জটিল বিবাহ

জটিল বিবাহ

কথায় আছে ভাগ্যের লিখন যায় না খন্ডানো।কথাটা যে ১০০% খাঁটি সেটা বুঝতে গিয়ে জীবন থেকে হারিয়ে গেছে পুরো তিনদিন।সেই তিনদিন আর খুঁজে পাবো বলে মনে হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমার ক্লাসের সবচেয়ে ভদ্র নম্র মেয়েটার নাম প্রত্যুষা।নামের বানানটা যেমন জটিল মেয়েটাও ঠিক ততটাই জটিল।ভাবলাম এই জটিল মেয়েটাকেই পটাতে হবে।এই মেয়ের সাথেই হবে আমার জটিল প্রেম।

আমার নিজের কথাই তো বলা হলো না।আমি শৈবাল।ঠিকই শুনছেন শৈবাল।বালের আগে শৈ আছে।এই নাম নিয়ে বন্ধুমহলের বেশ কয়েকবার নির্যাতিতও হতে হয়েছে।কিন্তু কি করবো বলুন। মা বাবার দেওয়া নাম। আমাদের বংশের নিয়ম অনুযায়ী বেশ বড় নামকরণ অনুষ্ঠান করে ধুমধামের সাথে বাবা এই নামটা রেখেছেন।ভালো নাম অবশ্য একটা আছে।দীপাঞ্জন হচ্ছে আমার ভালো নাম।আর তার সাথে বাপ দাদার উপাধি যোগ করে পুরো নাম হয় দীপাঞ্জন রায় শৈবাল।কিন্তু দীপাঞ্জন নামে আজ পর্যন্ত আমার বন্ধুদের একজনও একটি বারের জন্যও ডাকে নি।একবার ক্লাসের একটা মেয়ের মুখে শুনেছিলাম দীপাঞ্জন নামটা।তাও মেয়েটা আমায় আগে থেকে চিনতো না বলে।আসলে হয়েছিলো কি কবিতা আবৃত্তিতে নাম দিয়েছিলাম।যে স্যার উপস্থাপনা করছিলেন তার মুখে দীপাঞ্জন রায় শৈবাল নামটা কি চমৎকারই না লাগছিলো শুনতে।

নিজের ঢাক নিজেই পিঠাচ্ছি।আজকাল নাকি নিজের ঢাক নিজে না পিঠালে কেউ পিঠিয়ে দেয় না।পুরো কলেজের ৫০জন ছাত্রছাত্রীর মাঝে আমি ২য় হয়েছিলাম।যাই হোক পুরস্কার দেওয়ার সময় আমরা বন্ধুরা মিলে ইচ্ছামতো চিল্লাচ্ছিলাম।নিজের নাম যে মাইকে ঘোষনা হয়েছে সেটাও শুনতে পাই নি।তখন সামনের সারিতে বসে থাকা মেয়েটা ডাক দিয়ে বলেছিলো, “এই দীপাঞ্জন তোমার নাম ডেকেছে।মঞ্চে যাও।” কি শান্তি না লেগেছিল তখন।প্রাইজ আর সার্টিফিকেট নিয়ে এসে মেয়েটাকে একটা থ্যাংক ইউ বলার জন্য সামনে গিয়ে দেখলাম সাথে সিনিয়র ভাই উৎপলদা বসে আছেন।আমায় খুবই স্নেহ করেন।থ্যাংক ইউ বলেই নিজের পিঠ বাঁচাতেই আস্তে করে বলে ফেললাম,বউদি নাকি? জবাবে উৎপলদা চওড়া একটা হাসি উপহার দিলেন।

বন্ধুদের এই নাম নিয়ে নির্যাতনের ফলেই আজ পর্যন্ত একটা রিলেশানশিপ করতে পারলাম না।মানুষের বন্ধুরা তাদের এইসব ব্যাপারে সাহায্য করে কিন্তু আমার বন্ধুরা পুরাও উল্টা। ওদের জন্য রিলেশনশিপ হওয়ার আগেই তা ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। এই বন্ধুগুলো থাকার চেয়ে কতগুলো শত্রু থাকাও ভালো ছিল।এইগুলোকে ছাড়তেও পারি না।কি করবো বলুন বন্ধু তো।কতদিন কত উপকার যে করেছে তার কোনো হিসাবই নেই।কোনটা রেখে কোনটা বলবো।সেজন্যই একটাও বললাম না।

কোনো মেয়েকে যখনই ইম্প্রেস করতে গেছি সাথে সাথে ছাগলগুলো পেছন থেকে বলে উঠেছে, “নাম তার বাল।বালের আগে শৈ। হইলো নাম শৈবাল।” আর অমনি মেয়েটা দিয়েছে একটা মুচকি হাসি।মেয়েটার হাসি দেখে লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করেছে বার বার।কিন্তু মরতে গিয়েই শান্তি পেলাম না।এই বন্ধুগুলো নিজেরা জ্বালিয়ে মারবে কিন্তু নিজে নিজে মরতে দেবে না।একদিন পাড়ার এক বড় ভাই দলবল নিয়ে মারতে এসেছিল।ভাইয়ের দুই চেলা স্কুলপড়ুয়া দুটো মেয়ে জ্বালাতন করছিলো বলে পেদানি দিয়েছিলাম।আর তার প্রতিশোধ নিতেই মহামান্য বড়ভাইয়ের দলবলসহ আগমন। সেদিন উপরে যাইয়ার টিকেট তো কাটা হয়েই যেতো।উপরের টিকিট না হলেও হাসপাতালের টিকেট তো পুরো ফাইনাল ছিল।গলির মোড়ে একা একা দাঁড়িয়েছিলাম।দুদিক থেকেই আসছিলো ওরা।

দৌঁড়ে পালানোর কথাও ভুলে গিয়েছিলাম।পা নাড়াতেই পারছিলাম না।এতগুলো সজ্জিত ক্যাডার দেখে বোধশক্তি সব লোপ পেয়ে গিয়েছিল।ওরা আমার কাছে পৌঁছার আগেই কোথা থেকে জানি উদয় হলো ছাগলগুলো।সবকয়টার হাতে কাটারি,রামদা।এসেই ঘিরে দাঁড়ালো আমায়।ছাগলগুলোর রুদ্রমূর্তি দেখে বড়ভাইয়ের চেলারা পিছু হটে।বেঁচে যাই আমি।এরপর আমায় চারপাশ দিয়ে ঘিরে ওই জায়গা থেকে নিয়ে আসে।কিছুদূর আসার পথে একটা কামারের দোকানে ঢুকে কামার কাকার দোকানে দা কাটারি গুলো দিয়ে আসে।পরে শুনেছিলাম একটা ছাগল ওদের আমাকে মারতে আসা দেখে ফেলেছিলো।আর ওই ফোন করে বাকিগুলোকে ডেকে আনে।আসার পথে এই কামার কাকার দোকান থেকে ১৫মিনিটের জন্য এই অস্ত্রগুলো চেয়ে নিয়ে আসে।আর এই জন্যই এই ছাগলগুলোকে কখনো ছাড়তে পারি না।সবসময় ছায়ার মতো লেগে থাকে এই ছাগলগুলো।

যাই হোক এবার আর এই জটিল কন্যার কথা আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের জানতে দেই নাই। জটিল কন্যার সাথে জটিল প্রেম করার পরই ওদের জানাবো।না হলে জটিল প্রেম শুরু হওয়ার আগেই তা অতি সরলভাবে ভাঙিয়া যাইবার সমূহ সম্ভাবনা।আমার মাথায় শুধু একটা চিন্তা আমার ভালোবাসাবাসির দরকার নাই।জটিল কন্যা সাতদিন আমার সাথে রিলেশনশিপ রাখলেই হবে।অন্তত আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের দেখাতে তো পারবো।যে দেখ আমি আবাল নই।আমি শৈবাল।

অবশেষে জটিল কন্যার সামনাসামনি হলাম।অবশ্যই আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের চোখ এড়িয়ে।অতি সহজ বাক্যে আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম শুধুমাত্র সাতদিনের রিলেশনশিপই আমার জন্য অনেক।সাতদিনের রিলেশনশিপ হলেই আমার চলবে।জটিল কন্যাও অতি সহজভাবে বললো সে আমায় ভাবিয়ে জানাইবে।তার জন্য আমাকে কিছুসময়ের জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকিতে হইবে।আমি তাহাই মানিয়ে লইলাম।যদি জটিল কন্যা আমার কথায় সাড়া দেয় তবে আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের সামনে তাহাকে নিয়া হাঁটিয়া যাইতে পারিলেই আমার জন্য অনেক হইবে। কিন্তু কে জানতো এই হাঁটতে চাওয়ার ইচ্ছা আমার জন্য এত ভয়ংকর হবে। বিকাল বেলা বাড়ি ফিরতেই আমার পিতা আমায় ডাকিলেন,বাবা সুপুত্র এদিকে আসো তো বাবা।

বাবার মুখে বাবা সুপুত্র ডাক শুনেই বুঝতে পারলাম আমার কপালে আজ দুর্গতি আছে।এত সুন্দর করে বাবা আমায় তখনি ডাকেন যখন আমি কোনো মহা কেলেঙ্কারি করে ঘরে ফিরি।কিন্তু আজ তো আমার জানা মতে আমি অতি ভদ্র ভাবে সারাটা দিন অতিবাহিত করেছি।তবে কেনো আজ এই প্রহসন! ধীর পায়ে বাবার রুমে গেলাম।মাকেও মঞ্চে উপবিষ্ট মানে খাটে বসা পেলাম।বাবা আমায় যা বললেন সেটা শুনে আমার আকাশ ভেঙে পড়লো।

আমার সাতদিন কোনো মেয়ের সাথে হাঁটার স্বপ্ন বাবার কানে কি করে পৌঁছলো ভেবে পেলাম না।বাবা এখন আমায় সারাজীবন মেয়ে সাথে নিয়ে হাঁটার ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছেন।অর্থাৎ বাবা আমায় বিবাহের সংবাদ দিয়াছেন।কাল গায়ে হলুদ এরপর দিনই বিয়ে।বাবাকে বয়স আর পড়াশোনার অযুহাত দেখালাম।মাত্র তো ফাইনাল ইয়ার। আরো দুবছর পর মাস্টার্স শেষ হবে।তার পর চাকরি বাকরি একটা জুটিয়ে তবে বিয়ের চিন্তা। কিন্তু বাবা সেটা মানতে নারাজ। বলে দিয়েছেন একটা অকর্মা ছেলে যখন পালতে পারছেন তখন একটা লক্ষী বৌমাকেও খুব সহজেই নিজের মেয়ে বানিয়ে রাখতে পারবেন।ওদিকে মাও নিশ্চুপ।অন্যদিন আমার হয়ে ওকালতি করেন।কিন্তু আজ পুরো নিরব।বুঝতে পারলাম বাঁশ এবার সবদিক দিয়েই খেতে হবে।

সন্ধ্যা থেকেই বাবার নজরবন্দী হয়ে গেলাম।রাতটা কোনো মতে কাটালাম।সকাল হতেই কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে যাবো তখনি দেখি আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুরা একে একে আমার রুমে প্রবেশ করছেন।তাদের কাছেই জানতে পারলাম আজ থেকে আমার কলেজে যাওয়া বন্ধ।বিয়ের পর কলেজে যাওয়ার চিন্তা করার কথা বলেছেন।আর যদি আমি বিয়ে থেকে পালানোর কোনো প্লান করেছি কিংবা প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের সাহায্য নিয়েছি তবে আমার ওই বন্ধুদের যাকেই বাবা ধরতে পারবেন তার সাথেই বিয়ে দিয়ে দেবেন।আর সেই ভয়েই বন্ধুরা আমায় পাহারা দিতে চলে এসেছে।ওদের এক কথা।আমার জন্য জীবন দিয়ে দিতে রাজি কিন্তু স্লো পয়জন গ্রহণ করতে রাজি না।আবার বাবা বিয়ের শর্তও দিয়ে দিয়েছেন।বিয়ের পূর্বে মেয়ের মুখদর্শনও করতে পারবো না।

উপরওয়ালার নাম জপতে লাগলাম।বাবা না জানি কোন মেয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করে দিয়েছেন।স্বপ্ন দেখেছি সবসময় লক্ষ্ণীকে নিয়ে। এবার যদি ভাগ্যে কালী এসে জুটে তবে সন্ন্যাসী হওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকবে না।এদিকে ভাবছি প্রত্যুষার কথা।জটিল প্রেম আর করা হলো না।মেয়েটা আজ আমায় ওর ভাবনার কথা বলতো কিন্তু বাবা তো আমার কলেজে যাওয়ার পথই বন্ধ করে দিয়েছেন।আর পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত করেছেন আমারই প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের।

মহাধুমধামে গায়ে হলুদ সম্পন্ন হলো।সন্ধ্যায় শুরু হলো সাজগোজ। আমার না আমাদের বাড়ির বঙ্গললনাদের।বাবার এদিকে ভয় হচ্ছে।এদের সাজগোজের পাল্লায় লগ্ন না এবার বয়ে যায়।অবশেষে ব্যান্ড বাজিয়ে বহুমূল্যপুষ্পপত্রে সজ্জিত গাড়িতে করে আমি বর বেশে যাত্রা করলাম।আগে শুনেছিলাম বিয়ে হবে গায়ে হলুদের পরদিন। কিন্তু বাবা সেটা গায়ে হলুদের দিনই এগিয়ে এনেছেন।কোনো বিশ্বস্ত সুত্রে তিনি অবগত হয়েছেন।রাতে যখন পুরো পৃথিবী ঘুম রাজ্যে পাড়ি দেবে তখন সুযোগ বুঝে আমি পলায়ন করবো।আর তাই এই ব্যবস্থা।আমি বুঝে পাই না আমার প্রতিটা পরিকল্পনা বাবা কি করে আগেই টের পেয়ে যান।

যাইহোক কনের বাড়িতে পৌঁছলাম।বিয়েবাড়িতে পৌঁছে তো পুরোই টাস্কি খেয়ে গেলাম।যে দিকে চোখ যায় আমাদের সাথে পড়ে এমন সদস্যদেরই চোখে পড়ছে।যেন আমাদের পুরো কলেজ ক্যাম্পসটা এখানে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে।ব্যাপারটা কি! বাবা কি তবে পুরো কলেজ দাওয়াত দিয়ে দিয়েছে।ইজ্জত সম্মান আর কিছু রাখলো না।মনে মনে প্রত্যুষাকে খুঁজতে লাগলাম।সবাই যখন এসেছে প্রত্যুষাও তাহলে নিশ্চয়ই এসেছে।কিন্তু বিধিবাম। প্রত্যুষাকে একবারো চোখে পড়লো না। অবশেষে শাখ বাজিয়ে উলু দিয়ে পাঠা বলি শুরু হলো।মানে আমার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।পুরোহিত মশাই কন্যাকে নিয়ে আসার জন্য বললেন।আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের দেখলাম কনের পিঁড়ি ধরে আছে।

শুভদৃষ্টিতে যেই কনে মুখের উপর থেকে পান পাতা সরালো আমি টাস্কির উপর টাস্কি খেলাম।কনে আর কেউ না।কোনো কালী শ্যামাও না।বরং প্রত্যুষা স্বয়ং।মাথাটা একটা চক্কর দিয়ে উঠলো।বিয়ের মন্ডপে পড়ে গিয়ে আবার ইজ্জতের তেরোটা বাজানোর ভয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম।বিয়ে চলতে লাগলো।দ্য মোস্ট ব্যাচেলর দীপাঞ্জন রায় শৈবাল প্রত্যুষা ভৌমিকের আঁচলে সাত পাকে বাঁধা পড়লো।

পরিশেষে আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের সামনে দিয়ে কোনো একজন মেয়েকে নিয়ে হেঁটে যাওয়ার স্বপ্ন আমার পূরণ হয়েছে।তবে সেটা জটিল কন্যা প্রত্যুষাকে নিয়ে নয়।জটিল বউ প্রত্যুষাকে নিয়ে।আর ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানতে পেরেছি সেদিনের সাতদিনের রিলেশনশিপের প্রপোজালের কথা প্রত্যুষাই বাবাকে জানিয়েছিল।প্রত্যুষা আমার বাবার প্রাণপ্রিয় বন্ধু পরিমল আংকেলের মেয়ে।বাবা তার বন্ধুর মেয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলেন।বন্ধুর মেয়ে প্রত্যুষা সে কথা জানতো।কিন্তু বাবা আমায় কখনো সেটা বলে নি। আর আজ তিনদিনের ব্যবধানে ব্যাচেলর সিঙ্গেল দীপাঞ্জন রায় শৈবাল বিবাহিত পুরুষ।হায়রে ভাগ্য কি লেখা লিখলি!!তিনদিনে জীবন পাল্টে দিলি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত