অবিকল

অবিকল

নিজের অতীত জীবনের কথা আমার মনে বেশী আসে না। কিন্তু পুণার নিঃসঙ্গ জীবনযাত্রার ফলে মনটা মাঝে মাঝে ফাঁকা হয়ে যায়, তখন সেই শূন্য স্থানটা ভরাট করার জন্যে মনের অন্ধকার। কোণ থেকে দু-একটা বহু পুরনো স্মৃতি বেরিয়ে আসে। আজ তেমনি একটি স্মৃতিকথা লিখছি।

সালটা ঠিক মনে নেই, তবে ১৯২৪ থেকে ১৯২৬-এর মধ্যে। আমি তখন পাটনা ল-কলেজে আইন পড়ি। আমার বাড়ি মুঙ্গেরে। পাটনা থেকে মুঙ্গের ১১০ মাইল রাস্তা, তাই মাসের মধ্যে একবার-দুবার বাড়ি যাই। বাড়িতে মা বাবা স্ত্রী দুই ছেলে বিদ্যমান। লেখাপড়া ছেড়ে দেবার চার বছর পরে আবার কেঁচে গণ্ডুষ করেছি। মনের টান বাড়ির দিকেই বেশী।

পাটনা ও মুঙ্গেরের মধ্যে যাতায়াত করতে হলে কিউল জংশনে গাড়ি বদল করতে হয়। একবার আমি বিকেলের ট্রেনে বাড়ি থেকে পাটনা যাচ্ছি—বোধ হয় জানুয়ারী মাস—কিউল জংশনে পৌঁছে দেখি পাটনার গাড়ি ছেড়ে গেছে, ঘন্টা দুয়ের আগে আর গাড়ি নেই।

কিউল জংশনটি বেশ ফাঁকা-ফাঁকা। কাছেপিঠে জনবসতি নেই, দুটি লাইনের সংযোগ ঘটানোর। জন্যেই এই জংশনের সৃষ্টি। লম্বা নীচু কয়েকটা প্ল্যাটফর্ম পাশাপাশি চলে গেছে, তাদের মাঝামাঝি স্থানে একটুখানি ছাউনি, ছাউনির নীচে কয়েকটি ঘর; বাকি সব প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা পড়ে আছে। লোকজনও বেশী নেই, দু-চারজন কুলিকাবাড়ি খুঞ্চেওয়ালা আছে তারা ট্রেন চলে যাবার পর কোথায় অন্তর্হিত হয়েছে।

আমার সঙ্গে মোটঘাট নেই, ঝাড়া হাত-পা যাচ্ছি; তাই দুভাবনাও নেই। দু ঘন্টা দেরিতে পৌঁছু এই যা। এদিকে দিন শেষ হয়ে আসছে; ওয়েটিং রুমের জমাট ঠাণ্ডায় কিছুক্ষণ বসে থাকার পর উঠে পড়লাম। ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেছে, বাইরে এখনও আলো আছে।

শালখানা ঘঘামটার মতো মাথায় দিয়ে গায়ে ভাল করে জড়িয়ে নিলাম, তারপর প্ল্যাটফর্মের এ-মুড়ো ও-মুড়ো পায়চারি করতে লাগলাম। চুপ করে বসে থাকার চেয়ে হেঁটে বেড়ালে রক্তের চাঞ্চল্য বাড়ে, শীত কম লাগে।

প্রথমে লক্ষ্য করিনি, আর একটি ভদ্রলোক আমার মতই প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করছেন। তবে তিনি পায়চারি করছেন আমার উল্টো মুখে; প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি আমাদের দেখা হচ্ছে। ভদ্রলোকটি মুসলমান; আমারই মতো লম্বা একহারা চেহারা, ঘাড়ের কাছে একটু নজ, চোখে চশমা; পরিধানে গরম শিরওয়ানি ও পায়জামা, গলায় গলাবন্ধ, মাথায় পশমের রোমশ টুপি। আমার পাশ কাটিয়ে যাবার সময় তিনি আমার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে গেলেন। আমারও তাঁকে দেখে মনে হল লোকটি যেন চেনা-চেনা, আগে কোথাও দেখেছি।

কিন্তু কোথায় দেখেছি? যখন স্কুলে পড়তাম তখন আমার কয়েকটি মুসলমান বন্ধু ছিল, তাদেরই মধ্যে কেউ কি? নূর মহম্মদ? না, নূর তো ছিল মোটা আর বেঁটে। তবে কি জিয়াউদ্দিন? স্কুল ছাড়ার পর ওদের সঙ্গে আর দেখা হয়নি।

দ্বিতীয়বার তাঁর পাশ কাটিয়ে যাবার সময় লোকটিকে আরও ভাল করে দেখলাম। হাঁটার ভঙ্গি, দেহের গড়ন, মুখের ডৌল, সবই চেনা-চেনা, কিন্তু তবু চিনতে পারছি না। তিনি আমার শালের ঘোমটা ভেদ করে মুখখানা দেখবার চেষ্টা করলেন, আমার দিকে চাইতে চাইতে পাশ দিয়ে চলে গেলেন।

এবার আমি এক মতলব করলাম। আমি যদি তাঁকে চিনতে নাও পারি তিনি তো আমাকে চিনতে পারেন। তাই তৃতীয়বার তাঁর সামনা-সামনি হবার সময় আমি মাথার ওপর থেকে শালের ঘোমটা নামিয়ে দিলাম।

তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, অবাক বিস্ময়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। আমিও চেয়ে রইলাম। তাঁর মুখে একটা হতবুদ্ধি হাসি ফুটে উঠল, তারপর তিনি নিজের মাথা থেকে পশমের রোমশ টুপিটা খুলে নিলেন।

স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইলাম। এ যে অবিকল আমারি মুখ। এতক্ষণ চিনি-চিনি করে চিনতে পারছিলাম না। ওই টুপি ছদ্মবেশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এ কি সম্ভব! দুজন রক্তের সম্পর্কহীন মানুষের চেহারা একরকম হতে পারে?

কতক্ষণ পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, যখন চমক ভাঙলো তখন অন্ধকার হয়ে গেছে, আর ভাল করে তাঁর মুখ দেখতে পাচ্ছি না। সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার নাম জানতে পারি কি?

বললেন, আলি আহমদ। আপনার?

নিজের নাম বললাম। তিনি অস্ফুট স্বরে একবার বললেন, তাজ্জব! তারপর এগিয়ে এসে আমার বাহুতে হাত রাখলেন যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না যে আমি জলজ্যান্ত মানুষ।

বলা বাহুল্য, আমাদের কথাবার্তা উর্দুতেই হচ্ছিল।

প্ল্যাটফর্মের ঘরগুলিতে কেরাসিনের বাতি জ্বলছে। আমি বললাম, চলুন কোরে চা খাওয়া যাক।

চলুন।

কেনারের ঘরে সাদা টেবিল-ক্লথ ঢাকা একটি টেবিলে মুখোমুখি বসলাম। আলি আহমদ আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে হঠাৎ হো হো শব্দে হেসে উঠলেন। আমিও সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠলাম। দুজনে খুব খানিকটা হাসলাম। মনের মধ্যে যে অগাধ বিস্ময় জমা হয়ে উঠেছিল তা উচ্ছ্বসিত করে দেবার এই বোধ হয় একমাত্র পথ।

চা এল। আমরা শান্তভাবে চা খেতে খেতে পরস্পরকে দেখছি। আলি আহমদ প্রশ্ন করলেন, ভুরুর ওপর ও দাগটা কিসের? স্বাভাবিক নাকি?

বললাম, না, হকি খেলতে গিয়ে কেটে গিয়েছিল।

তিনি নিজের ভুরুর ওপর আঙুল বুলিয়ে বললেন, আমারও কেটে গিয়েছিল। একজন পাথর ছুঁড়ে মেরেছিল।

প্রশ্নোত্তর চলেছে। তাঁর বয়স পঁচিশ, বিবাহিত, দুটি মেয়ে আছে। বাড়ি পাটনা সিটিতে। কিছু জমিদারি আছে, লেখাপড়া বেশীদূর করেননি, বিষয়সম্পত্তির দেখাশোনা করেন। ভাগলপুরে শ্বশুরবাড়ি, সেখানে গিয়েছিলেন কয়েকদিনের জন্যে, এখন বাড়ি ফিরছেন।

আমার জীবনবৃত্তান্ত শুনে তিনি বললেন, এদিকে বিশেষ মিল নেই। কিন্তু চেহারা এমন হল কি করে?

আমি মাথা নাড়লাম; এ প্রশ্নের জবাব জানি না। হয়তো প্রকৃতির অজস্র অগণিত সৃষ্টির মধ্যে দুটি-একটির এমনি আকস্মিক মিল ঘটে যায়। হয়তো শুধু চেহারার মিল নয়, জীবনের ঘটনাতেও একজন মানুষের সঙ্গে আমার জীবন হুবহু মিলে যাচ্ছে। বিপুলা চ পৃথ্বী। শুধু পৃথিবী নয়, মহাশূন্যে কত গ্রহ জ্যোতিষ্ক আছে, সেখানে আমারই মতো একটি জীব অবিকল আমারই মতো জীবনযাপন করে চলেছে।

ঘণ্টা বাজল, গাড়ি আসছে।

আলি আহমদ ও আমি ইন্টার ক্লাসের একই কামরায় উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে লাগল। আমরা পাশাপাশি বসে আছি, কামরায় আর কেউ নেই; মাথার ওপর আলোটা টিমটিম করে জ্বলছে। আমরা মাঝে মাঝে দু-একটা অবান্তর কথা বলছি; যেন নিজের সঙ্গেই নিজে কথা বলছি। সঙ্গতি অসঙ্গতির কথা ভাবছি না, যখন যা মনে আসছে তাই বলছি। নিজের কাছে নিজের সতর্ক থাকার দরকার কি?

পাটনা সিটি স্টেশনে আলি আহমদ নেমে গেলেন। নামবার আগে আমার হাত ধরে বললেন, কাছাকাছি তো, আবার দেখা হতে পারে।

আমি বললাম, তা হতে পারে।

হেঁচকা দিয়ে আবার গাড়ি চলতে আরম্ভ করল, তিনি নেমে পড়লেন। অস্পষ্টালোকিত স্টেশনে একবার তাঁকে দেখতে পেলাম। মনে হল আমি যেন লম্বা পা ফেলে স্টেশনের ফটকের দিকে যাচ্ছি।

মনটা আচ্ছন্ন হয়ে রইল। রাত্রি নটার সময় পাটনা জংশন স্টেশনে নামলাম।

তারপর প্রায় চল্লিশ বছর কেটে গেছে, আলি আহমদ সাহেবের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। আমি যখন বেঁচে আছি তখন তিনিও নিশ্চয়ই বেঁচে আছেন। ভাবি, তাঁর চেহারা কি আমার চেহারার মতই দাঁড়িয়েছে? হঠাৎ যদি দেখা হয়, আবার চিনতে পারব কি?

২৫ জানুয়ারী ১৯৬৩

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত