্রী দুজনে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বিকেল চারটা, আমেনা বেগম ঘর গুছাচ্ছে। হঠাৎ পিছন থেকে মা বাবা, তিতলি ও তার জামাই এসে সবাইকে চমকে দিলো। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে কামরুল সাহেবকে শ্বাশুড়ি বললো, “জামাই বাবা, তোমার ব্যবসা কেমন চলছে?” কামরুল সাহেবের উত্তর দেয়ার মতো কিছু জানা ছিল না। বুকের সাথে থুতনি লাগিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। আমেনা বেগম মুচকি হেসে বললো, “মা, তোমাদের দোয়ায় বেশ ভালো চলতেছে।” সবাই হাত মুখ ধুয়ে রাতের খাবার খেয়ে যার যার মত বিশ্রামে যায়।
স্বামী স্ত্রী মিলে দুজনে মুখোমুখি হয়ে শুয়ে আছে। কামরুল সাহেব বললো, “তুমি মায়ের কাছে মিথ্যে বললে কেনো?” আমেনা বেগম তার কাঁধে হাত রেখে বললো, “আমি স্ত্রী হয়ে স্বামীকে কিভাবে ছোট করি বলো! স্বামীর সম্মানের জন্য আমি স্ত্রী অনায়াসেই মিথ্যে বলে যাবো।”

মিনিট পাঁচেক সময় চোখাচুখি করে আমেনা বেগম বললো, “শোনো, তিতলি ও তার জামাইকে একবারে খালি হাতে কিভাবে ফিরিয়ে দেই বলো! কিছু একটা তো দিতে হবে।” কামরুল সাহেব স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, “কি দিবো, দেয়ার মতো সামর্থ্য নাই।” আমেনা বেগম কিছুক্ষণ চুপচাপ ভেবে বললো, “তিতলির জন্য আমার আকাশীরং-এর শাড়ীটা দিতে চাচ্ছি, আর তোমার নতুন জীন্সের প্যান্ট ওর জামাইকে দিবো। তুমি অনুমিত দিলে।” কামরুল সাহেব স্ত্রীর দুই গালে হাত দিয়ে হেসে বললো, “আমার তো মা বাবা কেউ বেঁচে নেই। তোমার মা বাবা-ই এখন আমার মা বাবা। তোমার পরিবার-ই এখন আমার পরিবার।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত