জাকার্তা থেকে বদলী হলাম পিকিং

জাকার্তা থেকে বদলী হলাম পিকিং

জাকার্তা থেকে বদলী হলাম পিকিং। মধ্যে তিন মাসের ছুটি। কিন্তু পিকিং দিল্লীর রাজনৈতিক মহাকাশে তখন কালবৈশাখীর ইঙ্গিত দেখা দিয়েছে। তিন মাসের হোমলিভ পাব কি না, সে বিষয়ে আমার বেশ সন্দেহ ছিল, কিন্তু তাই বলে পুরো ছুটিটাই বাতিল হবে, তা ভাবিনি। কলকাতায় কিছুদিন হৈ চৈ করে কাটাব বলে বন্ধু বান্ধবদের চিঠিপত্রও দিয়েছিলাম। মাসিমাকেও লিখেছিলাম। বেশ খোশ মেজাজেই ছিলাম। —

থার্ড সেক্রেটারী রঙ্গনাথন বিয়ে করে সবে জাকার্তা এসেছে। এম্বাসীর আমরা সবাই ওদের দুজনের অনারে বোগরে একটা প্রোগ্রাম ঠিক করলাম। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাটাচি কাপুর চাঁদা তোলা শুরু করে দিল, প্রেস অ্যাটাচি মুখার্জী আর মিসেস মুখার্জী চিত্রাঙ্গদার সিলেকটেড সিনের রিহার্সাল আরম্ভ করে দিলেন। ভাইস-কন্সাল যোশী বোগরের সব ব্যবস্থার ভার নিল।

দুসপ্তাহ প্রস্তুতির পর সেই শনিবার এলো। সকাল সাতটায় চানসেরার বিল্ডিং থেকে আমাদের কনভয় রওনা হলো। কেনি দুর্ঘটনার জন্য নয়, আনন্দের আতিশয্যে আধঘন্টার রাস্তা যেতে আড়াই ঘণ্টা লাগল। পথে কনভয় থামিয়ে কাপুর ও জন চারেক ভাংড়া ডান্স দেখাল, রঙ্গনাথন ও মিসেস রঙ্গনাথনকে দিয়ে এক লাভসিনের শট তুলল সিনহা তার মুভিতে এবং আরো অনেক কিছু হলো।

বোগরের ঐতিহাসিক বোটানিক্যাল গার্ডেনে পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে ভাইস-কন্সাল যোশী যা খেল দেখাল, তা ভোলবার নয়। তিনজন স্টাফকে এয়ার-আর্মি-নেভাল এ-ডি-সি সাজিয়ে রিসিভ করল মিঃ ও মিসেস রঙ্গনাথনকে, একদল স্কাউট ছেলে-মেয়েদের দিয়ে গার্ড অব অনার প্রেজেন্ট করল, টেপরেকর্ডার বাজিয়ে মিলিটারী ব্যাণ্ডে জাতীয় সঙ্গীত শোনাল এবং সবশেষে নিজে মাথায় একটা গান্ধীটুপি চাপিয়ে ভারত সরকার ও ভারতবাসীর পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানিয়ে একটা বক্তৃতাও দিল। জনচারেক সেকেণ্ড ও থার্ড সেক্রেটারী অভিজ্ঞ টেলিভিশন ক্যামেরাম্যানদের মতো ছোটাছুটি করে অনুষ্ঠানটির মুভি তুলল।

দুপুরের ভোজনপর্বটাও বিচিত্র হলো। দক্ষিণ ভারতীয় মশালা দোসার সঙ্গে সম্বর এলো না, এলো বাঙালীদের মাছের ঝাল, পুরীর সঙ্গে এলো গুজরাটীদের ব্যাসনের ভাজা, পোলাও এলো সম্বরের সঙ্গে এবং এমনি মজাদার আরো অনেক কিছু। অপরাহ্নকালীন চায়ের পর শুরু হলো চিত্রাঙ্গদা। প্রথম দৃশ্য অভিনয় সবে শুরু হয়েছে এমন সময় অপ্রত্যাশিতভাবে সিংহল ও ইউ-এ-আর অ্যাম্বাসাডরদেয় নিয়ে আমাদের অ্যাম্বাসাডর হাজির। যোশী কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তিনজন এডিসি হাজির করল, স্কাউটদের আবার টেনে এনে লাইন করে দাঁড় করাল। আবার রিসেপশন, গার্ড অব অনার, আবার টেপ রেকর্ডারে ন্যাশনাল অ্যানথেম বাজানো হলো। যোশী আবার গান্ধী টুপি চাপিয়ে একটা সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দিয়ে তিনজন রাষ্ট্রদূতকে অভ্যর্থনা জানিয়ে আমাদের কৃতজ্ঞতা জানালেন।

চিত্রাঙ্গদা অভিনয় শেষ হলো। হঠাৎ কোথা থেকে অকস্মাৎ হাজির হলো পাকিস্তান অ্যাম্বাসীর দুজন সেকেণ্ড সেক্রেটারী মনসুর আলি আর রহমান।

মনসুর আলি গাইল একটা গজল, রহমান আবৃত্তি করে শোনাল কতকগুলি উর্দু শের।

তিনজন রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে মিসেস রঙ্গনাথনকে একটা পোর্টেবল টেলিভিশন সেট প্রেজেন্ট করলেন ইউ-এ-আর অ্যাম্বাসাডর, স্কাউটদের আপ্যায়নের আমন্ত্রণ জানালেন আমাদের রাষ্ট্রদূত এবং চিত্রাঙ্গদা অর্জুনের অনারে সিংহলের রাষ্ট্রদূত একটা ডিনারে আমন্ত্রণ জানালেন উপস্থিত সবাইকে।

সূর্য অস্ত গেল। বোগরের মালভূমিতে বেশ আমেজি ঠাণ্ডা হাওয়ার স্পর্শে সারাদিনের ক্লান্তি বিদায় নিল। আমাদের কনভয় আবার ফিরে এলো জাকার্তা।

পরের দিন সকালে অফিসে যেতেই রাষ্ট্রদূত ডেকে পাঠালেন।

গুড মর্নিং স্যার।

মর্নিং।

হাতে একটা রেডিও মেসেজ দিলেন!…ইনসট্রাক্ট ফার্স্ট সেক্রেটারী তাপস সেন প্রসিড পিকিং ডাইরেক্টলি স্টপ নো হোমলিভ বাট ওয়ান উইকস্ প্রিপারেটরী লিভ গ্রানটেড।…কোথায় তিন মাসের ছুটিতে কলকাতায় আনন্দ করব, তা নয়তো, তার পরিবর্তে মাত্র এক সপ্তাহের ছুটি!

অ্যাম্বাসাডর বললেন, আই অ্যাম স্যরি সেন। তুমি বলবার পর আমি নিজে ফরেন সেক্রেটারীকে একটা রেডিও মেসেজ পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তাতেও কিছু হলো না।

একটু থামলেন। আবার বললেন, পিকিং গিয়ে নিজের কাজকর্ম গুছিয়ে নেবার পর ছুটি নিয়ে একবার কলকাতায় ঘুরে এসো।

অ্যাম্বাসাডরকে আমি ধন্যবাদ জানালাম।

অ্যাম্বাসাডর বললেন, অনেক মিশনে অনেককে নিয়েই আমি কাজ করেছি, কিন্তু তোমার মতো সহকর্মী আমি বেশী পাইনি। ইনফ্যাক্ট তোমার মতো কলিগ পাবার জন্য নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। ইন এনি কেস, যে-কোন প্রয়োজনে তুমি আমাকে মনে করলে আমি সুখী হবে। তাছাড়া সামনের বছর তো আমি নিজেই মিনিস্ক্রীতে ফিরে যাব, তখন নিঃসঙ্কোচে তুমি আমাকে তোমার সুবিধা-অসুবিধার কথা জানালে আমি নিশ্চয়ই তোমাকে সাহায্য করতে পারব।

আমি মাথা নিচু করে সব শুনলাম। আরেকবার রাষ্ট্রদূত চতুর্বেদীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

দুটি সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমার বিদায় সংবর্ধনার পালা শুরু হলো। আমি ব্যাচিলার বলে সর্ব প্রথম সংবর্ধনা জানাল ইণ্ডিয়ান অ্যাম্বাসী ব্যাচিলার্স ইণ্ডিয়ান-এর তরফ থেকে। ইউনিয়নের তরফ থেকে ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত শিল্পী রেজাদ মহম্মদের আঁকা একটা অপূর্ব সুন্দরী চীনা মেয়ের পেন্টিং আমাকে উপহার দেওয়া হলো। এই আশা নিয়ে ব্যাচিলান ইউনিয়ন আমাকে এই উপহার দিয়েছিল– এই চীনা সুন্দরী আমার কৌমার্যকে চীনে অটুট রাখতে অনুপ্রাণিত করবে। চমৎকার!

পরবর্তী অনুষ্ঠানে মেয়েরা আমাকে বিদায় সংবর্ধনা জানালেন। তারপর স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন, ডিপ্লোম্যাটিক স্টাফরা এবং সবশেষে অ্যাম্বাসাডর চতুর্বেদী বেশ জাঁকজমকভাবে আমাকে বিদায় সংবর্ধনা জানালেন। ইন্দোনেশিয়ার ডেপুটি ফরেন মিনিস্টার ছাড়াও এশিয়া আফ্রিকা গোষ্ঠীর জন পাঁচ-ছয় রাষ্ট্রদূত ও নানা দেশের কয়েক ডজন সিনিয়ার ডিপ্লোম্যাট এই পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন।

তারপর একদিন সকালে সত্যিই আমি জাকার্তার মাটি ছেড়ে পাড়ি দিলাম সিঙ্গাপুর।

সিঙ্গাপুর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল আগেই বুক করা ছিল। পারা লেবার এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের কমিশনের মিঃ রাও-এর সঙ্গে হোটেলে এসেই আবার বেরিয়ে পড়লাম বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা করতে।

আমরা একদল মিলে গেলাম সিঙ্গাপুরের অতি খ্যাত নাইটক্লাব –সিভিউ হোটেলের চিকেন ইন-এ। পরের দিন কিছু মার্কেটিং করলাম। ন্যাশনাল মিউজিয়মের ধার থেকে কিছু চামড়ার জিনিস কিনে হাই স্ট্রীট-অৰ্চার্ড স্ট্রীট থেকে কিছু জামা-কাপড় ও একটা ভাল জাপানী ট্রানজিসটার রেডিও কিনে হোটেলে ফিরলাম লাঞ্চের সময়। তারপর লাঞ্চ খেয়েই রওনা হলাম এয়ারপোর্ট। এলাম হংকং।

কাইতাক এয়ারপোর্টে আমার পুরনো সহকর্মী ইন্দ্রজিত সিং-এর হাতে কতকগুলি জরুরী সরকারী কাগজপত্র পেলাম। পিকিং যাবার আগে দিল্লী থেকে জয়েন্ট সেক্রেটারী কতকগুলি কথা জানিয়েছেন। মাসিমারও একটা চিঠি এসেছিল ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে। মাসিমার চিঠিতে জানলাম লীনার ছেলে হয়েছে।

পরের দিন ভোরে উঠেই রওনা হলাম চীন-হংকং সীমান্তের দিকে। সীমান্ত পার হলাম। ওপারে গিয়ে ট্রেনে চড়ে গেলাম ক্যান্টন; তারপর প্লেনে পিকিং।

চারটি বছর প্রায় দুঃস্বপ্নের মতো কেটে গেল। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত একটা অব্যক্ত চাপা উত্তেজনার মধ্যে কাটত আমাদের সবার। ছুটি তো দুরের কথা, একটি দিনের জন্যও বিশ্রাম করার অবকাশ পাইনি। প্রতিদিনই একটা না একটা গুরুতর সমস্যা নিয়ে কেটেছে পিকিং-এর দিনগুলি।

শেষে আমার পিকিংবাসের পালাও একদিন শেষ হলো। বদলী হলাম করাচী। দিল্লীতে আমার এক বন্ধু সেক্রেটারীকে লিখলাম, কি ব্যাপার? আমাকে এক ট্রাবলস্পট থেকে আর এক ট্রাবলস্পটে কেন বদলী করা হচ্ছে? উত্তর এলো, সাউথ ব্লকের সারা ফরেন মিনিষ্ট্ৰীতে নাকি কৃতী ডিপ্লোম্যাট বলে আমার খুব সুনাম এবং সেজন্যই জার্কাতা থেকে পিকিং, পিকিং থেকে করাচী।

তবে পিকিং থেকে করাচী যাবার পথে একমাসের ছুটি জুটেছিল আমার অদৃষ্টে! মাসিমার চিকিৎসার একটু সুব্যবস্থা করতে না করতেই আমার ছুটি শেষ হয়ে এলো। কয়েকদিন পরে রওনা হলাম দিল্লী। দিন চার-পাঁচ ফরেন মিনিস্ক্রীতে আলাপ-আলোচনা করার পর চলে গেলাম করাচী।

সরকারী কাজ-কর্মে যথেষ্ট বিড়ম্বনা ভোগ করতে হলেও করাচীর দিনগুলো মোটামুটি ভালই কাটছিল। পাকিস্তানের ফরেন সার্ভিসে অনেক বাঙালী আছেন। পাকিস্তান রেডিওতেও বাঙালীর সংখ্যা কম নয়। এদের অনেকের সঙ্গেই বেশ একটা হৃদ্যতার সূত্র গড়ে উঠেছিল। প্রত্যেক শনিবার সন্ধ্যাবেলায় মনসুর আলির বৈঠকখানায় গানের আসর বসত। মনসুরের ভাটিয়ালী, মিসেস খাতুনের রবীন্দ্র সঙ্গীত, আমাদের হাই কমিশনের মিঃ রায়ের মেয়ে বন্দনার অতুল প্রসাদ-নজরুলের গান শেষ হতে না হতেই মনসুরের মা ডাক দিতেন, এসো বাবা, খাবার-দাবার সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ওদের ওখানে সরষে বাটা দিয়ে যে ইলিশমাছের ঝাল খেয়েছি, তা জীবনে ভুলব না। রবিবার দিন আড্ডা বসতো মিঃ রায়ের বাড়ি। শুরু হত তেলেভাজা চা দিয়ে, শেষ হতো বিয়ে বাড়ির মেনু দিয়ে।

বছর খানেক বাদে ছুটির আবেদন করলাম। আবেদন মঞ্জুর হলো। তিন মাসের ছুটিতে আমি কলকাতা গেলাম।

মাস দেড়েক বেশ কেটে গেল। খবরের কাগজের খবর পড়ে বেশ বুঝতে পারছিলাম, করাচীর হাওয়া বদলে গেছে। বেশ অনুমান করতে পারছিলাম মনসুর আলির বাড়ির সাপ্তাহিক গানের আসর বন্ধ হয়েছে, রবিবার মিঃ রায়ের ড্রইংরুমে আর আড্ডা জমছে না। তারপর একদিন কাগজে দেখলাম, পাকিস্তান সিকিউরিটি কাউন্সিলে কাশ্মীর সমস্যা আলোচনার জন্য সরকারীভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। দুদিন বাদেই দিল্লী থেকে জয়েন্ট সেক্রেটারীর নিমন্ত্রণপত্র পেলাম, তাড়াতাড়ি দিল্লী এসো। ইণ্ডিয়ান ডেলিগেশনের সদস্য হয়ে সিকিউরিটি কাউন্সিলে যেতে হবে।

একটি দিনের মধ্যেই কলকাতার পাট চুকিয়ে দিলাম। পরের দিন সকালের ফ্লাইটে গেলাম দিল্লী। এক সপ্তাহ ধরে আলাপ আলোচনা শলা-পরামর্শের পর গেলাম করাচী। ইণ্ডিয়ান ডেলিগেশন সোজা চলে গেল নিউইয়র্ক। ঠিক হয়েছিল করাচীতে কাগজপত্র ঠিকঠাক করেই আমিও সোজা নিউইয়র্ক যাব।

দিল্লীতে ঠিক হয়েছিল আমি দুদিনের মধ্যে করাচীর কাজ শেষ করব এবং বুধবার সন্ধ্যার প্লেনে বম্বে গিয়ে রাত্রেই এয়ার ইণ্ডিয়া ফ্লাইটে লণ্ডন রওনা হব। কিন্তু করাচীর পরিস্থিতি এমনই জটিল হয়ে উঠেছিল যে, রবিবার কেন, সোমবার-মঙ্গলবারের রিজার্ভেশনও বাতিল করতে হলো। শেষ পর্যন্ত বম্বে হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও বাতিল করতে বাধ্য হলাম। স্থির হলো বুধবার মাঝরাতে প্যান-আমেরিকান ফ্লাইটে লণ্ডন যাব এবং শুক্রবার সকালে এয়ার ইণ্ডিয়ার ফ্লাইটে নিউইয়র্ক।

এয়ারপোর্টে এসে কাস্টমস পাশপোর্ট চেক করিয়ে আমাকে ট্রানজিট লাউঞ্জের একপাশে বসানো হলো। একটু দূরে একজন পুলিশ অফিসারকে একটু অন্যমনস্ক হয়ে সিগারেট খেতে দেখলাম। বুঝতে কষ্ট হলো না, আমার প্রতি নজর রাখার জন্যই প্রভুর আবির্ভাব। করাচীর আগে প্যান-আমেরিকানের এই প্লেনটি কলকাতায় থেমেছিল। কিন্তু ট্রানজিট লাউঞ্জে একজনও কলকাতার প্যাসেঞ্জার দেখতে পেলাম না। বুঝলাম, কলকাতার যাত্রীরা বিমান থেকে নামার অনুমতি পাননি।

প্লেনের ডিপারচার অ্যানাউন্সমেন্ট হলে এয়ার লাইন্সের একজন গ্রাউণ্ডস্টাফ আমাকে সর্বাগ্রে প্লেনে যেতে বললেন। ইঙ্গিত বুঝতে কষ্ট হলো না। সামনের সিঁড়ি বেয়ে কেবিনে ঢুকে দেখলাম পূর্বের পুলিশ অফিসারটি আগে থেকেই আমাকে অভ্যর্থনা কবার জন্য সেখানে উপস্থিত।

কেবিনে আমি ছাড়া আর মাত্র দুজন প্যাসেঞ্জার ছিলেন। চীফ স্টুয়ার্টকে বলে আমি আমার নির্দিষ্ট সীটটি ছেড়ে একেবারে পিছনের সারির ধারের সীটটিতে বসলাম।

কেমন যেন আনমনা হয়েছিলাম কিছুক্ষণের জন্য। নানা চিন্তায় টেরই পাইনি কখন প্লেন ছেড়েছে, কখন আরব সাগরের উপর দিয়ে বেইরুটের দিকে ভেসে চলেছে আমাদের বিমান। আবছা আলোয় হঠাৎ একটা শিশুকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে আমার যেন সংবিৎ ফিরে এলো। কিছুক্ষণ শিশুটিকে আপন মনে ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। আরও কিছু সময় কেটে গেল। তারপর আস্তে তুড়ি দিয়ে বাচ্চাটিকে ডাক দিলাম! রাত্রির নিস্তব্ধতায় আমার প্রায় নীরব নিমন্ত্রণে শিশুটির ঈষৎ চাঞ্চল্য বন্ধ হলো। একটু দ্বিধা, একটু সঙ্কোচে সে আমার থেকে একটু দূরে থমকে দাঁড়াল! কয়েক মিনিট দুজনেই দুজনকে দেখলাম। আরো দুচার মিনিট কেটে গেল। আমি ধীরে একটু এগিয়ে গেলাম। ভাল করে দেখলাম। বেশ ভাল লাগল। মনে হলো পশ্চিম পাকিস্তানেরই হবে; তা নয়তো এত ফর্সা, এত সুন্দর হয় কি!

অতি সন্তর্পণে আমি শিশুটির একটি হাত ধরলাম। প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমারে কিয়া নাম হ্যায় বেটা?

কেমন যেন বিস্ময়ের সঙ্গে মোটা মোটা বড় বড় চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে তাকাল।

মিনিট খানেক বাদে আমি আর-একবার জিজ্ঞাসা করলাম, বেটা তুমারা নাম বাতাও!

কয়েক মুহূর্ত পরে ধীরে ধীরে শিশুটি আধো-আধো স্বরে আমাকে চমকে দিয়ে বলল, আপনি কি বলছেন?

এই কদিনে করাচী আমার মনটাকে তিক্ত করে দিয়েছিল। সিকিউরিটি কাউন্সিলের আগামী দিনগুলির চিন্তায় মন কম উদ্বিগ্ন ছিল না। মাঝরাতে প্লেনের মধ্যে এই শিশুটির কচি মুখে বাংলা কথা শুনে যেন একটা দমকা হাওয়ায় মনের মালিন্য সব ধুয়ে-মুছে গেল। হাসির রেখা ফুটে উঠল আমার মুখে।

হাত ধরে আদর করে কাছে টেনে নিলাম শিশুটিকে। জিজ্ঞাসা করলাম, কি নাম তোমার?

উজ্জ্বল দুটি মিষ্টি কচি চোখের দৃষ্টি আমার সারা মুখের ওপর দিয়ে বুলিয়ে নিয়ে বললো, আমার নাম স্বপন।

একটি মুহূর্ত থেমে আমাকে আবার প্রশ্ন করল, তোমার নাম কি?

স্বপন নামটা শুনে হঠাৎ অনেকদিন পর ভুলে-যাওয়া অতীতের একটা স্বপ্নের কথা মুহূর্তের জন্য আমার সারা মনকে আচ্ছন্ন করে দিল।

চিন্তার অবকাশ পেলাম না। স্বপন আমার হাতটা ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললো, বল না, তোমার কি নাম?

হাসি মুখে উত্তর দিলাম, আমার নাম তাপস।

আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে স্বপন ছুটে গেল টুরিস্ট ক্লাসের দিকে।

স্বপন চলে গেল, কিন্তু অতীত দিনের স্মৃতি স্বপ্নের মেঘ আমার মনের আকাশ আচ্ছন্ন করে দিল। ভুলে গেলাম কাশ্মীর সমস্যা, আসন্ন সিকিউরিটি কাউন্সিলের অধিবেশনের কথা; ভুলে গেলাম আজকের আমাকে, ভুলে গেলাম ইণ্ডিয়ান হাই কমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারী তাপস সেনকে।

…বাবা মারা যাবার পর কাকিমার কৃপায় তাপসের পক্ষে কাকার সংসারে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে আর একটা দিনও নষ্ট করেনি। পাটনায় কাকা-কাকিমাকে প্রণাম করে চড়ে পড়ল ট্রেনে। চলে এলো কলকাতায় মাসিমার কাছে। পিতৃ-মাতৃহীন তাপসকে আপন সন্তানজ্ঞানে মাসিমা নিজের সংসারে ঠাঁই দিলেন।

ফার্স্ট ডিভিসনেই পাস করল তাপস। ভর্তি হল স্কটিশ চার্চে। সঙ্গে সঙ্গে গোটা দুই টিউশনিও যোগাড় করে নিল নিজের খরচপত্র চালাবার জন্য। মাসিমা ও মেসোমশাই দুজনে আপত্তি করেছিলেন। তাপস বলেছিল, পরিশ্রম করে আয় করার মধ্যে একটা আনন্দ ও আত্মতৃপ্তি আছে। তাছাড়া আজে বাজে সময় নষ্ট না করে দুটি ছাত্র পড়ালে ক্ষতি কি? মাসিমা মেসোমশাই আর আপত্তি করেননি।

জনক রোড থেকে স্কটিশ চার্চে যেতে চল্লিশ মিনিটের মতো সময় লাগে। দশটা নাগাত বাড়ি থেকে বেরিয়ে লেক মার্কেটে এসে ২বি বাস ধরে তাপস রোজ কলেজ যায়। আবার চারটে নাগাত রওনা হয়ে পৌনে পাঁচটার মধ্যে ফিরে আসে। ঐ সময় ২বি বাসে স্কটিশ বেথুনের অনেক ছেলেমেয়েই প্রতিদিন যাতায়াত করে। বেশ কয়েক মাস পরে তাপস আবিষ্কার করল পরাশর রোড থেকে বেরিয়ে একটি মাত্র মেয়েই প্রায় নিত্যই ওই বাসে বেথুনে যায়, আসে। বছর খানেক পরে দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে মুখে শুধু একটু হাসির রেখা ফোটাত। কিন্তু তার বেশী নয়।

আরও মাস ছয়েক বাদে একদিন দুজনে পাশাপাশি বসে কলেজ গিয়েছিল। তাপস ইচ্ছা করে লেডিস্ সীটে ওর পাশে বসেনি। পাশের সীটটা খালিই ছিল এবং কোন মহিলা যাত্রীও ছিলেন না।

ইশারায় আমন্ত্রণ পেয়েই তাপস পাশে বসেছিল। দুজনেরই মধ্যে প্রায় অজান্তে একটা সেতুবন্ধন রচনা হচ্ছিল। বাস-স্টপে এসে না দেখা হলে অদর্শনের অতৃপ্তি দুজনেই অনুভব করত।

প্রায় দুবছর পর, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার মাত্র কিছুকাল আগে দুজনের মধ্যে প্রথম কথা হলো। তাপস জিজ্ঞাসা করল, আপনাদের টেস্ট কবে থেকে?

এই তো আগামী পনেরোই থেকে শুরু। একটু থেমে পালটা প্রশ্ন এলো, আপনাদের?

সতেরোই, বুধবার থেকে।

এমনি করে মন্থর গতিতে অত্যন্ত সংযতভাবে এগিয়ে চলেছিল দুটি জীবন। টেস্ট আরম্ভ হলো, শেষ হলো। একদিন ফাইন্যাল পরীক্ষা আরম্ভ হলো, শেষ হলো। তাপস ইকনমিক্সে অনার্স নিয়ে স্কটিশ চার্চেই বি-এ পড়া শুরু করল। ক্লাস আরম্ভ হবার পরই লেক মার্কেট বাসস্টপে খুঁজেছিল সেই পরিচিতার মুখ, কিন্তু পায়নি। ভেবেছিল হয়তো আর কোনদিন তার দেখা পাবে না। হয়তো একটু হতাশ হয়েছিল, হয়তো চাপা দীর্ঘ নিঃশ্বাসও পড়েছিল সবার অলক্ষ্যে। কিন্তু বিধাতাপুরুষের খামখেয়ালীর খেলা পূর্ণ করবার জন্য অকস্মাৎ আবার দুটি প্রাণের, দুটি মনের সাক্ষাৎ হয়েছিল ঐ লেক মার্কেট স্টপেই।

দীর্ঘদিনের অদর্শনের বেদনা বোধকরি দুটি প্রাণে একই সুরে, একই তালে, একই সময় বেজে উঠেছিল। দুজনে প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠল, আরে, আপনি যে! দুজনেই হেসে ফেলেছিল, দুজনেই লজ্জা পেয়েছিল। বাস-স্টপের অন্যান্য যাত্রীদের চাপা অথচ বিশেষ অর্থমূলক হাসি দুজনকে আরো বেশী লজ্জিত করেছিল।

পাঁচই আগস্টও দুজনে কলেজে এসেছিল, কিন্তু হঠাৎ সেদিন সারা কলকাতায় আগুন জ্বলে উঠেছিল। কলেজের ফটক থেকে ছেলেমেয়েরা ফেরত গেল। ইতিমধ্যে খবর এলে শ্যামবাজারের পাঁচ মাথায় স্টেটবাসে আগুন লেগেছে, ইউনিভার্সিটির সামনে পুলিশ গুলী ছুঁড়েছে, বৌবাজারে টিয়ারগ্যাস ফাটছে। ব্রাহ্মণের রাগ ও খড়ের আগুনের মতো কলকাতা শহরটাও মাঝে মাঝেই দপ করে জ্বলে ওঠে। একেবারে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সেদিনও এমনি করেই কলকাতা জ্বলে উঠেছিল।

হেদুয়ার কোণায় ছেলেমেয়েদের ভীড়ের মধ্যে আবার দুজনের দেখা।

বাড়ি যাবেন না?

নিশ্চয়ই যাব।

তবে চলুন না!

কিসে যাব বলুন? ট্রাম নেই, বাস নেই, ট্যাক্সি নেই, রিক্সা নেই, কি করে যাব?

তাপসের কথায় চিন্তার রেখা ফুটে উঠল লীনার কপালে, উজ্জ্বল দুটো চোখ ম্রিয়মাণ হয়ে গেল। দু-চার মিনিট দুজনেই চুপচাপ থাকার পর লীনা প্রস্তাব করল, চলুন, সার্কুলার রোডের দিকে যাই।

চলুন।

সেই দিনটির কথা তাপস-লীনার পক্ষে জীবনেও ভোলা সম্ভব নয়। সার্কুলার রোডে এসে যে রিক্সাওয়ালা শিয়ালদ’ পর্যন্ত যেতে রাজী হয়েছিল, রাজাবাজারের মোড়ে পুলিসের গুলী দেখে সে রিক্সা ফেলে দৌড় মারল একটা দোকানের মধ্যে। লীনার হাত ধরে তাপসও আশ্রয় নিয়েছিল আর একটা দোকানের দোরগোড়ায়। প্রায় আধ ঘণ্টা পর দুজনে আবার নেমেছিল কিন্তু এবার আর কপালে একটা রিক্সাও জুটল না। হাঁটতে হাঁটতে এলো শিয়ালদ’। আবহাওয়াটা খুব থমথমে হলেও কোন গোলাগুলি চলছিল না তখন। অতি সন্তর্পণে শিয়ালদ’ পার হলো, পার হলো বৌবাজারের মোড়।

মৌলালীর কাছাকাছি আসতেই আবার দপ করে জ্বলে উঠল সারাটা অঞ্চল। কিছু লোক পুলিশের গাড়িতে ইট-পাটকেল ছুঁড়তেই পুলিশের উত্তর এলো টিয়ারগ্যাস ছুঁড়ে! দার্জিলিংয়ের মতো সারাটা রাস্তা টিয়ারগ্যাসের মেঘে ঢেকে ফেলল সারাটা অঞ্চল। ঐ অন্ধকারের মধ্যেই একটা টিয়ারগ্যাস শেল এসে পড়ল ওদের দুজনের কয়েক হাত দূরে। লীনা চিৎকার করে জড়িয়ে ধরেছিল তাপসকে। রুমাল দিয়ে লীনার চোখ দুটো চেপে ধরে তাপস লীনাকে নিয়ে পাশের কর্পোরেশনের ওয়ার্কশপে গিয়ে ভিক্ষা করে একটু জল যোগাড় করে লীনার চোখে মুখে ছিটিয়ে দিয়েছিল। রুমালটাও ভিজিয়ে নিয়েছিল।

কিছুক্ষণ বাদে সি-আই-টির নতুন রাস্তা ধরে আবার দুজনে হাঁটতে শুরু করেছিল। কিছুদূর চলার পর লীনা প্রশ্ন করল, আপনি নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত?

আপনার চাইতে কম।

একটু থেমে আবার লীনা প্রশ্ন করে, একটা কোল্ড ড্রিঙ্ক খাবেন?

আপনার বুঝি খেতে ইচ্ছে করছে?

লিণ্টন স্ট্রীটের কাছাকাছি এসে একটা পানের দোকান খোলা পাওয়া গেল। দু-বোতল কোল্ড ড্রিঙ্ক খেয়ে দুজনে আবার চলা শুরু করল। পার্ক সার্কাস ময়দানের কাছে এসে লীনা প্রস্তাব করল, চলুন, একটু বিশ্রাম করি, আর যেন পারছি না।

চলুন।

দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল হতে চলেছে। সূর্যের তেজে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। পাম গাছের ছায়ায় দুজনে অনেকক্ষণ বসে ছিল। নিজেদের সুখ-দুঃখ, মন প্রাণের কোন কথা সেদিন হয়নি, কথা হয়েছিল শুধু পড়াশোনার, কলেজের ক্লাসের, প্রফেসরদের।

অনেকক্ষণ পর তাপস প্রশ্ন করেছিল, আপনার বাবা মা নিশ্চয়ই আপনার জন্য খুব চিন্তা করছেন।

হ্যাঁ, তা একটু করছেন বৈকি। একটু থেমে, একটু হেসে টিপ্পনী জুড়ল লীনা, হাজার হোক মেয়ে তো, তার ওপর বয়স হয়েছে!

তা তো বটেই।

একটু পরে পালটা প্রশ্ন আসে, আপনার বাবা মাও নিশ্চয়ই খুব চিন্তা করছেন, তাই না?

না, তারা চিন্তা করছেন না।

কেন?

ঠোঁটটা কামড়ে, চোখ দুটোকে একটু নীচু করে তাপস উত্তর দিল, তারা কেউই নেই।

লীনা হঠাৎ একটু চঞ্চল হয়ে, একটু উতলা হয়ে বলল, তাই নাকি?

লীনা পর পর অনেকগুলো প্রশ্ন করেছিল। তাপস শুধু বলেছিল, তাপস সেনের জীবন কাহিনী বলার মতো নয়। শুধু জেনে রাখুন সে মাসিমার বাড়ি থাকে, স্কটিশ চার্চে বি-এ পড়ে। শেষে শুধু বলেছিল, আসুন না একদিন আমাদের বাড়ি, মাসিমা খুব খুশি হবেন।

হাসিমুখে লীনা বলেছিল, নিশ্চয়ই আসব।

দুদিন পরেই লীনা এসেছিল মাসিমার সঙ্গে দেখা করতে। মাসিমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, আলাপ হয়েছিল, অনেক গল্পও হয়েছিল কিন্তু তাপসকে দেখল না। অনেকক্ষণ বাদে লজ্জা সঙ্কোচ কাটিয়ে যতটা সম্ভব সহজ হয়ে লীনা একবার জিজ্ঞাসাই করে ফেলল, তাপসবাবুকে দেখছি না তো মাসিমা!

না মা, সে তত এখন বাড়িতে থাকে না, ছাত্র পড়াতে গেছে। ঘাড় বেঁকিয়ে ঘড়িটা দেখে নিয়ে বললেন, আর পনেরো মিনিটের মধ্যেই আসবে।

তাপস ফিরে লীনাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিল। লীনা আর অপেক্ষা করেনি, হাত ঘড়ি দেখে বলল, অনেকক্ষণ এসেছি, এবার চলি।

সিঁড়ি দিয়ে নীচে পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিল তাপস। সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় লীনা বলেছিল, কাল সন্ধ্যাবেলায় আমাদের বাড়ি আসবেন।

কেন?

মা বলেছেন।

কেন?

ধন্যবাদ জানাবেন বলে।

কেন?

সেদিন অত কষ্ট করে আমাকে নির্বিঘ্নে বাড়ি আসবার ব্যবস্থা করার জন্য

সন্ধ্যাবেলায় তো আমাকে ছাত্র পড়াতে হয়।

একদিন না হয় ছাত্র নাই পড়ালেন।

তাপস গিয়েছিল, তবে একটু দেরী করে। চা খেয়ে একটু গল্প করে লীনার মাকে একটা প্রণাম করেই উঠে পড়েছিল।

শুধু লীনার নয়, তার মায়েরও বেশ লেগেছিল তাপসকে। কয়েক দিনের মধ্যে লীনার মনে একটা আশ্চর্য বিপ্লব ঘটে গেল। চৈত্রের খরার পর যেমন হঠাৎ কালবৈশাখী এসে সব কিছু ওলট-পালট করে দেয়, সবার অলক্ষ্যে লীনার জীবনেও এমনি ভাবে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। ভালবাসল তাপসকে।

পরবর্তী আড়াইটা বছর স্বপ্নের মতো কেটে গেল। দুটি মন, দুটি প্রাণ মিশে একাকার হয়ে গেল। দুটি জাবিন, দুটি সুর, দুটি ধারা একই ছন্দে, একই তালে, একই দিকে, একই উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেল। জীবনের অর্থ বদলে গেল, বাঁচার আনন্দ তীব্র থেকে তীব্রতর হলো। দুটি স্বপ্নও মিশে এক হয়ে গেল। প্রত্যক্ষে মেলামেশা, অপ্রত্যক্ষে আত্মসমর্পণের পালা শেষ হলো।

আউটরাম ঘাটের ধার দিয়ে হেস্টিংসের দিকে এগোতে এগোতে লীনা প্রশ্ন করে, তোমার কি মনে হয় তোমার জীবনের সব অপূর্ণতা, সব প্রয়োজন, সব দাবি আমি মেটাতে পারব? পারব কি তোমাকে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করার কাজে সাহায্য করতে? তোমাকে সুখী করতে?

পায়ে চলা বন্ধ হয়, কিন্তু মন উড়ে চলে যায় অনাগত ভবিষ্যতের দিনগুলিতে।

তাপস বলে, নিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে নিশ্চয়ই পারবে।

কেন, আমার নিষ্ঠা সম্পর্কে তোমার মনে কি আজও সন্দেহ আছে?

না, তা নেই। তবে মানুষের মন তো! ক বছর আগে যেমন তোমার এই নিষ্ঠা ছিল না, কবছর পরে হয়তো এই নিষ্ঠা কমতে পারে, বাড়তে পারে।

তাপস কোন বিষয়েই বেশী কিছু আশা করে না। তার আশা আকাক্ষা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, সব বিষয়েই একটা সংযত ভাব আছে, তা লীনা ভাল ভাবেই জানে। তাই আর প্রশ্ন করে না।

মাসিমার মন-রাজ্যেও লীনার আধিপত্য বিস্তার হয়। কলেজ থেকে ফিরে সন্ধ্যা নাগাত একটিবার সে আসবেই মাসিমার খোঁজ নিতে। বাথরুম থেকে বেরুলে মাসিমাকে সিঁদুর পরিয়ে দিতে লীনার বড় ভাল লাগে। মনে মনে মাসিমারও ইচ্ছা করে লীনার সিঁথিতে টকটকে লাল সিঁদুরের একটা টান দিতে, কিন্তু সে আশার অভিব্যক্তি দেন না। সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে লীনা প্রণাম করে মাসিমাকে, মাসিমা বুকের মধ্যে টেনে নেন লীনাকে।

সেবার শীতকালে ঠাণ্ডা লেগে মাসিমা অসুস্থ হলে লীনা বিকালের দিকে রোজ রান্না করে গেছে। পরের দিন সকালের রান্না ফ্রিজে তুলে রেখেছে। মাসিমা আর ধৈর্য ধরতে পারেন না, কি বলব মা, তোমাকে কোনদিন বরণ করে ঘরে তুলতে পারব কি না জানি না, কিন্তু তার আগেই তুমি একে একে সব দায়িত্ব তুলে নিতে শুরু করলে!

লীনা কোন উত্তর দেয় না। হরলিকস আনার তাগিদে হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।……

আজ করাচী থেকে বেইরুটের পথে তাপসের মনে পড়ে সে-সব দিনের স্মৃতি। সেসব দিনের পর মনের মধ্যে আরো অনেক দিনের স্মৃতি জমেছে, কিন্তু তবুও লীনার স্মৃতি অম্লান হয়ে রয়েছে তার মনে। মনে পড়ে জন্মদিনের কথা। খুব ভোরবেলায় লীনা এসে চুরি করে একটা প্রণাম করে পালিয়ে যেত। বিকালের দিকে সরকারীভাবে এসে কিছু উপহার দিত। আর? আর শোনাত গান।

মনে পড়ছে আরো অনেক দিনের কথা।

..জানো তাপস, আমার প্রথম ছেলে হলে তার কি নাম রাখব?

না।

স্বপন।

তাপস বলে, মেয়ে হলে?

ছবি।

এই দুটো নাম বুঝি তোমার খুব পছন্দ?

লীনা বলেছিল, আমার জীবনের স্বপ্ন সার্থক করে যে ছেলে হবে, সে হবে আমার স্বপন। আর যে মেয়ে আমাদের আগামী দিনের ছবি বাস্তব করে দেখা দেবে, তার নাম হবে ছবি i…

কাঁচের জানালা দিয়ে দূরের আকাশের মিটমিট করা তারাগুলো দেখতে দেখতে নিজের জীবন আকাশের ঐশ্বর্যে ভরা দিনগুলির স্মৃতি মিটমিট করে জ্বলে উঠল। জনক রোডের জীবনে ঐ তারা দূরে ছিল না। আর আজ? তারা দূরে বহুদূরে চলে গেছে। ঐ আকাশ, ঐ তারা হাতছানি দিয়ে ডাক দেয়, কিন্তু হাতের নাগালের বাইরে।

আরো মনে পড়ে। মনে পড়ে শেষ অধ্যায়ের কথা। সমস্ত স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।

মাসিমার প্রস্তাব শুনে লীনার বাবা হেসেই উড়িয়ে দিলেন। বললেন, একটা অর্ডিনারী বি-এ পাস করা ছেলের সঙ্গে কি এই মেয়ের বিয়ে হতে পারে?

লীনার দাদা বারান্দায় দাঁড়িয়ে টিপ্পনী কেটেছিল, বলিহারি ছেলে রে বাবা! বাস-স্টপে দাঁড়িয়ে প্রেম করে বিয়ে করতে চায়।

মাসিমা অনেক বুঝিয়েছিলেন, তাপস সাধারণ ছেলে নয়, সে একদিন দশ জনের একজন হবেই।

শুধু শূন্যহাতে নয়, অজস্র, অপমানের বোঝা নিয়ে মাসিমা ফিরে এসেছিলেন।

লীনা কেঁদেছিল, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করেছিল, কিন্তু নিজের মনের কথা, প্রাণের ইচ্ছা জানাতে পারেনি লজ্জায়, সঙ্কোচে। সংস্কার তার কণ্ঠরোধ করেছিল। আরো অসংখ্য প্রেমের কাহিনীর মতো এদের কাহিনীও এইখানেই শেষ হলো।

যৌবনে সব বাঙালী মেয়েই প্রেমে পড়ে। যে বাঙালী মেয়ে বলে যৌবনে সে প্রেমে পড়েনি, সে হয় মিথ্যাবাদিনী, নয় তো মানসিক বিকারগ্রস্ত। দেহের মধ্যে নতুন জোয়ার আসার সঙ্গে সঙ্গে মনের রাজ্যে নতুন পলিমাটি পড়ে সে উর্বর হয়, ফুল ফোটে, ফসল ধরে। প্রেমের ফসল। ছোটবেলায় মেয়েরা পুতুল খেলা করে। বর সাজায়, বৌ সাজায়। তাদের বিয়ে দেয়, নেমন্তন্ন খাওয়ায়। পুতুলকে ছেলে সাজায়, আদর করে, কোলে নিয়ে দোল দিয়ে ঘুম পাড়ায়। আবার ঝিনুকবাটি নিয়ে দুধ খাওয়ায়, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করে, ওষুধ খাওয়ায়। খেলতে খেলতেই মেয়েরা হঠাৎ একদিন বড় হয়, তাদের অঙ্গে অঙ্গে যৌবন দেখা দেয়, দেহের নেশায় মাতাল হয়। পুতুল খেলা আর ভাল লাগে না। এবার মানুষ নিয়ে খেলা শুরু হয়। মেয়েরা খেলতে খেলতে শেখে, শেখে আগামী দিনগুলির জীবনধারার সঙ্গে নিজেদের মিশেয়ে দিতে।

লীনা পুতুল খেলার মতো তাপসের সঙ্গে খেলা করেনি। আত্মসমর্পণ করেছিল সে। তাপসের ভালবাসার ঐশ্বর্যে সে মন ভরিয়ে তুলেছিল, কিন্তু আর এগুতে পারেনি। নিজে মর্মে মর্মে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করেছে, কিন্তু একটি বারের জন্যও মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারেনি তার জীবনের চরম কাহিনী। মনে হয়েছে, একটি একটি করে বুকের পাঁজরাগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে, তবুও পারেনি বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে, দাদার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে।

তাপস আবার একদিন পাটনা ফিরে এম-এ পড়তে শুরু করল। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পক্ষীক্ষা দিয়ে ফরেন সার্ভিসে ঢুকল। একদিনের জন্য কলকাতা এসে মাসিমাকে প্রণাম করে চলে গেল জেনেভা। জীবনে আর পিছনে তাকায়নি। তাপস কলকাতা ছাড়ার পরই লীনার বিয়ে হয়েছিল, মাসিমা নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তাপস সেখবর পেয়েছিল। বিয়ের পরও মাসিমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত লীনা। কলকাতায় এলে দেখা করত। তাপস তাও জানত।

…আজ হঠাৎ এই প্লেনের মধ্যে ঐ ছোট্ট স্বপনকে দেখে মনে পড়ল সমস্ত স্মৃতি। ইচ্ছা করল একটি বারের জন্য স্বপনকে ডেকে এনে আদর করি। কিন্তু প্লেনের সবাই এখন ঘুমে কাতর। টুরিস্ট ক্লাসে উঁকি দিয়ে দেখলাম দুজন জাপানী ভদ্রলোক রিডিং-লাইট জ্বেলে বই পড়ছেন, আর সবাই ঘুমিয়ে আছেন। ভারতীয় যাত্রীদের কাছে এখন শেষরাত্তির হলেও, জাপানীদের ঘড়িতে এখন দুপুর। করাচী ছাড়ার পরই তারা ব্রেকফার্স্ট খেয়েছেন, বেইরুটের পরই লাঞ্চ খাবেন।

নিজের সীটে বসে আর-একবার বাইরের আকাশটা দেখে নিলাম। একটা সিগারেট ধরালাম। দু-তিন মিনিট বাদেই সারা প্লেনে আলো জ্বলে উঠল। ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে নিলাম। বুঝলাম বেইরুট এসে গেছি। ক’মিনিট বাদে এয়ার-হোস্টেস জানাল, আর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে আমরা বেইরুটে পৌঁছব। যাত্রীরা যেন ধুমপান বন্ধ করে সীট-বেল্ট বেঁধে নেন। এয়ারহোস্টেস আরো জানাল যে, বেইরুট থেকে নতুন বৈমানিক ও কর্মীরা বিমানের ভার নেবেন।

প্লেন বেইরুটে পৌঁছল। আমরা তিনজন প্রথম শ্রেণীর প্যাসেঞ্জার সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে একটা বাসে উঠে টার্মিনাল বিল্ডিং গেলাম। টুরিস্ট ক্লাসের ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন মেয়ে-পুরুষ যাত্রী আর একটা বাসে দু-এক মিনিট বাদেই টার্মিনাল বিল্ডিংয়ে এলেন। সবে একটা সিগারেট ধরিয়ে এলিভেটরের দিকে দু-পা বাড়িয়েছি, এমন সময় ছুটে এসে স্বপন আমার হাতটা ধরে বললে, আমি স্বপন।

টুক করে আদর করে কোলে তুলে নিয়ে আমি বললাম, তুমি বুঝি স্বপন?

গাল দুটো ফুলিয়ে চোখ দুটো টেনে টেনে বললো, আমিই তো স্বপন।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, স্বপন, তোমার বাবা-মা কোথায়?

আমার বাবা তো লণ্ডনে, তুমি জানোনা?

না তো।

তুমি আমার মাকে দেখেছ?

না তো।

স্বপন প্রায় হুড়মুড় করে আমার কোল থেকে নেমে আমার হাত ধরে টানতে টানতে বলল, এস না আমার মাকে দেখবে।

স্বপন আমার বাধা মানল না, টানতে টানতে হাজির করল তার মার কাছে। স্বপন বলল, এই তো আমার মা।

আমি তো প্রায় পাথরের মতো হয়ে কোন মতে উত্তর দিলাম, তাই বুঝি?

লীনা বলল, তুমি!

হ্যাঁ, আমি।

কেমন আছ?

খুব ভাল।

একটু থেমে পাল্টা প্রশ্ন করলাম আমি, তুমি কেমন আছ?

আমিও খুব ভাল আছি।

বেশ তো।

দুজনেই দুজনকে একবার প্রাণ ভরে দেখে নিলাম।

তোমার শরীর তো খারাপ হয়ে গেছে, আমি বললাম।

না, না, শরীর ঠিকই আছে। তোমার দেখার ভুল।

তাই নাকি?

লীনা হেসে মাথা নীচু করল।

দু-এক মিনিট নীরবতার মধ্য দিয়ে কেটে গেল। হঠাৎ স্বপন আমাকে প্রশ্ন করল, তুমি আমার মা-র গান শুনেছ?

এবার আমিও হেসে ফেললাম। স্বপনের গাল টিপে একটু আদর করে বললাম, বল না তোমার মাকে একটা গান শোনাতে।

দুহাত দিয়ে স্বপন মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, একটা গানকর না মা।

না বাবা, এখানে গান করে না, লীনা উত্তর দেয়।

আর সব প্যাসেঞ্জাররা উপরে লাউঞ্জে অথবা ডিউটি-ফ্রি শপে চলে গিয়েছিলেন। আমিও লীনা আর স্বপনকে নিয়ে উপরে গেলাম। লেবাননের মরুপ্রান্তরের উষ্ণ হাওয়ার বেইরুট এয়ারপোর্টের টার্মিনাল বিল্ডিংয়ে প্রবেশের অনুমতি নেই। সেখানে কৃত্রিম ঠাণ্ডা হাওয়ার রাজত্ব; কিন্তু তবুও লীনার সান্নিধ্যে বিচিত্র অনুভূতিতে আমার গলা বুক শুকিয়ে এলো। একটা চাপা উত্তেজনায় শরীরটা কেমন করে উঠল। আয় আয় চাঁদ আয় মুখে বলা যায়, কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি চাঁদ এসে হাজির হয়, তাহলে অপ্রত্যাশিত অনেক কিছু ঘটতে পারে। সারা প্লেনে লীনাকে স্বপ্ন দেখেছি, তার কথা ভেবেছি, তার প্রতিটি স্মৃতি রোমন্থন করেছি। না-পাওয়ার বেদনার মধ্যেও একটু যেন সুখের, একটু যেন তৃপ্তির স্বাদ পাচ্ছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্নের লীনা, স্মৃতির লীনা, কাহিনীর লীনাকে আজ দীর্ঘদিন বাদে পাশে পেয়ে আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত চাঞ্চল্য দেখা দিল। বাইরে তার কোন প্রকাশ হতে দিলাম না, কিন্তু নিজে ভিতরে ভিতরে অসহ্য যন্ত্রণাভোগ করতে লাগলাম।

স্বপনকে চকোলেট কিনে দুবোতল কোল্ড ড্রিংক নিলাম, একটা বোতল লীনাকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, এই নাও। আর কি খাবে?

কিছু না। তুমি কিছু খাবে?

না।

খাও না কিছু। আমি খাওয়াচ্ছি।

একটু চুপ করে উত্তর দিলাম, তুমি আদর করে, যত্ন করে, ভালবেসে খাওয়াবে, সে সৌভাগ্য করে তো-আমি জন্মাইনি। সেজন্য কয়েকটা মুহূর্তের জন্য সে আনন্দ, সে সৌভাগ্য, সে তৃপ্তিভোগ করে লাভ কি?

লীনা চুপ করে মাথাটা নীচু করল।

একটু পরে স্বপনের হাত ধরে ডিউটি-ফ্রি শপিং সেন্টারে ঢুকলাম। বাঁদিকে জুয়েলার্সের দোকানের সামনে এসে হঠাৎ লীনার হাতটা চেপে ধরে বললাম, একটা অনুরোধ রাখবে?

কি অনুরোধ?

আজ বুঝি কৈফিয়ৎ তলব না করে আমার অনুরোধ রাখা সম্ভব নয়?

না, ঠিক তা নয় তবে…

তবে আবার কি?

দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে লীনা কি যেন মনে একটা ফন্দী আঁটল। বলল, দুটি শর্তে তোমার অনুরোধ রক্ষা করতে পারি।

শুনি কি শর্ত।

প্রথম কথা আমি যা দেব, তোমায় খেতে হবে, আর দ্বিতীয়তঃ প্লেনে আমাদের কাছে বসবে।

দুঃখের মধ্যেও একটু না হেসে পারলাম না। বললাম, তথাস্তু।

তারপর জুয়েলার্স সপে ঢুকে আঠারো পাউণ্ড দিয়ে বেশ একটা পছন্দসই সুইস ঘড়ি কিনে নিজে লীনার হাতে পরিয়ে দিলাম। লীনা কোন প্রতিবাদ, কোন মন্তব্য জানাল না, শুধু স্তব্ধ হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।

শপিং সেন্টার থেকে আবার স্ন্যাক বারে ফিরে লীনার শর্ত পূরণ করে একপেট খেলাম। দুজনে দুকাপ কফিও নিলাম।

একটু পরেই অ্যানাউন্সমেন্ট হলো রোম, জেনিভা, লণ্ডন, নিউইয়র্কগামী প্যান-আমেরিকানের যাত্রীদের উদ্দেশ্যে। যাত্রারম্ভের জন্য প্লেন প্রস্তুত। আমরা নীচে গেলাম। দুদরজা দিয়ে দুদিক দিয়ে প্লেনে চড়লাম। চীফ স্টুয়ার্টকে ডাক দিয়ে অনুরোধ করলাম, আমার এক আত্মীয়া মিসেস সরকার ও মাস্টার সরকার টুরিস্ট ক্লাসে আছেন। আমি কি তাদের পাশে বসতে পারি?

প্যাসেঞ্জার-চার্টটা দেখে চীফ স্টুয়ার্ট উত্তর দিল, উইথ প্লেজার সার।

ফার্স্ট ক্লাস কেবিন থেকে বেরিয়ে আমি লীনাদের পাশে বসলাম। সীটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে লীনা টিপ্পনী কাটল, আমি ভাবলাম ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে ঢোকার পর হয়তো আমাকে ভুলে গেলে।

ভুলতে পারলে হয়তো ভালই হতো। যদি নিজের সমস্ত অতীত স্মৃতি মুছে ফেলে সাধারণ ডিপ্লোম্যাটদের মতো হুইস্কির গেলাসে ডুব দিয়ে সর্বদেশের যুবতীদের উষ্ণ সান্নিধ্য উপভোগ করতে পারতাম, তবে হয়তো বুকের ভেতরটা এমন জ্বলে-পুড়ে ছারখার হতো না।

পূর্ব দিগন্ত থেকে সূর্যের তাড়া খেয়ে রাত্রির বুক চিরে প্লেনটা ছুটে চলেছিল রোমের দিকে। অফুরন্ত রাত্রির অন্ধকারের আমেজে যাত্রীরা কম্বল জড়িয়ে তখনও ঘুমোচ্ছেন। অনেকক্ষণ জেগে থাকার পর অনেকক্ষণ বসে বসে কাটাবার পর স্বপনও ঘুমিয়ে পড়ল। তিনটি সীটের মাঝের দুটি হাত তুলে দেওয়া হলো। জানালার দিকের সীটে স্বপনকে শুইয়ে লীনা আমার পাশ ঘেসে বসল। আমি বললাম, এত কাছে, এত নিবিড় হয়ে কেন?

লীনা একটিবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, জীবনে তো তোমাকে পেলাম না। মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য একটু কাছে বসছি, তাতেও তোমার আপত্তি? একটু থেমে বলল, জীবনে তো অনেক ইচ্ছাই পূর্ণ হলো না। ভগবান যখন অপ্রত্যাশিত ভাবে তোমাকে এই রাত্রিটুকুর জন্য পাইয়ে দিয়েছেন, তখন এই আনন্দ থেকে, এই সৌভাগ্য থেকে আমাকে বঞ্চিত কোরো না।

আমি কোন উত্তর দিলাম না। লীনা আস্তে আমার কাঁধের ওপর মাথা রেখে একটু কাত হলো।

বেশ লাগলো। হঠাৎ যেন মনে হলো আমি রাজা হয়েছি, মনে হলো, আমি যেন সব চাইতে সুখী লোক। মনে হলো, পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে রাণীকে নিয়ে চলেছি দেশ-দেশান্তর দেখতে।

কখন যে লীনার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে টেনে নিয়েছি, তা নিজেও টের পাইনি। কিছুক্ষণ পর লীনা আমার আর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে টেনে নিলে উপলব্ধি করলাম, দুটি হাতে দুটি প্রাণ আজ কত নিশ্চিন্তে, কত নির্ভয়ে, কত সহজে নির্ভরশীল।

হঠাৎ এয়ার-হোস্টেস এসে ব্রেকফার্স্ট দিয়ে গেল। জিজ্ঞাসা করল, স্যার, ইউ উইল হ্যাভ কফি অর টি?

কফি।

হোয়াট অ্যাবাউট ইওর ওয়াইফ, স্যার?

এয়ার-হোস্টেসের কথা শুনে চমকে উঠলাম। কে যেন আমার কণ্ঠস্বর রোধ করে ধরল, আমি কোন উত্তর দিতে পারলাম না।

একটি মুহূর্ত নষ্ট না করে লীনা উত্তর দিল, ক্যান আই ডিফার ফ্রম মাই হাসব্যাণ্ড?

একগাল হাসি হেসে এয়ার-হোস্টেসটি বলল, থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম।

বিদায় নেবার আগে এয়ার হোস্টেস এ-কথাও জানিয়ে গেল, আপনাদের ছেলের ঘুম ভাঙ্গলে আমাকে জানাবেন, আমি তার খাবার দিয়ে যাব।

এবারেও লীনা উত্তর দিল, থ্যাঙ্ক ইউ।

এবার আমার কণ্ঠস্বর ফিরে এলো। লীনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ কি করলে?

নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল, কি আর করলাম? আমাকে-তোমাকে স্বপনকে পাশাপাশি দেখে এয়ার-হোস্টেসের পক্ষে কি অন্য কিছু ভাবা সম্ভব?

ভেবে দেখলাম সত্যিই তো। তবুও জিজ্ঞাসা করলাম, তা তো বুঝলাম, কিন্তু তুমি তো সত্যি কথা বলতে পারতে?

আমি কেন তর্ক করব বল? দুনিয়াতে যে স্বীকৃতি আমাকে কেউ দেয়নি, সেই স্বীকৃতি আজ এই অপরিচিতা এয়ারহোস্টেসের কাছ থেকে পেলাম। আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, জীবনে কোনদিন ভুলব না এই এয়ার-হোস্টেসকে।

একটু থামল। আমার চিবুক ধরে আমার মুখটাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে লীনা প্রশ্ন করল, এয়ার-হোস্টেসের কথা তোমার ভাল লাগেনি? পারবে তুমি ওর এই কথা ভুলতে?

এমনি মিষ্টি আমেজ নিয়ে ভাসতে ভাসতে প্যান-আমেরিকানের পক্ষীরাজ এলো রোম, এলো জেনিভা। এলো লণ্ডন।

প্লেন থেকে বেরুবার আগে লীনাকে ধন্যবাদ জানালাম। আমাকে অপ্রত্যাশিত মর্যাদা অভাবনীয় স্বীকৃতি দেবার জন্য। উপদেশ দিলাম, সুখে থেকো, সাবধানে থেকো। আশ্বাস দিলাম, স্বামী পুত্র বা তোমার যে-কোন প্রয়োজনে যদি কোনদিন স্মরণ কর, তবে বুঝব আমার কৌমার্যের এই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছি।

স্বপনকে কোলে টেনে নিয়ে অনেক আদর করলাম। সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে আশীর্বাদ করলাম।

এক ফাঁকে হঠাৎ লীনা আমাকে প্রণাম করতে চমকে উঠলাম। আমি হাত তুলে আশীর্বাদ করার শক্তিটাও হারিয়ে ফেলেছিলাম। লীনার চোখের জলটা পর্যন্ত মুছিয়ে দিতে পারলাম না। আমার চোখের দৃষ্টিটাও ঝাপসা হয়ে উঠল।

লীনার কেবিন ব্যাগ ও আরো দুটো-তিনটে ছোটখাট জিনিসপত্র এক হাতে ও অন্য হাতে আমার ফেলট ওভারকোট ও ব্রীফ-কেস তুলে নিলাম। আমার পিছন পিছন স্বপনের হাত ধরে লীনা নেমে এলো।

তিন নম্বর ওসানিক বিল্ডিংয়ে হেলথ কাউন্টারের দিকে এগোতেই লীনার স্বামী কাঁচে-ঘেরা উপরের ভিজিটার্স গ্যালারি থেকে হাত নাড়লেন। স্বপন চিৎকার করে ঘোষণা করল, ঐ যে আমার বাবা। স্বামীর দিকে তাকিয়ে লীনা শুধু একটু শুকনো হাসি হাসল।

আমি ওদের নিয়ে হেলথ কাউন্টার থেকে পাশপোর্ট কাউন্টার হয়ে কাস্টমস কাউন্টারে এলাম। আমাদের লণ্ডন হাই কমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারী আমার বন্ধু মিঃ চারী আগে থেকেই কাস্টমস কাউন্টারে অপেক্ষা করছিলেন। হাই কমিশনের আরো দুজন স্টাফ এসেছিলেন আমার জন্য। তাঁরা আমার মালপত্র নিয়ে বাইরে চলে গেলেন। আমার অনুরোধে লীনাদের মালপত্রও তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই দেখে নিলেন কাস্টমস-এর একজন অফিসার। অফিসারটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা সবাই বাইরে এলাম।

বাইরের ঠাণ্ডার হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য আমি ওভারকোট পরে মাথায় ফেলট চাপিয়ে নিলাম। স্বপন ছুটে গিয়ে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল। খুব নরম গলায় লীনা পরিচয় করিয়ে দিল, ইনি হচ্ছেন মিঃ তাপস সেন। করাচী ইণ্ডিয়ান হাই কমিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারী এবং এখন চলেছেন ইউনাইটেড নেশনস এ। একটু থেমে বলল, প্লেনে পরিচয় হলো তোমার ছেলের দৌলতে। শুধু তাই নয়, তোমার ছেলের অনেক দৌরাত্ম্য সহ্য করেছেন, অনেক খামখেয়াল চরিতার্থ করেছেন এবং সর্বোপরি পথ দেখিয়ে মালপত্র টেনে এনে অশেষ উপকার করেছেন।

এরপর স্বামীর দিকে ফিরে শুধু বলল, ইনি আমার স্বামী মিঃ সরকার।

আমি হাতজোড় করে মিঃ সরকারকে নমস্কার করলাম। বললাম, আপনার স্ত্রী যে এত মিথ্যা কথা বলতে পারেন, তাতো ভাবিনি। আমার সম্পর্কে যে বক্তৃতা দিলেন তা একটুও সত্যি নয়। একটু ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিয়ে বললাম, দুনিয়াতে আমি বড় একা, বড় নিঃসঙ্গ। তাই স্বপন ও আপনার স্ত্রীর অশেষ কৃপায় কিছু সময়ের জন্য অন্তত নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। সেজন্য আমি ওঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।

স্বপনকে আর একটি বারের জন্য কোলে তুলে নিয়ে আদর করলাম। বললাম, কই, তুমি তো তোমার মার গান শোনালে না?

স্বপন বলল, মা, গাও না একটা গান।

আমরা সবাই না হেসে পারলাম না। মিঃ সরকারকে বললাম, বেশ ছেলেটি আপনার। ইচ্ছা করে চুরি করে পালাই।

মিঃ সরকার একটু হাসলেন।

আমি আর একবার মিঃ সরকারকে নমস্কার করলাম, স্বপনকে আদর করলাম এবং সব শেষে লীনাকে বললাম, আপনাকে ও আপনার ছেলেকে হয়তো অনেকদিন মনে রাখব, ক্ষমা করবেন।

আমি আর কালবিলম্ব না করে বিদায় নিয়ে মিঃ চারীর সঙ্গে জনাকীর্ণ লণ্ডনের রাজপথে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম।…

তাপস বিদায় নেবার পরও কয়েকটা মুহূর্ত লীনা নিশ্চয় পাথরের মতো তারই পথের দিকে চেয়েছিল।

মিঃ সরকার বললেন, তুমি ওঁর পুরো ঠিকানাটা রেখেছ?

লীনা শুধু মাথা নেড়ে জানাল, না।

সেকি! অতবড় একটা ডিপ্লোম্যাটের সঙ্গে আলাপ হলো অথচ তার ঠিকানাটা রাখলে না?

লীনা শুধু বলল, ভুলে গেছি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত