অমরবৃন্দ

অমরবৃন্দ

গৃহিণী থিয়েটার দেখিতে গিয়াছিলেন। কাজেই শুইতে যাইবার বিশেষ তাড়া ছিল না। রাত্রি দশটা নাগাদ আহারাদি শেষ করিয়া লাইব্রেরি-ঘরে আসিয়া বসিলাম। ভৃত্য তামাক দিয়া গেল।

নৈশ-প্রদীপের তৈল পুড়াইয়া কাজ করা আমার অভ্যাস নাই-ভারি ঘুম পায়! কিন্তু আজ স্থির করিলাম-গৃহিণী যখন বারোটার পূর্বে ফিরিবেন না, তখন মাঝের এই দুই ঘণ্টা সময় কাজ করিয়াই কাটাইয়া দিব। বাংলা সাহিত্যের অমরবৃন্দ নাম দিয়া একটি প্রবন্ধ লিখিব মনে আঁচিয়া রাখিয়াছিলাম; সম্পাদক মহাশয়ও প্রত্যহ তাগাদা দিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। এমন কি শীঘ্র লেখাটা না দিলে তিনি আমার বাসায় আসিয়া আড্ডা গাড়িবেন, এমন ভয়ও দেখাইয়াছিলেন। কিন্তু তবু কিছুতেই লেখাটা বাহির হইতেছিল না। আজ স্থির করিলাম, যেমন করিয়া হোক প্রবন্ধের পত্তন করিব। একবার আরম্ভ করিতে পারিলে আর ভয় নাই।

টেবিলের সামনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞভাবে বসিলাম। সম্মুখে টেবিল-সংলগ্ন মেহগ্নির র‍্যাকের উপর বাংলাভাষায় যে কয়খানি অমর গ্রন্থ আছে, সারি দিয়া সাজানো ছিল—সেই দিকে একদৃষ্টে তাকাইয়া ঘন ঘন তামাক টানিতে লাগিলাম।

প্রথমে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে ধরা যাক। মধুসূদনের অমর সৃষ্টি কোন চরিত্র? রাবণ নিশ্চয়, তাহাতে সন্দেহ নাই। রাবণকে লইয়াই প্রবন্ধ আরম্ভ করিতে চেষ্টা করিতে হইবে; মন্দ হইবে না।

তারপর বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমের কোন্ সৃষ্টি অমর? কপালকুণ্ডলা? দেবী? সূর্যমুখী? ভ্রমর?—কি আশ্চর্য! বঙ্কিম কি পুরুষ-চরিত্র অঙ্কিত করেন নাই? তবে, কেবল নারীচরিত্রগুলি মনে পড়িতেছে কেন?

যাক—এবার রবীন্দ্রনাথ। তাঁহার কে কে আছে? চিত্রাঙ্গদা—দেবী নহি, নহি আমি সামান্যা রমণী। আর? রাজা বিক্রম! হুঁ-হইতেও পারে! তা ছাড়া চোখের বালির বিনোদিনী আছে–সন্দীপ আছে—

রবীন্দ্রনাথের পর কে? শরৎচন্দ্র। তাঁর রাজলক্ষ্মী, কমল, সুরেশ, সব্যসাচী, কিরণময়ী—-

অতঃপর? শরৎচন্দ্রের পর কে? আর কেহ আছে কি!…টেবিলের ধারে মাথা রাখিয়া ভাবিতে লাগিলাম। ভাবিতে ভাবিতে

আমি আফিমের নেশা করি না। কিন্তু তামাকের ধোঁয়ার সঙ্গে চিরদিনের অভ্যাস মিশিয়া বোধ হয় একটু তন্দ্রা আসিয়া পড়িয়াছিল। আমি মানসচক্ষে দেখিলাম—আমার সবুজ বনাত-ঢাকা টেবিলের উপর কচি কচি ঘাস গজাইয়াছে। শাখাযুক্ত কলমদানিটা কোন ফাঁকে দুটি নব পল্লবিত বৃক্ষে পরিণত হইয়াছে। চারিদিকে যে বই খাতা ইত্যাদি ছড়ানো ছিল, সেগুলা পাথরের চ্যাঙড় মাটির ঢিবি বনিয়া গিয়াছে। গঁদের পাত্রটা বেবাক শিবমন্দিরে রূপান্তরিত হইয়া গিয়াছে। অথচ আয়তনে কিছুই বাড়ে নাই—আমি যেন বাইনাকুলারের উল্টা মুখ দিয়া এই দৃশ্য দেখিতেছি।

বড় ভাবনা হইল। আমার লেখার সমস্ত সরঞ্জাম যদি এইভাবে পাহাড় জঙ্গল বৃক্ষ ইত্যাদিতে পরিবর্তিত হইয়া যায়, তাহা হইলে সম্পাদক মহাশয়কে কি দিয়া ঠেকাইয়া রাখিব? রচনার পরিবর্তে দূর্বাঘাস তিনি কখনই লইবেন না, তিনি তেমন লোকই নন।

টেবিলের ওপারে বইয়ের র‍্যাকটা ধোঁয়াটে একটা পাহাড়ের মতো দেখাইতেছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন আয়তনের বইগুলা তাহারি উত্তুঙ্গ চূড়ার মতো আকাশে মাথা তুলিয়াছিল। হঠাৎ খুট খুট শব্দ শুনিয়া ভাল করিয়া সেইদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখি—দুইজন ঘোড়সওয়ার একটা বইয়ের তলা হইতে বাহির হইয়া আসিতেছে। পাহাড়ী রোমশ দুইটি ঘোড়া, পিঠে কম্বলের জিন, তাহার উপর দুই সিপাহী আসীন। একজন হিন্দু, অন্যটি মুসলমান। হিন্দুর মাথায় মুরেঠা, গায়ে আঙরাখা, পায়ে নাগরা, কোমরে তরবারি। মুসলমানের মাথায় টোপ, গায়ে কিংখাপের শিরমানি ও পায়জামা, পায়ে মখমলের জুতা। তাহারও রেশমী কোমরবন্দ হইতে শমশের ঝুলিতেছে।

দুজনে আসিয়া আমার কলমদানের একটা বৃক্ষতলে নামিল। গাছের ডালে ঘোড়া বাঁধিয়া হিন্দু বলিল, খাঁ সাহেব, এইখানেই কোথায় আছে। আমার মনে আছে, আমি পাহাড়ের গুহা থেকে সেটা ছুঁড়ে নীচের উপত্যকায় ফেলে দিয়েছিলুম।

খাঁ সাহেবের চেহারা অতি সুন্দর; মুখে সামান্য দাড়ি আছে, কিন্তু তাহাতে গণ্ড ও চিবুকের গোলাপী বর্ণ ঢাকা পড়ে নাই। তাঁহার চোখের দৃষ্টি মেঘলা আকাশের মতো ছায়াচ্ছন্ন—যেন দুঃখের গভীরতম তল পর্যন্ত ড়ুব দিয়া দেখিয়া আসিয়াছেন। তিনি ইতস্তত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন, তাই তো সিংহজী, এতদিন পরে সে জিনিস কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে? যাহোক, চেষ্টা করে দেখতে দোষ নেই। হয়তো ঘাসের তলায় চাপা পড়ে গেছে। আসুন, খুঁড়ে দেখা যাক। বলিয়া কোমর হইতে তরবারি বাহির করিলেন।

সিংহজী হাসিয়া বলিলেন, তলোয়ার রাখুন। সব কাজ কি তলোয়ারে হয়? আমি খোন্তা জোগাড় করছি। এই বলিয়া সিংহজী আমার একটা কলম তুলিয়া লইয়া বলিলেন, চমৎকার খোন্তা পাওয়া গেছে। আপনিও একটা নিন।

দুজনে অম্লান বদনে আমার দুইটি কলম তুলিয়া লইয়া ঘাসের উপর এখানে-ওখানে খুঁড়িতে আরম্ভ করিলেন। আমি ভাবিতে লাগিলাম—কে ইহারা? কোথায় ইহাদের কথা পড়িয়াছি। একজনের মুখে শৃগালের ধূর্ততা মাখানো, অন্যজন শার্দুলের মতো গম্ভীর। অথচ দুজনের মধ্যে। অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্ব। কে ইহারা?

সিংহজী সহসা সানন্দে বলিয়া উঠিলেন, পেয়েছি, পেয়েছি, খাঁ সাহেব। এই দেখুন। বলিয়া একটি ক্ষুদ্র বস্তু তুলিয়া ধরিলেন।

খাঁ সাহেব নিকটে আসিয়া বলিলেন, সত্যিই তো! লাগিয়ে দেখুন, আপনারটা বটে কিনা।

সিংহজী বলিলেন, আমি আমার আঙ্গুল চিনি না? বলিয়া নিজের বাঁ হাতটা তুলিয়া ধরিলেন। তখন দেখিলাম তাঁহার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলটা নাই। সিংহজী ছিন্ন আঙুল যথাস্থানে জুড়িয়া দিতেই সেটা বেবাক জোড়া লাগিয়া গেল।

এতক্ষণে ইহাদের চিনিলাম—আঙুলকাটা মাণিকলাল ও মবারক আলি খাঁ!

মবারক বলিলেন, সিংহজী, আপনার হারানো নিধি তো আপনি খুঁজে পেলেন। এবার চলুন, আমার হারানো নিধির সন্ধান করি।

মাণিকলাল মিটি মিটি হাসিয়া বলিলেন, কে, দরিয়া বিবি?

মবারক কিয়ৎকাল অধোমুখে রহিলেন, শেষে বলিলেন, সিংহজী, আপনি তো সব কথাই জানেন। যে আমাকে সাপের মুখে পাঠিয়ে দিয়েছিল, আমি তাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছি।

শাহজাদি আলম জেব-উন্নিসা বেগম?

হ্যাঁ, তাকে কিছুদিনের জন্য পেয়েছিলুম, আবার হারিয়েছি।

মাণিকলাল জিজ্ঞাসা করিলেন, তাঁকে খুঁজলেই পাবেন মনে হয়?

মুবারক বলিলেন, জানি না। কিন্তু তবু খুঁজতে হবে।

বেশ, চলুন।

দুইজন ঘোড়ার দিকে অগ্রসর হইলেন। এই সময়ে পশ্চাতের পাহাড় হইতে পি পি করিয়া। উইয়ের মতো এক পাল ভেড়া বাহির হইয়া আসিল। গড্ডালিকা-প্রবাহের পশ্চাতে একজন মেষপালক। তাহাকে দেখিয়াই মনে হইল পূর্বে কোথায় দেখিয়াছি। কিন্তু চিনি চিনি করিয়াও চিনিতে পারিলাম না। মেষপালক বয়সে প্রৌঢ়; দাড়ি গোঁফে মুখ আচ্ছন্ন, স্কন্ধে উপবীত। মুখে একটু ব্যঙ্গ-হাস্য লাগিয়া আছে—যেন পৃথিবীর সমস্ত ধাপ্পাবাজি তিনি ধরিয়া ফেলিয়াছেন।

মেষযূথ সবুজ মাঠের উপর চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। মেষপালক অনায়াস-পদে মন্দিরের নিকটবর্তী হইলেন। তারপর একটি প্রস্তরখণ্ডের উপর মস্তক রক্ষা করিয়া শ্যামল শস্পশয্যায় শয়নপূর্বক মন্দিরের চত্বরে পা তুলিয়া দিলেন।

মাণিকলাল এতক্ষণ অশ্বের পাশে দাঁড়াইয়া দেখিতেছিলেন; বলিলেন, লোকটা তো মহা পাষণ্ড। শিবমন্দিরে পা তুলে দিলে! অথচ ব্রাহ্মণ বলে বোধ হচ্ছে। আসুন তো দেখি! মেষপালকের নিকটে গিয়া ক্রুদ্ধস্বরে বলিলেন, কে রে তুই—শিবমন্দিরের গায়ে পা তুলে দিয়েছিস! পা নামা ব্যাটা।

মেষপালক পা নামাইয়া উঠিয়া বসিল। দুইজন অস্ত্রধারী পুরুষকে নিরীক্ষণ করিয়া বলিল, তোমাদের সঙ্গে তরবারি রহিয়াছে দেখিতেছি। দুইজনেই বলবান। সুতরাং আমার অন্যায় হইয়াছে, এরূপ কার্য আর করিব না।

মাণিকলাল কহিলেন, তুমি ব্রাহ্মণ বলেই আজ নিষ্কৃতি পেলে। কিন্তু এ-রকম ভাবে পা উঁচু করে শোবার উদ্দেশ্য কি?

মেষপালক বলিল, পা উঁচু করিয়া শুইলে ধ্যান করিবার সুবিধা হয়। চেষ্টা করিয়া দেখিও।

মাণিকলাল এই অদ্ভুত মেষপালকের কথা শুনিয়া বিস্মিতভাবে বলিলেন, তোমার নাম কি?

মেষপালক মৃদহাস্যে বলিল, আমার নাম জাবালি। উপবেশন কর।

মাণিকলাল তখন দণ্ডবৎ হইয়া প্রণাম করিয়া উপবেশন করিলেন। মবারকও পাশে বসিলেন।

মাণিকলাল সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, প্রভু, আপনি ভেড়া চরাচ্ছেন কেন?

জাবালি বলিলেন, দেখ, ভেড়ার মাংস অতিশয় সুস্বাদু। তাহাদের প্রতিপালনে কোনও কষ্ট নাই। তাহারা আপনি চরিয়া খায়, আপনি বংশবৃদ্ধি করে। আমি বিনা ক্লেশে উহাদের মাংস পাইয়া থাকি। উপরন্তু উহাদের রোম হইতে কম্বল প্রস্তুত হয়। সুতরাং অন্নবস্ত্র কিছুরই অভাব থাকে না।

মবারক জিজ্ঞাসা করিলেন, অন্নবস্ত্র ছাড়া মানুষের অন্য কাম্য কি নেই?

জাবালি প্রতিপ্রশ্ন করিলেন, আর কি আছে?

মবারক একটু ইতস্তত করিয়া বলিলেন, রমণীর প্রেম।

জাবালি বলিলেন, বৎস, প্রেম একটা সংস্কার মাত্র—অতএব অন্যান্য সংস্কারের মতো উহা বর্জনীয়। কিন্তু ক্ষুধা সংস্কার নয় শীতের প্রকোপকেও সংস্কার বলা চলে না। উহারা সংস্কারবিবর্জিত উলঙ্গ সত্য—চোখ ঠারিয়া উড়াইয়া দেওয়া যায় না। জগতে আর যাহা কিছু সকলই সংস্কার। দেখ, কিছুকাল পূর্বে আমি শিবমন্দিরে পা তুলিয়া দিয়াছিলাম বলিয়া তোমরা আমাকে তিরস্কার করিতেছিলে। কিন্তু ভাবিয়া দেখ, শিব কে? তাহার আবার মন্দির কিসের? ইহা যদি শিবের মন্দির হয়, তবে শিব নামক কোনও ব্যক্তি নিশ্চয় ইহার মধ্যে আছে। আমি আদেশ করিতেছি, আনো দেখি শিবকে এই মন্দির হইতে বাহির করিয়া।

মাণিকলাল নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিলেন। তখন জাবালি আবার বলিলেন, শিব এখানে নাই, সুতরাং ইহা শিবমন্দির নহে। অতএব ইহার গায়ে পা তুলিয়া দিলেও কোনও অপরাধ হয় না। কিন্তু তোমরা দুইজন অস্ত্রধারী পুরুষ যখন আপত্তি করিতেছ, তখন সুবুদ্ধি-পরিচালিত হইয়া আমি সেকার্য হইতে বিরত হইলাম।

মবারক পুনশ্চ প্রশ্ন করিলেন, কিন্তু নারীর প্রেম একটা সংস্কার মাত্র, এ যুক্তি কি সুবুদ্ধি-পরিচালিত?

জাবালি কহিলেন, অবশ্য। শারীরিক ক্ষুধার তাড়নাই পুরুষকে নারীর প্রতি আকৃষ্ট করে; এই আকর্ষণ নারী-বিশেষের প্রতি নয়—নারী-সাধারণের প্রতি। ক্ষুধার সময় মৃগমাংস ও মেষমাংস যেরূপ সমান প্রেয়-নারী সম্বন্ধেও তাহাই, কোনও প্রভেদ নাই। কেবল, সুস্বাদু খাদ্য দেখিয়া যেরূপ লোকে লুব্ধ হয়, সুন্দরী নারী দেখিয়াও সেইরূপ লালায়িত হয়। এই লালসাকে প্রেম বলিতে চাহ বলিতে পার, কিন্তু তাহা ভ্রম। বস্তুত, প্রেম বলিয়া কিছু নাই, মানুষ বংশানুক্রমে আত্মপ্রতারণা করিয়া এই প্রেমরূপ সংস্কারের উদ্ভব করিয়াছে।—ভাবিয়া দেখ, তুমি যতদিন জেব-উন্নিসাকে না পাইয়াছিলে ততদিন দরিয়া বিবিকে লইয়া সন্তুষ্ট ছিলে; কিন্তু জেব-উন্নিসাকে পাইবামাত্র দরিয়া বিবির প্রতি তোমার বিতৃষ্ণা জন্মিল। ইহার কারণ কি?

মুবারক দ্বিধা-প্রতিফলিত মুখে নীরব রহিলেন, সহসা উত্তর দিতে পারিলেন না। মাণিকলাল বলিলেন, প্রভু, আপনার কথাগুলি কড়া হলেও সত্য বলে মনে হচ্ছে। নির্মল থাকলে আপনার উপযুক্ত জবাব দিতে পারত। সে ভারি বুদ্ধিমতী-ঔরংজেব বাদশাকে ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু, একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি? আপনি স্বয়ং সমস্ত সংস্কার থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন তো?

জাবালি বিনয় সহকারে বলিলেন, দন্ত করিতে নাই। দম্ভে বুদ্ধির মলিনতা জন্মে! তথাপি, আমি সম্পূর্ণ দম্ভমুক্ত হইয়া বলিতেছি যে, আমার সংস্কার দূর হইয়াছে।

মুবারক ঈষৎ অধীরভাবে বলিলেন, সাহেব, আপনার বক্তব্য আমার কাছে খুব স্পষ্ট হল না। এমন অনেক সময় দেখা যে, একটি লোক পৃথিবীর শতকোটি নারীর মধ্যে কেবল একটিকেই সারা জীবন ভালবেসেছে—অন্য স্ত্রীলোকের পানে মুখ তুলেও চায়নি; সেই স্ত্রীলোকের মৃত্যুতে জগৎ অন্ধকার দেখেছে; কিন্তু তবু অন্য নারীকে হৃদয় সমর্পণ করতে পারেনি। এই একনিষ্ঠা কি প্রেম নয়?

জাবালি বলিলেন, বৎস, উহাই প্রেম নামে অভিহিত বটে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উহা একটি সংস্কার মাত্র। সংস্কার মাত্রেই দুঃখের কারণ, তাই প্রেম-পীড়িত ব্যক্তিরা সর্বদা দুঃখ পায়। দেখ, ছাগজাতীয় জীব প্রেম নামক সংস্কার হইতে মুক্ত, তাই তাদের প্রেমজনিত দুঃখ নাই; বিশেষের প্রতি তাহার নিষ্ঠা নাই, তাই তাহার অনুরাগ সর্বব্যাপী। তাহাকে বিশ্বপ্রেমিক বলিতে পার। এই ছাগের অবস্থাই সকল মোক্ষাভিলাষীর কাম্য। উহাই ভূমা।

মুবারক বিরক্তভাবে মুখ ফিরাইয়া লইলেন, জাবালির কথার উত্তর দিতে তাঁহার প্রবৃত্তি হইল না। এইখানেই বোধ করি আলোচনা শেষ হইত, কিন্তু এই সময় মন্দিরের অপর পার্শ্বে দুইজন তর্করত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনা গেল। দেখিতে দেখিতে দুইজন ধুতি-পাঞ্জাবি-পরিহিত যুবক মন্দিরের অন্তরাল হইতে বাহির হইয়া আসিল। একজন দীঘাকৃতি গৌরবর্ণ পুরুষ, খদ্দরের বেশভূষা যেন তাহার বিশাল অঙ্গে ঠিক মানাইতেছে না; অন্যটি পরিপূর্ণ বাঙালী, শ্যামল সুশ্রী চেহারা, মুখ বুদ্ধির প্রভায় উজ্জ্বল।

রজতগিরিনিভ পুরুষ জলদগম্ভীর স্বরে বলিল, তুমি ভুল করছ, বিনয়। আমার হাতে যখন অস্ত্র নেই, তখন আমি শুধু হাতেই লড়ব; কিন্তু তবু দুষ্টের পীড়ন চুপ করে পড়ে সহ্য করব না। আমি গোরার গুলি খেয়ে মরতে রাজী আছি, কিন্তু পাহারাওয়ালার রুলের গুঁতো আমার অসহ্য।

বিনয় বলিল, বড়টা যখন তুমি স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত, তখন অপেক্ষাকৃত ছোটটায় আপত্তি কেন?

গোরা বলিল, আবার ভুল করলে। আমার কাছে বন্দুকের গুলিটা তুচ্ছ, রুলের গুঁতোই বড়। কারণ ওতে আমার মনুষ্যত্বকে আহত করে, বন্দুকের গুলি তা পারে না।

বিনয় বলিল, তা যেন হল। কিন্তু এদিকে উদ্দেশ্য সিদ্ধি যাতে হয় সেদিকেও তো দৃষ্টি রাখা দরকার।

উদ্দেশ্যটা তোমার কি শুনি?

দেশের উদ্ধার।

গোরা গর্জন করিয়া উঠিল, না-কখনো না। আমাদের প্রথম এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে। মনুষ্যত্বের উদ্ধার। মনুষ্যত্বকে যদি ভীরুতার হাত থেকে উদ্ধার করতে না পার, তাহলে দেশ নিয়ে করবে কি? সত্যাগ্রহ? তুমি কি মনে কর, নিজের দাবিকে আঁকড়ে ধরে এক জায়গায় বসে থাকলেই সত্যের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করা হয়?

বিনয় বলিল, তাছাড়া বর্তমান অবস্থায় আর কি করা যেতে পারে? তোমার মতো গর্জন করলে কোনও ফল হবে কি?

না, শুধু গর্জনে কাজ হবে না, বর্ষণও চাই। আমাদের দেহ আছে, হাত পা আছে, সেই হাত পা দিয়েই কাজ করতে হবে। অনাচারের বিরুদ্ধে আমাদের দেহ-মনের সমস্ত শক্তিকে যুযুৎসু করে তুলতে হবে। কেবল প্রহার সহ্য করবার শক্তিকে পোক্ত করে তুললে কাজ হবে না। ওটা জড়শক্তি—জীবশক্তি নয়।

এই সময়ে মন্দিরপার্শ্বে কয়েকজন লোক আসীন দেখিয়া বিনয় বলিয়া উঠিল, গোরা, তোমার বক্তৃতা থামাও-কারা রয়েছে।

জাবালি হাত তুলিয়া উভয়কে নিকটে ডাকিলেন। তাহারা নিকটবর্তী হইলে কহিলেন, স্বাগত! তোমরা উপবিষ্ট হও।

গোরা ও বিনয় সসম্ভমে ঋষিকে প্রণাম করিয়া উপবেশন করিল। জাবালি আশীবাদ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমাদের মধ্যে কিসের বচসা হইতেছিল?

বিনয় অল্প কথায় ঋষিকে তর্কের বিষয় বুঝাইয়া দিল। তিনি বলিলেন, ভাল বুঝিলাম, তোমরা ভারতবর্ষকে স্বাধীন করিতে চাও। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞাসা করি–স্বাধীনতা লাভ করিয়া ভারতবর্ষের কী ইষ্টসিদ্ধি হইবে?

বিনয় মৃদু হাসিয়া বলিল, একেবারে গোড়ার প্রশ্ন। গোরা, জবাব দাও।

গোরা বলিল, স্বাধীনতাই চরম ইষ্ট নয়, ইষ্টসিদ্ধির একটা উপায় মাত্র। আসল কাম্য-সুখ।

জাবালি বলিলেন, যদি তাই হয়, তবে সুখলাভের জন্য দুঃখকে বরণ করিতে চাহ কেন?

গোরা বলিল, বৃহত্তর দুঃখের হাত এড়াইবার জন্য; যেমন, গো বীজের টীকা নিলে বসন্ত রোগের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়।

মাণিকলাল গোরাকে সমর্থন করিয়া বলিলেন, ঠিক কথা। আর একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে; যেমন, ক্ষুধার বৃহত্তর দুঃখ এড়াবার জন্য ঋষিবর মেষপালনরূপ অল্প দুঃখ স্বীকার করছেন।

জাবালি সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, ভাল। তোমাদের যুক্তি বিচারযোগ্য বটে। এখন বল দেখি, ভারতবর্ষ নামক বিশাল ভূখণ্ডকে বা তদ্দেশবাসী নরনারীকে স্বাধীন করিয়া তোমাদের কি লাভ হইবে। তোমরা নিজের চরকায় তৈল দিতেছ না কেন?

গোরা বলিল, ভারতবর্ষই আমার চরকা, আমি তাতেই তেল দিতে চাই। ভারতবর্ষের ছত্রিশ কোটি নরনারীর সুখই আমার সুখ।

জাবালি কিয়ৎকাল তৃষ্ণীম্ভাব ধারণ করিয়া রহিলেন, তারপর ধীরে ধীরে শিরঃসঞ্চালন করিয়া বলিলেন, বৎস, তুমি পরের প্রতি মমতাসম্পন্ন হইয়া ভ্রান্তপথে চলিয়াছ-ও-পথে কাম্যলাভ করিতে পারিবে না। ভারতবর্ষই বল আর অন্য দেশই বল, উহা কতকগুলি সমাজ বা গোষ্ঠীর সৃষ্টি করিয়াছে। সকল সমাজের কাম্য এক নহে—এমন কি পরস্পর বিরোধী। একে যাহা চাহে, অন্যে তাহা চাহে না। ব্যক্তিগতভাবেও তদ্রুপ;-তুমি সাত্ত্বিকভাবে জীবন যাপন করিতে চাহ, আর একজন মদ্য মাংস আহার করিয়া তামসিকভাবে কালহরণ করিতে ভালবাসে। সুতরাং কেবলমাত্র স্বাধীনতার দ্বারা সকলকে একই কালে সুখী করা অসম্ভব। সে চেষ্টাও পণ্ডশ্রম।

কিছুক্ষণ হেঁটমুখে চিন্তা করিয়া গোরা বলিল, তবে, আপনার মতে, সার্বজনীন সুখলাভের উপায় কি?

জাবালি বলিলেন, আত্মসুখের চিন্তায় অবহিত হওয়া। সকলেই যদি স্বার্থসন্ধ হইয়া নিজ নিজ সুখের কথা ভাবিতে থাকে তাহা হইলে অচিরাৎ তাহারা সুখবস্তু লাভ করিবে। দেখ, কি সহজ উপায়। সকলে স্বার্থপর হও, আর কাহারও দুঃখ থাকিবে না।

বিনয় ও মাণিকলাল হাসিতে লাগিলেন। গোরার মুখেও একটু হাসি দেখা দিল, সে বলিল, প্রস্তাবটা বোধ হয় নূতন নয়—আগেও শুনেছি। কিন্তু স্বার্থে স্বার্থে যখন সঙ্ঘাত বাধবে তখন তো দুঃখ আপনি এসে পড়বে!

জাবালি বলিলেন, সত্য। মনুষ্যজীবনের চরম শ্ৰেয় কি, তাহা মানুষ জানে না বলিয়াই যত প্রকার দুঃখের উদ্ভব হয়। কেহ মনে করে অর্থই সুখ, কেহ মনে করে স্বাধীনতাই সুখ। এইজন্য লক্ষ্যবস্তুর বিভিন্নতা হেতু বিরোধের উৎপত্তি হয়। তুমি ভারতবর্ষকে সুখী করিতে সমুৎসুক। উত্তম কথা, যাহা বলিতেছি শোন। লোকশিক্ষা দাও। মানুষকে বুঝাও যে, সংস্কার বিমুক্ত হইয়া সুখের অন্বেষণই একমাত্র ইষ্ট। সুখ কি তাহা মানুষ ভুলিয়া গিয়াছে—তাহাকে নূতন করিয়া বুঝাইয়া দাও। যেদিন সকলে হৃদয়ঙ্গম করিবে সুখ নামক মানসিক অবস্থাই একমাত্র পরমার্থ-ঐহিক বিষয়-সম্পত্তি বা দারা-পরিজন নহে—সেদিন জগতে আর দুঃখ থাকিবে না।

মবারক এতক্ষণ নীরবে বসিয়া শুনিতেছিলেন। তিনি প্রশ্ন করিলেন, কিন্তু সুখ কাকে বলে সেটা তো আগে জানা দরকার। সুখের সংজ্ঞা কি?

জাবালি হাসিলেন, বলিলেন, দুঃখ-সংযোগের বিয়োগই সুখ। ইহার অধিক কিছু বলিব না। গীতা নামক একটি গ্রন্থ আছে—উহাতে কিছু কিছু সত্য কথা বলা হইয়াছে; পাঠ করিয়া দেখিতে পার। শুনিয়াছি, আকবর শাহ উহা পারস্য ভাষায় অনুবাদ করিয়াছিলেন।

সহসা দূরে রমণীকণ্ঠের আর্তধ্বনি ইহাদের আলোচনার জাল ছিন্ন করিয়া দিল। সকলে চমকিয়া ফিরিয়া দেখিলেন, একটি যুবতী ভয় ব্যাকুল ভাবে তাঁহাদের দিকে ছুটিয়া আসিতেছে এবং দুইজন মাতাল পরস্পর গলা-জড়াজড়ি করিয়া স্থলিতপদে টলিতে টলিতে তাহার পশ্চাদ্ধাবন করিতেছে।

একটা মাতাল ভাঙা গলায় গান ধরিল, এসেছিল বা গরু পর গোয়ালে জাবনা খেতে

দ্বিতীয় মাতাল বলিল, If music be the food of love, play on-The man that hath no music in himself, nor is not moved with concord of sweet sounds

পলায়মানা যুবতী আবার অস্ফুট চিঙ্কার করিয়া বলিল, বাঁচাও-কে আছ, রক্ষে কর—

গোরা, বিনয়, মবারক ও মাণিকলাল একসঙ্গে উঠিয়া সেইদিকে ছুটিয়া গেলেন; গোরা জিজ্ঞাসা করিল, কি হয়েছে?

স্ত্রীলোকটি তাঁহাদের সম্মুখে দাঁড়াইয়া হাঁফাইতে হাঁফাইতে বলিল, ওরা আমার পেছু নিয়েছে। আমি অভয়া।

মাতাল দুটাও কিছু দূরে দাঁড়াইয়া পড়িয়াছিল। ক্রুদ্ধ মবারক তরবারি বাহির করিয়া তাহাদের কাটিতে উদ্যত হইলেন। মাণিকলাল ইসারায় তাঁহাকে নিবৃত্ত করিয়া কর্কশকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা কারা?

এক নম্বর মাতাল তখনো ভাঙা গলায় গান গাহিতেছিল, সে গান বন্ধ করিল না। দ্বিতীয় মাতাল বলিল, কেন বাবা, বদিয়াতি করছ—শিকার পালায়, পথ ছাড়ো। আমরা দুজনে নামকাটা সেপাই।

মাণিকলাল তাহার নাসিকায় একটি মুষ্ট্যাঘাত করিলেন; গোরা তাহার সঙ্গীতজ্ঞ সহচরের গালে একটি প্রচণ্ড চড় কশাইয়া দিল। দুজনেই ধরাশায়ী হইল। দ্বিতীয় মাতালটা শয়ান অবস্থাতেই মাথা তুলিয়া বলিল, এই তো বাবা, অন্যায় করছ। মাতাল মেরে কোনও লাভ নেই-তার চেয়ে মদ মারো, মজা পাবে। গোকুলবাবুকে ঐ কথাই বলেছিলুম—

প্রথম মাতাল ক্ষীণকণ্ঠে গান ধরিল, দেহি পদপল্লবমুদারম—

মবারক তৎক্ষণাৎ তাহাকে একটি পদাঘাত করিলেন; সে একবার হেঁচকি তুলিয়া নীরব হইল।

এই সময় জাবালি সেখানে আসিয়া মাতাল দুইটিকে শায়িত অবস্থায় দেখিয়া বলিলেন, কি হইয়াছে? ইহারা মদ্যপ দেখিতেছি। আহা, উহাদের মারিও না, ছাড়িয়া দাও।

দ্বিতীয় মাতাল একটি হাত তুলিয়া বলিল, Amen! বেঁচে থাক বাবাজী। তোমার দাড়ির জয়জয়কার হোক। কিন্তু বাবা, মদ্যপ বলে প্রাণে বড় ব্যথা পাই। দেবেনটা পাতি মাতাল কিন্তু বাবা, আমি সুরাপান করিনে আমি, সুধা খাই জয়কালী বলে—

দেবেন্দ্র উঠিয়া বসিবার চেষ্টা করিয়া বলিল, নিমে, চুপ কর, গানটা গাইতে দে— বলিয়া গান গাহিবার উদ্যোগ করিল—সুরাপান করি না আমি–

নিমচাঁদ বাধা দিয়া বলিল, তুই শালা রামপ্রসাদের কি জানিস? ক্যাডাভারা চাষা কোথাকার। তুই মালিনী মাসীর গান গা

গোরা বলিল, চোপরও। —অভয়া, এ দুটো নিয়ে কি করি বল তো?

অভয়া এতক্ষণে বেশ প্রকৃতিস্থ হইয়াছিল; হাসিয়া বলিল, ছেড়ে দিন। আচমকা ভয় পেয়েছিলুম, নইলে ভয় পাওয়া আমার স্বভাব মনে করবেন না যেন, গৌরবাবু। তাছাড়া, মাতালের অভিজ্ঞতাও আমার জীবনে কম হয়নি।

জাবালি বলিলেন, বৎসে অভয়া, তোমার প্রস্তাব আমি সম্পূর্ণ অনুমোদন করি। কারণ, আমি দেখিতেছি, সুরাসক্ত হইলেও ইহারা কিয়ৎ পরিমাণে সংস্কারমুক্ত হইয়াছে। সুতরাং ইহারা বিশেষ করিয়া তোমার দয়ার পাত্র।

অভয়া ভক্তিভরে জাবালির পদধূলি লইয়া বলিল, প্রভু, আপনার বাণীই আমার জীবনের শান্তি। সংস্কার থেকে মুক্তি কখনো পাব কিনা জানি না, কারণ, দেখতে পাই একটা সংস্কার ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে তার বিপরীত সংস্কারটা ঘাড়ে চেপে বসে। কিন্তু সেই পথেই চলেছি!

জাবালি বলিলেন, সেই পথেই চল। উহাই একমাত্র পথ—অন্য পন্থা নাই।

অভয়া জিজ্ঞাসা করিল, দেবী হিন্দ্ৰলিনীকে দেখছি না? তিনি কোথায়?

হিন্দ্রলিনীর নাম শুনিবামাত্র জাবালির মুখে দুঃখের ছায়া পড়িল, চক্ষু বাষ্পচ্ছন্ন হইল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, হিন্দ্ৰলিনী নাই—তিনি স্বৰ্গতা। বলিয়াই সচকিতভাবে চতুর্দিকে চাহিয়া বলিলেন, কিন্তু সেজন্য আমার কোনও দুঃখ নাই। যবচূর্ণ থাসিতে ঈষৎ ক্লেশ হয় বটে কিন্তু তাহা যৎসামান্য। আমার মেষপাল লইয়া আমি পরম সুখে আছি। বলিয়া বদনমণ্ডল প্রফুল্ল করিবার চেষ্টা করিলেন।

মবারক পাশে দাঁড়াইয়া শুনিতেছিলেন; তিনি মৃদু হাসিয়া মুখ ফিরাইয়া লইলেন।

ইতিমধ্যে, বোধ করি মাতালের গণ্ডগোলে আকৃষ্ট হইয়াই, অনেকগুলি নরনারী পাহাড়তলি হইতে বাহির হইয়া ঘটনাস্থলের দিকে অগ্রসর হইতেছিল। তাহাদের সকলকে চিনিতে পারিলাম না, কয়েকজনকে আন্দাজে চিনিলাম। একজন আধ-পাগলা গোছের লোক একটা ভাঙা বেহালা লইয়া অনবরত তাহাতে ছড় চালাইতেছিল, কিন্তু বেহালায় আওয়াজ বাহির হইতেছিল না। মুর্তিমতী ইন্দ্রাণীর মতো একটি নারী–মুখে গাম্ভীর্য, বৃদ্ধি ও সৌন্দর্যের অপূর্ব সম্মিলন হইয়াছে—মন্থরপদে আসিতে আসিতে পিছু ফিরিয়া ডাকিল—চারু!

তাহাকে চিনিতে বিলম্ব হইল না! এমন আরও অনেক নরনারী আসিল, কাহাকেও দেখিয়া চিনিলাম, কেহ চেনা-অচেনার সংশয়ময় সন্ধিস্থলে রহিয়া গেল।

দুইটি তরুণী হাত-ধরাধরি করিয়া নিঃশব্দে সকলের সঙ্গে যোগদান করিয়াছিল, কেহ তাহাদের লক্ষ্য করে নাই। দুজনেই শ্যামবর্ণা কৃশাঙ্গী, চেহারাও প্রায় একই রকম। বিনয়ের পাশ দিয়া যাইবার সময় বিনয় মুখ তুলিয়া তাহাদের প্রতি চাহিয়া মৃদু হাসিল, বলিল, ব্যাপার কি? একেবারে যুগল রূপে যে!

বুঝিলাম, দুটিই ললিতা। একটি বিনয়ের, অন্যটি শেখরের।

বিনয়ের ললিতা মুখ টিপিয়া হাসিল, উত্তর দিল না। গোরার কাছে গিয়া নিম্নস্বরে বলিল, গৌরবাবু, সুচিদিদি আপনাকে ডাকছেন। এদিকে কিসের গোলমাল হচ্ছে—তাই ডেকে পাঠালেন।

গোরা বলিল, যাচ্ছি। কিন্তু তার আগে—

গোরা সাঁড়াশির মতো আঙুল দিয়া নিমচাঁদ ও দেবেন্দ্র দত্তকে ঘাড় ধরিয়া তুলিল—বলিল, চল–

নিমচাঁদ বলিল, নিজে থেকেই যাচ্ছি বাবা—গলাটিপি দাও কেন? ওটা যে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে! To gild refined gold, to paint the lily, to throw a perfume on the violet

খট খট! খট খট! একটা বেসুরা শব্দে সকলে চমকিয়া মুখ তুলিয়া দেখিল, একজন বৃদ্ধ মুসলমান একটা লাঠি কাঁধে ফেলিয়া পাগলের মতো ছুটিয়া আসিতেছে এবং বিকৃত উত্তেজিত কণ্ঠে বারবার কি একটা বলিতেছে।

সকলে চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়াইয়া রহিল; মোহগ্রস্ত বৃদ্ধ লাঠি কাঁধে তাহাদের প্রদক্ষিণ করিতে করিতে চিৎকার করিতে লাগিল, তফাৎ যাও! তফাৎ যাও! সব ঝুঁট হ্যায়!

ক্রমশ পাগলা মেহের আলির কণ্ঠস্বর আমার কর্ণে ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া মিলাইয়া গেল। আমার সম্মুখে যে-দৃশ্য অভিনীত হইতেছিল তাহাও অল্পে অল্পে ফিকা হইয়া অদৃশ্য হইয়া গেল। কেবল কানের কাছে সেই উৎকট খট খট শব্দ প্রবল হইয়া উঠিতে লাগিল।

টেবিল হইতে মাথা তুলিয়া দেখি, বহিদ্বারের কড়া সজোরে নড়িতেছে। চোখ রগড়াইয়া উঠিয়া পড়িলাম।

গৃহিণী থিয়েটার দেখিয়া বাড়ি ফিরিয়াছেন।

৭ চৈত্র ১৩৪০

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত