বিধাতা পুরুষের ঔদার্য অনেক

বিধাতা পুরুষের ঔদার্য অনেক

বিধাতা পুরুষের ঔদার্য অনেক, কিন্তু কৃপণতাও কম নয়। এই দুনিয়ার সর্বত্র তাঁর বদান্যতার প্রকাশ। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে রয়েছে কৃপণ মনোবৃত্তির অসংখ্য পরিচয়। এই পৃথিবীর একদিকে যখন আলো, অন্যদিকে তখনই অন্ধকারের রাজত্ব চলে। অনন্তকাল ধরে এই সনাতন নিয়ম পৃথিবীর বুকে রাজত্ব করে চলেছে। পৃথিবীর দুটি দিক একই সঙ্গে সূর্যের আলোয় ভরে উঠবে না, অন্ধকারের মধ্যেও-ডুব দেবে না।

এই পৃথিবীর বুকে যে মানুষের বাস তার জীবনেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নেই! অজস্র কোটি কোটি মানুষের মধ্যে ভগবান একটি পরিপূর্ণ সুখী মানুষ তৈরী করতে পারেননি। জীবনের একদিকে যার আলোয় ভরে গেছে, সাফল্যে ঝলমল করে উঠেছে, তারই জীবনের অপর দিকে নিশ্চয়ই অন্ধকারের রাজত্ব। সমাজ সংসার যার মুখের হাসির খবর রাখে, যার সাফল্যের ইতিহাস জানে, তার মনের কান্না, ব্যক্তিগত জীবনের চরম ব্যর্থতার কাহিনী সবাই না জানলেও তা সত্য। এই দুনিয়ায় কেউ প্রকাশ্যে, কেউ লুকিয়ে কাঁদে, কিন্তু কাঁদে সবাই। অত বড় সার্থক, সাফল্যমণ্ডিত ডিপ্লোম্যাট মিঃ পরিমল বোসও কাঁদতেন। তবে তার চোখের জলের কাহিনী, ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতার ইতিহাস কেউ জানে না, জানবেও না।

ভারতবর্ষের ফরেন সার্ভিসের সবাই পরিমল বোসকে চেনেন। তাঁর সুখ্যাতির কাহিনী ভারতের প্রায় সমস্ত দূতাবাসে শোনা যাবে, শোনা যাবে দিল্লীর সাউথ ব্লকে ফরেন মিনিষ্ট্ৰীতে। লণ্ডনে ইণ্ডিয়ান হাই কমিশনে আসার আগে মিঃ বোস ওয়াশিংটন, কায়রো, মস্কো ও ইউনাইটেড নেশনস-এ কাজ করে বিশেষ সুখ্যাতি অর্জন করেন। অনেক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং সর্বত্রই ভারতের পররাষ্ট্র নীতি প্রচারে বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এই তো সেবার লণ্ডনে কমনওয়েলথ প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনে শেষের দিন মূল ইস্তাহার নিয়ে ভীষণ মতভেদ দেখা দিল কয়েকটি দেশের মধ্যে। মার্লবোরা হাউসের কনফারেন্স চেম্বারে ঝড় বয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য মিঃ বোসের ড্রাফট্‌ মেনে নিলেন সবাই।

পরে ক্ল্যারিজেস হোটেলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মিঃ বোসের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। দিল্লী ফিরে বিজ্ঞান ভবনে এক বিরাট সাংবাদিক সম্মেলনেও মিঃ বোসের কূটনৈতিক বুদ্ধির প্রশংসা করতে তিনি দ্বিধা করেননি।

কর্মজীবনে ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছেন মিঃ বোস। সার্থক, সাফল্যমণ্ডিত ডিপ্লোম্যাট মিঃ পরিমল বোসের খবর সবাই জানেন, জানেন না তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বিচিত্র ও বেদনাভরা ইতিহাস…

…রিটায়ার করার ঠিক আগের বছর সোনার বাংলা দুটুকরো হলো। দেশ স্বাধীন হলো। প্রফুল্লবাবু সপরিবারে চলে এলেন কলকাতায়। সরকারী চাকরী থেকে রিটায়ার করার পরই প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের টাকায় মধ্যমগ্রাম দেশহিতৈষী কলোনীতে কয়েক কাঠা জমি কিনলেন, ছোট একটা মাথা গোঁজার আস্তানা তৈরী করলেন। একদিন মধ্যমগ্রামের যে জমি পতিত ছিল, যে জলাকীর্ণ বিস্তীর্ণ অঞ্চল মানুষের অগম্য ছিল, বছর কয়েকের মধ্যে সেইখানেই নবাগত কয়েক শ পরিবারের কলগুঞ্জনে মুখর হয়ে উঠল। দেখতে দেখতে নানা ধরনের ঘর বাড়ী উঠে পড়ল, ছন্নছাড়া কিছু মানুষ আবার স্বপ্ন দেখল ভবিষ্যতের। প্রথম বছর সম্ভব হয়নি, কিন্তু পরের বছরই দুর্গাপূজা শুরু হলো। কলোনীর একদল ছেলে-মেয়ে মিলে নববর্ষ রবীন্দ্র জয়ন্তী উৎসব চালু করল। কিছুদিনের মধ্যে দেশহিতৈষী পাঠাগারও গড়ে উঠল। প্রাণচঞ্চল নতুন কলোনীতে আরো অনেক কিছু হলো। মানুষে-মানুষে পরিবারে-পরিবারে হৃদ্যতার গাঁটছড়াও বাঁধা পড়ল।

বোসদের বাড়ীর পরেই একটা পুকুর। তার ওপাশে রাখালদাদের বাড়ী। এই কলোনীতে আসার পরই রাখালদার ছোট দুটি বোনের বিয়ে হলো। কলোনীর প্রায় সবাই এসে সাহায্য করেছিলেন বিয়েতে, কিন্তু পরিমলের মতো কেউ নয়। জামাইরা তো প্রথম প্রথম বুঝতেই পারেনি পরিমল ওদের আপন শালা নয়।

পরিমল যখন থার্ড ইয়ারে পড়ে তখন রাখালদার বিয়ে হয়েছিল। রাখালদার বাবার সঙ্গে পরিমলই প্রথম রাণাঘাট গিয়ে তার বীথিকা বৌদিকে দেখে এসেছিল। রংটা একটু চাপা হলেও দেখতে শুনতে বীথিকা বৌদিকে ভালই লেগেছিল। ক্লাস নাইন থেকে টেনে উঠেই পড়াশুনা ছাড়লেও পড়াশুনার চর্চা ছিল। গানবাজনা না জানলেও সখ ছিল। স্কুলে পড়ার সময় মাঝে মাঝে থিয়েটারও করেছেন।

বেশ ভাল ভাবেই রাখালদার বিয়ে হলো। প্রফুল্লবাবু বরকর্তা হয়ে গিয়েছিলেন আর পরিমলের পরই সব দায়িত্ব ছিল। বৌভাতের দিন শ দেড়েক লোক নিমন্ত্রিত হয়েছিল। তাঁদের আদর-অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে লাউড স্পীকারে রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনাবার ব্যবস্থা–সব কিছুই পরিমল করেছিল।

বীথিকা বৌদিকে বিয়ে করে রাখালদা বেশ সুখী হলেন। জীবনে যারা আকাশকুসুম কল্পনা করে না, যাদের চাওয়া ও পাওয়া দুটোই সীমাবদ্ধ, মনের মতন স্ত্রী পাওয়াই তাদের সব চাইতে বড় কাম্য। রাখালদা বিএ পাস করে ফেয়ারলি প্লেসে রেলের বুকিং অফিসে মোটামুটি ভালই চাকরি করতেন। মাইনে হয়তো খুব বেশী পেতেন না, কিন্তু পাকা সরকারী চাকরিতে অনেক শান্তি অনেক নির্ভরতা। তবে খাটুনি ছিল বেশ। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তেন আর বাড়ী ফিরতে ফিরতে প্রায় আটটা-সাড়ে আটটা বাজত। বেশীদিন সরকারী বা সওদাগরী অফিসে চাকরি করলে ছুটির দিন তাসখেলা ছাড়া বড় একটা সখ-আনন্দ কারুর থাকে না। রাখালদার সে সখও ছিল না। তবে হ্যাঁ, রবিবার দুপুরে একটু দিবানিদ্রা ও পরে ইভিনিং শোতে একটা সিনেমা দেখা তাঁর অনেকদিনের অভ্যাস।

বীথিকা বৌদির জীবনটাও একটা ছকের মধ্যে বাঁধা পড়ল। ভোরবেলায় উঠে রান্না-বান্না করে স্বামীকে অফিস পাঠানোই ছিল প্রথম ও প্রধান কাজ। রাখালদা অফিসে চলে গেলে শ্বশুর-শাশুড়ী ও নিজের রান্না করতেন। সকাল-সন্ধ্যা দুবেলা রান্নাঘর নিয়ে পড়ে থাকতে তার মন চাইত না। তাইতো শ্বশুর-শাশুড়ীর খাওয়া-দাওয়া হতে না হতেই রাত্রের রান্না শুরু করে দিতেন। নিজের খাওয়া-দাওয়া মিটতে মিটতে একটু বেলা হতো তবে ওবেলার কোন তাড়া থাকত না, এই যা শান্তি।

বেলা একটু পড়তে না পড়তেই রাখালদার মা উঠে পড়তেন। ইতিমধ্যেই একটু বিশ্রাম করে বীথিকা বৌদি যেতেন পরিমলের মা, মাসিমার কাছে। একটু গল্প-গুজব করতে না করতেই পরিমল ঠাকুরপো কলেজ থেকে ফিরত। তারপর বৌদির সঙ্গে শুরু হতো কলেজের গল্প। কলকাতার কলেজে প্রতিদিন কত মজার ঘটনাই ঘটে। বৌদি কলেজে যেতেন না, কিন্তু ঠাকুরপোর কাছে গল্প শুনে সে সব মজা উপভোগ করতেন। শুধু গল্প শোনানো নয়, পরিমল ঠাকুরপোর আরো অনেক কাজ ছিল। বই পড়া ছিল বৌদির নেশা। দেশহিতৈষী পাঠাগারে যেসব বই আছে, সেসব অনেকদিন আগেই পড়া। কলেজ লাইব্রেরী থেকে নিত্য বই আনা ছিল পরিমল ঠাকুরপোর অন্যতম প্রধান কাজ। সাপ্তাহিক-মাসিক পত্রিকাও নিত্য আসত। বৌদির ভীষণ ভাল লাগত। বিয়ের আগে রাণাঘাট শহরের যেখানেই কোন গানের জলসা হোক না কেন, বৌদি শুনতেন। বিয়ের পর এসব সখ-আনন্দের কথা প্রথম বলেছিলেন পরিমল ঠাকুরপোকে, আচ্ছা ঠাকুরপো, তোমাদের কলেজে বা এদিকে কোন পাড়ায় জলসা হয় না?

সে-কি বৌদি! তুমি কি একটা আশ্চর্য প্রশ্ন করলে বল তো? কলকাতার কলেজে শুধু গানের জলসা কেন, বক্তৃতার জলসা, পলিটিক্সের জলসা ও আরো কত রকমের জলসা হয়। হয় না শুধু পদ্য শুনার জলসা।

তাই নাকি ঠাকুরপো?

তবে আবার কি?

ঠাকুরপো একটু চুপ করে আবার শুরু করে, বাল্মিকীর মতো ভাল ইম্যাজিনেটিভ রাইটার বা কালিদাসের মতো ভাল রোমান্টিক কবি থাকলে একালে কলকাতার যে কোন এক একটি কলেজ নিয়ে রামায়ণ বা শকুন্তলার চাইতে আরো মোটা, আরো ভাল বই লিখতে পারতেন।

বৌদি একটু মুচকি হাসেন!

তুমি হাসছ বৌদি। কিন্তু বিশ্বাস কর, কলকাতার কলেজগুলো এক-একটি আজব চিড়িয়াখানা। ছাত্র-অধ্যাপক সবাই রসিক। আদিরস, বাৎসল্য, বীর-রস, ভয়-রস, বীভৎস-রস ও আরো অনেক রসের মশলা একত্রে যদি কোথাও পাওয়া যায়, তবে তা কলকাতার কলেজ।

পরিমল ঠাকুরপোর কাছে গল্প শুনতে বেশ লাগে বৌদির। কলেজের সোস্যালের সময় জলসার দুটো কার্ড জোগাড় করে পরিমল। রাখালদাকে কার্ড দুটো দিয়ে বলে, শুধু চীফ কমার্শিয়াল সুপারিনটেনডেন্টের সেবা না করে একটু বৌদির সেবাও করো।

রাখালদার জলসা-টলসায় কোন আগ্রহ নেই। এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। বলেন, তোর বৌদির যত বাতিক। মধ্যমগ্রাম থেকে ইউনিভার্সিটি ইনষ্টিটিউটে গিয়ে কটা আধুনিক গান শোনার কোন অর্থ হয়।

রাখালদাকে তবুও যেতে হয়। স্ত্রীর আব্দারের চাইতে পরিমলের আগ্রহকে অগ্রাহ্য করা তার কঠিন হয়। বৌদির কিন্তু বেশ লাগে। মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানান পরিমলকে।

রাখালদা নিতান্তই একজন ভদ্রলোক। কোন সাতে-পাঁচে নেই। কোন অহেতুক বাতিক নেই। কলোনীর সবার সঙ্গেই পরিচয় আছে, কিন্তু একটু অতিরিক্ত খাতির কারুর সঙ্গে নেই। পরিমল ও বৌদি দুজনেই মাঝে মাঝে সুবিধামত টিপ্পনী কাটেন রাখালদার অফিস নিয়ে। পরিমল বলে, রাখালদা, তুমি মোর লয়াল দ্যান দি কিং, রাজার চাইতে বেশী রাজভক্ত।

বৌদি বলেন, না, না, ঠাকুরপো। তোমার দাদা হচ্ছেন সি-সি-এস-এর ঘরজামাই।

রাখালদা এসব সমালোচনা মুচকি হাসি দিয়ে এড়িয়ে যান। শুধু বলেন, যার অফিস ফেয়ারলি প্লেসে সে কি করে আনফেয়ার হবে বলো?

নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে রাখার একটা আশ্চর্য ক্ষমতা আছে রাখালদার, কিন্তু পরিমল ঠিক তার বিপরীত। প্রতি পদক্ষেপে তার প্রাণশক্তির প্রকাশ। দেশহিতৈষী কলোনীর সব কিছুতেই সে সবার আগে। মাস তিনেকের অক্লান্ত পরিশ্রমে কলোনীর ছেলেদের সাহায্যে একটা চমৎকার পার্ক করেছে এই কলোনীরই একটা পতিত জমিতে। প্রত্যেক রাস্তার নামকরণ করে বোর্ড লাগিয়েছে, কেরোসিনের টিন কেটে রং মাখিয়ে ওয়েষ্ট বিন করে সব রাস্তায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। রবিবারের সাহিত্য-সভা, মেয়েদের জন্য পূর্ণিমা সম্মিলনী, বাচ্চাদের জন্য আগমনী সংসদও পরিমলের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এই কলোনীতে। এত কাজ করেও নিজের পড়াশুনায় বিন্দুমাত্র গাফিলতি নেই পরিমলের। এরই মধ্যে এক ফাঁকে মতিঝিল কলোনীতে দুটি ছেলেকে পড়িয়ে আসে।

বৌদি হচ্ছে পরিমলের প্রাইভেট সেক্রেটারী। এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র টাকাকড়ি জমা রাখে বৌদির কাছে। নিজের সংসারের টাকা-পয়সার কোন ঝামেলায় না থাকলেও পরিমলের অনেক সংসারের অনেক ঝামেলা পোহাতে হয় তাঁকে। তবুও ভাল লাগে তাঁর। নিজের সংসারের গণ্ডীবদ্ধ জীবনে পরিমল হচ্ছে তাঁর একমাত্র বাতায়ন এবং এই একটি বাতায়নের মধ্য দিয়েই তিনি বিরাট দুনিয়ার কিছুটা স্পর্শ, কিছুটা আনন্দ অনুভব করেন।

দিন এগিয়ে চলে।

পরিমল ইকনমিকসে অনার্স নিয়েই বিএ পাস করল। সারা দেশহিতৈষী কলোনীর সমস্ত মানুষগুলো আনন্দে আটখানা হয়ে পড়ল। পাড়ার ছেলেরা তাদের খোকনদাকে রিসেপশন দিল, পূর্ণিমা সম্মিলনীর মেয়েরা শাঁখ বাজিয়ে চন্দনের তিলক পরাল। এইসব কাণ্ডের মূল কিন্তু রাখালদা। রেজাল্ট বেরুবার দিন সবচাইতে আগে খবর নেন তিনি। কলেজ স্ট্রীট মার্কেট থেকে একটা চমৎকার ধুতি কিনে ট্যাকসি করে ছুটে এসেছিলেন কলোনীতে। চীৎকার করে সারা দুনিয়াকে জানিয়েছিলেন, পরিমল অনার্স নিয়ে পাস করেছে। বৌদিকে ঠেলে বের করে বলেছিলেন, ওগো, শীগগির সবাইকে খবর দাও আমাদের খোকন অনার্স নিয়ে পাস করেছে। উত্তেজনায় শুধু বৌদির ওপর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি। নিজে সারা কলোনী ঘুরে ছিলেন। গর্বের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন, ইকনমিকসে অনার্স পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়।

অনেকেই খেয়াল করলেন না কিন্তু বৌদি আর পরিমল দুজনেই খেয়াল করল যে বিয়ের পর এই প্রথম রাখাল সরকার অফিস কামাই করলেন।

শান্ত, স্নিগ্ধ, রাখালদার চাপা ভালবাসার প্রথম প্রকাশে দুজনেই মুগ্ধ হলেন।

সবাই বলেছিলেন এম-এ পড়তে, কিন্তু বৃদ্ধ বাবার পেন্সনের টাকায় আর পড়তে রাজী হলো না পরিমল। মতিঝিল কলোনীর একটা স্কুলে শ দেড়েক টাকায় মাস্টারী শুরু করে দিল।

ছাত্র থেকে মাস্টার হলো পরিমল, কিন্তু আর কিছু পরিবর্তন হলো না। এখনও রাত জেগে পড়াশুনা করে, ছাত্র পড়ায়, কলোনীর সব ব্যাপারে পুরো দমে মাথা ঘামায়, বৌদিকে নিয়ে আগের মতোই হৈ হুল্লোড় করে। সবাই খুশি। প্রফুল্লবাবু খুশি, তাঁর স্ত্রী খুশি; পরিমল খুশি, বৌদি খুশি, রাখালদা খুশি। কলোনীর সবাই খুশি। খুশির মধ্য দিয়েই আরো দুটো বছর কেটে গেল।

হঠাৎ একদিন পরিমল একটা নতুন স্যুট নিয়ে বাড়ী আসতেই বাবা-মা একসঙ্গে প্রশ্ন করলেন, কি ব্যাপার রে! চিরকাল ধুতি পাঞ্জাবি পরে কাটাবার পর এখন আবার কোট-প্যান্ট আনলি কেন?

পরিমল বলেছিল, কলেজের পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দিল্লী বেড়াতে যাচ্ছি। দিল্লীতে তো ভীষণ শীত, তাই কোট-প্যান্ট নিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ যদি ঠাণ্ডা লেগে অসুস্থ হয়ে পড়ি, সেই আর কি..

বাবা-মা বলেছিলেন, ভালই করেছিস।

মা সঙ্গে সঙ্গে ও-বাড়ী ছুটে গেলেন, জানো দিদি, জানো বৌমা, খোকন দিল্লী যাচ্ছে। ওখানে তো ভীষণ শীত তাই কোট-প্যান্টও কিনে এনেছে।

বৌদি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসেছিলেন এ বাড়ী। ঠাকুরপোর হাতটা ধরে একটা টান দিয়ে বললেন, ডুবে ডুবে জল খাওয়া কবে থেকে শিখলে ঠাকুরপো? তুমি যে দিল্লী যাবে, একথা তো একটিবারও আমাকে জানালে না।

বৌদির একটু অভিমান ভাঙ্গাবার জন্য একটু রসিকতা করে বললো, কি করি বল বৌদি! তোমরা তো বিয়ে-টিয়ে করে বেশ আছ। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো, আমার তো ওসব কিছু হবে না, তাই মন ভাল করার জন্য একটু কদিনের জন্য ঘুরে আসছি।

এক মুহূর্তে বৌদির সব অভিমান বিদায় নিল। ঠোঁটের চারপাশে হাসির রেখা ফুটে উঠল। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, আজই তোমার দাদাকে বলছি।

বেশ একটু চেঁচিয়েই পরিমল বললো, দোহাই তোমার, একটু তাড়াতাড়ি কর।

যাবার দিন রাখালদাই দায়িত্ব নিলেন পরিমলকে ট্রেনে তুলে দেবার। পরিমল বারবার বারণ করেছিল, কিন্তু রাখালদা বলেছিলেন, তা হয় না খোকন। তুই দিল্লী যাবি আর আমি স্টেশনে যাব না?

পাঁচটার সময় অফিস ছুটি হবার পরই রাখালদা হাওড়া রওনা হয়েছিলেন। একটু ঘুরে-ফিরে ট্রেন ছাড়বার অনেক আগেই প্ল্যাটফর্মে হাজির হলেন। একবার নয়, দুবার নয়, বহুবার সমস্ত থার্ডক্লাশ কম্পার্টমেন্ট তন্নতন্ন করে খুঁজলেন, কিন্তু পরিমলের দেখা পেলেন না। কি মনে করে সেকেণ্ড ক্লাশগুলোতে একবার দেখে নিলেন। তবুও পরিমলকে পেলেন না। ট্রেন ছাড়ার তখন মাত্র মিনিট পনেরো বাকি। একবার পুরো ট্রেনটাই ভাল করে খুঁজতে গিয়ে একটা ফার্স্ট ক্লাশ কামরায় পরিমলকে আবিষ্কার করলেন। রাখালদা তো অবাক। জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার রে খোকন? একবারে ফার্স্ট ক্লাশে করে দিল্লী চলেছিস!

পরিমল বলেছিল, কি আর করব? কোন ক্লাশে টিকিট না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই ফার্স্ট ক্লাশের টিকিট কেটেছি।

তা তোর আর সব বন্ধু-বান্ধব কই?

পরিমল ঘাবড়ে যায়। একটু সামলে নিয়ে বলে, ওরা সবাই কাল রওনা হবে। আমি একদিন আগে গিয়ে সব ব্যবস্থা করব কিনা তাই……

কয়েক মিনিট বাদেই দিল্লী মেল ছেড়ে দিল।

রাখালদা কি যেন মনে করে রিজার্ভেশন চার্ট দেখলেন। না তো অন্য কারুর পাশ নিয়ে তো যায়নি, নিজের নামেই তো রিজার্ভেশন। তবে নামের পাশে তো টিকিটের নম্বর নয়, ওটা তো একটা সরকারী পাশের নম্বর। রাখালদা একটু আশ্চর্য হন, একবার যেন চমকে ওঠেন। ফার্স্ট ক্লাশ পাশ! সে তো অনেক বড় বড় অফিসার পায়। তবে কি অন্য কিছু? রাখালদার মনে বেশ একটা আলোড়ন হয়।

রাত্রে শুয়ে বৌদিকে বলেন, জানো খোকন ফার্স্ট ক্লাশে করে দিল্লী গেল।

সে কি গো?

রাখালদা একটু চুপ করেন। আবার বলেন, তাছাড়া, টিকিট কিনে যায়নি, সরকারী পাশে গিয়েছে। ফার্স্ট ক্লাশ তো খুব বড় বড় অফিসাররা পায়। তাই ভাবছিলাম খোকন বোধহয় বেড়াতে যায়নি, নিশ্চয়ই অন্য কোন ব্যাপারে গিয়েছে।

বৌদিও একটু চিন্তিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর কেউই কাউকে কিছু বলেন না।

দিল্লী থেকে পরিমলের পৌঁছানোর সংবাদ এলো। দিন দশেকের মধ্যে আবার কলকাতায় ফিরেও এলো। শুধু কুতবমিনার-লালকেল্লার গল্প করল; আর কিছু বললো না।

মাস তিনেক আবার আগের মতো সহজ সরল হয়ে কাটিয়ে দিল পরিমল। স্কুল, টিউশানি, কলোনীর লাইব্রেরী, পূর্ণিমা সম্মিলনী, আগমনী সংবাদ, পার্ক-রাস্তাঘাট ও ওয়েষ্ট বিনের দেখাশুনা আর বৌদিকে নিয়েই বেশ কাটাল।

ইতিমধ্যে খবরের কাগজে নাম বেরিয়েছে, কিন্তু তবুও কাউকে কিছু বলেনি। যেদিন স্কুলে রেজেষ্ট্ৰী ডাকে আসল চিঠিখানা হাতে পেল সেইদিন বাড়ী ফিরে সবাইকে জানাল সে ইণ্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসে জয়েন করছে।

প্রফুল্লবাবু ও তার স্ত্রী আনন্দে চোখের জল ফেললেন। রাখালদা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন তার খোকনকে, কলোনীর ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। আর বৌদি? আনন্দে আর উত্তেজনায় সবার অলক্ষ্যে পরিমলকে দুহাত দিয়ে বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বিশ্বাস কর ঠাকুরপো, আমি জানতাম তুমি একদিন জীবনে নিশ্চয়ই উন্নতি করবে। হাত দুটো ছেড়ে দিয়ে মুখটা একটু ঘুরিয়ে নিলেন বৌদি। দুচোখ তাঁর জলে ভরে গেল। কি যেন বলতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরুল না। পরিমল সান্ত্বনা জানাতে চেয়েছিল, কিন্তু পারল না। মনের মধ্যে এমন কান্না গুমরে উঠল যে তারও স্বর বেরুল না গলা দিয়ে।

দেখতে দেখতে দিনগুলি কেটে গেল। আবার একদিন দিল্লী মেলে চড়ল পরিমল। বাবা-মা, রাখালদা-বৌদি, কলোনীর একদল ছেলেমেয়ে ছাড়াও অনেক মাস্টার ও ছাত্ররাও এসেছিলেন বিদায় জানাতে। ঐ ভীড়ের মধ্যেই এক ফাঁকে বৌদি একবার একপাশে একটু আড়ালে নিয়ে কানে কানে বলেছিলেন, আমাদের ছেড়ে যেতে তোমার কষ্ট হচ্ছে না ঠাকুরপো?

সে কথা কি মুখে না বললে তুমি বুঝতে পার না?

কেমন যেন একটু ব্যাকুল হয়ে বৌদি আবার প্রশ্ন করেন, বিলেত আমেরিকা গিয়ে কি তুমি আমাকে ভুলে যাবে?

বিদায়বেলায় বিয়োগব্যথার ঝঙ্কার বেজে উঠেছিল পরিমলের সারা মনে। বললো, চেষ্টা করেও বোধহয় এজীবনে তোমাকে ভুলতে পারব না।

বৌদির সারা মনের আকাশে শ্রাবণের ঘন কালো মেঘ জমে উঠেছিল, কিন্তু হঠাৎ তারই মধ্যে একটু বিদ্যুৎ চমকে একটু আলো ছিটিয়ে গেল। মুখে সামান্য একটু হাসির রেখা ফুটিয়ে বৌদি বললেন, সত্যি বলছ?

সত্যি বলছি।

সপ্তাহখানেক দিল্লীতে থেকে পরিমল গেল লণ্ডন। কেম্ব্রিজে তিন মাসের রিওরিয়েনটেশন কোর্স করে থার্ড সেক্রেটারী হয়ে চলে গেল ওয়াশিংটনে ইণ্ডিয়ান এম্বাসীতে। দুটি বছর কেটে গেল সেখানে। তারপর সেকেণ্ড সেক্রেটারী হয়ে মস্কোয়, কায়রোয়। তারপর আবার প্রমোশন। ফার্স্ট সেক্রেটারী হয়ে প্রথমে ইউনাইটেড নেশনস-এ, পরে লণ্ডন ইণ্ডিয়ান হাইকমিশনে। কর্মজীবনের এই চাঞ্চল্যকর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মনও বিচিত্র পথে মোড় ঘুরেছে। অতীতের সব হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট করে দিয়েছে।

ফরেন সার্ভিসের সার্থক ডিপ্লোম্যাট হয়েও পরিমল পুরোপুরি মিশিয়ে দিতে পারেনি কূটনৈতিক দুনিয়ার আর পাঁচজনের সঙ্গে নিজের জীবন, অতীতের আদর্শ নিয়ে আজও ছিনিমিনি খেলতে শেখে নি সে। ওয়াশিংটনের পেনসিলভানিয়া এভিনিউ, মস্কোর রেড স্কোয়ার, লণ্ডনের পিকাডিলী সার্কাসের চাইতে মধ্যমগ্রামের দেশ হিতৈষী কলোনীকে আজও সে বেশী ভালবাসে। মিস অ্যালেন, মিসেস চোপরা, মিস চৌধুরী, মিস রঙ্গনাথন, মিসেস যোশীর অনেক আকর্ষণের স্মৃতি ছাপিয়ে মনে পড়ে শুধু বৌদিকেই। আশ-পাশের অনেক মানুষের চাইতে অনেক বেশী মনে পড়ে দেশহিতৈষী কলোনীর অর্ধমৃত মানুষকে। ওয়াশিংটন, মস্কো, কায়রো, নিউইয়র্ক, লণ্ডনকে ভাল লেগেছে, কিন্তু দেশহিতৈষী কলোনীর মতো এদের সঙ্গে কোন প্রাণের টান অনুভব করে নি। ফরেন সার্ভিসের সহকর্মী মিত্তিরের ভালবাসায় মুগ্ধ হয়েছে, কিন্তু রাখালদার শূন্য আসন পূর্ণ করতে পারে নি। তাইতো হোমলিভ পেলে একটি মুহূর্ত নষ্ট করে নি, ছুটে এসেছে কলকাতায়, মধ্যমগ্রামের দেশহিতৈষী কলোনীতে।

ওয়াশিংটন থেকে মস্কো বদলী হবার সময় তিন মাসের হোমলিভে ছুটে এসেছিল কলকাতা। প্রায় সারা দেশহিতৈষী কলোনীর সবাই এসেছিলেন দমদম এয়ারপোর্টে। কাস্টমস এলাকার বাইরে সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। অন্যান্য সব প্যাসেঞ্জারের আগে বেরিয়ে এলো পরিমল। অনেকেই ফিস ফিস করে বলাবলি করেছিলেন, দেখছিস খোকনদার কি প্রেষ্টিজ।

রাখালদা বলেছিলেন, ওরে বাবা, হাজার হলেও ডিপ্লোম্যাট। খোকনের মালপত্তর ছোঁবার সাহস কোন কাস্টমস অফিসারের নেই।

সবাই একবাক্যে সে কথা স্বীকার করেছিলেন।

পরে অবশ্য পরিমল বলেছিল, আমাদের মতো যাদের ডিপ্লোম্যাটিক পাশপোর্ট থাকে তাদের সাধারণতঃ কাস্টমস কিছু বলে না। শুধু এদেশে নয়, পৃথিবীর সব দেশেই ডিপ্লোম্যাটরা এই সম্মান পান।

শুনে সবাই অবাক হয়েছিলেন। প্রথমে মা-বাবা ও রাখালদাকে প্রণাম করলেন। কলোনীর ছেলেমেয়েদের একটু আদর-টাদর করে চারপাশ তাকিয়ে নিলেন। বললেন, রাখালদা বৌদি আসেন নি?

রাখালদা একটু মুচকি হেসে বলেছিলেন, এসেছে কিন্তু ভেবেছে হয়তো তুই ওকে চিনতে পারবি না বা চিনতে তোর প্রেস্টিজে বাধবে। তাই ঐদিকে লুকিয়ে আছে।

বৌদির কি মাথাটা পুরোপুরিই খারাপ হয়ে গেছে, এই কথা বলেই পরিমল ছুটে গিয়েছিল বৌদির কাছে।

প্রথমে একটু প্রাণভরে দেখেছিল তার বৌদিকে, একটু হেসেছিল। তারপর বলেছিল, আমার আজকাল ভীষণ অহঙ্কার হয়েছে। তুমি কোন্ সাহসে এয়ারপোর্টে এলে।

বৌদির মুখের পর দিয়ে বেশ একটা তৃপ্তির হাসির ঢেউ খেলে গেল। বৌদি এবার একটু হাসলেন। তোমার তো অহঙ্কার করার কারণ আছে ঠাকুরপো। দৃষ্টিটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে বললেন, আজ তুমি কত বড় অফিসার, কত বড় বড় লোকের সঙ্গে মেলামেশা কর। কত টাকা রোজগার কর; সুতরাং আমার মতো একটা অতিসাধারণ মেয়ের পক্ষে তোমার কাছে আসতে সঙ্কোচ হওয়া স্বাভাবিক।

ব্যস ব্যস আর ঢং কোরো না, বাড়ী চল।

বৌদি সেদিন মুখে এসব কথা বললেও মনে মনে অসম্ভব গর্ববোধ করতেন তার ঠাকুরপোর জন্য। এই কলোনীতে তো এতগুলো বৌ আছে, কিন্তু কই ঠাকুরপো তো আমার মত আর কাউকে ভালবাসে নি। আমিই তো ওর সব চাইতে প্রিয়, সব চাইতে নিকট ছিলাম। সেদিন দমদম এয়ারপোর্টে ঠাকুপোর ঐ কটি কথায় খুব খুশী হয়েছিলেন বৌদি। মনে মনে শান্তি পেয়েছিলেন এই ভেবে যে পরিমল বোস ডিপ্লোম্যাট হয়েও তার ঠাকুরপো আছে।

মস্ত বড় অফিসার হয়ে বিলেত আমেরিকা ঘুরে এসেও পরিমলের যে কোনই পরিবর্তন হয় নি, একথা বুঝতে দেশহিতৈষী কলোনীর একটি মানুষেরও কষ্ট হলো না। সেই ধুতি সেই গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে লেগে পড়েছিল কলোনীর কাজে।

প্ৰথম কদিন কি ভীষণ উত্তেজনা ও হৈ-চৈ করেই না কাটল। মা-বাবা, রাখালদা-বৌদি ও আরো কয়েকজনের জন্য অনেক জিনিষপত্র এনেছিল পরিমল। সে সব নিয়েও কম হৈ-চৈ হলোনা। টেপ রেকর্ডারে কথাবার্তা টেপ করিয়ে নিয়ে বাজিয়ে শোনালে উত্তেজনা প্রায় চরমে পৌঁছাল!

প্রফুল্লবাবু ও তার স্ত্রী পুত্রের কল্যাণে কলোনীর সবাইকে মিষ্টি মুখ করালেন। জনে জনে আশীর্বাদ করলেন পরিমলকে।

রাখালদা পরের দিন নিউইয়র্কের ফিফথ এভিনিউর বিখ্যাত দোকান আলেকজাণ্ডারের টেরিলিন প্যান্ট, বুশ শার্ট পরে অফিস গেলেন। সি-সি-এস অফিসের প্রায় সবাই জানল, পরিমল বোস ছুটিতে বাড়ী এসেছে। বৌদি কিন্তু লজ্জায় ফ্রেঞ্চ শিফন শাড়িটি পরলেন না। বললেন, না ঠাকুরপো, এ শাড়ী পরে বেরুলে সবাই হাসবে।

একদিন পরিমল বৌদিকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিল। সেদিন ঠিকই শিফন শাড়ীটা পরেছিলেন। পরিমল জিজ্ঞাসা করেছিল, এ কি বৌদি সবাই হাসবে যে!

একটু হেসে বৌদি জবাব দিয়েছিল, ফরেন সার্ভিসের পরিমল বোসের সঙ্গে বেরুলে কেউ হাসবে না, বরং বলবে কি সিম্পল! তাই না ঠাকুরপো?

রিক্সা করে দমদম এয়ারপোর্টের মোড় অবধি এসে ট্যাক্সি ধরল পরিমল। তারপর সোজা ফেয়ারলি প্লেস বুকিং অফিসে। রাখালদা তো অবাক।

কি ব্যাপার রে খোকন?

কি আবার ব্যাপার। বৌদিকে নিয়ে সিনেমায় যাচ্ছি, তাই তোমাকে নিতে এলাম।

রাখালদা বললেন, নারে আমার অনেক কাজ। তোরাই যা। আমি আর তুই রবিবার যাব।

ঠাকুরপো, সি-সি-এস-এর জামাইকে অফিস ফাঁকি দিতে বলছ? ফেয়ারলি প্লেসে কাজ করে কিভাবে আনফেয়ার হয় বল।–বৌদি টিপ্পনী কাটলেন।

রাখালদা ঠাট্টা করে বললেন, আরে তুমি! এমন সেজেছ যে চিনতেই পারছি না।

পরিমল অনেক পীড়াপীড়ি করল। রাখালদা কানে কানে ফিস ফিস করে বললেন, এমন হঠাৎ কাজকর্ম ফেলে চলে যাওয়া ঠিক হবে না, তোরা আজকে যা। রবিবার আমরা তিনজনে একসঙ্গে যাব।

পরিমল বললো, ঠিক আছে। তাহলে শেষ পর্যন্ত তোমাদের রেলের ক্যান্টিনের ফিস ফ্রাই খাওয়াও।

রাখালদা ফিস ফ্রাই-এর অর্ডার দেবার পথে কানে কানে প্রায় সব সহকর্মীকে বললেন, ঐ হচ্ছে আমাদের খোকন। এখন বদলী হয়ে আমেরিকা থেকে রাশিয়া যাচ্ছে। বৌদিকে নিয়ে সিনেমা চলেছে।

প্রায় সবাই এক ঝলকে দেখে নিলেন পরিমলকে। কয়েকজন এসে আলাপও করেছিলেন, রাখালের কাছে আপনার কথা কত যে শুনেছি, তা বলবার নয় বলে।

সেদিন দুজনে সিনেমা দেখলেন, ঘুরলেন-ফিরলেন বেড়ালেন। রাত্রিতে বাড়ী ফেরার পথে ট্যাক্সিতে বসে বসে অনেক কথা হলো দুজনে।

জানো বৌদি, তোমার জন্য ভীষণ মন খারাপ করে। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে ছুটে আসি। একটু থেমে পরিমল বলে, অনেক মেয়ে দেখলাম, অনেকের সঙ্গেই আলাপ-পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, কিন্তু কই তোমার মতো একটিও পেলাম না।

বৌদিও বলেছিলেন, তুমি তো তোমার দাদাকে ভালভাবেই জানো। উনি আমাকে ভালবাসেন। কিন্তু আমার মনের খোরাক জোগাবার দিকে তাঁর কোন নজর নেই। তাই তো তুমি চলে যাবার পর আমার বড় কষ্ট হয়।

ভূপেন বসু এভিনিউ পিছনে ফেলে ট্যাক্সি শ্যামবাজারের পাঁচ মাথা ক্রশ করল। বৌদি আবার একটু বাইরে কি যেন দেখে নিলেন। বৌদি আবার বলেন, আজ কিন্তু আমার সব দুঃখ দুচে গেছে। তুমি যে এতবড় হয়েও, এতদেশ ঘুরে এসেও আমাকে ভুলে যাওনি, আমাকে যে ঠিক আগের মতনই ভালবাস, সেজন্য আমি খুব খুশি।

এমনি করে দেখতে দেখতে ছুটির দিনগুলি ফুরিয়ে আসে। পরিমল আবার একদিন দমদমের মাটি ছেড়ে উড়ে যায় আকাশে, চলে যায় মস্কো।

যে আকাশ-পথে পরিমল উড়ে গিয়েছিল, সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রাখালদা স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখেন পরিমল তাঁর আপন ভাই, দুজনে মিলে নতুন করে সোনার সংসার গড়ে তুলছেন।

রাত্রে রাখালদা ঘুমিয়ে পড়লে বৌদি পাশ ফিরে শুয়ে জানলার মধ্য দিয়ে শিউলি গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে দূরের আকাশ দেখতে দেখতে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেন নিজেকে। ঠাকুরপো তো আমার চাইতে দু-তিন বছরের বড়ই হবে। ওর সঙ্গেও তো আমার বিয়ে হতে পারত। আমিও ঐ আকাশ দিয়েই প্লেনে করে উড়ে যেতাম বিলেত, আমেরিকা, রাশিয়া ও আরো কত দেশ! কত সুখেই আমি থাকতাম! কত আদর, কত ভালবাসাই না পেতাম! কত বড় বড় লোকের সঙ্গে আমার আলাপ হতো, পরিচয় হতো! ঠাকুরপোর মতো আমাকে নিয়েও সারা কলোনীর সবাই মেতে উঠত।

ঐ একই আকাশের তলায় মস্কোয় নিঃসঙ্গ ডিপ্লোম্যাট পরিমল বোস স্বপ্ন দেখত, এই জীবনে যদি ঠিক আর একটা বৌদি পেতাম, তবে তাকে বিয়ে করে জীবনটাকে পূর্ণ করতাম। যার সঙ্গে মনের এত মিল, যার কাছে আমি আত্মসমর্পণ করে এত আনন্দ, এত তৃপ্তি পাই, তাকে যদি পেতাম এই জীবনে…

মুক্ত বিহঙ্গের মতো মন আরো কতদূর যেন ভেসে চলে যায়।

পরিমল আবার হোমলিভে আসে, আবার দমদমের ভীড় ঠেলে যায় বৌদির কাছে। আবার কটি দিন হাসিতে, খেলায়, আনন্দে দুজনের মন মেতে ওঠে। বৌদির গণ্ডীবদ্ধ জীবনে হঠাৎ জোয়ার আসে, পরিমলের সংযত জীবনে একটু যেন চঞ্চলতা আসে।

এরই ফাঁকে মা বিয়ের কথা বললে পরিমল বলে, বিলেত আমেরিকায় গেলে ছেলেরা ভাল থাকে না। অযথা বিয়ে দিয়ে কেন একটা মেয়ের সর্বনাশ করবে বল?

তুই আজকাল ভারী অসভ্য হচ্ছিল, মা মৃদু ভর্ৎসনা করেন তাঁর ছেলেকে।

পরিমল আবার ঐ একই আকাশ দিয়ে উড়ে চলে যায়। ঐ আকাশের দিকে তাকিয়েই আবার দুটি মন, প্রাণ ভেসে চলে যায় অচিন দেশে। একজন মধ্যপ্রাচ্যের প্রাণকেন্দ্র নীল নদীর পাড়ে কায়রোয়, আর একটি প্রাণ কলকাতা মহানগরীর উপকণ্ঠে, কিন্তু সবার অলক্ষ্যে দুটি প্রাণ একই স্বপ্ন দেখতে দেখতে মিলিত হয় ভূমধ্য মহাসাগরের পাড়ে কোনও এক দেশে। বৌদির সঙ্গে তার অনেক মিল পরিমল জানে, বৌদিও জানে ঠাকুরপোর মনের সঙ্গে তাঁর অনেক মিল। কিন্তু দুজনের কেউই জানে না একই আকাশ প্রতিদিন মাঝরাতে তাদের দুজনকে হাতছানি দিয়ে টেনে নিয়ে যায় স্বপ্নময় এক রাজ্যে।

শেষরাতের দিকে বৌদির চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে আসে। ঘুমের ঘোরে অচৈতন্য অবস্থায় রাখালদা বৌদিকে একটু নিবিড় করে কাছে টেনে নেন। তন্দ্রাচ্ছন্ন বৌদির বেশ লাগে সে নিবিড় স্পর্শ।

পরিমলের মন মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করতে চায়, আবার মাঝে মাঝেই ভেঙ্গে পড়ে। বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে বৌদির ফটোটা তুলে নেয়, অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কখন যে চোখের পাতা দুটো ভিজে ওঠে, তা টের পায় না। নিজের অজ্ঞাতসারেই বলে, বীথি! ইচ্ছা করে না আমার কাছে ছুটে আসতে? আদর করতে? ভালবাসতে? ইচ্ছে করে না–

হঠাৎ রাখালদার কথা মনে হয়। পরিমলের মাথাটা ঘুরে ওঠে।

তিন মাসের ছুটিতে আবার পরিমল এলো কলকাতা। দীর্ঘদিন পর দুর্গাপূজা দেখবে এবার। দেশহিতৈষী কলোনীর ছেলেরা মাতোয়ারা হয়ে উঠল আনন্দে। মা-বাবা, রাখালদা-বৌদি সবাই খুশি। পূজার এক মাস বাকী, কিন্তু তবুও একটি দিন নষ্ট করল না পরিমল। মেতে উঠল পুজার উদ্যোগ করতে। যশোর রোডের পর বিরাট ফেস্টুন টাঙান হলো, দেশহিতৈষী কলোনী সার্বজনীন দুর্গোৎসব। ব্যাপকভাবে উদ্যোগ আয়োজন হলো পূজার।

ভাদ্দুরে গোমড়ামুখো আকাশ হেসে উঠল, শরতের আকাশ হাসি মুখে দেখা দিল। বৌদির শোবার ঘরের পাশের শিউলি গাছটা ফুলে ভরে উঠল, গন্ধে মাতোয়ারা করল বৌদির মন। দশভূজা মা দুর্গা এলেন তার দরিদ্র সন্তানদের ঘরে।

নবমী পূজার দিন আরতি আরম্ভ হলে পূজা প্যাণ্ডেলেই মা বকাবকি শুরু করে দিলেন পরিমলকে। তুই কি আশ্চর্য ছেলে বল তো? এতদিন পর পূজায় বাড়ী এলি অথচ এতবার বলা সত্ত্বেও একটি বারের জন্যও নতুন জামা-কাপড়টা পরলি না?

বাবা বললেন, মার পূজার এই শেষ দিনে নিজের মাকে দুঃখ দিও না।

পাশ থেকে রাখালদা বললেন, ছিঃ খোকন! কেন এই সামান্য একটা ব্যাপারে মাসিমা-মেসোমশাইকে কষ্ট দিচ্ছ। যাও দৌড়ে গিয়ে নতুন কাপড় পরে এসো। আরতি শেষ হবার পর পরই তো আবার থিয়েটার শুরু করতে হবে।

বাধ্য হয়ে পরিমল বাড়ীর দিকে পা বাড়াল।

রাখালদাদের শিউলি গাছের তলা দিয়ে এগিয়ে এসে পুকুর পাড়ে আসতেই হঠাৎ বৌদির সঙ্গে মুখোমুখি দেখা।

কি গো বৌদি, তুমি এখনও আরতি দেখতে যাও নি?

আরতির পর একেবারে থিয়েটার দেখে ফিরব বলে সব ঠিকঠাক করে বেরুতে বেরুতে দেরী হয়ে গেল।

গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আবছা আলো ছড়িয়ে পড়েছিল পরিমলের মুখে। বৌদি এক ঝলক দেখে নেন। জিজ্ঞাসা করেন, তুমি এখন প্যাণ্ডেল ছেড়ে এদিকে এলে?

মাথায় একটু দুষ্ট বুদ্ধি আসে পরিমলের। বলে, তোমাকে একটু একা পাব বলে।

বৌদির মুখে একটু দুষ্টু হাসি খেলে যায়। একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে পরিমল এগিয়ে যায় বৌদির কাছে। মুহূর্তের জন্য দুজনেই মৌন হয়।

পরিমল যেন কেমন করে তাকায় বৌদির দিকে, বৌদি তাঁর স্বপ্নালু দৃষ্টি দিয়ে দেখেন ঠাকুরপোকে। দুজনেরই দীর্ঘ নিঃশ্বাস পড়েছিল একই সঙ্গে। হঠাৎ একটু হাওয়ায় মিষ্টি শিউলির গন্ধ ভেসে আসে। দুজনেই যেন মনে মনে মাতাল হয়ে ওঠে। এক টুকরো মেঘ ঢেকে দেয় শরতের চাঁদকে। সেই অন্ধকারে জ্বলে ওঠে দুজনের প্রাণের প্রদীপ। হারিয়ে যায় স্বপ্নরাজ্যের দেশে।

বৌদি একটু পা চালিয়ে যান প্যাণ্ডেলে। কিছুক্ষণ পরে নতুন কাপড়-জামা পরে পরিমলও ফিরে যায় প্যাণ্ডেলে। কাঁসর-ঘণ্টা-ঢাকের আওয়াজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাখালদা আরতি করতে মত্ত, কলোনীর সবাই সে আরতি দেখতে মত্ত। মত্ত হয়নি পরিমল, হয়নি বৌদি। তাঁদের দুজনের সলজ্জ দৃষ্টি বার বারই মিলেছিল মাঝ পথে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত