ছোট ছোট মেঘের টুকরো

ছোট ছোট মেঘের টুকরো

০১.
ছোট ছোট মেঘের টুকরোর সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে চাঁদ আবার লুকিয়ে পড়ল। রত্না একটু আড়াল দিয়ে চোখের জল মুছে নিল। আমার সান্ত্বনা জানাবার কোন ভাষা ছিল না। তাছাড়া গলা দিয়ে যেন কথাও বেরুতে চাইল না। ইচ্ছা করছিল রত্নার চোখের জল মুছিয়ে দিই, তাকে অনেক কিছু বলে একটু সান্ত্বনা জানাই। কিছুই পারলাম না। দুজনেই চুপচাপ বসে রইলাম।

কতক্ষণ যে দুজনে এমনি করে নিশ্চল দুটি প্রাণহীন পাথরের মূর্তির মতো বসেছিলাম, তা মনে নেই। মনে আছে, রত্নার মা রত্নাকে নিয়ে গিয়েছিলেন ওদের হাউস বোটে।

আমার হাউস বোটের ছাদ থেকে সিঁড়ি দিয়ে নীচে শিকারায় চড়বার সময় শাড়ীর আঁচলটা একটু টেনে ভাল করে গায়ে জড়াতে জড়াতে রত্না শুধু বলেছিল, চলি দাদা, কাল সকালে আবার আসব।

আমি তারও কোন জবাব দিতে পারিনি। মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলাম বলেও মনে হয় না।……

…অনেক আশা, অনেক স্বপ্ন নিয়ে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর গিয়েছিলাম। বহুদিন পরে, বহু চেষ্টা করে কদিনের জন্য মুক্তি পেয়েছিলাম সাংবাদিক জীবনের নিত্যকর্ম পদ্ধতি থেকে। ভেবেছিলাম, ডাল হ্রদের জলে হাউস বোটে ভাসতে ভাসতে একটু তাজা করে নেব নিজের দেহ আর মনকে। বায়ুগ্রস্থ আমেরিকান টুরিষ্টদের মতো উল্কার বেগে ঘুরে বেড়াবার কোন পরিকল্পনা আমার ছিল না। গুলমার্গ পহলগাও দেখারও কোন আগ্রহ ছিল না। অন্যান্য বাঙ্গালী টুরিষ্টদের মতো বক্স-ক্যামেরা হাতে নিয়ে শালিমার গার্ডেন দেখতেও আমি চাইনি। তাইতো তারিক-এর নিউ মডার্ণ প্যারিস হাউস বোটে এসেই বলেছিলাম, দুটো টাকা বেশী নিও কিন্তু নতুন খদ্দের এনে আর ভীড় বাড়িও না। আর একটা বিষয়ে তারিককে সতর্ক করেছিলাম, খবরদার! খবরের কাগজ আনবে না, আমি চাইলেও আনবে না। তাইতো তিন দিন ধরে নিউ মর্ডাৰ্ণ প্যারিসে কাটাবার পর এক কাপ কফি খেতে গিয়েছিলাম নেহেরু পার্কের রেস্টুরেন্টে।

তিন দিন পর কিছু মানুষ দেখে বোধহয় একটু ভালই লেগেছিল। পরের দিন বিকালেও গেলাম। সেদিনও বেশ লাগল। তারপর থেকে বিকালের দিকে এক কাপ কফি খাবার অছিলায় কিছু নতুন মানুষ দেখার লোভে রোজই যেতাম নেহেরু পার্কের ঐ রেস্টুরেন্টে।

সেদিনও একই উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়েছিলাম। কফি খাওয়াও হয়ে গিয়েছিল অনেকক্ষণ। ঠিক উঠব উঠব ভাবছি এমন সময় কোথা থেকে ছুটে এসে রত্না বলল, বাচ্চুদা আপনি এখানে?

আমাকে দেখে রত্না যতটা অবাক হয়েছিল, আমিও ওকে দেখে ঠিক ততটাই বিস্মিত হয়েছিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কোথা থেকে?

মাত্র ঐ কটি মুহূর্তের মধ্যেই রত্নার সব চাঞ্চল্য, সব উচ্ছ্বাস বিদায় নিল। সারা মুখের চেহারাটাই যেন বদলে গেল। কেমন যেন হঠাৎ নিষ্প্রভ হয়ে গেল রত্না। সেদিন বিশেষ কিছু বুঝতে পারিনি। শুধু এইটুকু বুঝেছিলাম রত্না পাল্টে গেছে। কেন সে নিষ্প্রভ হয়েছিল সেদিন, কেন তার সব উচ্ছ্বাস বিদায় নিয়েছিল মাত্র একটি মুহূর্তের মধ্যে, সেসব কিছুই বুঝতে পারিনি।

রত্না শুধু বলেছিল, মাসখানেক হলো আমি লণ্ডনের সংসার তুলে চলে এসেছি। একটু থেমে বলেছিল, মন মেজাজ বিশেষ ভাল না; তাই বাবা-মার সঙ্গে বেড়াতে এসেছি।

আমি আর উঠলাম না। রত্নাকে বললাম, বসো কফি খাবে তো?

মুখে কোন উত্তর দিল না। জিভ দিয়ে নীচের ঠোঁটটা একটু কামড়াতে কামড়াতে শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল আমার প্রস্তাবে।

কফি খেতে খেতে আমি বললাম, কি আশ্চর্য এই দুনিয়াটা! কোনদিন স্বপ্নেও ভাবিনি শ্রীনগরে তোমার দেখা পাব।

ঠিক বলেছ বাচ্চুদা, দুনিয়াটা বড় আশ্চর্যের জায়গা। মানুষ যা চায়, যা ভাবে তা হয় না। আর যা কল্পনা করতেও কষ্ট হয়, ঠিক সেটাই জীবনে ঘটবে। কফির কাপ থেকে মুখটা উঁচু করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তাই না বাচ্চু দা?

আমি একটু মুচকি হেসে বললাম, ঠিক বলেছ।

কফি খেয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে নেহেরু পার্কে একটু ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে জিজ্ঞাসা করলাম, লণ্ডন থেকে কবে দেশে ফিরলে?

রত্না যেন কেমন আনমনা ছিল। মনে হলো আমার কথা শুনতে পায়নি। আবার প্রশ্ন করলাম, কবে দেশে এলে?

এইতো কিছুদিন হলো; এখনও একমাস হয়নি।

বিনয় ডাক্তার কেমন আছে?

কি বললেন?

বিনয় ডাক্তার কেমন আছে?

ও! একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল রত্না। বলল, খুব ভালো।

আরো কয়েক মিনিট ঘুরে বেড়ালাম পার্কের মধ্যে। এতদিন পর এমন অপ্রত্যাশিতভাবে আমার সঙ্গে দেখা হলো, কিন্তু তবুও কথাবার্তা বলার বিশেষ তাগিদ না দেখে মনে হলো, রত্নার মনমেজাজ বোধ হয় ভাল নেই।

রত্নাকে পৌঁছে দিলাম ওদের হাউস বোটে, দি প্যারাডাইসে। আমাকে দেখে ওর বাবা-মা খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন। পরে দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেদিন বিদায় নিয়ে চলে এলাম আমার হাউস বোটে।

মনটা কেমন চঞ্চল হয়ে গিয়েছিল, মাথাটাও কেমন যেন ঝিম ঝিম করছিল। হাত-পা ছড়িয়ে ড্রইং রুমে সোফার পর শুয়ে পড়লাম। তারিক একটু উতলা হয়ে আমার তবিয়তের খবর নিল। আমি ওকে নিশ্চিন্ত হতে বলে একটু চোখ বুজলাম। ডিনার খাবার জন্য তারিক ডেকেছিল কিন্তু আমি আর উঠিনি।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বেশ জ্বর হয়েছে। সারা দিন চুপচাপ শুয়ে কাটিয়ে দিলাম। বিকেলে কফি খেতেও বেরুলাম না। সন্ধ্যার পর ছাদে গিয়ে একটা ইজিচেয়ারে বসে চাঁদের আলোয় দূরের হরিপর্বত দেখছিলাম। ক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, টের পাইনি। কার যেন একটা ঠাণ্ডা হাত কপালে লাগতেই চমকে উঠলাম। চেয়ে দেখি রত্না।

কি ব্যাপার? তুমি?

রত্না আমার সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলল, জ্বর হয়েছে একটা খবর তো দিতে পারতেন।

একটু মুচকি হেসে রত্নার প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলাম। বললাম, তারিককে একটু ডাক দাও না, কফি খেতাম।

তারিককে একটু আমাদের বোটে পাঠিয়েছি, এখুনি আসছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই রত্নার বাবা-মা এসে হাজির। মহা ব্যস্ত হয়ে চ্যাটার্জী সাহেব আমার নাড়ী পরীক্ষা করলেন, জিভ দেখলেন, কপালে বুকে হাত দিলেন। তারপর তার ছোট্ট এ্যাটাচি থেকে কি যেন একটা হোমিওপ্যাথিক ঔষধ বের করে আমাকে খাইয়ে দিলেন।

পরের দুটি দিন মিস্টার ও মিসেস চ্যাটার্জী এসেছিলেন আমাকে দেখতে। রত্নাও এসেছিল, তবে হিসেব করে নয়। সকালে এসেছে, দুপুরে এসেছে, এসেছে সন্ধ্যায় ও রাত্তিরে। আমার তদারক করেছে, আমার সঙ্গে গল্প করেছে। দুটি দিন পরেই আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলাম, কিন্তু তবুও রত্না আসত, আসত গল্প করতে, গল্প শুনতে।

কয়েকদিন পর লক্ষ্য করলাম, রত্না কি যেন আমাকে বলতে চায় অথচ বলে না বা বলতে পারে না। একটি একটি করে দিন চলে যায়, আমার শ্রীনগরত্যাগের আগের দিন সন্ধ্যায় মিস্টার ও মিসেস চ্যাটার্জী রত্নাকে নিয়ে এলেন আমার হাউস বোটে। অনেক গল্পগুজব হলো। শেষে ওরা বিদায় নিলেন।

রত্না বলল, মা তোমরা যাও, আমি একটু পরে যাচ্ছি।

রত্না আর দেরী করেনি। সেদিন রাত্রে আমার হাউস বোটের ছাদে বসে আবছা চাঁদের আলোয় রত্না তার জীবননাট্যের নাতিদীর্ঘ অথচ ঘটনাবহুল কাহিনী শুনিয়েছিল আমাকে। নির্বাক, নিশ্চল, মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে কাহিনী শুনেছিলাম আমি।

০২.

প্রথম মাস দুই সারা লণ্ডন শহরটাকে চষে ফেলল কিন্তু তবুও কোন সুরাহা করতে পারল না অলক। পরে একদিন অপ্রত্যাশিত ভাবে পরিচয় হয় এক ইংরেজ সাংবাদিকের সঙ্গে এবং শেষে তাঁরই সাহায্যে ফুট স্ট্রীটের এক আধাখ্যাত সাপ্তাহিকের আর্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরি পায়। অলকের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ডিরেক্টরের সুপারিশে ছমাসের মধ্যে অলকের মাইনে বারো থেকে পনেরো পাউণ্ড হলো।

মাইনে বাড়ার পর অলক বাসা পাল্টাল। গোল্ডর্স গ্রীনে একটা ছোট্ট দুখানা ঘরের ফ্ল্যাট নিলো। একখানা ঘরে ষ্টুডিও হলো। বেডরুমের কোন এক কোণায় রান্নার ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু নিজের বাড়ীতে একটু আধটু চা-কফি ছাড়া আর কিছু অলক করতে পারত না। নতুন নতুন যারা দেশ থেকে যায় তারা অবশ্য এর চাইতে বেশী কিছু পারে না। দুচার মাসের মধ্যে সবাইকে রান্না-বান্না শিখে নিতে হয়। অলক সে তাগিদটুকুও বোধ করত না। সকাল বেলায় দুএক কাপ চা খেয়ে অফিস বেরুবার পথে গোল্ডর্স গ্রীন স্টেশনের পাশে একটা ইটালীয়ান রেস্তোরাঁয় হেভী ব্রেকফার্স্ট খেয়ে নিত। দুপুরে লাঞ্চের টাইমে ফ্লীট স্ট্রীটের কোন না কোন রেস্টুরেন্টে দুএকটা স্যাণ্ডউইচ আর এক কাপ কফি খেতো।

বিকেলে অফিস ছুটির পর প্রায়ই চারিং ক্রশ অবধি হেঁটে আসত। কোনদিন ষ্ট্ৰাণ্ড, কোনদিন ভিক্টোরিয়া এম্বব্যাঙ্কমেন্ট ধরে হেঁটে আসতে আসতে অলকের বেশ লাগত মানুষের ভীড় দেখতে। স্ট্র্যাণ্ডের উইণ্ডো শপিংও মন্দ লাগত না। কিছুকাল পরে যখন এসব পুরনো হয়ে গেল তখন সোজা চলে আসত নিজের ফ্ল্যাটে। নিজের স্টুডিওতে কাজ করত অনেক রাত অবধি।

ল্যাণ্ডস্কেপের চাইতে জীবন্ত মানুষের পোর্ট্রেট আঁকতেই অলকের বেশী ভাল লাগত। প্রথম দিন ইজেলের সামনে রং তুলি নিয়ে বসবার সময় ভেবেছিল সামনের ফ্ল্যাটের বৃদ্ধ ভদ্রলোকের পোর্ট্রেট আঁকবে। কিন্তু তাই কি হয়? যার স্মৃতি, যার ভালোবাসা অলকের জীবন যাত্রার একমাত্র পাথেয়, অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই কবিতারই পোর্ট্রেট আঁকল অলক। একটির পর একটি করে চার রকমের চারটি পোট্রেট আঁকল কবিতার। স্টুডিওর চার দেওয়ালে ঝুলনো হলো সেই চারটি পোর্ট্রেট। রিভলবিং একটা টুলের পর বসে অলক ঘুরে ঘুরে দেখত সে পোর্ট্রেটগুলো আর মনে মনে বলতো কবিতা, তুমি আমার কাছে নেই, পাশে নেই সত্য কিন্তু আমার জীবনের চতুর্দিকে থেকে তুমি আমার সমস্ত সত্ত্বাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছ। এই বিদেশ বিভূঁইতে শুধু তুমিই আমাকে চতুর্দিক থেকে রক্ষা করবে।

বেডরুমে একলা একলা ঘুমুতে মন টিকত না। প্রায়ই মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে যেত। ছুটে আসত স্টুডিওতে। বাকি রাতটুকু কবিতার চারটি পোর্ট্রেট দেখে কাটাত অলক।

তারপর মাস কয়েকের অক্লান্ত পরিশ্রমে কবিতার একটা লাইফ সাইজ পোর্ট্রেট তৈরী করল অলক। জীবনের এত দরদ দিয়ে, এত ভালবাসা দিয়ে মনের সমস্ত সত্ত্বা, সমস্ত মাধুরী মিশিয়ে পর পর কটি রাত জেগে পোর্ট্রেটের ফিনিশিং টাচ দিয়েছিল অলক। যে কবিতাকে নিজের জীবনে, নিজের সংসারে সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, তাকেই রং-তুলি নিয়ে বরণ করে তুলল শিল্পী অলক, প্রেমিক অলক। এই নতুন পোর্ট্রেটকে দেবীর মর্যাদা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করল নিজের বেড রুমে।

পরবর্তী কিছুকাল অফিস ছাড়া অলক বাকী সময়টুকু কাটিয়েছে কবিতার পোর্ট্রেট দেখে, তাদের সঙ্গে কথা বলে, গান গেয়ে, আর পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে। মন কিন্তু এইখানেই স্থির হতে পারেনি, সে আরো এগিয়ে গেছে। মন চেয়েছে সমস্ত কিছু দিয়ে কবিতাকে গ্রহণ করতে, তাকে প্রাণের মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে দেহের প্রতিটি সত্ত্বা, প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে গ্রহণ করতে।

মন দিয়ে, প্রাণ দিয়ে তো দুনিয়া চলে না। মনের হুকুম মেনে চললে দুনিয়াটা হয়তো আরো সুন্দর, আরো মনোরম হতো। কিন্তু তা হয়নি। হবারও নয়। অলকের সে উপলব্ধি হলে আর সহ্য করতে পারেনি, কবিতার পোর্ট্রেট ধরে হাউ হাউ করে কেঁদেছে। সারারাত্তির কেঁদেছে। সারাদিন কেঁদেছে।

বেশীদিন আর এমনি ভাবে কাটাতে পারেনি। অফিস ফেরার পথে কোনদিন বড় একটা বোতল সঙ্গে এনেছে। দেবদাসের মতো ঢক ঢক্‌ করে গিলেছে সে বিষ। মাতাল হয়ে ভুলতে চেয়েছে কবিতাকে। পারেনি। বরং আরও মনে পড়েছে। মনে পড়েছে এলাহাবাদ টেগোর সোসাইটিতে গান গাইবার কথা। কবিতা হারমোনিয়াম বাজিয়েছিল আর অলক গেয়েছিল, আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে, আমি তোমায় সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ সুরের বাঁধনে।

বোতলের শেষটুকু পর্যন্ত খেয়েছে। ভেবেছে তাল সামলাতে পারবে না। অজ্ঞান-অচৈতন্য হয়ে বাকি রাতটুকু সমস্ত অতীত স্মৃতি ভার থেকে মুক্ত থাকবে। সব হিসাব-নিকাশ উল্টে-পাল্টে গেছে।

বন্ধুহীন, প্রিয়হীন অলকের দিন এইভাবেই কাটছিল। পরে বিধাতা পুরুষের অসীম কৃপায় ডুরী লেন থিয়েটারের পাশের একটা ছোট্ট গলির মধ্যে একটা পাবে অপ্রত্যাশিতভাবে আলাপ হলো ডাঃ মুখার্জীর সঙ্গে। প্রায় প্রথম দর্শনেই অলককে ভাল লেগেছিল ডাক্তারের। ভাবভোলা উদাস নিঃসঙ্গ ব্যর্থ প্রেমিক শিল্পীকে কার না ভাল লাগবে? ডাক্তারের মধ্যে সমবেদনশীল দরদী মনের স্পর্শ পেয়ে অলক প্রায় কৃতার্থ হয়েছিল।

রোজ সম্ভব হতো না, কিন্তু প্রায়ই দুজনে মিলত। কোন দিন কোন পাবে এক জাগ বিয়ার নিয়ে, কোনদিন চিপস খেতে খেতে ভিক্টোরিয়া এম্বব্যাঙ্কমেন্টে হাঁটতে হাঁটতে, কোনদিন আবার মার্বেল আর্চের পাশে বা হাইড পার্কের কোণায় বসে বসে দুজনে গল্প করেছে, আড্ডা দিয়েছে। অলকের আহত মন ডাক্তারের ভালবাসার ছোঁয়ায় মুগ্ধ হয়েছিল। শুদু তাই নয় একদিন এক দুর্বল মুহূর্তে উজাড় করে দিয়েছিল নিজের স্মৃতি, বলেছিল কবিতাকে ভালবাসার ইতিহাস আর তার ব্যর্থতার কাহিনী।

জানো ডক্টর, বাবা নিজে ওস্তাদ ছিলেন বলে তিনি চাইতেন আমি গান শিখি, ওস্তাদ হই, তাঁর ঐতিহ্য, তাঁর ধারা রক্ষা করি। ছোট বেলায় বাবার কাছেই গান শিখেছি। সবাই বলতো আমার নাকি ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। আমার কিন্তু মন বসতো না। আমি চাইতাম ছবি আঁকতে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পরই বাবা মারা গেলেন। আর আমার গানের চর্চাও বন্ধ হলো। ভর্তি হলাম বোম্বে, জে, জে, স্কুল অফ আর্টস-এ।

সেকেণ্ড ইয়ারে পড়বার সময় মা মারা গেলেন। ছুটিতে এলাহাবাদ যাবার তাগিদ ও আকর্ষণ দুটোই কমে গেল। তাছাড়া দাদা বৌদির সংসারে আমার আসনটা ঠিক মজবুত ছিল না। আমার কাছে এলাহাবাদের একমাত্র আকর্ষণ ছিল আমার ছোট্ট ভাইঝি ময়না। দীর্ঘ দুটি বছর ওকে না দেখে মনটা বড়ই উতলা হয়ে উঠেছিল। বড় ইচ্ছে করছিল ওকে আদর করতে। তাছাড়া ও যখন খুব ছোট্ট ছিল তখন থেকেই আমার কাছে রং-তুলি নিয়ে খেলা করত, গান শিখত। ইতিমধ্যে খবর পেলাম ময়না ভীষণ অসুস্থ। ফাইন্যাল পরীক্ষা যেদিন শেষ হলো, তার পরের দিনই বোম্বে মেলে চেপে পড়লাম। এলাম এলাহাবাদ।

মাস খানেক ধরে ময়নাকে নিয়ে জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলল। তারপর ময়না ভাল হয়ে উঠল। ভেবেছিলাম বোম্বে ফিরে একটা চাকরি জোগাড় করব আর একটা ছোট্ট ষ্টুডিও খুলব। কিন্তু ময়না কিছুতেই ছাড়ল না। পৃথিবীতে শুধু ময়না ছাড়া আর কেউ আমাকে ভালবাসত না। তাই তাকে কাঁদিয়ে, তাকে প্রতারণা করে, তার ভালবাসার অপমান করে চোরের মতো পালিয়ে যেতে মন চায়নি। আমি বাধ্য হয়ে থেকে গেলাম এলাহাবাদে।

অলক থামেনি, আরো এগিয়ে গিয়েছিল। কিছু মাত্র দ্বিধা না করে, কার্পণ্য না করে তার চোখের জলের পূর্ণ ইতিহাস শুনিয়েছিল ডাক্তারকে।

…টেগোর সোসাইটি থেকে রবীন্দ্রজয়ন্তী উৎসবে অলককে গান গাইতে ধরল পাড়ার ছেলেরা। অনেক দিন চর্চা নেই বলে তাদের অনুরোধ এড়িয়ে গেল। শেষে অনুষ্ঠানের দিন অনুষ্ঠানের শেষ শিল্পীর গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে টেগোর সোসাইটির সেক্রেটারী মাইক্রোফোনে ঘোষণা করলেন, আজকের অনুষ্ঠানের শেষ শিল্পী অলক মৈত্র।

নিরুপায় হয়ে অলককে গান গাইতে হয়েছিল। হারমোনিয়াম বাজাবার অভ্যাসটা ঠিক ছিল না। তাই বিশেষ অনুরোধে সেদিনের নির্ধারিত অনুষ্ঠানের শেষ শিল্পী কবিতা বাজিয়েছিল হারমোনিয়াম। প্রথমে ভেবেছিল একটি গান গাইবে, কিন্তু শ্রোতাদের দাবী ও কবিতার অনুরোধের মর্যাদা রাখবার জন্য অলককে চার চারটি গান গাইতে হয়েছিল। শ্রোতাদের নমস্কার করে স্টেজ থেকে উঠে উইং স্ক্রীনের পাশে এসেই অলক ধন্যবাদ জানিয়েছিল কবিতাকে। আপনাকে অশেষ অশেষ ধন্যবাদ। এই আনাড়ীর সঙ্গে বাজাতে আপনার নিশ্চয়ই খুব অসুবিধা হচ্ছিল, কিন্তু তবুও যে ধৈর্য ধরে বাজিয়েছেন তার জন্য আমি সত্যই কৃতজ্ঞ।

কবিতা বলেছিল, থাক্ থাক্‌ অনেক হয়েছে। ধন্যবাদ জানাব আপনাকে।

কেন বলুন তো? কি অপরাধ করলাম?

সত্যি বলছি, চমৎকার গান গেয়েছেন। বড় ভাল লেগেছে।

ঠাট্টা করছেন?

আমাকে কি এতই অসভ্য মনে হচ্ছে যে প্রথম আলাপের সঙ্গে সঙ্গেই আপনার সঙ্গে ঠাট্টা করব।

শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো কবিতাকে একদিন ভাল করে গান শোনাবে অলক।

প্রয়াগতীর্থ এলাহাবাদের গঙ্গা-যমুনার মতো অলক আর ছোট্ট ময়নার স্নিগ্ধ শান্ত জীবনে হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে সবার অলক্ষ্যে অন্তঃসলিলা সরস্বতী এসে মিশে গেল।

জীবনের সেই পরম লগ্নে প্রথম প্রেমের উন্মাদনায় দুজনেই একটু বেহিসেবী হয়ে পড়েছিল। সমস্ত রাত্রির অন্ধকারের পর যখন প্রথম সূর্য ওঠে তখন সমস্ত রাঙিয়ে সে আত্মপ্রকাশ করে। সারা রাত্রির মৌনের পর যখন পাখীর ঘুম ভাঙে, যখন দিনের আলোর প্রথম ইঙ্গিত পায়, অনাগত সূর্য-কিরণের প্রথম স্পর্শের সামান্যতম অনুভূতি উপলব্ধি করে, তখন তার কলকাকলী সারা বিশ্বকে জাগিয়ে দেয়। একটু বেলা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের রক্তিম আভা বিদায় নেয়, পাখীদের কলকাকলীও থেমে যায়। পরিচয়ের পর্ব শেষ হবার পর যখন দুজনকে সম্যকভাবে আবিষ্কার করল, উপলব্ধি করল, তখন সে উন্মাদনা, সে আধিক্য বিদায় নিল।

খসরুবাগের পিছন দিকের বাগানে কবিতার প্রথম পোর্ট্রেট আঁকল অলক। কবিতা স্থির হয়ে বসতে পারে না বেশীক্ষণ। দশ-পনেরো মিনিট পরপরই ছটফট করে উঠত। অলক তাকে ধরে নিয়ে বসিয়ে দিত। মুখটা নড়ে গেলে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঠিক করে দিত, লম্বা বিনুনীটা আবার পেছন থেকে টেনে এনে সামনে বুকের পর ঝুলিয়ে দিতে ঠিক আগের মতো করে। আবার দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে সব কিছু ঠিক রেখেও এ্যাঙ্গেলটা ঠিক করে দিত কবিতা। একটু বকে, একটু আদর করে আবার ঠিক করে নিত অলক।

পোর্ট্রেটটা যখন শেষ হলো তখন চমকে উঠেছিল কবিতা। দুহাতে তালি বাজিয়ে বলেছিল, আঃ ওয়াণ্ডারফুল!

ভাবের বন্যায়, তৃপ্তির আনন্দে, ভালবাসার আতিশয্যে কবিতা দুহাত দিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিল অলককে। আর অলক? গঙ্গার মতো স্নিগ্ধ শান্ত অলক হঠাৎ পদ্মার মতো পাগল হয়ে উঠেছিল কবিতার প্রথম আলিঙ্গনে, কেউটে সাপের বিষের মতো ভালবাসার বিষ ঢেলেছিল কবিতার দুটি ওষ্ঠে।

মিনিট দুই পরে দুজনেরই সম্বিত ফিরে এসেছিল। দুজনেই লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিয়েছিল। লজ্জায় কারুর মুখ দিয়েই কথা বেরোয়নি বেশ কিছুক্ষণ। প্রথম নিস্তব্ধতা ভাঙ্গল অলক, কবিতা।

উঃ।

রাগ করলে?

কোন উত্তর দেয় না কবিতা। শুধু মুচকি হাসে।

অলক আবার প্রশ্ন করে, বল না কবিতা, রাগ করেছ?

কবিতা আলতো করে অলকের কাঁধে মাথা রেখে ক্ষীণকণ্ঠে বলে, উঁহু!

এরপর অলক কবিতার জীবন থেকে যেন শীতের জড়তা কেটে গেল, যেন কোন ইঙ্গিত না দিয়ে কালবৈশাখীর ঝড় উঠল দুটি প্রাণের গ্রহণ রাজ্যে! প্রায় ঝড়ের বেগে দুরন্ত বর্ষার পদ্মার মতো দুটি জীবন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চললো।

এলাহাবাদের পরিচিত মানুষের ভীড়ের মধ্যে সীমিত স্বাধীনতায় মন ভরে না। দুটি প্রাণ, দুটি মন, দুটি আত্মা অন্তহীন আকাশের তলায় দিগন্ত বিস্তৃত উন্মুক্ত প্রান্তরের স্বাধীন পরিবেশে মিলতে চায়, চায় ভালবাসার প্রয়াগতীর্থে বিলীন হয়ে যেতে।

অলক বলে, জানো ডক্টর, কামনাবৃত্তির মধ্যে ভালবাসা না থাকতে পারে, কিন্তু ভালবাসার মধ্যে নিশ্চয়ই কামনাবৃত্তি লুকিয়ে থাকে। রক্ত-মাংসের মানুষ এর উধ্বে যেতে পারে না, আমরাও পারিনি। দুজনেই সে আগুনের উত্তাপ উপলব্ধি করেছিলাম, কিন্তু ভবিষ্যতের চিন্তা করে সে আগুনে আহুতি দিতে পারিনি।

দুজনেই ঠিক করলাম, আর কিছু না হোক অন্তত লোকারণ্যের বাইরে সমাজের শ্যেন চক্ষুর আড়ালে দুজনে নিঃসঙ্গ তীর্থ যাত্রা করব, আগামী দিনের ইতিহাসের বনিয়াদ তৈরী করব। কবিতা তার অন্তরঙ্গ বন্ধু পূর্ণিমার সঙ্গে পূর্ণিমার দিল্লীবাসী, মামার কাছে যাবার অনুমতি নিল বাবা-মার কাছ থেকে। আমিও গেলাম। উদয় অস্ত ঘুরে বেড়িয়েছি দুজনে। হেসেছি, খেলেছি, আনন্দ করেছি, করেছি ভবিষ্যতের পরিকল্পনাকে পাকাঁপাকি।

পূর্ণিমার মামা গাড়ীতে করে আগ্রা-জয়পুর দেখার প্রোগ্রাম করলেন। হঠাৎ যাবার আগের দিন সন্ধ্যায় কবিতা জানাল, তার শরীর খারাপ। মামা প্রোগ্রাম বাতিল করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কবিতা বলেছে, তা হয় না মামা। মামা বার বার আপত্তি করেছেন, কবিতাও বার বারই প্রতিবাদ করেছে। শেষে মামা মামীমাকে রেখে যেতে চেয়েছেন, কিন্তু তখন পূর্ণিমা বলেছে, না মামা, তা হয় না। মামী না গেলে আমিও যাব না। মামা ঠিক রাজী হতে পারেন নি, কিন্তু পূর্ণিমা বলেছে, দুটো দিন আমাদের ছাড়া থাকলে কবিতা উড়ে যাবে না। কেশ থাকতে পারবে তাছাড়া বুড়ো রামনাথ তো রইলো।

মামা-মামী পূর্ণিমা রওনা হবার পরই কবিতার শরীর ঠিক হয়ে গেল। কবিতাকে নিয়ে সেদিন আমি গেলাম রিজ-এ। অনেক গল্প, অনেক গান হলো, ভবিষ্যত নিয়েও অনেক আলোচনা হলো। স্থির হলো, এবার এলাহাবাদ ফিরে যাবার কিছুদিনের মধ্যেই দুটি জীবন একই গ্রন্থীতে বাঁধবার ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর দুজনে চলে যাব বম্বে, খুলব ষ্টুডিও।

কিছু পরে কবিতাকে একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড় করালাম। আর আমি রং-তুলি দিয়ে প্রাণহীন ক্যানভাসে আমার মনের প্রতিমাকে গড়ে তুলতে শুরু করলাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মোটামুটি স্কেচটা করে নিলাম। কবিতা আর স্থির থাকতে পারল না। আমার সঙ্গে ঠাট্টা করতে করতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। আমি অনেকবার বারণ করলাম, কবিতা, এতে হুড়োহুড়ি কোরো না। হঠাৎ কোন পাথরে চোট লেগে যাবে। আমি যত বারণ করি, আমাকে রাগাবার জন্য ও তত বেশি দৌড়াদৌড়ি করে। শেষে হঠাৎ একবার একটা গোল পাথরের পর পা পড়া মাত্র কবিতা ছিটকে গড়িয়ে পড়ল অনেকটা দূরে। মনে পড়ে ওর শুধু একটা বিকট চীৎকার শুনেছিলাম। আমি দৌড়ে লাফিয়ে গেলাম ওর পাশে। দেখি আধা-শুকনো মোটা ডালে খোঁচা খেয়ে হাত পা রক্তারক্তি হয়েছে। চীৎকার করে ডাক দিলাম, কবিতা?

কোন সাড়া পেলাম না। মুহূর্তের জন্য আমার সমস্ত কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেল, মনে হলো মাটিটা কাঁপছে, চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো, কবিতাকে বাঁচাতে হবে। ওর মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে একটু ভাল করে নজর করতে দেখলাম জ্ঞান নেই। আর দেখলাম সারাটা কাপড় রক্তে ভিজে উঠেছে। দুএক মিনিটের মধ্যেই আবিষ্কার করলাম একটা মোটা ডাল ওর উরুতে কয়েক ইঞ্চি ঢুকে গেছে আর সেখান দিয়ে রক্ত বইছে।

অলক সেদিনের ভয়াবহ স্মৃতির কথা স্মরণ করে ভয়ে-আতঙ্কে শিউরে উঠল। ডাক্তারের হাতটা চেপে ধরে বলল, আমি আর বিন্দু মাত্র দ্বিধা না করে ডালটাকে টেনে বের করলাম। ওর শাড়ীর আঁচল ছিঁড়ে ওখানে একটা ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিলাম।

ডাক্তার এতক্ষণ মুখ বুজে শুধু শুনছিল। এবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর?

তারপর ওকে নিয়ে গেলাম দিল্লীর উইলিংডন হাসপাতালে। এমার্জেন্সীতে নেবার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তাররা দল বেঁধে ঢুকল অপারেশন থিয়েটারে। অনেকক্ষণ ধরে অপারেশন হলো। সতেরোটা ষ্টিচ করতে হয়েছিল।

ডাক্তার মুখার্জী একটু চমকে উঠলেন, ভ্রূ দুটোও কুঁচকে উঠল।

অলক বলল, শুধু শুনেই ঘাবড়ে যাচ্ছো ডক্টর! আর ভেবে দেখো তো আমার সেদিনের অবস্থা।

অলকের চোখের পর থেকে ডাক্তার দৃষ্টিটা একটু ঘুরিয়ে নিল। মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে গিয়ে কি যেন চিন্তা করে নিল।

অলক বলেছিল, তারপরের কাহিনী বিস্তারিতভাবে বলে লাভ নেই। শুধু জেনে রাখ, পূর্ণিমা আর মামা-মামীমার অসীম কৃপায় কবিতা ভাল হয়ে উঠল আর আমরা দুজনেই অনেক অপমানের হাত থেকে রক্ষা পেলাম! কবিতা যখন এলাহাবাদ ফিরে গেল, তখন ও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে। দিল্লীর রিজ-এর কাহিনী, অপারেশনের খবর কেউ জানল না। পূর্ণিমা আর ওর মামা-মামী ছাড়া কবিতার অপারেশনের খবর আজো কেউ জানে না।

পৃথিবীর অসংখ্য প্রেমের কাহিনীর মতো অলক-কবিতার প্রেম বাস্তবে সাফল্য লাভ করেনি। একটা সামান্য আর্টিষ্টের সঙ্গে যে কবিতার বিয়ে হওয়া অসম্ভব, সে কথা অলককে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন ওর বাবা, দাদা। এতদিন যে কথা, যে কাহিনী এলাহাবাদের কেউ জানত না, হঠাৎ এতদিন পরে সে কাহিনী জর্জ টাউন, টেগোর টাউন, কটরা, সিভিল লাইন্সের সব বাঙ্গালী মহলে ছড়িয়ে পড়ল।

কবিতা-বিহীন জীবনে অলক সহ্য করতে পারেনি এই অপমানের ঝড়। একদিন গভীর রাতে ময়না ঘুমিয়ে পড়ার পর অলক দেশত্যাগী হলো।

জানো ডাক্তার, আর একবার দিল্লী দেখতে ভীষণ ইচ্ছা করল। তাই সব চাইতে প্রথম এলাম সেখানে। রিজ-এর চারপাশে, উইলিংডন হাসপাতালের পাশে-পাশে ঘোরাঘুরি করে কিছুটা চোখের জল ফেলে কবিতার উদ্দেশ্যে আমার শ্রদ্ধা জানালাম, তার ভালবাসার স্মৃতি রোমন্থন করে অনেক দুঃখের মধ্যেও নতুন করে বাঁচার প্রেরণা পেলাম। শেষ দিন পূর্ণিমার মামা-মামীকে প্রণাম করে ভারতবর্ষ থেকে বিদায় নিলাম।

অলকের চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল। গলার স্বরটা অস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তবুও থামল না।

মা, ময়না আর কবিতা এই তিন জনের তিনটি ছবি আর মাত্র দশটি পাউণ্ড সম্বল করে চড়ে পড়লাম প্লেনে। এলাম তেহেরান। তেহেরান থেকে বাগদাদ, বাগদাদ থেকে কায়রো, কায়রো থেকে আথেন্স, তারপর রোম, জুরিখ, জেনেভা, ফ্রাঙ্কফার্ট, প্যারিস ও সব শেষে এই হতচ্ছাড়ার দেশে। নমাস ধরে ঘুরেছি এইসব দেশে। যে কবিতাকে আমি পেলাম না আমার জীবনে, সেই কবিতার অসংখ্য পোর্ট্রেট এঁকেছি। জীবন ধারণের জন্য সামান্য কিছু পয়সার বিনিময়ে সে সব পোর্ট্রেট দিয়ে এসেছি ঐসব দেশের সম্ভ্রান্ত মানুষের হাতে। আমার ঘরে আমি কবিতাকে কোন মর্যাদা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলাম না, তাইতো মর্যাদার সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠা করে এলাম অসংখ্য মানুষের সংসারে।

প্রায় হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল অলক। তবুও বেশ খানিকটা সামলে নিয়ে বলল, এখানে এসেও কবিতার পোর্ট্রেট একেছি; একটি নয় দুটি নয়, অনেকগুলি। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে আজ আর তার পোর্ট্রেটগুলো কাউকে দিতে পারব না।

একটু চুপ করল অলক। শেষে বলল, ভাই ডক্টর, এই দেশেও আমার মন টিকছে না। কয়েকদিনের মধ্যেই ইমিগ্রেশন নিয়ে কানাডা চলে যাচ্ছি। ডাক্তার মুখার্জীর হাতটা চেপে ধরে বলল, ডক্টর, বোধহয় তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি। এ ফাঁদে আমি আর পা দেবো না। তাই তোমার সঙ্গেও আর বিশেষ যোগাযোগ রাখব না বা রাখতে পারব না। তবে কানাডা যাবার আগে তোমার হাতে আমার কবিতার পোর্ট্রেটগুলো দিয়ে যাব। একটু মর্যাদার সঙ্গে ওগুলো রক্ষা কোরো।

এবার ডাক্তারকে জড়িয়ে ধরল। বলল, আর একটা শেষ অনুরোধ আছে তোমার কাছে। যদি কোনদিন কবিতার দেখা পাও বোলো, আমি আজও ভুলতে পারিনি তাকে। বোলো, আজও বোধহয় আমি তাকে ভালবাসি। সে আর তার স্বামী যেন আমাকে ক্ষমা করে। ডক্টর! আর যদি কোনদিন কোন কারণে সুযোগ আসে তবে আমার ময়নার একটু খোঁজ কোরো, একটু আদর কোরো আমার হয়ে।

ডাক্তার আর অলক দুজনেই চোখের জল মুছতে মুছতে বিদায় নিল সে রাত্রে। দিন তিনেক পরে অলক তার গোল্ডর্স গ্রীনের ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছিল ডাক্তারকে। কবিতার পোর্ট্রেটগুলো দেখে ডাক্তার যেন ভূত দেখার মতো আঁতকে চমকে উঠেছিল। অলক জিজ্ঞাসা করেছিল, কি হলো ডক্টর?

কোনমতে সামলে নিয়ে ডাক্তার জবাব দিল, না, কিছু না। এত গুলো সুন্দর পোর্ট্রেট দেখে চমকে না উঠে কি করি বলুন!

পোর্ট্রেটগুলো নেবার আগে ডাক্তার শুধু জিজ্ঞাসা করেছিল আচ্ছা ধরুন, যদি কোনদিন আপনার কবিতার দেখা পাই, আর তাকে যদি একটা পোর্ট্রেট দিতে হয়, তবে কোনটা দিলে আপনি সুখী হবেন?

ডক্টর, যদি কোনদিন কবিতার দেখা পাও তবে সে ভারটা তাকেই নিতে বোলো।

ডাক্তার মুখাজী ধীর পদক্ষেপে প্রস্থান করলেন।

অলক তাঁর শূন্য মন্দিরে ফিরে এসে প্রায় উন্মাদের মতো চীৎকার করে কেঁদে উঠল।

০৩.

জানেন বাচ্চুদা, আপনার বিনয় ডাক্তার আমার অতগুলো পোট্রেট নিয়ে আসতেই হঠাৎ আমার মাথায় বজ্রাঘাত হলো। অতীত বর্তমানের সমস্ত স্মৃতি যেন আমাকে উন্মাদ করে তুলল। সেদিন যে কিভাবে নিজেকে সংযত রেখেছিলাম, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন, আর কেউ না।

অনেক রাত হয়েছিল। হাউস বোটের ছাদে বেশ ঠাণ্ডা লাগছিল। কিন্তু তবুও দুজনের কেউই নড়তে পারলাম না।

রত্না আঁচল দিয়ে আর একবার চোখের জল মুছে নিল। বলল, আপনার ডাক্তার বিন্দুমাত্র উত্তেজনা প্রকাশ করল না। কিন্তু দিন কতক আগে আমার উরুর অপারেশন নিয়ে আলাপ-আলোচনা আর সেদিনের পোর্ট্রেট আনার সঙ্গে আমার চোখের সামনে সব কিছু স্পষ্ট হয়ে উঠল। যথারীতি ডিনার খেতে বসলাম দুজনে। আমার গলা দিয়ে কিছু নামতে চাইছিল না। ডাক্তার কিন্তু অন্য দিনের চাইতে সেদিন অনেক বেশী খেয়েছিল। অন্য দিন একটার বেশী ফিশ ফ্রাই খায় না, সেদিন আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য তিন তিনটে খেলো। দুবার করে ভাত আর মাছ চেয়ে নিল।

রত্নার গলা দিয়ে আর স্বর বেরুচ্ছিল না। আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম কিন্তু তবুও ওঁকে কিছু বলতে পারলাম না।

এক কাশল, একটু চোখের জল মুছে নিয়ে আবার শুরু করল, আজ আর আপনার কাছে কিছু গোপন করব না। সব কিছু বলে কিছুটা হালকা হতে চাই।

রত্নার মন হাল্কা হয়েছিল কিনা জানিনা। তবে বলেছিল, ডাক্তার সে রাত্রে ওকে অনেক আদর করেছিল, ভালবাসায় ডুবিয়ে দিয়েছিল। সমস্ত মন প্রাণ নিয়ে চরম আনন্দ দিতেও কার্পণ্য করেনি। তারপর দু’হাত দিয়ে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

রত্নার চোখে অনেকক্ষণ ঘুম আসেনি। কিন্তু বিধাতা পুরুষের বিধান কে খণ্ডাবে। শেষ রাত্রিরের দিকে সর্বনাশা ঘুম তাকে গ্রাস করল।

অন্য দিনের চাইতে পরের দিন অনেক বেলায় ঘুম ভাঙল রত্নার। হাসপাতালে ডাক্তারের ডিউটি আটটা থেকে। সাড়ে সাতটার মধ্যে ব্রেকফার্স্ট খেয়ে রওনা হয়। ঘড়িতে সাড়ে আটটা বাজে দেখে চমকে উঠল রত্না। কিন্তু ডাক্তারকে তখনো ঘুমিয়ে থাকতে দেখে হঠাৎ যেন আঁতকে উঠল!

রত্না আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, বাচ্চুদা, একটু পরে একটু নাড়া চাড়া করতেই দেখলাম সব কিছু শেষ। পাশে দেখি স্লিপিং পিলের দুটো খালি শিশি পড়ে আছে। বালিশের তলায় একটা চিঠি পেয়েছিলাম……

রত্না, আমি যাচ্ছি, দুঃখ কোনো না। তোমাকে আমি ভালবেসেছি, কিন্তু সে ভালবাসা স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসা। তার বেশী কিছু নয়। তুমি যাঁর কবিতা, সেই অলক আর তোমার সারা মনকে বঞ্চনা করে রত্নাকে উপভোগ করার কোন অধিকার আমার নেই।
রত্না, আমি যাচ্ছি, আবার তোমার কাছে ফিরে আসব। তবে আগামী জন্মে নয়। আগামী জন্মে তুমি নিশ্চয়ই অলককে পাবে। তার পরের জন্মে আমি আসব তোমার কাছে।

আমার জন্য তুমি চোখের জল ফেলো না। আমি তো তবুও কটি বছর তোমার ভালবাসা পেয়েছি, তোমাকে উপভোগ করেছি, সুখে দুঃখে তোমাকে পাশে পেয়েছি। দুঃখ হয় সেই সর্বত্যাগী শিল্পীর জন্য, যে তোমার ভালবাসার জ্বালা বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা পৃথিবীময় আর শুধু তোমার ছবি এঁকে দিন কাটাচ্ছে।

আর হ্যাঁ, অলক যাবার আগে আমাকে দুটি বিশেষ অনুরোধ করেছিল। তার একটি আমি রক্ষা করার সময় পেলাম না। ওর বড় আদরের ময়নাকে একটু দেখো আর অলকের হয়ে একটু আদর কোরো।
ভগবান তোমার সহায় হোন।
তোমার বিনয়

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত