আত্মপ্রলাপের বিবৃতি

আত্মপ্রলাপের বিবৃতি

ঘরে ফিরে মীনাকে দেখতে পেলাম না। বারকয়েক ডাকলাম, মীনা এই মীনা! কোথায় গেলে? মীনার কোন প্রতিউত্তর নেই। না থাকারই কথা। মীনা তখন ঘরে ছিল না। দুটি মাত্র ঘর আমাদের। অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক চিন্তা করতে গিয়ে বাড়িওয়ালা ঘরগুলো কবুতরের খোপের মতো বানিয়েছেন। একটা লোহার খাট এবং একটা হাল আমলের কাঠের টেবিল রাখলেই ঘরে হাটাচলার কায়দা থাকে না। দুই ঘরের মাঝ বরাবর একখান নামমাত্র ড্রয়িং রুম। সোফাসেট কেনার সামর্থ্য নেই- বলবো না। বাবা-মা গ্রামে থাকেন। তাদেরকে একটা মোটা অংকের টাকা প্রতি মাসেই পাঠাতে হয়। বাসা ভাড়া, সারা মাসের বাজার খরচ, মীনার হাত খরচ মিটিয়ে আমার পকেটে খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকে।

যা দিয়ে টানাটানি হয়, মাসের মাঝামাঝি আসতেই এর ওর কাছে ধার দেনা হয়ে যায়। এসবের মাঝে সোফাসেট কেনাটা খুব বিলাসিতা মনে হয় আমার কাছে। যদিও মীনা এই নিয়ে ঘোর আপত্তি তোলে যখন তখন। অনেক সময় ওর কথার তেজ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়, কেন? তোমাকেই কেন বাবা-মাকে টাকা পাঠাতে হবে! তোমার বড় ভাই তো এক টাকাও দেন না! আমি চুপ করে থাকি। এসব অযাচিত কথাবার্তায় আমার মেজাজ খারাপ হয়। তবুও সামলে রাখি। সে আবার পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে বলে, পাশের ফ্ল্যাটের করিম সাহেব তো তোমার কলিগ! উনার বাসায় গিয়ে দেখো! চোখ কপালে উঠবে। আমি পত্রিকার পাতায় চোখ রেখে বলি, মীনা, কেন এভাবে বলছো? বাবা-মা আমার। তুমি কি আমাকে দায়িত্ব পালন করতে নিষেধ করছো?

— কিন্তু তোমার গুণধর ভাই!
— কেউ যদি জেনেশুনে অন্যায় করে।

এবং সেটা দেখে আমিও যদি সেই অন্যায় শুরু করি! তাহলে মনুষ্যত্ব বোধ বলে তো আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না! মীনা গজগজ করে। ওর অস্পষ্ট কথা আমার কানে পৌছোয় না। এসব ভালো লাগে না আমার। বাবার অসুখ। ঔষধপত্রের খরচ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হয়। আমি চাই না বাবার অসময়ে সাহায্য দানে ব্যর্থ হয়ে নিজেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাঁধা রাখতে।

ওঘর এবং রান্নাঘর খুঁজে মীনাকে না পেয়ে আমার ইষৎ অসুস্থ শরীরটাকে এলিয়ে দিলাম বিছানায়। এখন মাত্র এগারোটা বাজে। এসময় আমার বাসায় ফেরার কথা না। সকালে গিয়ে বাসায় ফিরি একেবারে সন্ধ্যের পরে। তাই হয়তো মীনা কোথাও ঘুরতে বা কোন বান্ধবীর বাসায় গিয়েছে। জ্বরটা ক্রমশ বাড়ছে। পায়ের কাছে পড়ে থাকা কাঁথাটা গায়ে জড়িয়ে নিলাম। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে শরীরের উত্তাপ বেড়ে চলেছে। আমি টের পাচ্ছি। জ্বরটা মাপতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু থার্মোমিটার খুঁজে বের করা এই মুহুর্তে আমার জন্য পৃথিবীর সবিচাইতে দুরূহ কাজ। তারপরো বিছানা ছেড়ে উঠলাম। শরীরের নিয়ন্ত্রণ এখন অব্দি পুরোপুরি হারাই নি। তবে ভেতরে ভেতরে আমি একেবারে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছি। খাটের দেরাজ থেকে লেপ বের করলাম।

থার্মোমিটার না পেয়ে পুনরায় লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ভেতর থেকে একটা হিংস্র কাঁপুনি থেকে থেকে আমার শরীরটাকে নেতিয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি প্রাণটা বেরিয়া গেলো। আমি মোবাইলটা কোন রকম অন করে মীনার নাম্বারটা বের করলাম। ফোন দেবো দেবো করে আর দিলাম না। থাক ওর যখন সময় হবে তখন নিশ্চয়ই ঘরে ফিরবে। আমার কি অধিকার আছে আরেকজনের অধিকার খর্ব করার। ও হয়তো বন্ধুদের সাথে কোন রেস্টুরেন্টে আড্ডায় মেতে আছে। বা কোন বান্ধবীর বাসায় আড্ডা দিচ্ছে। আমার ফোন এই মুহুর্তে ওর জন্য খুবই অপ্রয়োজনীয় এবং বিরক্তিকরও বটে। সকাল থেকেই শরীরটা ভালো যাচ্ছিলো না। অফিসে গিয়ে অবনতি টের পেয়ে সম্পাদককে অবহিত করলাম। তিনি শুনেই আমার ছুটি মঞ্জুর করলেন। তিন বছরের চাকরি জীবনে এই প্রথম অসুস্থতাজনিত ছুটি নিতে বাধ্য হতে হল আমাকে।

একটা বিষাক্ত সাপ আমার পিছু নিয়েছে। যে কোনো মুহুর্তে আমার নাগাল পেয়ে যাবে সে। আমি প্রাণপনে ছুটছি। যতটা শক্তি সঞ্চয়ে আছে পুরোটায় ব্যয় হচ্ছে এই দৌড়ের পেছনে। সাপের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে কিছুটা হালকা হলাম। একটা নিম গাছতলায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছি। খুব ভয় পেয়েছিলাম। একটি বিষাক্ত সাপ এভাবে কাউকে তাড়া করতে পারে তা কখনো কল্পনা করি নি। বাসা থেকে ফোন এলো। পাশের বাড়ির এক ছেলে। বলল, ভাইজান, কিছুক্ষণ আগে চাচা মারা গেছেন।

আমরা হসপিটালে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সময় পেলাম না। আপনি দ্রুত রওনা দিন। আমি পুনরায় দৌড় শুরু করলাম। ক্রমশ আশপাশের জঙ্গল ভেদ করে আমি ছুটছি। বাবার সাথে শেষ দেখাটা হবে না আমার। হায় হায়! আমি তো রাস্তা খুজে পাচ্ছি না। এ কোন গহীন বনে এসে পড়লাম! কোন দিকে যাই। ওদিকে বেলা বয়ে যাচ্ছে। হঠাত আমার চোখ পড়লো একটি হাল আমলের  রেস্টুরেন্ট কাম বারের দিকে। আশ্চর্য এই  জঙ্গলের ভেতরেও রেস্টুরেন্ট! আমুদে বার! আমি এগিয়ে গেলাম। আশ্চর্যজনক ভাবে গেটের কাছে মীনার সাথে দেখা হয়ে গেলো। মীনাকে পেয়ে কিছুটা আরামবোধ করলাম। এক ছুটে ওর কাছে গিয়ে বললাম, মীনা, বাবা মারা গেছেন। আমাদের দ্রুত যেতে হবে। তুমি চলো আমার সাথে। আমার কথা শুনে মীনার কোন ভাবান্তর হল না। অস্ফুটে বলল, ও। আচ্ছা তুমি এই বেঞ্চিটায় বসো। আমি ভেতর থেকে আসছি। আজ আমার বন্ধুর বার্থডে। সেলিব্রেশন করতে করতে ঘন্টা দুয়েক সময় লাগবে।

আমি ফ্যালফ্যাল করে মীনার দিকে চেয়ে আছি। ও রেস্টুরেন্টের ভেতরে চলে যাচ্ছে। ক্রমশ অচেনা জগতের দিকে হারিয়ে যাচ্ছে। মীনা মীনা আমার বা মাথায় একটা শীতল হাতের স্পর্শ পেলাম। আমার গলায় তখনো স্পষ্ট গোঙানির শব্দ। মীনা মী মী না বাবা ঘুমটা আচানক ভেঙে গেল। মীনা বসে আছে আমার পাশে। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম। বিকেল তিনটা। আমার শরীর ঘামে ভিজে একাকার। মীনা আমার হাত ধরে বলল, একি তুমি কখন এলে। আমি একটু আম্মুর কাছে গিয়েছিলাম। ভাবলাম অনেকদিন যাই না। সরি তোমাকে বলে যাই নি।

আমি গোল গোল চোখে চেয়ে আছি মীনার দিকে। ঠিক যেন চিনি আবার মনে হয় চিনি না। একটু আগেও এই মীনা আমাকে রেখে চলে গিয়েছিলো বন্ধুদের সাথে। বাবার মৃত্যু যার বিন্দু মাত্র টনক নড়াতে পারে নি। শরীরে তখনও হালকা উত্তাপ রয়েছে। ও আমার বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, একি শরীরে তো জ্বর। দেখি দেখি গেঞ্জিটা খোলো। মুছে দিতে হবে। এই ঘাম শরীরে বসলে ঠান্ডা লাগবে। একটা নরম তোয়ালে দিয়ে সে আমার বুক পিঠ যত্ন করে মুছে দিলো। আমি তখন শিশুর মতো ওর দুই হাতের কাছে আমাকে সঁপে দিলাম। আসলে এর বাইরে আমার কিছু করার ছিল না। তারপর অভিমান মিশ্রিত কন্ঠে বলল, তুমি কেন আমাকে ফোন করো নি? বলো! বড্ড পাজি হয়েছো না! কি খেয়েছো? কখন এলে বাসায়? কি হয়েছিল?

আমি তখনও একটা নির্মম ঘোরের মধ্যে ছিলাম। মীনা, যে আমার অর্ধাংশ। কিন্তু তাকে আমি ঠিক চিনতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। ও একাধারে বলেই চলেছে। আমি কোন উত্তর দিচ্ছি না। দিচ্ছি না বললে ভুল হবে আমার সেই শক্তি বোধ তখন লোপ পেয়েছে। মনে হচ্ছে, আমি আর কোন দিন কথা বলতে পারবো না। মীনা দ্রুত মোবাইল বের করে এক পরিচিত ডাক্তারকে আসতে বলল। ওর প্রতিটি কথা আমার কানে প্রবেশ করে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। একটা অদ্ভুত মিশ্রিত অনুভূতি ব্রেইনের ভেতর খেলা করছে। আমার চোখ বুজে আসছে। জ্বরটা বোধ হয় আবার আসবে।

শরীরে বড্ড অবসাদ। বালিশের কাছে পড়ে থাকা মোবাইলটা টুন টুন করে বেজে উঠলো। এসএমএস। বাবার এসএমএস এসেছে। বাবা গোটা গোটা বাংলা অক্ষরে লিখছেন, ‘এইমাত্র পোষ্ট অফিস থেকে টাকাটা উঠিয়ে নিয়ে আসলাম। রাতে ফোন দিবো।’ এসএমএসটা পড়ে আমার চোখের কোণে জল জমলো। কয়েক ফোটা পড়ল বালিশে। জ্বরটা পুনরায় জাঁকিয়ে এলো। আমি ঠকঠক করে কাঁপছি। আমার উপরে লেপ-কম্বল চাপিয়ে দিচ্ছে মীনা।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত