প্রেমের মরা জলে ডোবে না

প্রেমের মরা জলে ডোবে না

আমার ক্লাস টুতে পড়ুয়া কাকাতো ভাই এক মেয়ের উপর সিরিয়াস ক্রাশ খেয়েছে। এই তো কিছুদিন আগেও আমার ভাইটাকে কাকি মেরে ধরে কোচিং এ পাঠাতো অথচ সেই ছেলে এখন রোজ নিয়ম করে কোচিং যায়। ঘটনা এমন যেন কোচিং ই ওর জীবনের একমাত্র সঙ্গী। মাঝেমাঝে আমিও অবাক হয়ে ভাবি ছেলেটার হলো টা কি? তো সেদিন কলেজ থেকে ফিরে সবে বিছানায় গা এলিয়েছি। এমন সময় কাকাতো ভাই অনয়ের আগমন।

—–কিরে কোচিং এ যাবি না?
—–দিদি শরবত খাবা? এনে দিই?

এই কথা শোনার পর আমি হুড়মুর করে উঠে বসলাম। ওর দিকে কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম বাইরে সূর্য উঠেছে কিনা। নাহ! সূর্য তো ঠিকই উঠেছে। তাহলে সমস্যা টা কোথায় হচ্ছে। অনয় আমার দিকে তাকিয়ে একটা চওড়া হাসি দিলো।

—–মায়ের কোমরে ব্যথা।
—–ওষুধ লাগবে? আমকে নিয়া আসতে বলছে নাকি?
—–না না। বাবা ওষুধ নিয়া আসছে। তুমি একটু আমাকে কোচিং এ দিয়া আসবা? ওহ আচ্ছা। এই ব্যাপার? তাই তো বলি হঠাৎ এতো খাতির কিসের। আমি এবার পায়ের উপর পা তুলে আয়েসি ভঙ্গিতে বসে বললাম,

—–যেতে পারি। কিন্তু একটা শর্ত আছে।
—–ঠিকাছে ঠিকাছে। আমি আমার জমানো সব কিটক্যাট তোমাকে দিয়ে দেবো।
—–এই তো গুড বয়। অনয় কে নিয়ে কোচিং এর সামনে যেতেই দেখলাম অনয় হাত দিয়ে চুল ঠিক করছে। শার্ট টা বার বার ঠিক করছে। এরপর দেখলাম ও দৌঁড়ে গিয়ে ওর বয়সী একটা মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

—–হেই জিনি। মিট মাই সিস্টার। আমি তখনো দূরে দাঁড়িয়ে অনয়ের কান্ড দেখছি। হুশ ফিরলো অনয়ের ডাকে।

—-হেই সিস। কাম অন। মিট মাই ফ্রেন্ড জিনিয়া।

আমার মনে হচ্ছিল আমার চোখদুটো মনে হয় এক্ষুণি খুলে পড়বে। “সিস”? ভাবা যায়? জিনিয়ার সাথে আলাপ করানোর পর আমার ভাই তার জিনির হাত ধরে কোচিং এ ঢুকে গেলো। অনয় যখন কোচিং থেকে ফিরেছে তখন আমি মোটামুটি ওর কোচিং এ যাওয়ার রহস্য বের করে ফেলেছি। ওর কাছে গিয়ে বললাম,

—–কিরে ঐ জিনি না ফিনি কি যেন নাম ঐ মেয়েটা কে রে?
—–ওর নাম ফিনি নয়, জিনি। ও আমার ক্রাশ হয় ক্রাশ।
—–ও বাবাহ! ক্রাশ বানান করতে পারিস? অনয় রক্তলাল চোখে আমার দিকে তাকালো।
—–সি আর ইউ এস এইচ। হইছে? এখন যাও আমাকে পড়তে দাও।
—–পড়বি। আমি কি তোকে ডিস্টার্ব করছি নাকি?
—–দেখো দিদি। আমাকে এখন পড়তে হবে। খুব সিরিয়াস হয়ে পড়তে হবে। জিনির সামনে পড়া না পারলে তখন স্যার কান ধরাবে। তখন তো জিনি আমার সাথে আর প্রেম করতে চাইবে না। অনয়ের মুখে এই কথা শোনার পর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো অনয় আমাকে ঠেলে রুম থেকে বের করে দিলো। আমিও দুঃখ দুঃখ কণ্ঠে ওকে বললাম,

—–আসিস আবার। কোচিং এ নিয়ে যাব ভালো মতো। দিন আমারো আসবে। হুহ! কিন্তু হায় আমার দিন আর এলো না। কিছুদিন পর জানতে পারলাম অনয়ের জিনি পটে গেছে। অনয় এখন রোজ কোচিং যাওয়ার আগে পাক্কা একঘণ্টা বসে রেডি হয়। ওর গা থেকে ভুড়েভুড়ে পারফিউমের গন্ধ আসে। কাকার পকেট থেকে আজকাল প্রায়ই নাকি টাকা উধাও হয়ে যায়। আমার জমানো কিটক্যাট গুলোও আজকাল আলমারিতে তালাবন্ধ করে রাখতে হয়। কারণ ওগুলোও উধাও হয়ে যায়।

বাড়ির সবাই এগুলো নিয়ে চিন্তিত হলেও আমি মোটেও চিন্তিত নই। আমি জানি এসব কোথায় যাচ্ছে। আমার ক্লাস টুতে পড়ুয়া ভাই প্রেম করছে অথচ আমি এখনো নিজের ক্রাশ পাত্তা দেয় না, সেই শোক নিয়ে বসে আছি। জীবনে আসলে করলাম টা কি। রাগে দুঃখে মাঝেমধ্যে রানু মন্ডলের গান শুনে মরে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু তাও পারি না। ভয় করে আরকি। কাকার কাছে একবার বলছিলাম যে তার গুণধর ছেলে প্রেম করছে। কাকা আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে অট্টহাসি দিয়ে বললেন,

—–এতোদিন তো আধপাগলি ছিলি, এখন কি পুরাই পাগলী হইলি নাকি? ও প্রেমের বোঝে টা কি? আমি হাজার চেষ্টা করেও কাকাকে বোঝাতে পারি না তার ছেলে আসলে কি কি বোঝে। অনয় আমার অবস্থা দেখে মিটিমিটি হাসে আর গর্বের সাথে বলে,

—–প্রেমের মরা জলে ডোবে না। বুঝলা সিস? আমি আর কি করি! বিরস বদনে এসব দেখি আর মনে মনে ভাবি, “আপনা টাইম আয়েগা”।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত