ডিটেক্টিভ মা এবং আমি

ডিটেক্টিভ মা এবং আমি

মেয়েরা যখন প্রেমে পরে তখন সারাদিনই কারনে অকারনে মুচকি মুচকি হাসে।এইটা আমার মা মনে মনে বিশ্বাস করেন।সেদিন কি কারনে যেন ফোন হাতে নিয়ে হাসছিলাম মা ভাবলো আমি কারো প্রেমময় মেসেজ পড়ে হাসছি।আমার প্রতি মা সন্দেহজনক দৃষ্টি ফেলে কিছুটা হাস্যকর ভঙ্গিতে বললেন-

-কি ব্যাপার!হাসছেন কেন?কে মেসেজ দিয়েছে? মায়ের এই কথা শোনার পর আমি আরও জোরে জোরে হাসার চেষ্টা করে বললাম-
-দিয়েছে একজন।বলা যাবে না।

মা রেগে গেলেন কি না জানি না।কিন্তু দ্বিধাদ্বন্দ্বটা হয়তো এখনো মনে কাজ করছে তার।মাঝেমাঝে এই কাজটা আমি ইচ্ছে করেই করি।মায়ের সামনে বসে ইচ্ছে ইচ্ছে করে অকারনেই মুচকি মুচকি হাসি কেননা এতে করে মা আরও বেশী সন্দেহ করবেন আর আমি এই জিনিসটাই উপভোগ করবো। সেদিন ল্যাপটপে বসে বসে ফেসবুক চালাচ্ছিলাম।মা যে কখন থেকে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আমার সাথে সাথে নিউজফিডের দিকে তাকিয়ে ছিলো খেয়ালই করি নি।নিউজফিড ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ একটি ছেলের ছবি চলে আসলো।সেই ছেলের ছবিটা দেখে মা কি ভাবলো জানি না।হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলো-

-এই ছেলেটা কে রে?তুই ওর ছবি দেখছিস কি জন্যে? প্রশ্নটা করা মাত্রই চমকে উঠলাম।পেছনে তাকিয়ে দেখলাম মা কঠোর দৃষ্টিতে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে আছে।আমি বললাম-

-মা,এইটা আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড।
-ছেলে ফ্রেন্ড?তোর সাথে কথা হয় ওর?
-হু হয়তো..
-দেখেই কেমন কেমন লাগছে।ওর সাথেই কি সারাক্ষণ কথা হয়? আমি হেসে বললাম-
-ফেসবুক ফ্রেন্ড মানে সারাদিন যে মেসেজে কথা বলে গল্প করতে হবে এমন কিছু না মা।
-তুই ল্যাপটপে তাকিয়ে এতো হাসিস কেন?এই ছেলেটা কি তোকে হাসির মেসেজ দেয়।
-ফেসবুকে তো শুধু একটা ছেলেই আমার ফ্রেন্ড লিস্টে নেই।আরও আছে।যখন যাদের ইচ্ছে হয় মেসেজ দেয়,আমি রিপ্লাই দেই।কখনো বা আমি মেসেজ দেই,ওরা রিপ্লাই দেয়।

মা ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবলো অতঃপর চলে গেলো।এইবার বুঝলাম আমার ল্যাপটপে ফেসবুক চালানোটাকেও মা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছেন। বিকেলবেলা বারান্দায় বসে বসে চা হাতে নিয়ে বাহিরের দৃশ্য দেখা আমার অভ্যাস।আজ বিকেলেও ঠিক একইভাবে বারান্দায় বসে চা কাপ হাতে নিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে যাচ্ছি।প্রায় অর্ধেক চা শেষ করেছি এমনসময় দেখলাম মা আসছে।মায়ের হাতেও চায়ের কাপ।একটা চেয়ার নিয়ে আমার পাশে বসে পরলো।মা কখনো আমার সাথে বারান্দায় বসে চা খায় নি।আজই প্রথম মা এই কাজটা করছে।আমি জিজ্ঞেস করলাম-

-মা,তুমি কি কিছু বলবে? মা বললো-
-তোর কাছে কেন মনে হলো যে আমি তোকে কিছু বলার জন্যই এখানে এসে বসেছি। আমি কিছু না বুঝার মতো করে বললাম-

-এমনি। চায়ে দুই চুমুক দিতেই মা তার উদ্দেশ্যমতো কথা শুরু করলো এবিং আমিও বুঝে গেলাম যে মা এখানে কি কারনে এসেছেন।মা বললো-
-বাহিরে কি দেখিস?কেউ কি দাঁড়িয়ে ছিলো তখন?
-কে দাঁড়িয়ে থাকবে?
-থাকতে পারে না…কতোই তো মানুষ আশা যাওয়া করে।আচ্ছা,বল তো এমন কি কেউ আছে যে তুই বারান্দায় এসে চা খেতে বসলেই দাঁড়িয়ে থাকে বকের মতো।

-এমন কেউ নেই।যদি তোমার মনে হয় যে এমন কেউ থাকে আর আমি তোমাকে বলতে চাচ্ছি না তাহলে কাল থেকে তুমি নিজেই আমার বদলে এখানে বসে বসে চা খেয়ো প্রতিদিন। মা কিছু চোখে পাতাগুলোকে ঝাপ্টে।চায়ের কাপ হাতে নিয়েই চলে গেলো। রাত হলেই মেয়েরা সেজেগুজে ছবি তুলবে এইটা এক ধরনের প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।সুতরাং আমিও এই প্রথা থেকে আলাদা কোনো মেয়ে নই।আমার যেদিন ছবি তুলতে ইচ্ছে করে সেদিন রাত হলেই ইচ্ছে মতো সাজি অতঃপর ছবি তুলি।রাত করে আজও সাজছি।ফোন নিয়ে সেলফিও তুলছি।আমার ডিটেক্টিভ মা বিষয়টাকে খেয়াল করলে।এই সেলফি তোলার কারনটা আজ ঘেটেঘুটে দেখে পর্যবেক্ষণ করে কারনটা সে জেনেই ছাড়বে মনে হচ্ছে।মা এলো এবং আমার পাশে বসে বললো-

-এতো সাজছিস কেন?কাউকে দেখাবি নাকি?
-কাকে দেখাবো আবার আমি!
-ওই যে ফেসবুক টেসবুক না চালাস..ওখানে দিবি নাকি!
-মা,আমি জানি তুমি কি বলতে চাচ্ছ।তোমার ধারণা সবসময়ই ভুল হয়।এইবারও তুমি যা ভাবছো তেমন কিছু না।

মা উঠে চলে গেলেন।ডিটেকটিভ মা এখনো আমার প্রেমিক খোঁজার অভিজানে আছেন। মা আমার যেই জিনিসটাকে সবচেয়ে বেশী অপছন্দ করেন সেটা হচ্ছে আমার মোবাইল ফোন।আমার হাতেমোবাইল ফোনটা দেখলে তিনি এতো বিরক্ত হন যে মাঝেমাঝে আমার অসুখ হলেও বলে আমি যেন মোবাইলটাকেই ওষুধ বানিয়ে গিলে খেয়ে ফেলি।তার পড়ালেখা করার সময় মোবাইলটা একবার হাতে দেখলেই মায়ের বিখ্যাত কথাগুলো শুনতে হয়। হঠাৎ মনে হলো মাকেই একটা ফেসবুক আইডি খুলে দিই।আমি ঠিক তাই করলাম।মাকে একটা ফেসবুক আইডি খুলে দিলাম এবং ফেসবুকের সবকিছু বুঝিয়েও দিলাম।ঘরের কাজ শেষ করে মা ফেসবুক চালায়।আগে টিভিতে যেই নাটক সিরিয়াল দেখতো সেটাও এখন দেখতে দেখা যায় না মাকে।মাঝেমাঝে দেখি ফোন হাতে নিয়ে মা হো হো করে হাসছেন।মা হাসলে মা যেই ভঙ্গিতে আমার কাছে হাসির কারন জানতে চাইতো এখন আমি সেই ভঙ্গিতে বলি-

-কি হলো!হাসছেন কেন! মা হেসে হেসে জবাব দেয়-
-দেখ পলক,এই ভিডিওটা।লোকটা আবল তাবোল বলে আর আমার হাসি পায়।

কিছুক্ষণ পর মা আবারও হেসে বললো-কেকা ফেরদৌসির রান্নার রেসিপি নিয়ে একটা মজার ভিডিও শেয়ার দিয়েছি তোকে।দেখলে তুইও খুব হাসবি। মা এখন নাটক সিরিয়াল কম দেখেন।সময় পেলেই ফেসবুক চালান।আমি সেজে ছবি তুললে মাও সেজে আমার পাশে দাঁড়ান সেল্ফি তোলার জন্য।অবশেষে আমার ডিটেক্টিভ মাতা আবিষ্কার করতে পেরেছেন যে মোবাইল ফোনে তাকিয়ে হাসির কারন শুধু প্রেমই হয় না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত