জনমদুঃখী মা

জনমদুঃখী মা

প্রায় ১ বছর আগে আমার মাকে আমি নিজে গিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসি।অবাক হবার কিছুই নেই।আমার গর্ভধারিণী মাকেই আমি রেখে এসেছি।মরে পচুক সেখানে,অনেক জ্বালিয়েছে।অফিস থেকে এসেই আমার প্রিয়তমা স্ত্রীর কাছ থেকে যে কতো নালিশ শুনতে হতো!সারাদিন আমার বউটাকে একটুও শান্তিতে থাকতে দিতোনা, বকবক আর প্যানপ্যান কার সহ্য হয়?শেষবার তো শাপলা বলেই দিলো,”শুনো,হয় এই বাড়িতে আমি থাকবো,নয়তো তোমার মা থাকবে!আমার পক্ষে ঐ মহিলাকে সহ্য করা আর সম্ভব নয়।তোমার মা আমাকে রাত-দিন জ্ঞান দিতে থাকে।অথচ বাথরুমটা ঠিক মতো করতে পারেনা..কি দুর্গন্ধ!

ছিহ!আমি আর থাকবোনা এইখানে।বিয়ের আগে কি বলেছিলে তুমি?আমার পক্ষে সহ্য করা আর সম্ভব নয়।”এই বলে কাঁদতে থাকে বউটা আমার।রাতে খায়-ও নি কিছু,কিন্তু না খেলে যে..ভালোবেসে বিয়ে করছি,আর বউটা এই অবস্থাতেও এভাবে কষ্ট পাবে!যদিও কাজের মেয়েটার কাছে জানতে পেরেছিলাম,আমার মা-ও সারাদিন কিছু খায়নি।রাতে তো নয়’ই! কিন্তু বউয়ের জন্য ভালোবাসা তখন উপচে পড়ছে আমার।তাই মা খেলো কিনা, ঔষধ খাইছে কিনা,খবর নেয়ার মতো ইচ্ছা জন্মায়নি।রাতে যখন বউটা আমার ওপাশ ফিরে কাঁদছিলো,আমি ভাবছিলাম কি করা যায়!মা’ই এর সমাধান দিলেন।কাজের মেয়েটা এসে বললো, মা ডাকছে।বিরক্ত হয়েই মার রুমে গেলাম।

-কি ডাকছো কেন??
-বাবা,প্রত্যেক দিন তো তুই বাড়ি আইসা আমার কাছে আসোছ,আইজ আইলি না যে..
-‘রোজ আসি ,আজ আসিনি,তো কি হয়েছে?’বিরক্ত হয়ে জবাব দেই।
-না..তা নয় বাবা,দরজায় দাঁড়াই আছোস যে বাবা..আয়,আমার কাছে আয়।

আমি বিরক্তিকর মুখ নিয়েই মায়ের কাছে গেলাম।মা আমার মুখে, মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন।তারপর বললেন,”মুখটা ওমন শুকনা লাগতাছে ক্যান বাবা?রাতে খাস নাই কিছু!শাপলা মা-ও তো খায়নি।যা,ওরে নিয়া খাইয়া নে। আমি তখন আর মেজাজ ধরে রাখতে পারিনি।বললাম,”আর খাওয়া!তোমার যন্ত্রণায় খাওয়া যায়?কেন তুমি শাপলার সাথে সারাদিন ঘ্যানঘ্যান করো বলো তো?ও তো তোমার ছেলের বউ!তাইনা?”

মায়ের দুচোখ দিয়ে কয়েকফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে গালে।আমি দেখেও না দেখার ভান করে রইলাম।মা’ই তখন বললো, “আমি তোগো খুব জ্বালাই,তাইনারে ?বুঝি সেইটা..বয়স হইছে তো..আমার কারণে তোর সংসারে অশান্তি হইলে যে আমি খুব কষ্ট পামু বাবা।১০মাস পেটে লইছি।তোর কষ্ট হইলে আমি কেমনে বালা থাকমু! তার থাইক্যা বরং আমারে তুই আশ্রমে দিয়া আয় বাবা..সেইখানেই আমি বালা থাকমু। শুধু মাঝে মাঝে গিয়া দেখা করিস এট্টু,পেটে ধরছি তো..ছেলের মুখ না দেখলে কষ্ট হইবো খুব।তয় সংসারে অশান্তি হইলে দেহাও করা লাগবোনা বাবা…”এই বলে মা আমার মুখে, মাথায় হাত বুলাতে থাকে!আমার অনুভূতিটা তখন অনেকটা ঝাপসা ছিলো কিনা,জানিনা।তবে বউকে দ্রুত সেটা জানাতে ভুল করিনি।

-সত্যি বলছো!মাকে কাল বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবে?
-হ্যাঁ, এবার চলো,খাবে..
-আমি খেয়েছি সোনা,তুমি খেয়ে নাও প্লিজ..এই বলে শাপলা আমাকে আলতো একটু আদর দিয়ে গুণগুণ করে ফোনটা হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়।

সেদিন মা আমার সারারাত জেগে থেকে চোখের পানি ফেলেছিলো।কাজের মেয়েটা মার রুমে থাকে কিনা..রাত-বিরাতে মায়ের বাথরুমে যেতে সাহায্য করে। পরেরদিন মাকে নিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থানে রওনা দিলাম।যাবার আগে মা বারবার পিছন ফিরে বাড়িটা দেখছিল,হাতে একটা ছবির ফ্রেম। শাপলার মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে একটা চুমো দিয়ে বলেন,”সাবধানে থাইক্যো মা,এই সময়ে খাওয়া-দাওয়াটা নিয়ম কইরা করবা,হাসি-খুশি থাকবা..তাইলে তোমার আর পেটের বাচ্চা, দুইজনের জন্যই বালা হইবো।”শাপলা চুপচাপ শুনে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়।এর পর মা কাজের মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলে,”শান্তা,তুই কিন্তু বউমার দিকে খেয়াল রাখবি।”

-আইচ্ছা খালাম্মা।
-মা,দেরি হয়ে যাচ্ছে তো..
-হ বাবা,চল।

আমি মাকে ধরে গাড়িতে নিয়ে বসাই।ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌছে যাই।গাড়িতে বসে মা কোনো কথা বলেনি।শুধু লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল। দীর্ঘশ্বাসটার মধ্যে অনেকগুলো কষ্ট ঝরে পড়ছিল,অনেক স্মৃতিও ছিল তাতে।দীর্ঘশ্বাসরা ভিতরে চেপে থাকা অনেক কষ্টের কথা বলে দেয়!! আমি কি বলবো,কথা খুঁজে পাচ্ছিলামনা।আমি এতোটাই পাপী যে,মাকে কি বলবো তা বুঝতে পারছিলামনা! তবে আসার সময় মা আমাকে ধরে খুব কান্না করছিল।আমার চোখটাও কিছুটা ভিজে উঠে।তবে স্থায়ী হয়নি।

মা আমার চোখে,মুখে কপালে চুমো দিতে লাগলো।যেনো আর কোনোদিন দেখা হবেনা বা অনেকদিন পর দেখা হয়েছে,এমন ভাবে।”বাবা..আমার সোনা বাবা..আমার কলিজার টুকরা..আমার এই চান মুখটা আর..”মা কাঁদতে থাকে।”কেঁদোনা মা,বললাম তো,আমি এসে দেখা করবো।কিন্তু না,আমি আমার কথা রাখিনি।মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে খবর নিতাম,পরে সেটাও রাখা হয়নি।তবে এটা সত্য, বাড়িতে আসার পর বাড়িটা কেমন যেনো ফাঁকা লাগছিলো,একধরনের শূন্যতা কাজ করছিলো মনে।কি যেনো নেই,কি যেনো হারিয়ে গেছে..বউয়ের হাসিমুখটা দেখে মায়ের উপস্থিতি ভুলে যাই অনেকটা।তবে মায়ের ঘরে মাঝে মাঝে চোখ পড়লে,কেমন যেনো চিনচিন ব্যথা করতো বুকের বা’পাশে।

আচ্ছা,আমি তো এমন ছিলামনা!তাহলে এমন হলাম কেন!মায়ের সাথে দেখা করতে যেতামনা,কি জানি!মায়ের মুখ দেখে যদি বাড়িতে আনতে ইচ্ছে হতো!তখন তো বাড়িতে নতুন করে আবার অশান্তি হতো!না,থাক! এর কিছুদিন পর হঠাৎ করেই আমার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠে।হাসপাতালে নিয়ে যাই।আমাদের ছেলে হয়।ভালো লাগার থেকে কষ্ট কাজ করেছে বেশি,ছেলেটা পেট থেকেই জণ্ডিস নিয়ে জন্মায়।খুবই খারাপ অবস্থা ছিলো ওর।আইসিওতে রাখা হয়।কিন্তু না!৭দিন বেঁচেছিল সে,তারপর!শাপলা খুব কান্না করেছে,কষ্ট পেয়েছে ভীষণ।প্রথমবার মা হয়েও.. আমিও কষ্ট পেয়েছি,গোপনে চোখের পানি ফেলেছি।বাড়িতে এনে শাপলাকে খুব বুঝিয়েছি,যেনো কান্না না করে।আমার ভিতরটাও যে ভিজছিলো না,তা নয়।আমার শাশুড়ি শাপলাকে বুঝায়।খাইয়ে দেয়।আমি অফিসে যাই,বাসায় আসি।কিন্তু আমার খোঁজ কেউ নেয়না।শাপলাকে ওর মা যখন খাইয়ে দেয়,তখন আমার মায়ের কথা হঠাৎ করেই খুব মনে পড়ে।

আমার মা-ও তো আমাকে খাইয়ে দিতো!রোজ খবর নিতো!অথচ আজ কেউ তো..কষ্ট পেতাম খুব।মাথার চুল টেনে ধরতাম!কাজের মেয়েটা একদিন এসে বলে,”খালাম্মারে নিয়ে আসেন ভাই,খালাম্মা খুব বালা মানুষ,শাপলা ভাবীরে কোনো অশান্তি দিতোনা,সারারাইত কান্না করছে যাওনের আগের দিন।খালাম্মায় খুব কষ্ট পাইতাছে, ওনারে কষ্ট দিলে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কাঁইপ্যা উঠবো।দেখতাছেন না,কি হইতাছে!!” আমি কেমন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি অনেক্ষণ।সত্যিই তো..আমার মা আমাকে কতো আদর যত্ন করে মানুষ করেছে।নিজে না খেয়ে আমাকে খাইয়েছে।আমার গর্ভধারিণী মাকে আমি কষ্ট দিয়েছি।না,মাকে ফোন দেই একটা!ওহ!সীম তো চেঞ্জ করেছি,নাম্বারটাও তো..এ আমি কি করলাম আল্লাহ!!

আমি ফুপিয়ে কাঁদতে থাকি।বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি আর মধ্যরাত তখন।মায়ের রেখে যাওয়া সবকিছু অবলোকন করি মায়ের রুমে গিয়ে।সেখানে মায়ের সাথে আমার ১টা ছবি ছিলো,হাতে নেই ছবিটা।কাঁদতে থাকি খুব। একসময় ঘুমিয়ে পড়ি।কেউ এসে খবর নেয়নি।হঠাৎ দেখি মা আমাকে ডাকছে,বলছে,”বাবা রাসেল..উঠ বাবা,আমারে একটা বার মা বইল্যা ডাক দে বাবা।কতোদিন তোর মা ডাক শুনিনা।না শুইন্যা কেমনে মরমু ক?ডাকনা বাবা..একটা বার মা বইল্যা ডাক।”আমি ঘুমের ঘোরেই মা বলে চিৎকার করে জেগে উঠি।দেখি, ফজরের আযান হচ্ছে।আমার চোখ মুখ ভেজা।না,আমাকে মায়ের কাছে যেতেই হবে।মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে মাকে নিয়ে আসবো।যা খুশি হোক। “কি হলো?এতো সকাল সকাল কই যাচ্ছো তুমি?”

-মাকে নিয়ে আসতে বাড়িতে
-মানে! অবাক হয়ে জানতে চায় শাপলা
-মানে খুব সহজ। বুঝতে পারছোনা? “কি হলো রে তোদের.. ”
-আম্মা আপনি আপনার মেয়েকে বুঝান।আমি আমার মাকে আনতে যাচ্ছি।

আচ্ছা,রাস্তা এতো লম্বা কেন?শেষই হচ্ছেনা যেনো!এতো দীর্ঘপথ কি আজ শেষ হবে।আমার মা!আমি মায়ের কাছে যাচ্ছি।মায়ের সেই কোমল মুখটা কতোদিন পর দেখবো।আমার মা!মায়ের ছবিটা বুকে ধরে রাখি।একি!বৃদ্ধাশ্রমে আজ এতো মানুষ জড়ো হলো কেন!গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে দৌড় দেই!

-তুমি আসলে অবশেষে! চমকে পিছনে তাকাই।দেখি বৃদ্ধাশ্রম এর মালিক জাহাঙ্গীর আলম।”তোমাকে অনেকবার কল দেয়া হয়েছিল।কিন্তু তোমার ফোন বন্ধ,তোমার মা যে “মা!কি হয়েছে মায়ের? কি হলো চুপ করে আছেন কেন আংকেল?কথা বলুন!”

-তোমার মা…এই বলে ওনি জড়ো হয়ে থাকা মানুষের ভিড়ে একটা খাটিয়া দেখালেন।কেঁপে উঠে আমার বুক!তাহলে কি…দৌড়ে আমি খাটিয়ার কাছে যাই!

“মা!”চিৎকার করে মাকে জড়িয়ে ধরি।”দেখো মা,তোমার ছেলে তোমাকে নিতে এসেছে।কথা বলো মা..কি হলো?চুপ করে আছে কেন?মা…”আমি কাঁদতে থাকি ভীষণরকম।আমার মা কথা বলছেনা কেন?মা..কথা বলো,একটাবার বাবা বলে ডাকো!দেখো, তোমার ছেলে তোমার কথা শোনার জন্য মরিয়া হয়ে আছে।প্লিজ মা..মা,আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মা।তোমার কুলাঙ্গার ছেলেকে তুমি ১০মাস পেটে ধরেছো।মাগো…আমার গর্ভধারিণী মা..প্লিজ.. মা..ক্ষমা করো..মাগো..একটার চোখ মেলে তাকাও প্লিজ..আমাকে না দেখতে চেয়েছো..মা..মা..!

-রাসেল!কি হয়েছে তোমার?রাসেল!!শাপলা রাসেলকে ধাক্কা দেয়।রাসেল চোখ খোলে।রাসেলের দু’গাল বেয়ে পানি পড়তে থাকে।এরপর উঠে শাপলাকে ঝরিয়ে ধরে কাঁদতে থাকে সে।”আমার খুব কষ্ট হচ্ছে..মাকে খুব মিস করছি শাপলা..মা..মায়ের সাথে খুব অন্যায় করেছি..আমার গর্ভধারিণী মাকে কিভাবে পাবো আবার!”

-শান্ত হও রাসেল।ভুল তো আমিও করেছি অনেক, মায়ের সাথে অন্যায় করেছি খুব।ভেবেছিলাম মাকে নিয়ে আসলে পায়ে ধরে ক্ষমা চাইবো,কিন্তু শাপলাও কেঁদে ফেলে রাসেল কাঁদতে কাঁদতে ওর গর্ভধারিণী দুঃখী মায়ের ছবিটা হাতে নেয়।যে মা,শেষবার ছেলের মুখটা দেখতে পায়নি!ছেলেও মায়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ পায়নি।ভুলটা বুঝতে পেরেছে রাসেল,তবে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রাসেল আর শাপলার এই অপরাধবোধটা সারাজীবন ওদের পোড়াবে..রাসেলকে একটু বেশিই কষ্ট দিবে!

-বাবা রাসেল…
-মা…
-বাবা রাসেল..তোর মুখটা এমুন শুকনা লাগতাছে ক্যান?কিছু খাস নাই বুঝি!
-না মা,তুমি ডাকোনি তো শাপলা চেয়ে দেখে,রাসেল দরজায় দাঁড়িয়ে নিজে নিজে কথা বলছে।শাপলা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে!!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত