টাকা

টাকা

টিউশানির জন্য বের হবো এমন সময় মায়ের ফোন,

-হ্যালো মা।

-বাজান তোর শরীলডা কেমন?সকালে খাইছিস কিছু?
-মা আমি ভালোই আছি।আর খাইছি!তোমাদের কি খবর?
-ভালো নাইরে বাজান।মুক্তার শরীলডা খুব খারাপ।

দিনে দিনে মিয়াডা আমার শুকিয়ে যাচ্ছে।কিচ্ছু মুহি দেইনা।আর তোর বাপের অবস্থা আরো খারাপ।সারাদিন ঘরে শুয়ে পড়ে খকখক করে কাশে।একটু ভালো লাগলেই বিড়ি খাতি চায়। বলছি বাজান,এই মাসে কইডা টাহা ধরা দিতি পারবি।মানে মুক্তাকে ডাক্তার দেখাবো আর তোর বাপের জন্যি কইডা ওষুধ কেনবো।পারবি বাবা?

-মা তুমিতো জানোই,আমি টিউশানি করে কয়টাকা পায়।তাও চেষ্টা করবো এ মাসে বেশি কিছু দেয়ার।

-তাই করিস বাজান।আর এই কুরাবানীর ঈদে বাড়ি আসিস।দেড়ডা বছর হলো তুই বাড়ি আসিস নে।মুক্তা তোর জন্য গত ঈদেও পথ চেয়ে বসে ছিলো।তুই কখন ওর জন্য নতুন জামা কিনে আনবি।শেষে যখন দেখলো তুই আসলি না,নে খেয়েই মেয়েটা আমার কাদতে কাদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।আর আমারি কি মন চাইনা যে তোর মুখখেন দেহি।তোরো কি আমাদের দেখতি মন চাইনা। এসব বলেই মা কেঁদে ফেলে।

-মা,তুমি কাদবা না।আমি এবার ঈদে আসবো।এখন পড়াতে যাবো, রাখি।

ফোন কাটার পর দুচোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলাম না।মন চাচ্ছে একটু জোরে কাদি,কিন্তু পারলাম না।। আমি সবুজ।অনার্স ২য় বর্ষে একটা সরকারি কলেজে মেসে থেকে পড়াশোনা করি আর টিউশানি করিয়ে যা টাকা পায় সেটা দিয়ে আমার খরচ আর পরিবার চালায়।কিন্তু তাতেও হয়না।ছোটোবোন মুক্তারে দেখার জন্য বুকের ভিতর তুফান বয়ে যায় তবুও দেখতে যেতে পারিনা।অনেকটাকা খরচ হয়ে যায়,সেই টাকা দিলে আমার পরিবার দুইবেলা খাইতে পারে। ঈদের দুদিন বাকি।টিউশানির টাকা সব কালেক্ট করেছি।কাল বাড়ি যাবো।মাকে বলেছি সব। আমাকে চমকে দিয়ে ভোরে মায়ের ফোন আসে,কাঁদোকাঁদো গলায় বলতে থাকে,

-বাজান তুই তাড়াতাড়ি বাড়িত আয়।মুক্তার কি জানি হয়ছে।খালি নাক,মুখ দিয়ে রক্ত পড়তেছে।আমি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।বাজান আমার কাছে টাহা পয়সা নাই।তুই কইডা টাহা নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি আই।বাজান তুই আমার মাইয়াডারে বাচা।(কাঁদতে কাঁদতে মা ফোন কেটে দিলো) বেড়িয়ে পড়লাম,যেভাবেই হোক কিছু টাকা গোছাতেই হবে।নতুন যে দুইটা টিউশানি নিছি তাদের কাছে গিয়ে সব বললাম।সব কিছু শোনার পর তারা কিছু অগ্রিম দিছে।সব মিলিয়ে হাজার পঞ্চাশেক টাকা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলাম।

পথের মধ্যে হাজারো স্মৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে লাগলো।মায়ের কড়া শাসন,মিষ্টি আদর আর মুক্তার দুষ্টামিতেই আমার সারাটাদিন কেটে যেতো।খালি কাছে এসে বলতো, “বাইয়া বাইয়া আমি এটা করবো,ওটা খাবো।” এসব বলেই মুখরিত করে রাখতো বাড়িটা।আর মেঘ লাগলে পাগলিটা আমার বলতো বাইয়া ম্যাক লাগেছে।বলেই আমার কোলে লাফ দিয়ে উঠে পড়তো।সেই পাগলিটার কোত্থেকে যে কি হলো। আর বাবার কথা কি বলবো।মাত্রারিক্ত ধূমপানের ফলে ফুসফুসে সমস্যা।সেই থেকে বিছানায় পড়ে আছে।সবকিছু মিলিয়ে টুকেটাক সংসার চলতো।ইন্টারপাশ করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম কিছু একটা আমাকে করতে হবে।যাতে করে পরিবারটাও চলে আর আমার পড়াশোনাও।একজন বুদ্ধি দিলো জেলা কলেজে ভর্তি হয়ে টিউশানি করাতে।সেই থেকে শুরু।

সোজা হাসপাতালে চলে গেলাম।আমাকে দেখার সাথে সাথে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।আমি মাকে সান্ত্বনা দিয়ে মুক্তাকে দেখতে গেলাম।অক্সিজেন দিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে।ছোট বোনের এমন কিছু দেখে কোনো ভাই ঠিক থাকতে পারে কিনা আমার জানা নেই।অন্তত আমি পারলাম না। ডাক্তারের সাথে দেখা করলাম।তারা বললো কি হয়েছে টেস্ট না করে কিছু বলা যাচ্ছেনা।মনে হচ্ছে সিরিয়াস কিছুই হয়ছে।কিছু টেস্ট করাতে হবে।আপনি এক কাজ করুন লাখ দুয়েক টাকা জোগাড় করুন।আর আপাতত ৫০হাজার জমা দিন টেস্ট করার জন্য।

ডাক্তারের কথা শুনে আমার মাথায় বাজ পড়লো।এতোগুলো টাকা আমি কই পাবো।কে দিবে আমাকে এতো টাকা।পাবোনা জেনেও মাকে বলে বেড়িয়ে পড়লাম টাকার উদ্দেশ্যে।কিন্তু কোথাও একটাকাও পেলাম না।সবাই শুধু সান্ত্বনা দিলো,কিন্তু কেউ টাকা দিয়ে সাহায্য করলো না।সারাটাদিন রাত এক করে টাকা খুঁজলাম কিন্তু কানাকড়িও পেলাম না।এর মাঝে মা অনেকবার ফোন দিয়েছে।আমি তাকে শুধু এটাওটা বলে আশ্বস্ত করেছি।মুক্তার কথা মনে পড়ে দুচোখের পানি গাল বেয়ে টোপে টোপে নীচে পড়ছে।এই পানির সাথে যদি দুঃখ কষ্টগুলোও নীচে পড়ে যেতো তাহলে কত ভালোই না হতো। এসব ভাবতে ভাবতে একটা স্কুলের বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালবেলা মায়ের ফোনে ঘুম ভাঙলো।ফোন ধরেই মাকে বললাম,

-মা, আজ টাকা পেয়ে যাবো।

-বাজান,আর টাহা লাগবিনানে। ওরা বলেছে ভাড়ার টাকা দিয়েই মুক্তাকে নিয়ে যেতে।মুক্তাকে ওরা আর এখানে রাখবে না।তুই চলে আয় মুক্তাকে বাড়ি নিয়ে যাতি হবি।

-এসব বলছে কেন মা?ওনাদের বলো আমি টাকা নিয়ে আসতেছি।

-মুক্তা ভালো হয়ে গেছে বাজান।তুই চলে আয়।আর কোনোদিন ওর এমন অসুখ হবেনা।(ফোনের ওপাশের কথাটা শুনে আমার বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো।কেউ একজন বলছে,এই বেটি না কেদে লাশ বাড়ি নেয়ার ব্যবস্থা করো)

আমি যে হাসপাতালে যাবো,সেখানে যাওয়ার মতো শক্তি আমার আর নেই।অনেক কষ্টে গেলাম।মা দেখি বারান্দার এককোনে কাপড় দিয়ে ঢাকা একটা বস্তুর সামনে বসে আছে। আমি গিয়ে ডাক দিতেই মা বলে উঠলো, খবরদার ডাকিস না।ঘুম পাড়ছে ও। সেই সময় এক ডাক্তার এসে আমাকে সরি বলে চলে গেলো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত