মারিয়া আমার মেয়ে

মারিয়া আমার মেয়ে

বাবার সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল সুবিধাবাদী। মানিয়ে চলতে হত। কেননা বাবা অনেকটা সংসার বিমুখ ছিলেন। দেখা গেলো পরিবারে কারো সাথে মনোমালিন্য হবে, আমি চট করে বাবার সাইড নিতাম। এতে হত কি, বাবার নজরে আমি ভালো ছেলে হয়ে থেকে যেতাম। আমার জন্য হলেও বাকীরা এতে লাভবান হত। সংসার কোনমতে চলছিল।
আমাদের পরিবারটা আর দুটো সুখী পরিবারের মত ছিল না। বাবা একবার কাজে অনেকটা বাইরে ছিল। মা এসময় একজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সালটা হবে ২০১২এর দিক। তা অবশ্য বেশিদিন ছিল না। কিন্তু বাবা যখন ফিরে আসে, তার কানে যায়।

তবে থেকেই শুরু হয় হট্টগোল। এরপর আর বাবার সাথে মায়ের সম্পর্ক কোনদিন ঠিক হয়নি। দিনেদিনে আরো বেগতিক হয়েছে। মায়ের গায়ে হাত তুলত। আমরা চুপটি করে দেখতাম। সংসারটা বাবা নিজের স্বেচ্ছায় চালাচ্ছিল। কারো কোনো সলাপরামর্শ নিত না। খরচ দিতো না ঠিকমতো। একপ্রকার মানসিক অত্যাচার। এভাবে কোনমতে কলেজে উঠি। আল্লাহর রহমতে আমার বোর্ড বৃত্তি হয়। কোনো খরচে লাগত না পড়াশোনার । তখনও আমি বাবার পাশ নিয়ে চলতাম। ছোটবোনটা নাইনে সায়েন্সে। ওর প্রাইভেট পড়তে হত। তাও দিত না। তবে বাবার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো থাকাতে বায়না করে টাকা নিতাম। আমার এই পাশ নেওয়ার জন্য হলেও বাবা সংসারের ছাড়তে পারতেন না।

এর মাঝে আমার বিভীষিকাময় জীবনে একজনের আগমন ঘটে। খুব ঘটা করে পরিচয় আমাদের। ওর নাম ছিল সানজু। ফেসবুকে টুকিটাকি লিখতাম আমি। এ-ই দিয়ে পরিচয় হয় আরেকজনের সাথে। ওর নাম ছিল তমা। লাইক কমেন্ট এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল সবটা। ওদিকে সানজু অনেকটা পাগল ছিল আমার জন্য। কখনো মুখে না বললেও বুঝতাম আমি। অনুভূতিকে অনেকটা বাগড়া দিতাম। আমার উচিত ছিল তাকে মানা করে দেওয়া। একথা আমি বহু পরে গিয়ে বুঝতে পারি। আমার আর পিছনে ফেরার সুযোগ ছিল না।

এদিকে তমা হুট করে আমাকে ভালবাসার কথা বলে দেয়। আমি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তার সাথে কখনোই আমার কথা হয়নি। এমনটা কখনো হওয়ার প্রশ্ন আসে না। রীতিমতো হাসিতে উড়িয়ে দেই। দিন যায়, মাস আসে আমাদের কথা বলার মাত্রা তীব্রতর হতে থাকে। তমা আমার থেকে সিনিয়র কথাটা মাথা যেন গায়েব হয়ে যায়। আমার জীবন এক আজিব উঠের পিছনে চলছিল। হিতাহিতজ্ঞান কিছু ছিল না। এর ভবিষ্যত কি কখনো ভাবতাম না। বড় উদাসীন ছিলাম। এরপর তমার কথা আমি সানজু কে বলি। সে কষ্ট পায়। মানতে রাজি না। এবার ওকে ইমোশন কন্ট্রোল করতে বলি। যা বলতে গেলে দেরি হয়ে গেছিলো। ইগনোর করা ছাড়া উপায় ছিল না।

এরমধ্যে হুট বাবার মাথায় এই বয়সে এসে বিয়ের ভুত চাপে। মাকে তালাকের জন্য প্রেশার ক্রিয়েট করতে থাকে। অনেকসময় মারমুখী হয়ে যেতো। এবার একটা বিপ্লব দরকার ছিল। মা তো মানুষ। আর মানুষ বলে ভুল করেছিল। একবারও কি ক্ষমা করার কথা মনে আনা যেতো না। উল্টো এমন একটা পদক্ষেপ। এক সকালে বাবা পারলে মাকে জানে মেরে ফেলে। মায়ের মার খাওয়া ছেলে হয়ে আর কতোই বা চোখবুঁজে সহ্য করতাম। বিদ্রোহ গড়ে তুলি। দেখা গেছে বাবার হয়ে কথা বলেও কতোই বা ভাল ছিলাম। এভাবে তো বাচাঁ যায় না। বাবা আমার এমন আচরণে হতভম্ব হয়ে পড়ে। আম্মুর হাত ধরে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসি। সে খারাপ হলেও আমার মা। জন্ম দিয়েছেন আমাকে। কিভাবে ছাড়তাম এভাবে মরণের জন্য।

ওদিকে তমার সাথে ঠিকঠাক চলছিল। ওকে কিছু বুঝতে দিতাম না। আর যাইহোক ঘরের কথা সব বলা যেতো না। পারিনি। আমি এক ট্রমার মাঝখান দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার সাথে যে এতকিছু ঘটতেছে ওকে কিছুই জানাতাম না। দুমুঠো ভাত, আর মাথার ছাদের কাঙ্গাল হয়ে গেছিলাম। শেষপর্যন্ত খালামনির বাসায় উঠি। সেও ছোটবোনকে কটাক্ষ করতে ভুলত না। আমার সব সহ্য করতে হত। ভাত গলার নিচে নামত না। কলেজ যাওয়া বন্ধ ছিল। এরমধ্যেই টেস্ট পরীক্ষা চলে আসে। একরাতে তমা আমার একটা আবদার করে বসে। এতদিনে একটিবারো তাকে কিছুই দিতে পারিনি। এমনকি কল পর্যন্ত তমা নিজে করত। আরো ফোনে রিচার্জ করে দিতো। তমা নিচু স্বরে বলে, তোকে ঢাবি তে পড়তে হবে।

সত্যি বলতে জীবনের এমন মোহনায় ঢাবি আসলে কি জানার এতটুকু ইচ্ছে ছিল না। এইটা জানতাম ঢাবি ঠিকি বড় কিছু হবে। তমা একদিনের স্বপ্ন যা কখনো পূরণ হতে পারিনি আমার চোখে সাজাতে চেয়েছিল। ওকে ফেরাতে পারিনি। ওদিকে খালামনির বাসা থেকে কোনমতে টেস্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। সবার মাঝে একটা আলোচনার বিষয় গড়ে উঠে ভার্সিটি। আর আমি তখন কোনমতে পাস করলে বাঁচি টেস্টে। সময় যত যেতে লাগল, ক্যাম্পাস, ভার্সিটি নিয়ে আলোচনা তীব্রতা পেলো। ঢাবি নিয়ে আমার মনে ধারনা পরিষ্কার হতে শুরু করল।

কিন্তু সবকিছু এত সহজ ছিল না। টেস্টে আইসিটি তে ফেল করলাম। যে বিষয়ে সবসময় আমার বেশি নাম্বার থাকত। ক্লাশ ক্যাপ্টেন পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছে অনেকের হজম করতে সময় লাগল। আমাকে বি ক্যাটাগরি শাখায় দেয়া হল। এ ক্যাটাগরি তে ২/৩ বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হয়েছে এমন ছাত্র ছিল। তবে আমাকে দিলে কি হত? শিক্ষকদের সাথে এখানে আমার দূরত্ব শুরু হয়। তমা আমাকে বুঝাত যেভাবেই হোক। ওর কথা ছিল একদিকে যদি ভালো গুলো কে দেয় তবে একটু কম পারে যারা তার শিখবে কি করে। আমি তা মেনে নেই। সে যখন বলেছে। প্রায় তিনমাস পর বাবা মিমাংসা করতে রাজি হয়। একটা দলিল স্বাক্ষরিত হয়। যেখানে দু’জনের কিছু শর্ত উল্লেখ ছিল। আমার এতে ঘোর আপত্তি। কিন্তু সে সময় আর কোন উপায় ছিল না। খালার সেই চারদেয়ালের বাড়ি মনে হত আজাব । যে করেই হোক রেহাই পাওয়ার পথ খুজছিলাম। পেয়ে গেছি।

আগে যে বাসায় ভাড়া ছিলাম, সেই এলাকা ছেড়ে দেই। নতুন বাসায় উঠি। নতুন বাসার কিছুদিন যাবার পর বাবা কে আমাকে সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে পরীক্ষা দিতে বলে। তার কেন জানি বিশ্বাস ছিল, আমি ভাল কিছু করব। আর নাহলে সৈনিক পদে যেন দাঁড়াই। অথচ আমার চাওয়া ছিল অন্যকিছু। সবার মুখেমুখে শুনতে শুনতে ঢাবি নিয়ে আমিও স্বপ্ন দেখা শুরু করে দিয়েছি। তা তমার শুধু চাওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে নি। আমার একটা নিজের জেদে পরিনত হয়েছে। কলেজে সবাই কে তাক লাগানোর কথা ছিল। বাবা কে জানাই, আমি সামনে আরো পড়তে চাই। যদি তার সুযোগ নাহয় তুমি যা বলবে আমি করতে রাজি। বাবার ইচ্ছে না থাকলেও রাজি হয়। সে কখনো আমাকে কোনকিছুতে মানা করেনি। কিন্তু বাবা ছেলের সম্পর্কে চির ধরতে শুরু হয়ে যায় এরমধ্যে।

একবার আমার মুখ হঠাৎই সানজুর কথা উঠে। আমাদের মাঝে মনোমালিন্য হয়। সবকিছু নিতে পারছিলাম না। আমার এতটুকু চাওয়া ছিল আমার হয়তো বুঝ কম থাকতে পারে। তমা যেন অনন্ত আমাকে সামলায়। তা কখনো হত না । যা কখনো আগে হয়নি। খুব গুরুত্ব না দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। এরপরের দুদিন তমার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয়নি। তৃতীয় দিন ফোন রিসিভ করে তমার ছোটবোন। জানায়, তমা আজ দুদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। আমার কলিজাটা ছিড়ে যাবার মত উপক্রম। ৩৫০কিমি দূরে দুজনে। পারলে যেন উড়ে যাই। কিন্তু তা সম্ভব ছিল না।
নিরুপায় ছিলাম। তমার ছোটবোন, অনেক কথা শোনায়। ভালমতো বললে, রীতিমতো অপমান করে। তমা খাওয়া করত না আগেও ঠিকমতো। আমি কত জোর করেই ওকে খাওয়াতাম। এই সেই বলে। অথচ সে গত কয়েক খাচ্ছিল না। আমি খবর অবদি নেইনি। খবর নেই যে তা নয়, আগেকার মত নেয়ার মত নিতাম না। বাড়িতে এতকিছু চলছিল। না চেয়েও ইগনোর করে ফেলেছি। এতে রক্তক্ষরণ শুরু। যা কোনদিন আর ভরেনি।

এলাকায় ইউসিসি তে ভর্তি হলাম। বাবা ফি পর্যন্ত দিতো না। ফি নাহয় বাদে দিতাম, বাসা থেকে কোচিং মোটামুটি দূরে ছিল। অটো তে করে গেলে পারতাম। সেই ভাড়াটুকু দিতো না।তমার সাথে এতদিন কথা বলে বুঝেছি ওর বাসায় কোন ভিত্তি নেই তার। আমার কাছের মানুষটা এমন পরিচয়হীনতায় ভুগছে কি করে মেনে নিতাম। ওকে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে আবেদন করতে বলি। আমাদের মাঝে আর যাইহোক সে যেন এই কথাটা রাখে মিনতি করি। সে কথা ফেলাতে পারেনি। কোচিং এ ওইদিকে মন বসছিল না। হাবিপ্রবির অনভিজ্ঞ টিচার দিয়ে আমাদের ক্লাস নিতো। শুরু থেকে অতিষ্ঠ ছিলাম। জানলে সবাই পড়াতে পারে না বুঝে নেই। পরিচালকের সাথে ঝগড়া করে চলে আসি। মানসিক অবস্থা কোনমতে ঠিক ছিল না।

তমার পরীক্ষা এগিয়ে আসছিল। ওকে বুঝতে দিতাম না। কথা কমিয়ে দিলাম। ও পড়তে পারে যাতে। এদিকে আমার স্বপ্ন খন্ডখন্ড হচ্ছিল। কমার্সের টার্মগুলো কিছুতে আয়ত্ত করতে পারছিলাম না। বাবার উপর বড় অভিমান হয়। ঢাকা নাহয় অন্ততপক্ষে রংপুরে যদি কোচিং করতে পাঠাতো। কিছু করতে পারলে তারই নাম হত নাকি। এরিমাঝে জীবনে আরেক শনি আসে। সানজুর বান্ধবী আকস্মিক যোগাযোগ করে। সানজুর অবস্থা ভালো না। খায়না, ক্লাশে আসে না, খেয়াল নেই। সে পারলে আমার পা দু’টো ধরে। খানিক যেন কথা বলি সানজুর সাথে। একথা যদি তমা কে জানাই একনিমিষে সব শেষ করে দিবে। মনে ভয় ঢুকে যায়। আবার সানজুর বান্ধবীর কথাও ফেলতে পারি না।

সানজুর সাথে ভালোমন্দ কথা হত শুধু। এর বেশি কিছু নয়। সে খুব আফসোস করতো আমায় নিয়ে। তাকে বুঝাই, তাকে ফিরিয়ে দিয়ে এমনটা করে আমিও তমার সাথে ভালো নেই। মেসেঞ্জার থেকে সস নিয়ে দেখাতাম, আগের মত আর কথা হয় না। তবুও যেন বুঝে। সবাই যে যার মত থাকি যাতে। ভালো থাকব এতে।  তমার পরীক্ষা হয়ে যায়। বাড়ি আরেকবার রণক্ষেত্রে রুপ নেয়। বাবার শঙ্কা জাগে। যদি সত্যি সামনে আরো পড়ার আমার সুযোগ হয়। পুরনো খেলা আবার শুরু করে দেন। যা খরচ দিতো নগণ্য। তাও বন্ধ করার তাগিদ দেন। আমি অটল। চেষ্টা না চালিয়ে থেমে যাওয়ার পাত্র ছিলাম না। মনে আমারও শঙ্কা ছিল আমাকে দিয়ে হবে না। বাবা আমার মাঝে কি দেখেছেন তিনি আর আল্লাহতালা ছাড়া কেউ জানেন না। গ ইউনিটের প্রস্তুতি একদমই ছিল না। তবে খুব জিকে পড়তাম। কারেন্ট অ্যাফেয়ারস, জুবায়ের জিকে মুখস্থ ছিল বলতে গেলে।

তমার রেজাল্ট হয়। ভাইবার জন্য ডেকেছে। আনন্দে আকাশে উড়ি। চেনা পরিচিত সবার কাছে খবর নেই। নিয়োগের সম্ভাবনা কতটুকু। জানতে পারি জেলা ভিত্তিক নিয়োগ দেয়। আমার মনে আশা তীব্র হয়। ভাল কিছু হবে।
তমার ভাইবার দিনে ওকে কল করতে ভুলে যাই। নিজে থেকে কল করেছিল তাও ধরতে পারিনি। আগেররাতে বাবার সাথে তর্কাতর্কি লাগে। বাবা গায়ে হাত তুলবেন বলে উদ্ধৃত হন। সে রাতে চোখে জল চলে আসে। এত চড়াইউৎড়াই দেখলাম কখনো চোখে জল আসেনি। এবার আর ধরে রাখতে পারিনি। একথা তমা কে কি করে বুঝাতাম। ভাইবা থেকে এসে এনিয়ে কথা হয়। সে যে কম কষ্ট পায়নি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চুপ ছিলাম। কি বলে মাফ চাই।
এর কিছুদিনের মাথায় তমা খবর পায় আমি সানজুর সাথে কথা বলি।

এই ছিল আমাদের সম্পর্কের ইতি টানা। তমা আমার কোন কথা, কারণ জানতে কি বুঝতে চায়নি। সানজু কে জেরা করি। সে বলেনি। তবে তমা কিভাবে জানতে পারল তা আর জানা হয়নি। হাজারবার ওর কাছে মিনতি করতাম। অপরাধ করেছি। এবারের মত যেন মাফ করে দেয়। সে তার জিদে অনড় ছিল। আমাকে একটিবার সুযোগ দেয়নি। কল দিলে ফোন ধরে রেখে দিতো। কিছু জানতে চাইলে হ্যাঁ আর না জবাব দিতো। দোযখের আগুনে জ্বলছিলাম। পড়াশোনা চুলোয়। তখন থেকে স্মোক করা শুরু করি। সব দিক থেকে আমাকে চাপিয়ে ধরে। ছুড়ি হাতে বসেও নিজেকে শেষ করে দেবার স্বীদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি। নাম মাত্র বেঁচে ছিলাম।

সেপ্টেম্বরে সি ইউনিটের পরীক্ষা হবার কথা। আর কয়েকদিন বাকি ছিল। ঢাকা যাচ্ছিলাম ধারদেনা করে। বাবা শুধু টিকিটের টাকা দিছে। বাড়তি খরচ যে যার কাছে নিয়ে পাড়ি দেই স্বপ্নের তাড়নায়। এর আগে কখনো বগুড়ার সীমানা পাড় হই নি। প্রথমবার ঢাকার মাটিতে পা রাখা। তাও ঠিক করতে ওখানে অতিথি হয়ে আসা নাকি এখানে ঘর পাতা। ঢাবির আগে জাবির পরীক্ষা ছিল। সেই বিকেলে সে কি বৃষ্টি। মিরপুর থেকে গেলাম পরীক্ষা দিতে। তমা একটিবার আমার খবর নেয় নি। তার উপর জাবির কোনো প্রস্তুতি নেই। অহেতুক পরীক্ষা দিতে আসা। রাতেই ফলাফল আসল। যা হবার তাই হল। চান্স হয়নি। যদিও জাবিতে পড়ার ইচ্ছে ছিল না তবুও খারাপ লাগা কাজ করছিল। এ কথা কারো কাছে বলতে পারছিলাম না। না বাড়ি তে, না তমা কে।

সি ইউনিটের পরীক্ষা কলাভবনে ভাষাবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টেে সিট পড়লো। পড়া দিয়ে বের হয়ে চোখ ছলছল করছিল। কেঁদে ফেলি। নিজ হাত স্বপ্নের গলা টিপে দেই। আমার মনে হচ্ছিল ভাল কিছু হবে না। মিরপুর ফিরে ছাদে আসি। তখন ঝুম বৃষ্টি। ডি ব্লকের এখান থেকে নদী একটা দেখা যেতো নাম জানতাম না। ছাদের রেলিং এ বসে, পা বাইরে করে তমা কে কল দেই। শেষ বার বৃষ্টির পানি ইচ্ছে করে গায়ে স্পর্শ করাই। তমা কে অনুভবে আলিঙ্গন করি। সবার প্রতি অভিমান হয়। খুব অভিমান।

একটু গাইডলাইন পেলে হয়তো, ভাল কিছু হতে পারত। হল না। কাউকে পাশে পাইনি। কাউকে না। না জন্মদাতা কে, না ভালবাসার মানুষটাকে। সন্ধ্যা বেলায় গাবতলি থেকে বাস ধরি। এমনো দোয়া করি রাস্তায় যেব আমার কিছু হয়ে যায়। বাড়ি যেন এই শরীর না ফিরে। নিজের এই ব্যর্থতা মেনে নিতে পারছিলাম না। যেদিন রেজাল্ট দিলো। মাটিতে লুটে পড়লাম। নীরবে কাঁদছিলাম। পজিশন আসে ১৬শ এর পরে। আর কয়েকটা কুইজ দাগাইতে পারলে৷ দুনিয়াটা বিষাক্ত জ্ঞাত হচ্ছিল। এই দুঃখ কারো কাছে ভাগ করতে পারিনি। কেউ চায়নি। কেউ না।

মা যে সন্তানের জন্য কি করতে পারে আমার বেলায় তা বুঝিয়ে দিলো। মা খোজ লাগিয়েছিল, রাবির আর ঢাবির ঘ ইউনিটের পরীক্ষা এখনো বাকি। বাবা যদি তার আগে ছেলের উপর প্রেশার ক্রিয়েট করে মামলা করবে বাবার নামে। নির্যাতন মামলা। বাবা দমে গেলেন খানিক। তবে আগে যেমন টিকিটের টাকা দিয়েছিলেন এবার তাও দিলেন না।
ঘ ইউনিটের সিট পড়লো মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়ালে। পরীক্ষা দিলাম। এবারও মনে হল একটুর জন্য হাতছাড়া করলাম। ঢাবির পরীক্ষা দিয়ে এসে কিছুদিন পর গেলাম রাজশাহীতে। ওখানে স্টেশন থেকে খানিক দূরে মহিলা কলেজ রোডে ছিলাম৷ এবার রেজাল্ট দিলো।

১হাজারের পরের সিরিয়াল। মানে ওয়েটিং এ অনেক দূরে। এবার আর কোন অনুভূতি ছিল না। শীরা উপশিরা নিস্তেজ হয়ে গেছিল যেন। রাবির পরীক্ষার আগের রাতের ঘটনা। তমার সাথে কথা না বললে যেন দুম করে মরব। হাউমাউ করে কাদঁছিলাম। কল রিসিভ হয়নি৷ পরে সাকিল আমার বন্ধু কে কল করি। কান্না কাটি করি। সাকিল বুঝায়। রাবির পরীক্ষা দিতে বলে। একসময় বলে, একটা কথা বলি? সম্মতি দেই। একটা ফটো আমাকে টেক্সট করে তমার। তমা একটা ছেলের সাথে মুভি দেখতে যাচ্ছে রিক্সায়। সেই ফটো ফেসবুকে আপলোড দিছে। তখন থিয়েটারে দেবি মুভি চলছিল। আর আমি আমার দেবি মন থেকে হারাই। পরে তমা কল দিলেও কথা বলার মন সায় দেয়নি। পরেরদিন রাবির পরীক্ষা দিয়ে এসে সবার মুখে শুনি ভালো পরীক্ষা দিছে। সবাই চান্স পাবে এমন যেন। যেখানে আমি হাহুতাশ করে পাই না।

ট্রেনে করে যখন বাড়ি ফিরতেছিলাম ঘ ইউনিটের পরীক্ষায় প্রশ্ন জালিয়াতির কথা শুনি । এক বিজ্ঞ উকিল হাইকোর্টেে আবেদন করেছেন পুনঃপরীক্ষা নিয়ে৷ রাজু ভাস্কর্য সংলগ্ন আকতার নামে একজন নাকি আমরণ অনশনে বসেছে। আমার তাতে কোন মন নেই। বাসায় ফিরে দুই বন্ধু শাহবাজ আর সাকিলের সাথে বসলাম। বাবার তো সংসারের হাল ধরার লোক চাই। আমি দোকানে ঢুকব একটা। কাজ করব। অল্প অল্প করে জমিয়ে পরের বছর আবার পরীক্ষায় বসব। এ বছর কিছু করার নেই। ঢাবির জন্য কোথাও আর আবেদন করিনি। এমনকি জাতীয়তেও না।

এবার শেষ বারের মত ঢাবির ধুলো নিলাম। হ্যাঁ, ঘ ইউনিটে যারা পাশ করেছিল যারা তাদের আবার পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। আজকে ছিল। কোনএক অভিনেত্রীর ভাই নাকি এর সাথে জড়িত। এবার সিট পড়েছিল সেন্ট্রাল লাইব্রেরি তে। পরীক্ষা দিয়ে সোজা হাটা দিলাম যেখানে রাত কাটিয়েছি। বিডিআর ৩নং গেটের দিকে। ব্যাগপত্র নিয়ে শ্যমলী চলে গেলাম। শেষবারের মত ঢাকা শহরের কোলাহল, আকুতি কাছে টানছিল। আরেকবার আবেগের বসতি হয়ে বোকা হতে চাইনি।

সকালে সাকিল কে কল দিলাম। বিড়ি খাওয়ার টাকা নেই। সে যেন ব্যবস্থা করে। আগের রাতে রেজাল্ট দিছে। দেখিনি আমারটা। না দেখে ফেসবুকে জানিয়ে দেই চান্স হয়নি। তমা যেন দেখতে পারে। রাজশাহীতে কল দেবার পর আর দেইনি। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি৷ সাকিল দেখা করে বলল, বিড়ি না খেয়ে চল একখানে। কথা না বাড়িয়ে ওর সাথে সাথে যাই৷ একটা কম্পিউটারের দোকান। মাইশা কম্পিউটার। আমার আজও মনে আছে সাকিল আর সেই লোক চিল্লিয়ে কুল পাচ্ছিলেন না৷ এবার পজিশন ৪শ এর কিছু পড়ে। আমার বিশ্বাসে হচ্ছিল না। এ কিভাবে হয়!

জীবন ঘুরে যেতে থাকে। এতদিনের সংঘর্ষ কাজে আসছিল। জানুয়ারিতে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসি, অথচ এই ঢাকায় প্রথম আসা আমার পরীক্ষা দিতে। নতুন শুরু দরকার ছিল। তমা কে জীবন থেকে মুছে ফেললাম আগে। নাম্বার ডিলিট, ফেসবুকে ব্লকড। আল্লাহর কি কারিশমা, দুদিন পর ফোন চুরি। মন চাইলেও যোগাযোগের উপায় ছিল না। একটা বাটন ফোন কিনে নিলাম। আব্বু ক্ষুব্ধ ছিল, আবার মানুষ কে জোর গলায় বলে বেড়াত আমার ছেলে অমুক জায়গায় পড়ে৷ মা সব কথা ফোনে জানাত। একে তো ভাষাভিত্তিক সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা, তারপর প্রথম বর্ষ। কোনমতে টিউশনি পাচ্ছিলাম না। একবার এলাকার ভাই, ট্রিক শিখিয়ে দিলো। মিথ্যে বলতে হতো যদিও উপায় ছিল না। সাবজেক্ট অন্যটা বলতাম।

বেশিদিন লাগলো না টিউশনি পেতে। গণরুমের রাজনীতিতে ভাল বেড়ে উঠছিলাম। গেস্টরুমে আদব শেখানোর নামে ক্লাশ নিতো। গালিগালাজ, বকা দিতো। রোকেয়া হলের যাত্রী ছাউনি তে বসে কত কেঁদেছি। আম্মুর সামনে বোকার মত কাঁদতাম। আমরা আমরা মিলে একটা গ্রুপ ক্রিয়েট করলাম। বিপদেআপদে একেঅন্যের পাশে থাকতাম। রাতে ঘুরে বেড়াতাম। রাতের হাতিরঝিল, ধানমন্ডি লেক, উত্তরা তে ট্রাক থামিয়ে রাতভর ঘুরতাম। কেউ টিএসসির সংগঠনেে মেতে গেলো। কেউবা উদ্যানের গাঁজার আসরে। আমারও বদঅভ্যেস লেগেছিল৷ সিগারেটের। নতুন একটা ব্রান্ড বেরোলো একবার। পাঁচটাকা মাত্র ওটাই খেতাম। হল রাজনীতিতে না চাইতেও একটিভ উপাধি পেয়ে গেলাম।

শীতের রাতে র্যাকেট খেলায় প্রোটোকল দেয়া সবচে বিশ্রী লাগত। মানিয়ে নিলাম। সপ্তাহে মধুতে যেতে হত। শ্লোগান এ মুখর হত। একবার খুব জ্বর হল। ভাইরাস জ্বর। মেডিকেলে নিয়ে গেলো বন্ধুরা মাঝরাতে। দুদিন পর অসুস্থ শরীর নিয়ে হাজির হলাম বদরুন্নেসার গেটে। একটা আবেগ কাজ করছিল বহুদিন পর। ফেরার পথে মলচত্বরে কৃষ্ণচুড়া রক্তআঁখিতে মেতে উঠলাম। সময় তার গতিতে চলছিল। ১ম বর্ষ থেকে ২য়, ৩য় পাড় করলাম ফাইনাল ইয়ার সিজিপিএ বলার মত ছিল। একেবারে ফেলে দেবার মত না। বাড়ি তে সবার সাথে কথা হলেও বাবার সাথে বলতাম না। বাপের ছেলে বলে কথা। কম জেদ না। ক্যাম্পাস জীবনের শেষের দিক হলের সভাপতি নির্বাচিত হবার পাল্লায় এগিয়ে ছিলাম। ওদিকে মতিন ভাই একটা বেসরকারি ব্যাংকের নিয়োগপত্র পাঠায় দিলো। পরীক্ষায় টিকলে বাকিটা তিনি দেখবেন কথা দিয়েছিলেন। তার কথা রেখেছেন। জয়েনিং ছিল এজমাসের মাঝে।

অবশ্য খাম আমি খুলেও দেখিনি। কোন মোহ ছিল না। কেন জানি দোযখের আগুনে জ্বলতে মন করছিল। রাজনীতির দিকে ঝুঁকছিলাম। ক্ষমতার অদম্য খেলায় মাতব বলে। যে রাজনীতিতে ঢুকতে হয়েছিল জোর করে। অনিচ্ছায়। তাই ভবিষ্যৎ হবার পথে। দিনে দিনে অমানুষ হচ্ছিলাম। ছোটরা নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদা উঠাত। আমি ভাগ পেতাম। মতিন ভাই অফিস থেকে বাড়ি না ফিরে বাচ্চু মামার চায়ের দোকানে ডাকল এক সন্ধ্যায়। ছুটে গেলাম টিএসসিতে। লোকটার ডাক ফিরাইতে পারতাম না কেনো জানি। খুব করে বুঝাল সে। ক্ষমতার দম্ভ আর কতদিন? আমার জন্য চাকরিটা এখনো আছে জানান তিনি। কোন জবাব দিলাম না। মাকে মতিন ভাই ভালমতো চিনতেন। ফেরার কালে বলে উঠলেন, চাচি আম্মার দোয়া বিফলে যাবে না দেখিস।

গনতন্ত্রতোরণ থেকে ভিসিচত্তরে সন্ধ্যা নামলে ট্রাফিক জ্যাম লাগত বড়সড় আকারে। এক দিন নিউমার্কেট থেকে ফিরছিলাম। কিছু বাইক চালক অপদার্থ উল্টো পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। এজন্য ক্যাম্পাসে ঢুকবে যে রিকশাগুলো যেতে পারছিল না। একটা রিকশা চালক মামা দেখলাম খুব আকুতি করছিল একজন কে। বাইক সরাতে। একজন রোগী যাচ্ছে। বাইক চালক নাছোড়বান্দা। কোন না ভেবেই গেলাম সামনে। হেলমেট খুলতে বললাম। খোলা মাত্র গালে চড় বসালাম একটা। তখন এ.এফ রহমান হল থেকে আরো ছাত্র বেড়িয়ে এলো। রাস্তা ক্লিয়ার করল।

চোখ ফেরাতে যা দেখলাম, বিশ্বাস হচ্ছিল না। তমা? তমা আমার সামনে। কোলে একটা মেয়ে বাচ্চা। পাশের বুজুর্গ হাসফাস করছিলেন। হয়ত শ্বাসকষ্ট ছিল। ক্যাম্পাসে যা ধুলোবালি। চোখের পলকে রিকশা টান দিলো মেডিকেলের দিকে। তমা একটিবার ফিরে তাকায়নি। তমা কে দেখব এভাবে? কখনো ভাবিনি। যত জল্পনাকল্পনায় দিন গেলো। এক দুপুরে ঘুমোচ্ছিলাম। আমার বেডে ছোটভাই থাকত। সে এসে জাগাল। আমার সাথে দেখা করতে একজন গেস্টরুমে অপেক্ষা করছে। আমি ফ্রেশ হয়ে গেলাম। তিনি পরিচয় দিলেন, তমার মা হন। আমার আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি বসতে বললেন। এরপর এক-এক করে বলা শুরু করলেন।

তমা ওর মায়ের খুব কাছের ছিল। আমার সব কথা জানাত। সেই কিভাবে পরিচয় হল, অসুস্থ হওয়া, ভাঙন গড়ন সব। উঠবার আগে তিনি বলেন, তমার বাবা একবার বিছানা ধরলেন। শেষ দিনগুলো গুনছিলেন। তোমার সাথে মনোমালিন্যের ঠিক কয়েক দিন পর। তমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রবাসী এক ছেলের সাথে চটজলদি বিয়ে দিলেম। জলদির কাজ কি আর শুভ হয়। একবার জামাই সেই যে গেলেন, আর ফিরলেন না। ততদিনে তমার পেটে সন্তান। মেয়ে টাকে নিয়ে আগলে আছে। বাবা হারিয়েছে, ভালবাসা নেই। মেয়েটা বড় একা। কাল আমরা চলে যাবো। আমার চিকিৎসার জন্য আসা। আর কথা বাড়ালাম না। রিক্সায় উঠে দেবার আগে আন্টি কে জিজ্ঞেস করলাম, মেয়ের নাম কি রেখেছে?

– আন্টি হেসে বললেন, মারিয়া।

মনের হার্টবিট বেড়ে গেলো শুনে। মারিয়া! আমার পছন্দের নাম। তমা মনে রেখেছে। পারলো মেয়েটা? সকাল বেলা ৭নং বাসে করে সদরঘাট গেলাম। অনেক খুঁজাখুঁজির পর তার দেখা। মেয়েকে কাপড় পড়াচ্ছে শীতের। কাছে গেলাম। মারিয়া কাপড় পড়ছিল না বলে ছুটে এলো আমার কাছে। কোলে তুলে নিলাম। তমার চোখ ছলছল। কত জানার এ চোখে? কত প্রশ্ন? মানাতে হবে মেয়েটাকে। তার আগে চোখ ভরে তাকিয়ে নিচ্ছিলাম। বেশি হলে কুড়ি কিশোরী লাগতেছে। কে বলবে এই বাচ্চাটার এক বাচ্চা আছে। আমাদের বাচ্চা। মারিয়া। মারিয়া আমার মেয়ে।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত